কথায় বলে বিবাহ এবং চাকরি ভাগ্যের ব্যাপার। কার কোথায় হবে বলা মুশকিল। আমাদের দেশে, আগেকার দিনে এবং এখনো বহু পরিবারে দেখে শুনে সম্বন্ধ করে বিয়ে দেওয়াটাই প্রচলন। তবে নিজে দেখে শুনে বিয়ের চল এখন বাড়ছে। আসলে বিয়ে শুধুমাত্র দুটো মানুষের এক সূত্রে জড়িয়ে পড়ার নাম নয়,তাদের সঙ্গে বাঁধা পড়ে দুটি পরিবার,তাদের সমস্ত আশা আকাঙ্খা সমেত।

Banglalive

আগে ছেলেরা বিয়ে করত মেয়েদের বিয়ে হতো। এখন যুগ পাল্টেছে। আজকাল মেয়েরাও স্বাবলম্বী, দেশে বিদেশে নানা ধরনের কর্মক্ষেত্রে সফল ভাবে এগিয়ে চলেছেন,তাই তাঁরাও আজ নিজে দেখে শুনেই বিয়ে করেন। বলতে পারেন বাবা মা-দের কাজ অনেকটাই কমে গিয়েছে। বিয়ের জন্য পাত্র এবং পাত্রী দেখাটা একটা লম্বা প্রক্রিয়া,যার শেষ সুখকর আদৌ হবে কিনা,তার গ্যারান্টী নেই। তাই নিজের সন্তানদের ওপরে ভার ছেড়ে দিয়ে আজকাল অনেক বাবা মা’ই নিশ্চিন্তে থাকেন। সংসার যখন তারা করবে,পছন্দটাও তারাই করে নিক!

তবে একটাই সমস্যা। চাকরির ক্ষেত্রে যেমন একটা নির্দিষ্ট পড়াশোনা শেষ করেই ঢুকে পড়া যায়,বিয়ের ব্যাপারটা অত সহজ নয়। ঠিক কবে বিয়ে করা উচিত,এই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কোন বয়েসটা সঠিক বয়েস বিয়ে করার জন্য? চাকরিতে ঢুকেই বিয়ে?নাকি কিছুদিন পরে,নাকি বেশ কিছুদিন পরে, কিছু নির্দিষ্ট লক্ষপূরণের পরে,সেই নিয়েই চলে দ্বিধা দ্বন্দ্ব ।

