সব নারী ঘরে ফেরে…

838

দেশের রাজনীতির কী হাল? হু কেয়ারস! মণিপুরের মেয়েদের দুর্দশা কি ঘুচল? চুলোয় যাক সেসব। তিনি এখন সুশীলা গৃহিণী। গুছিয়ে সংসার করছেন। যমজ সন্তান ধারণ করেছেন প্রেমিকস্বামী ডেসমন্ডের। একসময় ১৬ বছরের অনশন বিশ্বের দরবারে ‘আয়রন লেডি’র সম্মান এনে দিয়েছিল তাঁকে। সেই ‘আগ্নেয়গিরি’ আজ মৃতপ্রায়। ‘অসাধারণ’ ইরম চানু শর্মিলা তাঁর সমস্ত ‘সংগ্রাম’ সরিয়ে আর পাঁচজন অতি সাধারণ মেয়ের মতোই ঘরেবরে। একুশ শতকেও নারীর অস্তিত্ত্ব, অবস্থান ঘুরেফিরে সেই সংসারসীমান্তেই?

এক যে ছিল দামাল মেয়ে নিজের কথা ভাবত না

সাল ২০০০। বছর আঠাশের এক মেয়ে। নানা ধরনের সবজি আর পেস্ট্রি দেখলেই হামলে পড়ত তার ওপর। সাজগোজ কোনও কালেই খুব বেশি করত না। চুলে হালকা চিরুনি বোলানো। গালে ক্রিম মাসাজ। যথেষ্ট ছিল তার কাছে। পরিপাটি পোশাক। কব্জিতে রিস্ট ওয়াচ। ৫’১১’’ উচ্চতার টানটান চেহারা এই সাজেই যেন স্বতন্ত্র হয়ে উঠত বাকি মণিপুরী মেয়েদের থেকে। একটাই দুর্বলতা, আয়নায় ঘুরেফিরে নিজেকে দেখতে ভালোবাসত। কী দেখত সে? মুখ নয়, তার দেখার বস্তু ছিল নিজের ভেতরটা। আসলে, সাজগোজ, খাওয়াদাওয়া, নিরুপদ্রব জীবনের থেকেও মেয়েটিকে বেশি টানত সেই সময়ের শাসনতন্ত্রের অব্যবস্থা। মিলিটারি শাসন তখন বার্নিং ইস্যু নাগাল্যান্ডে। যার দরুণ মণিপুরী মেয়েদের জীবন নরকের সেকেন্ড এডিশন। শাসকের একটাই লক্ষ্য, হয় শাসনতাসনে অতিষ্ট করে তোলো তাদের জীবন। নয়তো মিলিটারি সেনাদের যৌন খিদে মেটানোর উপকরণ করে তোলো।

মাতৃভূমির মতো আপন কাউকে সে আর মানত না

তাই সবাই যখন বিয়েথা করে নিশ্চিন্ত জীবনের স্বপ্নে বুঁদ, মেয়েটির একমাত্র চিন্তাকী করলে মণিপুরী মেয়েরা শুধু ‘ভোগ্য’ হয়ে থাকবে না। এই সব দুনিয়া ছাড়া চিন্তাভাবনা করতে করেই মেয়েটি ঠিক করল প্রতিবাদ করবে অন্যায়ের। কিন্তু কীভাবে? কারণ, তার বুকের ভেতর যত পোড়ে মুখ তো ততটাও ফোটে না! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মেয়েটি ঠিক করল অনশনে বসবে। আফস্পার বিরুদ্ধে। স্বাধীন নাগাল্যান্ড চেয়ে। মণিপুরী মেয়েদের অত্যাচার বন্ধ করতে। নীরব প্রতিবাদে বসার আগে নাকি মেয়েটা ক’দিন সময় নিয়েছিল। পেট ভরে খেয়েছিল নানা ধরনের সবজির স্যুপ আর রকমারি পেস্ট্রি। তারপরেই খানাপিনা বন্ধ। এই মেয়েই ইরম চানু শর্মিলা। দ্য আয়রন লেডি। বিশ্বের দীর্ঘতম অনশনকারিণী। নীরব প্রতিবাদের জীবন্ত প্রতীক। দুনিয়া হেঁটমুণ্ড হল শর্মিলার কাছে। মণিপুরী মেয়েরা জানল, তাদের অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যও কেউ তো আছে! ভাঁজ পড়ল তৎকালীন প্রশাসনের কপালে।

তারপর….?

