হাতে ঘুঙুর বাঁধা বল্লম‚ রানার ছুটত এক আনার চিঠির বোঝা নিয়ে

বিরহী যক্ষ তাঁর প্রিয়তমাকে যে মেঘের চিঠি লিখে খবর পাঠাতেন তার গায়ে কি কোনও ডাকটিকিট সাঁটা থাকত ? উত্তর অজানা । চিঠি পৌঁছানোর জন্য কোনও মাসুল দিতে হত কিনা তাও জানা নেই । কারণ; সেসব কথা মেঘদূতম কাব্যের কোথাও উল্লেখ নেই । ডাক মাসুলের জন্য যে ডাকটিকিট সে ব্যবস্থা চালু হয়েছিল আজ থেকে ১৭৭ বছর আগে । তার ইতিহাস যেমন তেমন নয়। তবে প্রেরক মারফত খবর আদান প্রদানের কথা অথর্ব বেদে আছে ।

৩৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যবিলনের রাজা প্রথম সারগনের আমলেই চিঠির মাধ্যমে সংবাদ দেওয়া নেওয়ার কাজ চালু হয়। সে সময় চিঠি লেখা হত মাটির টালি কিংবা পাথরের উপর। তারপর সেই মাটি কিংবা পাথর দিয়ে খাম তৈরি করা হত। রোদে খাম শুকিয়ে তাতে চিঠি ভরে প্রাপকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হত। ক্রীতদাসকে দিয়ে এই চিঠি দেওয়া নেওয়ার কাজ চলত। যার চিঠি সে সেটি পাওয়ার পর খামটি ভেঙে চিঠি বের করে নিত।

পারস্যের অধীশ্বর সাইরাস ও প্রথম দারায়ুসের আমলে জরুরি সামরিক এবং রাজনৈতিক তথ্য আদান প্রদান হত এক ধরনের ডাক ব্যবস্থার সাহায্য নিয়ে । এ দেশে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর নাতি প্রিয়দর্শী অশোকের আমলেও এক ধরনের ডাকব্যবস্থা চালু ছিল । ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে দিল্লির প্রথম সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকও প্রেরক মারফত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। ওই শতকের শেষে আলাউদ্দিন খিলজিও ডাকব্যবস্থা প্রচলন করেছিলেন ঘোড়া ও ডাকহরকরা মারফত। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনবতুতা ভারতবর্ষ ভ্রমণে আসেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় যে মহম্মদ বিন্‌
তুঘ্‌লকের রাজত্বকালে ডাকহরকরার মাধ্যমে এদেশে ডাক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।

শের শাহ তো ডাকব্যবস্থা আরও জোরদার করতে ৪৮০০ কিমি লম্বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বানিয়ে ফেলেছিলেন। ওই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে ক্লান্ত ঘোড়া বদল করা যায় এবং ডাকহরকরা যাতে বিশ্রাম নিতে পারে তার জন্য পথের মাঝে বেশ কয়েকটি সরাইখানা বানিয়ে দিয়েছিলেন।

১৬৭২ সালে মহীশূরের রাজা চিকদেওরাজ তাঁর রাজত্বে ডাকের সুব্যবস্থা করেছিলেন । পরবর্তীকালে হায়দর আলি এই ডাক ব্যবস্থার আরও উন্নতি ঘটান। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় দশ মাইল অন্তর একটি করে ডাকঘর ছিল। এই ডাকঘরগুলিকে বলা হত ‘ডাকের আড্ডাঘর’।

কলকাতায় ডাক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল ১৭৭৪ সালের ৩১ মার্চ । ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সর্বসাধারণের জন্য ওই ডাক ব্যবস্থা খুলে দেন । তবে তখন ডাকটিকিট বলে কিছু ছিল না । চিঠি দেওয়া নেওয়ার জন্য মাশুল নেওয়া হত । সেই মাশুল ধার্য হত চিঠি যাওয়ার দূরত্ব অনুযায়ী ।

ডাকটিকিট না থাকায় চিঠি পৌঁছনোর খরচ নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হত । ফলে বেশিরভাগ সময়েই ডাকঘরের কেরানিরা চিঠি প্রেরকের কাছ থেকে দু-চার পয়সা বেশিই নিত । আসলে বাড়তি পয়সাটি ঢুকতো কেরানির পকেটে । সে কারণে তখন ডাকঘরের সামান্য কেরানির চাকরি ছিল খুবই লোভনীয় ।