ছেলে মেয়ের সমানাধিকার-এর ব্যাপারে আমরা যতই গলা ফাটাই না কেন,বিবাহের উদ্দেশ্য এখনো মূলতঃ পারিবারিক বিলুপ্তিকরণ রোধ করতেই। সহজ ভাষায় বললে,সন্তান উৎপাদন এবং মানুষ করা। এই শুনে হয়তো নারীবাদীরা রে রে করে তেড়ে আসবেন,তবে কি মেয়েরা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র নাকি? ইত্যাদি প্রভৃতি। না,তা কখনোই নয়। তবে শুধু মাত্র একসাথে থাকতে চাইলে বিয়ের দরকার পড়ে না। আজকাল লিভ টুগেদার বৈধ এবং স্বীকৃত। অতএব বিয়ের আইনি ঝামেলায় না গিয়েও দুজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মহিলা এবং পুরুষ ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হতেই পারেন। তবে সন্তান হলে তার দায় দায়িত্ব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মায়ের ওপরে বর্তায়। একজন সন্তান প্রতিপালনে মা এবং বাবার ভূমিকা দুটোই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু মাত্র একটি মানুষের ওপরে সব দায় চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এসে পড়ে যদি বিয়ের আইনি স্বীকৃত না থাকে তো। এছাড়াও পারিবারিক সম্পত্তির ব্যাপারে যাতে ভবিষ্যতে কোনো রকমের আইনি সমস্যা না হয়,সেই জন্যই বিয়ের প্রয়োজনটা আরো বেশি করে পড়ে। তা বলে কি লিভ টুগেদার করে মানুষে সন্তান পালন করছেন না? অনেকেই করেন। তবে তার সংখ্যা এখনো অনেক কম। বাবা বা মা যাতে তার সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে না যেতে পারেন সেই জন্যই বিয়ের প্রয়োজনীয়তা। এছাড়াও আমাদের দেশে মেয়েদের অধিকার চিরকালই ছেলেদের চেয়ে একটু কম হিসেবে দেখা হয়। তাই বাড়ির বৌকে মেয়ে হিসেবে মেনে নেওয়ার সংখ্যা যেমন খুব কম ( জামাইকে আবার মাথায় তুলে রাখা হয়),তেমনি তাদেরকে সব রকম গুরুত্বপুর্ণ আলোচনা এবং ডিসিশন মেকিং থেকে দূরে রাখাও হয়। সে হোক না বৌ উচ্চশিক্ষিত বা চাকুরিরতা। স্বামীর অবর্তমানে যাতে তার স্ত্রী এবং সন্তান সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত না হন,সেই আইনি সুরক্ষাটা দেয় বিবাহ নামক ইন্সটিটিউশন । এছাড়াও একটা সম্পর্কের আইনি এবং সামাজিক স্বীকৃতি অধিকাংশরই প্রয়োজন আছে। আজও একলা ছেলে বা মেয়েকে ঘর ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে মানুষের বেশ কিন্তু কিন্তু আছে। কারণ তারা তাদের প্রেমিক বা প্রেমিকাকে নিয়ে বাড়িতে তুলবেন,সেটা সামাজিক ভাবে স্বীকৃত নয়। যদিও একটি প্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলে বা মেয়ে প্রেম করলে সেটা অস্বাভাবিক কেন,সেটার উত্তর কেউ দিতে পারেন না। কিন্তু আপত্তি জানাতে কেউ ভুল করেন না। এই নানা ধরনের অসুবিধার জন্য মানুষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এবং সন্তান ধারণ মেয়েদের করতে হয় বলেই তাদের নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিয়ে করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেকেই আছেন যারা শুধু মাত্র একে অপরের সাহচর্য পাওয়ার জন্যই বিয়ে করেন। তারা দুজনেই উপার্জন করেন ,কিন্তু সন্তান নেবেন না সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এদের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। এদেরকে বলে ডাবল ইনকাম নো কিডস। সুতরাং বিয়েটা মূলত সন্তান এর লালন পালনের জন্য হলেও আজকাল মানুষে এটাকে স্রেফ একটা সামাজিক স্বীকৃতির জন্যও করে থাকেন।

আরও পড়ুন:  গরমে কীভাবে হিট স্ট্রোকের হাত থেকে বাঁচবেন? জেনে নিন

বিয়ে কখন করবেন,সেটি এক এক জনের জন্য এক এক রকমের হয়। তবে আজকালকার যুগে,নিজে স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ে করাটাই উচিত। আগেকার দিনে বাড়ির আর্থিক আয় ব্যয় এর দায়িত্ব বর্তাতো স্রেফ ছেলেটির ওপরে। এখন ছেলে বা মেয়ে দুজনেই সমান ভাবে এই দায়িত্ব পালন করেন। অতএব, ছেলেদের তো বটেই,মেয়েদেরও পড়াশোনা শেষ করে চাকরি তে ঢুকে তবেই বিয়ের ব্যাপারে ভাবা উচিত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিয়ের পরেই মেয়েটি চাকরি ছেড়ে দিলেন এবং স্বামীই সব দায়িত্ব পালন করলেন।অনেকে স্বেচ্ছায় করেন,অনেকে দায়ে পড়ে করেন। অনেকের শ্বশুরবাড়িতে বাড়ির বৌ চাকরি করলে এখনো আপত্তি করেন। সাংসারিক শান্তি বজায় রাখতেই অনেকেই চাকরি ছাড়েন। মাতৃত্ব একটি বড় কারণ মেয়েদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পেছনে। অনেকের কাছেই শ্বশুর শাশুড়ির একসাথে থাকার সুবিধা থাকে না,সেরকম বিশ্বস্ত লোক পাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে মুশকিল হয়ে যায়। সমাজ এবং স্বামীরা স্বাভাবিক ভাবেই আশা করেন মা চাকরি ছেড়ে দিয়ে সন্তান মানুষ করবেন। আমাদের দেশে এখনো হাউস হাসব্যান্ড ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখা হয় না। ছেলে বেকার বাড়িতে বসে থেকে সন্তান মানুষ করবেন এবং বৌ চাকরি করবেন এটা একটা অভাবনীয় ব্যাপার। বিদেশে,বিশেষত নরওয়ে সুইডেনের মতো দেশে এটি স্বাভাবিক এবং স্বীকৃত। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গাতেই নয়।