তারপর তো মিথ। বরফের মতো কঠিন শীতল মেয়ের এই আগুনে প্রতিবাদ থামাতে তাঁকে বন্দি করল মণিপুরী শাসক। কেড়ে নিল ভোট দেওয়ার অধিকার। হাসপাতালে ভর্তি করে নেসাল টিউব দিয়ে জোর করে খাওয়ানো হতে থাকল হরলিকস, সেরেল্যাকস, অ্যাপির মতো নানা রকমের এনার্জিটিক তরল। কিন্তু চানু কি এত সহজে হার মানার বান্দা? সারাক্ষণ তিনি তুলো দিয়ে দাঁত, জিভ মুছতেন যাতে টিউবের তরল কোনোভাবে জিভেদাঁতে না চলে আসে। সঙ্গে আরও দুটো কাজ করেছিলেন তিনি। চুল আঁড়ানো, ক্রিম মাসাজ ছেড়েছিলেন। আর ভুলেও আয়নার ধারপাশ মাড়াতেন না। ভেতরের যে আমিকে তিনি দেখতেন বারবার, সে যে ততদিনে বাইরে বেরিয়ে এসেছে! বদলে জেলের খুপরি জানলা দিয়ে আকাশ দেখে ডানা ঝাপটাতেন চানু। কবে আবার বাইরে বেরোবেন? তাঁর সেই গুমরে মরা আঁচড় কাটত সাদা পাতায়। কবিতা হয়ে। এই সময় মাত্র একবার দাদা ইরম সর্বজিতের সঙ্গে দেখা করেছিলেন শর্মিলা। যদিও দাদা সারাক্ষণ তাঁকে সাপোর্ট করে গেছেন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে দেখা করেননি। যদি নাকে টিউব লাগানো, বন্দি মেয়েকে মা নিতে না পারেন! যদি মায়ের দুর্বলতা দুর্বল করে দেয় তাঁকেও। অনশনের পাশাপাশি জেলের মধ্যে বসে আরও একটি বিশাল কাজ করে ফেলেছিলেন শর্মিলা। প্রেম করেছেন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত গোয়ার বাসিন্দা ডেসমন্ড কাউটিনহোর সঙ্গে। তখন শর্মিলা চানুকে চেনে না বিশ্বে এমন কেউ নেই। নীরব শর্মিলার ভিতরের আগুনের আঁচে পুড়েছিলেন ডেসমন্ডও। কৌতূহলী হয়ে জেনে নিয়েছিলেন চানুর আদ্যপান্ত। তারপরেই চিঠি লিখেছিলেন লৌহমানবীকে।

অবশেষে পথ হারালো

চানুর বাড়ির লোকের মতে, এটাই শর্মিলার সেরা ‘ভুল’। ডেসমন্ডের প্রতি চিঠির ছত্রে ছত্রে নাকি যত না প্রেমের কথা থাকত তার থেকেও বেশি লেখা থাকত তাঁকে, তাঁর ক্ষমতাকে পরিবার, রাজ্যের মানুষের ‘ব্যবহার’ করার উদাহরণ। চানুর দাদামায়ের দাবি, এভাবেই নাকি শর্মিলাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছেন তাঁর প্রেমিক। তাই ১৬ বছরের অনশন ভেঙে মধু, চার চামচ হললিক্স আর একদলা গলা ভাত চানু যখন মুখে তুলেছিলেন, হায় হায় করে উঠেছিল মণিপুর। যে আগুন নিজেকে জ্বালিয়ে শুদ্ধ করে তুলছিল মণিপুরী মেয়েদের সেই আগুন কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই নিভে গেল! যদিও তখনকার শর্মিলার বক্তব্য ছিল এভাবে নয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে এসে। চানুর এই কাজে কিন্তু বাধা দেননি ডেসমন্ড। তিনি ভালোই জানতেন, চানু জ্বলতে পারেন, বলতে পারেন না! ফল যা হওয়ার তাইই হল। নির্বাচনে পরাজিত চানু। ১৬ বছরের গরিমা নিমেষে ম্লান। পাশ থেকে সরে গেলেন পরিবার, অনুগামীরা। বিদ্রোহিনীর এই নয়া বিপ্লবে ছিঃ ছিঃ করেছে সবাই। বরাবরের বাকহীনা এরপর নীরবে, নিঃশব্দে নিজেকে গুটিয়ে প্রেমিককে বিয়েথা করে নারী জীবনের পরম ধর্ম পালনে ব্রতী। গর্ভে ধারণ করেছেন যমজ সন্তান। সম্প্রতি, পরিচালক ইন্দ্রনীল সরকার শর্মিলাকে নিয়ে ‘দ্য টার্নিং পয়েন্ট’ ডক্যু ফিচার বানিয়েছেন। যেখানে চানু বিদ্রোহিনী নন। ঘরোয়া। চানুর যাপিত জীবনের এই বিশেষ দিকই অনুপ্রাণিত করেছে তাঁকে।

