বৈদিক যুগের প্রাজ্ঞদের মধ্যেও তিনিও একজন অতি অবশ্যই | কিন্তু তাঁর যাবতীয় গণ্ডি সঙ্কুচিত হতে হতে মিলিত হয়েছে একটি বিন্দুতে | একমাত্র পরিচয় বাহিত হয়েছে‚ তিনি কামসূত্রের প্রণেতা | বাৎস্যায়নের বাকি কীর্তি‚ বা তাঁর জ্ঞানের পরিধিকে খর্ব করা হয় | তাঁর প্রতি এতটাই তাচ্ছিল্য‚ যে নামের আগে বা পরে কোথাও ঋষি শব্দটি ব্যবহারেও কুণ্ঠা আর দ্বিধা |

Banglalive

কামসূত্র গ্রন্থে যৌনতার অংশ তুলনামূলকভাবে কম | রচিত হয়েছে সামাজিক আরও বিবিধ বিষয় | কিন্তু সব পথ এসে মিশে গেল শেষে যৌনতায় | বলাই বাহুল্য কোনও অশ্লীল বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই গ্রন্থ রচনা করে যাননি বাৎস্যায়ন | তথাপি চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী | কালজয়ী এই গ্রন্থের জন্যই তিনি কালের কাছে খলনায়ক হয়ে পরিচিত হয়েছেন |

আমার মতো ক্ষুদ্রবুদ্ধির পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় কেন বাৎস্যায়নকে নিয়ে চর্চা কম হয়েছে | তাঁর কামসূত্রকে নিয়ে কৌতূহল গগনচুম্বী | কিন্তু তাঁর জীবন অনালোচিত | যৎসামান্য জানা যায় এই বৈদিক পণ্ডিত সম্বন্ধে |

স্কুলস্তরের ইতিহাসে দাক্ষিণাত্যের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে পড়ানো হয় গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর কথা | সাতবাহন বংশীয় এই নৃপতির লিপি প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান | বাৎস্যায়ন কিন্তু তাঁর চরিত্রের অন্ধকার দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন | বলেছেন‚ রাজা সাতকর্ণী তাঁর স্ত্রী মলয়বতীকে অতি প্রাচীন এবং গুপ্তবিদ্যায় হত্যা করেছিলেন | যৌনসঙ্গম কালে স্ত্রী যখন তুরীয় সুখে তখন কাটামারি অস্ত্রে তাঁর প্রাণনাশ করেছিলেন | বাৎস্যায়ন সবাইকে সাবধান করেছেন যেন এই পন্থা অনুসৃত না হয় |

সাতকর্ণী ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব শেষ শতকে অথবা খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকে | সেই সূত্রে ধরে নেওয়া হয়‚ বাৎস্যায়ন তাঁর পরবর্তী | অনুমান করা হয়‚ খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে ষষ্ঠ শতকে তিনি ছিলেন | আবার বরাহমিহির তাঁর বৃহৎসংহিতা গ্রন্থে যৌনতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন | যা প্রায় গৃহীত বাৎস্যায়নের রচনা থেকেই | তাই‚ দ্বৈত সূত্রই বলছে‚ খ্রিষ্টীয় প্রথম থেকে ষষ্ঠ শতকে দীপ্যমান ছিলেন বাৎস্যায়ন |

এরকমও বিচিত্র নয় যে তাঁর প্রকৃত নাম বাৎস্যায়নই নয় | ছদ্ম পরিচয় মাত্র | কারণ বৈদিক ইতিহাসে আরও বাৎস্যায়ন আছেন | যিনি ন্যায়সূত্র ভাষ্য লিখেছিলেন | মহা ঋষি গৌতমের ন্যায়সূত্রের টীকাগ্রন্থ হল ন্যায়সূত্র ভাষ্য |

হিমালয় অঞ্চলের এক রাজার অনুরোধে বাৎস্যায়ন পূর্ব গারো পর্বতে উপজাতিদের মধ্যে প্রচলন করেছিলেন তান্ত্রিক দেবী তারার পুজো | সেই ধারা থেকেই পরে কামাখ্যা দেবীর পুজোর সূত্রপাত | দার্শনিক ও সুপণ্ডিত বাৎস্যায়ন জীবনের দীর্ঘ পর্ব অতিবাহিত করেচিলেন কাশীতে | 

কামসূত্রের মূল বক্তব্য হল‚ দৈহিক সুখের মায়াজালের ক্রীতদাস হলে মোক্ষলাভ থেকে দূরে সরে যেতে হবে | যৌনতা পাপ নয় | কিন্তু এর দাসানুদাস হয়ে পরা অপরাধ | মনুষ্যজীবনের মূল কাম্য হল ধর্ম‚ অর্থ ও কাম | কিন্তু তার সময়ক্রম ভিন্ন | প্রথম জীবনে অর্থ ও কামের পিপাসু মানুষ পরিণত বয়সে ধর্মকে অবলম্বন করবে | এটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়ে এসেছেন বাৎস্যায়ন |

কিন্তু এত বিষয় থাকতে তিনি যৌনতা বা কাম নিয়েই লিখেছিলেন কেন ? কেউ বলেন তিনি চেয়েছিলেন মানুষকে সচেতন করে তুলতে | আবার অনেক গবেষকের ধারণা‚ যৌনতা তখন নিষিদ্ধ বিষয় ছিল না | বাকি বিষয়গুলির মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল | তাই‚ অন্যান্য বিষয়ের মতো একেও একটি অধীত বা অধ্যয়নযোগ্য বিদ্যা স্বরূপ বিবেচনা করেছিলেন দার্শনিক বাৎস্যায়ন |

আরও পড়ুন:  পাঁচদিন আগে কনের হাত টেনে ছিঁড়ে নিয়ে গেল কুমির‚ তবুও বাধা মানল না আবেগ‚ বিয়ে সারলেন যুগল

NO COMMENTS