ছেলেদের ক্ষেত্রে ২৮ বছরের আগে বিবাহ করাটা একটু তাড়াতাড়িই মনে করা হয়। কারণ পড়াশোনা এবং উচ্চশিক্ষা,বিশেষ করে মাস্টার্স বা পি এইচ ডি সম্পুর্ণ করতেই ২৮ বছর হয়ে যায়। এরপরে একটি চাকরি বা পোস্ট ডক্টরেট করতে গেলেও নূন্যতম ২-৩ বছর না গেলে সেভাবে আর্থিক স্থিতিশীলতা আসে না। বিয়ের সব খরচ খরচা ছেলে বা মেয়ে রা নিজে দিতে না পারলেও বাবা মায়ের খানিকটা সুরাহা করতেই পারা যায়। সেই জন্যই চাকরিতে ঢুকেই বিয়ে করাটা অধিকাংশ ছেলেই প্রেফার করেন না। অনেকের স্বপ্ন থাকে বাবাকে বা মাকে তার নিজের একটি বাসস্থান বা গাড়ি কিনে দেওয়ার।বা ভ্রমণে নিয়ে যাওয়ার। আজকালকার দিনে নানা ধরনের লোন হওয়াতে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে। মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। প্রচলিত ধ্যান ধারণা ভেঙ্গে দিয়ে মেয়েরা আজ স্বাবলম্বী,এবং অণু পরিবার হওয়ার ফলে তাঁর বাবা মায়ের দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হয়। অনেকেই স্বামীর ওপরে নিজের বাবা মায়ের দায়িত্ব ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকেন না। তাই,মেয়েদের ক্ষেত্রেও,উপার্জন করা শুরু করে তবেই বিয়ের ব্যাপারে ভাবা উচিত। আর্থিক স্বাধীনতাই একমাত্র স্বাধীনতা। বাকি সব ক্ষেত্রেই কিন্তু আমাদের বিধি নিষেধ আছে। তবে যদি পরিবার বাড়ানোর কথা ভাবেন তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে ৩০ পেরোলে শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে এবং সন্তান ধারণে সমস্যা শুরু হয়। ফলে ডাক্তাররা বলেন ৩০ এর আগে প্রথম সন্তানের গর্ভ ধারণ করতে। ৩৫ এর পর থেকে এগ কোয়ালিটি এবং গর্ভধারণ দুটতেই সমস্যা হয়। তাই অনেক সময় চাকুরিরত মহিলারা ভাল পজিশন-এ পৌঁছানোর জন্য অনেকদিন অপেক্ষা করে তারপরে বিবাহ এবং সন্তান ধারণ করেন। আজকাল আই ভি এফ এর দৌলতে ৩৫ এর পরেও বহু মহিলা মা হচ্ছেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি ব্যয়সাপেক্ষ এবং শারীরিক ভাবেও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।ছেলেদের ক্ষেত্রে সন্তান ধারণের ব্যাপার নেই তাই বয়েসের সমস্যাটা অতটা প্রকট নয়। ফলে অনেকেই বহু দেরী করেই বিয়ে করার কথা ভাবতে পারেন।

আরও পড়ুন:  অনেক রোগের এক ওষুধ ডার্ক চকোলেট! জানেন কি?

সেই জন্যই বিয়ের ব্যাপারে নানা ধরনের প্যারামিটার কাজ করে। ছেলে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে এই ডিসিশনটা বায়োলজিকাল কারণেই আলাদা হয়। তবে যে বয়েসেই বিয়ে করুন না কেন স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসাই বুদ্ধিমান এবং বুদ্ধিমতীদের কাজ।   

1 COMMENT