গত কয়েকদিন ধরে চারদিকে নির্বাচনের ফল দেখে একটা শব্দ মনের মধ্যে এল | তা হল ত্রিশঙ্কু | অনেক জায়গায় দেখবেন বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল হয় ত্রিশঙ্কু | অর্থাৎ না এদিকে‚ না ওদিকে‚ মধ্যবর্তী এক ঝুলন্ত অবস্থা | শব্দটার সঙ্গে পৌরাণিক সম্পর্ক আছে | কেন কোনও অনির্ধারিত জিনিসকে ত্রিশঙ্কু বলা হয় তারও ব্যাখ্যা আছে | হিন্দু পুরাণে এও আর এক অভিশাপের আখ্যান |

Banglalive

বাল্মীকির রামায়ণের প্রথম দিকে আছে রাজা সত্যব্রতর কথা | তাঁর নামই পরে হয়ে যায় ত্রিশঙ্কু | যে শব্দ হিন্দু পুরাণে মধ্যবর্তী অবস্থানের প্রতীক | অর্থাৎ যেখানে অভীষ্ট ও বর্তমান অবস্থার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক |

সূর্যবংশে রাজা পৃথুর সন্তান ছিলেন সত্যব্রত | রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ছিলেন তিনি |  সত্যব্রতর জীবনে অভীষ্ট ছিল তিনি স্বর্গবাস করবেন | বৃদ্ধ বয়স সমাগত হলে পুত্র হরিশ্চন্দ্রকে ( পুরাণখ্যাত দানবীর রাজা হরিশ্চন্দ্র তিনি সিংহাসনে অভিষেক করালেন | রাজ্যাভিষেকের পরে পুত্রের স্কন্ধে সব দায়িত্ব অর্পণ করে নিষ্কাম হলেন সত্যব্রত |

ইহজীবনে তিনি যা পুণ্য করেছিলেন তাতে তাঁর স্বর্গারোহণ ছিল সময়ের অপেক্ষা | কিন্তু তিনি মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতে রাজি নন | ইচ্ছা করলেন জীবন্ত অবস্থায় নশ্বর দেহেই প্রবেশ করবেন দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গে |

কুলগুরু বশিষ্ঠকে অনুরোধ করলেন সত্যব্রত | যাতে তিনি এমন কোনও যজ্ঞাদি করেন যার পুণ্যফলে নশ্বর দেহেই স্বর্গে যেতে পারেন সত্যব্রত | বশিষ্ঠ তাঁকে বোঝালেন প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যেতে চাইছেন রাজা সত্যব্রত | এ সম্ভব নয় | স্বর্গালোকে প্রবেশের জন্য তাঁকে মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতেই হবে | 

কিন্তু তর সইল না রাজা সত্যব্রতর | তিনি অনুরোধ করলেন বশিষ্ঠর জ্যেষ্ঠপুত্র শক্তিকে | ধনৈশ্বর্যের প্রভূত প্রলোভন দেখালেন তাঁকে | যাতে তিনি পিতার প্রত্যাখ্যাত কাজ সম্পাদন করেন | কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হল | অত্যন্ত কুপিত হলেন শক্তি | অভিশাপ দিলেন | তাঁর শাপে রাজা সত্যব্রত চণ্ডালে পরিণত হলেন | রাজ্যত্যাগ করে বনে বনে ঘুরতে লাগলেন |

একদিন বনের পথিমধ্যে চণ্ডালরূপী সত্যব্রতর সাক্ষাৎ হল গুরু বিশ্বামিত্রর সঙ্গে | বশিষ্ঠের সঙ্গে বিশ্বামিত্রর সম্পর্ক ভাল ছিল না | পুরনো তিক্ততাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষোভ প্রশমিত করতে চাইলেন ঋষি বিশ্বামিত্র | রাজা সত্যব্রতকে প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি তাঁকে সশরীরে নিয়ে যাবেন স্বর্গে |

কঠোর যাগ যজ্ঞ শুরু করলেন বিশ্বামিত্র মুনি | তাঁর যজ্ঞ ক্রিয়াদির পুণ্যে রাজা সত্যব্রত ক্রমশ ঊর্ধ্বপানে উঠতে লাগলেন | যজ্ঞ সমাপনে দেখা গেল সত্যব্রত সমাগত স্বর্গের সম্মুখে | এতে দেবতারা সমস্বরে প্রতিবাদ করলেন | এ বার তো রসাতলে যাবে |

ইন্দ্রের নেতৃত্বে দেবতাগণ একত্রে ঠেলে ফেলে দিলেন রাজা সত্যব্রতকে | তিনি এ বার নিম্নগামী হয়ে পড়তে শুরু করলেন | স্বর্গ থেকে পৃথিবী অভিমুখে | কিন্তু ইন্দ্রের কাছে পরাজয় স্বীকার করবেন না বিশ্বামিত্র | তিনি আবার স্বর্গের দিকে ঠেললেন রাজা সত্যব্রতকে | দুই লোকের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকলেন রাজা সত্যব্রত | নতুন অবস্থানের জন্য তাঁর নাম হল ত্রিশঙ্কু |

এই করুণ অবস্থায় তিনি কাতর অনুরোধ জানালেন বিশ্বামিত্র সমীপে | যাতে তিনি কোনও পদক্ষেপ করেন | এই সসেমিরা অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন | সবদিক রক্ষার্থে বিশ্বামিত্র নতুন স্বর্গ বানালেন | সেখানে দেবরাজ হয়ে প্রবেশ করলেন ত্রিশঙ্কু | তখন তিনি ফিরে পেয়েছেন অভিশাপ পূর্বরতী রাজচেহারা |

কিন্তু দুটি স্বর্গ আর দুজন দেবরাজ কীভাবে হন ? দেবতারা দরবার করলেন বিশ্বামিত্রর কাছে | ঋষি আর কী করেন ! শ্যাম না কুল‚ কী রাখবেন ? মাঝামাঝি রফা পন্থায় এলেন | বললেন‚ স্বর্গ একটাই থাকবে | দ্বিতীয় যা সৃষ্টি করেছেন তা হবে‚ ত্রিশঙ্কুর স্বর্গ | সেখানে একাই থাকবেন তিনি | তিনি যেমন ইন্দ্র ও অন্য দেবতাদের স্বর্গলোকে যাবেন না | তেমনই দেবতারাও তাঁকে কিছু বলবেন না | এই সুন্দর সহাবস্থানে রাজি হল সব পক্ষই |

এ ভাবে নিজের স্বর্গে নিজেই নির্বাসিত রাজা সত্যব্রত ওরফে ত্রিশঙ্কু | পক্ষান্তরে তিনি ঝুলন্তই থাকলেন | মর্ত্য বা স্বর্গ কোনও স্থানেই জায়গা হল না | অভীষ্ট আর বর্তমান অবস্থানের মাঝে থেকেই গেল বিস্তর পার্থক্য |

আরও পড়ুন:  সঙ্গে ল্যাপটপ‚ তুখোড় টেক স্যাভি‚ ধর্মগুরু কম্পিউটার বাবা আবার মন্ত্রীও !

NO COMMENTS