কিন্তু অব্যবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না । ১৮৫০ সালে ডাক ব্যবস্থার সঠিক অবস্থাটা খতিয়ে দেখতে কোম্পানি কমিশন বসিয়ে দেয় । তাদের রিপোর্ট অনুসারে ১৮৫৪ সালে কোম্পানি পোস্ট অফিস অ্যাক্ট তৈরি করে । ইতিমধ্যে কলকাতায়, মুম্বইয়ে এবং মাদ্রাজে জেনারেল পোস্ট অফিস তৈরি হয়ে গিয়েছে। সেখানকার কাজকর্ম দেখাশোনার দায়িত্বে বসানো হয়েছে একজন মহানির্দেশককে । ডাক বিলি বন্টনের জন্য প্রায় সর্বত্র একটি নির্দিষ্ট মূল্য চালু হয়েছে । সরাসরি পয়সাকড়ি আদানপ্রদানের বদলে এসে গিয়েছে ডাকটিকিট । তবে সব ঠিকঠাক চালু হয়েছে ১৮৭০ সালে ।

গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টো ডাকব্যবস্থাকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছিলেন । তাঁর আমলের সরকারি কাগজপত্র থেকে জানা যায় যে তার আমলে কলকাতা শহরে সুবিধাজনক জায়গায় অতিরিক্ত চারটি রিসিভিং অফিস খোলা হয়েছিল । এই অফিসগুলি থেকে সবরকম চিঠিপত্র নেওয়া এবং বিলি করা হত। এই অফিসগুলি শুধুমাত্র কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকার ডাক ব্যবস্থার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল ।সরকারি খাতায় এই অফিসগুলির নাম ছিল ওয়ান আনা পোস্ট অফিস আর বাংলায় নাম দেওয়া হয়েছিল এক আনার পোস্ট অফিস । প্রত্যেক চিঠির জন্য মাশুল লাগত এক আনা ।

তবে একই চিঠির জন্য প্রেরককে অন্তর্দেশীয় ডাকমাশুল দিতে হত । কিন্তু কলকাতা শহরের সীমানা ছাড়িয়ে আরও সাত মাইল দূর পর্যন্ত চিঠিপত্র বিলি করতে হলে মাশুল লাগত দু’আনা । এক আনার পোস্ট অফিস আর এক আনার চিঠি তখন খুবই কার্যকরী হয়েছিল। কলকাতা ও তার আশপাশে তখন জনসংখ্যা বাড়ছিল, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখাটা তখন নানাদিক থেকেই প্রযোজনীয় ছিল।
দিন দিন এক আনার চিঠির সংখ্যা যেভাবে বাড়তে লাগল তাতে এক আনার পোস্ট অফিসের পক্ষে সমস্ত চিঠি সঠিক সময়ে পৌঁছনো আর সম্ভব হচ্ছিল না ।

এক আনার চিঠি আর এক আনার পোস্ট অফিস চালাতে সরকারকেও অনেক ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল ।গাঁটের কড়ি খরচ করে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সরকার স্বভাবতই মন থেকে সায় পাচ্ছিল না ।পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার রোজারিও নামে এক কোম্পানিকে কলকাতায় এক আনার চিঠি বিলি করার দায়িত্ব দেয় ।

এক আনার পোস্ট অফিস একাই যখন কলকাতার সমস্ত চিঠি বিলি বন্টন করত তখন চিঠির ওপর ব্রিটিশ সরকারের শিলমোহরে লেখা থাকত ‘one anna post office’। রোজারিও কোম্পানি এক আনার চিঠি বিলির ছাড়পত্র পাওয়ার পর শিলমোহরের লেখা হল O.A.P.O.Rozario & Co । বেসরকারি ডাক সংস্থা রোজারিও ব্যারাকপুর, দমদম, হাওড়া, খিদিরপুর, ভবানীপুর, বালিগঞ্জ পর্যন্ত চিঠি বিলি করত। দিনে তিনবার- সকাল ন’টা, দুপুর দু’টো, এবং বিকেল পাঁচটা ডাক বিলি হত ডাকহরকরা বা রানার মারফত । তাদের হাতে থাকত ঘুঙুর বাঁধা বল্লম। কিন্তু বেসরকারি সংস্থা মারফত ডাক বিলি বন্টন ব্যবস্থা নিয়ে নানা মহল থেকে এত অভিযোগ আর ক্ষোভ জমা হচ্ছিল যে ব্রিটিশ সরকার একদিন সে ব্যবস্থা তুলে দিতে বাধ্য হয়।

Advertisements

6 COMMENTS

  1. ভাল লেখা পড়তেও ভাল লাগল জানাও গেল অনেক কিছু।

  2. আজকাল মতামত আর প্রকাশিত হচ্ছে না, আপনারা সেন্সর করছেন হয়ত…

  3. এমন একটা লেখা মিস করে গিয়েছিলাম! তথ্যে ঠাঁসা অথচ পড়তে গিয়ে একবারও প্রবন্ধের ভার ভার ভাবখানা আসে না।

  4. দারুণ লেখা। খুব ওয়েল রিটন। এরকম আরো লেখা চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.