২৫ ডিসেম্বর নয়‚ বড়দিন যেখানে ৬ জানুয়ারি

ঘিঞ্জি বড়বাজারের গলি, ব্যবসায়ীদের দর হাঁকাহাঁকি পেরিয়ে একবার পা রাখলেই এক লহমায় বদলে যায় পুরো পরিবেশ | সেখানে তখন শান্ত পরিবেশে মন ভাল করা অদ্ভুত নীরবতা | সেখানে, মানে The Holy Church of Nazareth-এ | এই চার্চ কোনও ব্রিটিশ সাহেবের তৈরি করা নয় | বানিয়েছিলেন Armenian-রা | বলা হয়, ব্রিটিশদের আগে তাঁরাই পা রেখেছিলেন কলকাতায় | এবং প্রাচীন আর্মেনিয়ান ঐতিহ্য মেনে এই গির্জায় বড়দিন পালিত হয় ৬ জানুয়ারি | ২৫ ডিসেম্বর নয় |

The Holy Church of Nazareth কলকাতার সবথেকে পুরনো গির্জা | ঐতিহাসিকরা মনে করেন, আর্মেনিয়ানরা সারা পৃথিবীতে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করেছিলেন | তার সাক্ষী ছিল ব্রিটিশ কলকাতাও | হাওড়া সেতুর কাছে বড়বাজারের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে Brabourne Road-এ দাঁড়িয়ে আছে গির্জাটি | পুরনো সনদ বলে ১৭২৪ সালে গির্জাটি বানানো হয়েছিল | তৈরি হয়েছিল আর্মেনিয়ানদের সমাধিক্ষেত্রের উপর | তাই এই গির্জায় ঢুকলে বহু প্রাচীন সমাধি চোখে পড়বে | চোখে পড়বে জীবনের জয়গানও | মার্বেলে সাজানো গির্জার গ্যালারিতে আছে ম্যুরালের নান্দনিক কাজ | গির্জার altar-এ ধর্মীয় ক্রস ছাড়াও আছে ১২ টি মোমদানি | যেগুলো প্রভু যিশু আর তাঁর শিষ্যদের প্রতীক | A E Harris-এর আঁকা The Holy Trinity’, ‘The Last Supper’এবং ‘The Enshrouding of Our Lord’ কয়েক গুণ বাড়িয়েছে altar-এর আভিজাত্য |

গির্জার bell tower থেকে দরজার কারুকাজ | সর্বত্র ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্য আর সাবেকিয়ানার মিশেল | সাদা-কালো মর্বেলের সাজ বলে চলেছে এই শহরের বুকে ভিন্ন সংস্কৃতির গল্প | কলকাতায় অর্মেনিয়ান গির্জা মোট পাঁচটি আছে | তারমধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য হল ট্যাংরার Holy Trinity Chapel |

ব্রিটিশদের যেমন মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য আর সাম্রাজ্যবাদ, আর্মেনিয়ানদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা আর ধর্ম প্রচার | Armenian নাকি East India Co,-কে আগে, এই নিয়ে তর্ক চলবে | ঐতিহাসিকদের পাল্লা ভারী অবশ্য আর্মেনিয়ানদের দিকেই | সাবেক Eurasia-র অধিবাসীরা বহু আগেই ঘাঁটি বানিয়েছিলেন গঙ্গার পাড়ে | বলা হয়‚ ১৭০৭-এ ব্রিটিশরা প্রাথমিকভাবে The Holy Church of Nazareth তৈরি করেন | অনেকে আবার বলেন Aga Nazar নামে এক আর্মেনীয় জোর করে চাঁদা আদায় করে বানিয়েছিলেন এই গির্জা | পরে ১৭৩৪-এ আর এক আর্মেনীয়Aga Mamed Hazaar Maliyar গির্জাটির বর্তমান চেহারার রূপকার | গির্জার অন্দরসজ্জা করেছিলেন Katchik Arfiel | তিনি পাদ্রীদের থাকার জায়গার নক্সাও করেছিলেন | সমাধিক্ষেত্রের পাশে তুলে দিয়েছিলেন লম্বা পাঁচিল | দান করেছিলেন এই গির্জার ঘড়িও|

তবে The Holy Church of Nazareth-এ কিন্তু ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালিত হয় না | কারণ আর্মেনীয় বিশ্বাস, যিশুর জন্মদিন আসলে ৬ জানুয়ারি | তাঁরা মনে করেন খ্রিস্ট পূর্ব সময় থেকেই ২৫ ডিসেম্বর অন্য একটি উৎসব প্রচলিত ছিল | সেটাই কালক্রমে যিশুর জন্মদিন বলে পরিচিত হয় | এই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে আর্মেনীয়দের কাছে বড়দিন আসতে এখনও সপ্তাহ দুয়েক-এর অপেক্ষা |

(পুনর্মুদ্রিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here