রাজবাড়িতে পর্দানশীন মা দুর্গা থাকেন পর্দার আড়ালে

১৭৫৭ সালে মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব যখন তাঁর ঠাকুরদালানে দুর্গোৎসব শুরু করেন সেটা তখনকার দিনের হিসেবে সারা ভারতবর্ষের মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতোই ছিল | খোদ জার্মানি থেকে আনা সোনা রুপোর কারুকাজ করা মায়ের পোশাক‚ বিদেশি ঝাড়বাতির আলোর রোশনাই‚ সেরা বাইজির নাচ‚ বিখ্যাত কবিয়ালদের কবিগান‚ রাস্তার ধারে মেলা‚ অভিজ্ঞ পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণআর কত বলব !

সেই ঝাড়বাতি এখনও আলো দেয় | মায়ের পোশাক অবশ্য তৈরি হয় দিশি কারিগরের হাতে | তাতে আসল ধাতু খুঁজতে যাওয়া বৃথা | বাইরের শিল্পী নয়‚ এখন তো আর পর্দাপ্রথা নেই‚ তাই বাড়ির ছেলে মেয়েরাই নেচে-গেয়ে-অভিনয় করে বিজয়া সম্মিলনী মাতিয়ে তোলে | তবে মজার কথা এই যে আর সকলের জন্য পর্দা প্রথা উঠে গেলেও আমাদের মা এখনও পর্দানশীন | তাই দুর্গামূর্তির সামনে আজও ঝোলে অভ্রের টুকরো দিয়ে তৈরি চিকের পর্দা | আমাদের সিংহ মশাইও আগে রুপোর পাত গায়ে জড়িয়ে থাকতেন কিন্তু তাঁর হয়তো সেই ধরাচুড়োয় গরম লাগত‚ তাই তিনি এখন গায়ে রুপোলি রং মেখেই সন্তুষ্ট |

এখনকার রাজাদের হাতে তো আর রাজত্ব নেই‚ কিন্তু  সেই আমেজটা ধরে রাখার চেষ্টা আছে পুরোদমে | তাইজন্যেই তো মায়ের বিসর্জনের সময় আগে যেখানে উড়তো নীলকণ্ঠ পাখি‚ আজ অস্তিত্ব-সংকটে আক্রান্ত সেই পাখির জায়গায় মায়ের সঙ্গে বিসর্জনের পথে ভেসে পড়ে মাটির নীলকণ্ঠ |

পুজোয় মাকে অন্নভোগ দেওয়া এই বাড়ির রীতি নয় | মাকে ভোগ দেওয়া হয় ভাজা খাবার | সেই খাবারের রেসিপি আজও বদলায়নি | কিন্তু বদলে গেছে তাদের মাপ | আগেকার দিনের সেই জিলিপি ধরতে হলে দুটো হাতকেই কাজে লাগাতে হতো এখন সে বেচারা ওজন আয়তন দুটোই কমিয়ে এক হাতের তালুর মধ্যে চলে আসে বাধ্য সন্তানের মতো |

শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজো বলতে কিন্তু দুটো বাড়ির পুজোকে বোঝায় | প্রথমটা রাজা নবকৃষ্ণ দেব মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ১৭৫৭ সালে শুরু করেছিলেন | আর দ্বিতীয়টা তিনি শুরু করেন তাঁর পুত্র রাজা রাজকৃষ্ণ দেবের জন্মের পর‚ ১৭৯০ সালে | এই দুই পুজোর নিয়মকানুন সবই এক | তাই যখন ঠাকুর দেখতে বেরোবেন রাস্তার এপার ওপার দুই পারের দুই বাড়ির পুজো যদি না দেখেন তাহলে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো দেখা কিন্তু আপনার সম্পূর্ণ হল না |

আর কোনওভাবে‚ যদি সন্ধিপুজোর সময় এসে পড়েন তখন দেখবেন বাড়ির কোনও পুরুষের হাতে বন্দুক থেকে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে সবাইকে জানান দিয়ে শুরু হবে সন্ধিক্ষণের সূচনা | আবার ২৪ মিনিট ব্যাপী সন্ধিক্ষণের সমাপ্তির সঙ্গে আবার গর্জে উঠবে ব্রিটিশ আমলের তৈরি লাইসেন্সড দোনলা বন্দুক | যে সময় হাতে হাতে এতো ঘড়ির চল ছিল না | সে সময় এই বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজই আশেপাশের লোককে জানিয়ে দিত সন্ধিক্ষণের শুরু ও শেষ |

শোভাবাজার রাজবাড়ির মা দুর্গা যখন শ্বশুরবাড়ি ফেরেন তখন ব্যান্ড বাদ্যি বাজিয়ে কাঁধে করে মাকে প্রথমে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছে দেওয়া হয় | আর মায়ের সঙ্গে পায়ে হেঁটে সেই শোভাযাত্রায় বাড়ির বেশিরভাগ সদস্যই সামিল হন | তারপর জোড়া নৌকা করে মাঝগঙ্গায় নিয়ে গিয়ে হয় মায়ের বিসর্জন | আগেও এভাবেই হত‚ এখনও হয় |

রাজা নবকৃষ্ণ দেব কী কারণে দুর্গা পূজো শুরু করেছিলেন তা নিয়ে ইতিহাসবিদরা হয়তো অনেক মতামত দিতে পারবেন | আমরা তো সেই যুগ পার হয়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছি‚ তাই ওদিকে আমাদের মন নেই | আমরা বরং পুজোর সময় যে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সব এক হয়ে ঠাকুরদালানে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারি‚ এই আমাদের অনেক পাওয়া | দূরদূরান্ত থেকে আজও সবাই এই পুজোর টানেইওই কটা দিন এক ছাদের নীচে জড়ো হয় | ছোটবেলার পর আবার তুতো ভাইবোনেরা ঠাকুর দালানে বসে আগের মতো গল্প করে |

জটিল জীবনের জালে সারা বছর হয়তো কেউ এরা কারও সঙ্গে যোগাযোগও করে উঠতে পারে না | তবু পুজোর সময় তাদের প্রাণখোলা আড্ডা দিতে দেখলে বোঝা যায় মনের যোগটা আজও এই মায়ের পায়েই বাঁধা পড়ে আছে | সারা পৃথিবীর বাঙালিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন যে দুর্গতিনাশিনী‚ তাঁর আশীর্বাদী হাত সকলের মাথার ওপর থাক | এই পুজো মঙ্গলময় হোক | আনন্দময়ীর আগমনে সকলের জীবন ভরে উঠুক আনন্দ-আলোকে |

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.