কে ছিলেন কালাপাহাড় ? কেন ধর্মান্তরিত হয়ে ধ্বংস করেছিলেন বহু হিন্দু মন্দির ও বিগ্রহ ?

12247

প্রাচীন হিন্দু মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হলেই একটি নাম অবধারিত ভাবে উঠে আসে‚ তা হল কালাপাহাড় | বাস্তবিকই তাঁর হাতে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য হিন্দু দেবালয় | বাংলা ও ওড়িশার বহু মন্দির‚ বিগ্রহ ধ্বংস করেছিলেন তিনি | কিন্তু জানেন কি তিনি ছিলেন একজন ধর্মনিষ্ঠ হিন্দু ব্রাহ্মণ ? আসুন‚ চোখ রাখি তাঁর জীবনে | কীভাবে নায়ক থেকে হয়ে উঠলেন খলনায়ক |

# মুঘলদের বহু আগেই দিল্লিতে সুলতান বংশ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মুসলিম শাসকদের হাতে | তাঁরা মূলত তুর্কী এবং আফগান মুসলিম শাসক | মামেলুক তুর্কী বংশ যখন দিল্লিতে‚ তখনই বাংলায় সুবেদারি ব্যবস্থা শুরু হয়ে যায় | অর্থাৎ দেব বংশের শাসনের পরেই বাংলার ক্ষমতায় ইসলামিক শাসকরা |

# সেই ধারায় ১৫৬৪-১৫৭৬ ক্ষমতায় ছিলেন করানি সুলতানি বংশ | ত্রিবেণীর যুদ্ধে পরাজিত হন সুলেইমান করানি | হিন্দু বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ রাজীবলোচন ( বা কালাচাঁদ ) রায় ভাদুড়ি তখন প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন | করানি বুঝতে পারেন বাংলায় তাঁকে ক্ষমতাসীন হতে গেলে রাজীবলোচনের সখ্যতা চাই | 

# রাজীবলোচনকে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন সুলেইমান করানি | বলা হয়‚ সেখানে সুলেইমানের মেয়েকে দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন রাজীবলোচন | যাকে বলে প্রেমে পাগল অবস্থা |

# এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন সুলেইমান | তাঁর পাতা ফাঁদে ধরা দিয়েছেন প্রতিপক্ষ | সুলেইমান-কন্যার পাণিপ্রার্থী হলেন রাজীবলোচন | সুলতান সুলেইমান বললেন তিনি এই বিবাহে রাজি | তবে রাজীবলোচনকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হতে হবে |

# গোঁড়া রাজীবলোচন বললেন তা হবে না | সুলেইমানের মেয়েকে হিন্দু ধর্ম নিতে হবে | দেখা গেল তাতেও রাজি সুলেইমান | তিনি রাজীবলোচনের মিত্রতা চান |

# কিন্তু বাধা এল রাজীবলোচনের নিজের সমাজে | তৎকালীন সনাতন হিন্দু সমাজ রে রে করে উঠল | একজন মুসলিম রমণী কী করে হিন্দু হবেন ? সনাতন ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া যায় না | একমাত্র জন্মসূত্রেই কেউ হিন্দু হতে পারেন | 

# নিরূপায় রাজীবলোচন তখন বললেন‚ ঠিক আছে | তিনি মুসলিম কন্যাকেই বিয়ে করবেন | কিন্তু নিজে হিন্দু ব্রাহ্মণই থাকবেন | এতেও আপত্তি হিন্দু সমাজের | একরোখা রাজীবলোচন বিয়ে করলেন সুলেইমান-কন্যাকে |

# কিন্তু হিন্দু সমাজে একঘরে হয়ে গেলেন সস্ত্রীক রাজীবলোচন | সমাজপতিদের নির্দেশে বন্ধ হয়ে গেল ধোপা-নাপিত | শেষে এমন অবস্থা হল‚ তাঁদের শিশুপুত্র খাবারের অভাবে ধুঁকতে লাগল | স্বজাতির এই বিরূপ আচরণে রাজীবলোচনের মন ভরে গেল তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষে | তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন |

# তবে তাঁর ধর্মান্তকরণের পিছনে আরও একটি গল্প প্রচলিত | সেখানে কথিত‚ কৃষ্ণকায়‚ লম্বা সুপুরুষ রাজীবলোচন রোজ পুজো দিতে আসতেন মন্দিরে | প্রাসাদ থেকে তাঁকে দেখে মুগ্ধ হন সুলেইমানের মেয়ে | সুলতানকন্যা বাবার কাছে আব্দার করেন‚ বিয়ে করলে ওই ব্রাহ্মণ তরুণকেই করবেন | নতুবা কাউকে নয় | 

# এবার এক ঢিলে দুই পাখি মারবেন বলে ঠিক করলেন সুলতান সুলেইমান করানি | তিনি আমন্ত্রণ জানালেন রাজীবলোচন রায়কে | বললেন‚ বিয়ে করতে হবে তাঁর কন্যাকে | নইলে প্রাসাদের জহ্লাদের এক কোপে তাঁর মস্তক ছেদ করা হবে |