আমার কৈফিয়ত

আমি নারী। সুতরাং, হয় আমি নারীবাদী হব। নয়তো পরম শত্রুর মতো যত্ন করে অন্য নারীর কুচ্ছো গাইতে বসব। এটাই নাকি আজন্ম চলে আসা নারীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। গোটা লেখা পড়ার পর পাঠকও হয়তো দু’টি সিদ্ধান্তের একটিকে আমার সম্বন্ধে ব্যবহার করবেন। আমি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি থেকে কলম ধরেছি। শর্মিলা চানুর জীবন অল্পবিস্তর সকলেরই জানা। কিন্তু ২০১৬র পর থেকে চানুর এভাবে ফুরিয়ে যাওয়া? কেউ তার খবর রাখেন না। কারণ, সবাই ক্ষুব্ধ ওমন শক্ত মেয়ের প্রেমের কাছে মাথা নোয়ানোয়। ভালোবাসা অন্যায় নয়। প্রেমের কাছে পদানত হয়ে কাঙাল হয়েছেন বহু রাজাউজির। কিন্তু সেই ভালোবাসা বোধহয় অন্যায্য, যে ভালোবাসা মানুষকে বেপথু করে। যদিও ডক্যুর সৌজন্যে কলকাতায় স্ত্রী চানুকে নিয়ে এসে ডেসমন্ডের কৈফিয়ত, ‘আমি কোনোদিন চানুকে ওর পথ থেকে সরে আসতে বলিনি। বাবার বাড়ি থেকেও আলাদা করিনি। ওঁরা যদি ওঁদের মেয়ের খোঁজ না করেন তার জন্য আমি দায়ী? ও যদি চায় আবার নিজের কাজে ফিরে যেতেই পারে। তবে আগে সন্তানদের জন্ম দিক। বড়ো করুক। তারপর না হয়….।’ তারপর সত্যিই আবার জ্বলে উঠতে পারবেন তো শর্মিলা?

এই মুহূর্তে লৌহমানবীর দশা কী, জানেন? শর্মিলা খবরই রাখেন না উত্তরবঙ্গে এখন নাগরিক বিল নিয়ে তুমুল হট্টগোল চলছে। খোঁজ নেওয়ার দরকারই মনে করেন না, মণিপুরের মেয়েরা কতটা ভালো আছে বা আদৌ ভালো আছে তো? সব ছেড়ে স্বামীর হাতে নিশ্চিন্তে নিজেকে সঁপে নিরাপদে গোয়ায় দিন কাটাচ্ছেন! উনিশ শতকের ‘জীবন্ত আগ্নেয়গিরি’ জাস্ট প্রেমের পরশে একুশ শতকে ‘মৃতপ্রায়’! নারী দিবসে চারিদিকে আরও একবার ‘নারীস্বাধীনতা’র তীব্র হিড়িক উঠবে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবুন তো, কালেদিনে ইরম চানু শর্মিলার মতো ‘লৌহমানবী’র যদি এই হাল হয় তাহলে আপনিআমি তো তুচ্ছু!!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.