# প্রাণ বাঁচাতে রাজীবলোচন রাজি হলেন বিধর্মে বিবাহে | কিন্তু শর্ত দিলেন তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণই থাকবেন | ইসলাম গ্রহণ করবেন না | আপত্তি করলেন না সুলেইমান | বিয়ে হয়ে গেল রাজীবলোচন রায়ের |

# যে কারণেই বিয়ে হোক না কেন‚ ইচ্ছে না থাকলেও রাজীবলোচন বাধ্য হলেন ইসলামে ধর্মান্তরিত হতে | কারণ হিন্দু সমাজে তিনি তখন ম্লেচ্ছ‚ ঘৃণ্য ও ব্রাত্য | এটাই যে হবে‚ আগেই অনুমান করেছিলেন আফগান সুলতান সুলেইমান করানি | 

# ধর্মান্তকরণের পরে রাজীবলোচনের নতুন নাম হয় মহম্মদ ফারমুলি | তবে তিনি কুখ্যাত হয়ে ওঠেন কালোপাহাড় নামেই | লোকমুখে হয়ে দাঁড়াল কালা পাহাড় | চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য ছিল নামের | তাঁকে সেনাপতি করে দিলেন শ্বশুর সুলেইমান করানি |

# কালাপাহাড়ের তখন একমাত্র লক্ষ্য হিন্দুধর্ম‚ হিন্দু ধর্মের দেবালয় ও বিগ্রহের বিনাশ সাধন | বাকি জীবনে নির্বিচারে সেটাই করে গেছেন তিনি | অবিভক্ত বাংলা অর্থাৎ বাংলা বিহার ওড়িশা জুড়ে |

# ওড়িশার তৎকালীন শাসক রাজা মুকুন্দদেবকে পরাজিত করে পুরী‚ কোণার্ক‚ সম্বলপুর‚ কটকে তাণ্ডবলীলা চালান কালাপাহাড় | ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আক্রমণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোণার্কের সূর্যমন্দির | বলা হয়‚ মন্দিরের শীর্ষে ছিল ভারী চুম্বক | ভূমিতেও ছিল চুম্বক | প্রতিটা পাথরের দুপাশে আছে লোহার পাত | এই ব্যবস্থার ফলে মন্দিরের মূল বিগ্রহ ভাসমান অবস্থায় থাকত | কে এই চুম্বক-হরণ করে‚ তা নিয়ে দ্বিমত আছে | কোনও ঐতিহাসিক মনে করেন‚ কালাপাহাড় এসে লুণ্ঠন করে নিয়ে যান ওই রহস্যজনক চুম্বক |

# কালাপাহাড়কে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসেন কুচবিহারের রাজার ছেলে শুক্লধ্বজ ওরফে চিলা রাই | কিন্তু তিনি পরাস্ত হয়ে বন্দি হন কালাপাহাড়ের হাতে |

# তাম্রলিপ্তের বর্গভীমা মন্দির ধ্বংস করতে এসেছিলেন কালাপাহাড় | কিন্তু মন্দির ও দেব বিগ্রহের সৌন্দর্য দেখে তিনি কোনও এক কারণে নিরস্ত হন | আক্রমণ না করে উল্টে মন্দিরের প্রশস্তি করেছিলেন |

# পরাক্রমী এই ধ্বংসকারীর মৃত্যু নিয়েও গল্প প্রচলিত | বলা হয়‚ তিনি এগিয়েছিলেন ওড়িশার সম্বলপুরে সম্বলেশরীর মন্দির ধ্বংস করতে | মন্দিরের আগেই শিবির ফেলেছিলেন | সেখানে এক তরুণী গোপিনীর কাছে দইয়ের ছাঁচ কিনে পান করেন কালাপাহাড় ও তাঁর সেনারা | তাতেই মৃত্যু হয় তাঁদের | পরে সেই গোপিনীকে আর পাওয়া যায়নি | বলা হয়‚ স্বয়ং সম্বলেশ্বরী এসেছিলেন ওই রূপে |

# সম্বলপুরে মহনদীর তীরে এক আমবাগানের ভিতরে বহু সমাধি আছে | মনে করা হয় ওখানেই সমাহিত হয়েছিলেন কালাপাহাড় | তাঁর সেনাবাহিনীর সঙ্গে | তবে বছর বারো আগে উগ্র ধর্মান্ধদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওই সমাধিও |

# সুলেইমান করানি খানের পরে বাংলার শাসক হন তাঁর পুত্র দাউদ খান | কথিত তাঁর নামেই চালের নামকরণ হয় দাদখানি চাল | দাউদ খানেরও সেনাপতি ছিলেন কালাপাহাড় |

# দাউদ খান ছিলেন বাংলার শেষ আফগান শাসক | এরপর বাংলা চলে যায় মুঘল শাসনের অধীনে | ইতিহাসের অন্য এক সূত্র বলে‚ ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন দাউদ খান ও তাঁর সেনাপতি কালাপাহাড় | 

Advertisements

2 COMMENTS

  1. বিজেপি জানলেও এই ইতিহাস কে নিজেদের মতো করে প্রচার করবে।
    ওদের অবস্থা হলো, 1টি প্রবাদ বাক্যের মতো, যাকে দেখতে পারি না, তার চলন বাঁকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.