উইলিয়ম জেমস হার্শেল কে ছিলেন ?

বাপ পিতেমোর জুতোয় পা গলানো চলবে না | স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বাবা | ব্যারনেট বংশমর্যাদার জোরে নামের আগে’ স্যর’ বসছে বটে | কিন্তু তাই বলে‚ জিন ভাঙিয়ে জ্যোতির্বিদ হওয়া ! সেটি চলবে না | ফরমান হোক‚ ফতোয়া হোক‚ হয়ে গেছে জারি | তাই‚ আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে তিনি চোখ রাখলেন‚ মাটিতে নয়‚ মানুষের হাতের পাঞ্জায় | তাও‚ বহু দূরে জলে জঙ্গলে ম্যালেরিয়ায় ভরা নেটিভ পরবাসে |

ততদিনে পরের দু ভাই গুটি গুটি এগোচ্ছেন জ্যোতির্বিদ হওয়ার দিকে | কিন্তু তিনি বারো জন ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় এবং সর্বোপরি জ্যেষ্ঠ পুত্র | তাই পিত্রাদেশ পালন করতেই হয়েছিল | ১৮৩৩  খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের বাকিংহ্যামশায়ারে জন্মানো স্যর উইলিয়ম জেমস হার্শেল আইসিএস অফিসার হয়ে চলে এসেছিলেন কোম্পানির ভারতবর্ষে | ঠাকুর্দা উইলিয়ম হার্শেল ও বাবা জন হার্শেল‚ দুজনেই নামী জ্যোতির্বিদ‚ সেসব ভুলে উইলিয়ম জেমস শুরু করলেন প্রশাসক জীবন | ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কাজের জায়গা হল বেঙ্গল প্রভিন্স | ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরে দক্ষ অফিসার হার্শেলের কর্মক্ষেত্র সেকালের হুগলি | 

সেখানে রাস্তা তৈরির জন্য সাহেব বরাত দিলেন স্থানীয় ঠিকাদারকে | ইমারতি জিনিস সরবরাহের জন্য | দু পক্ষের মধ্যে যে চুক্তিপত্র হল তাতে স্বাক্ষরের সঙ্গে আর যা তা থাকল‚ তা হল ওই ঠিকাদারের হাতের পাঞ্জার ছাপ | হার্শেল সাহেবের নির্দেশে নতুন নিয়ম বহাল হয়েছিল | যাতে কোনওভাবেই ওই ঠিকাদার কথার খেলাপ না করতে পারে | 

হাতের ছাপ নিয়ে অনেকদিন ধরেই ভাবনাচিন্তা করছিলেন হার্শেল | তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শুধু ভাগ্যলিপি নয় | হস্তরেখা অনেককিছু নির্ধারণ করে | একে কাজে লাগিয়ে চিহ্নিত করা যায় অপরাধীকে | দিনের পর দিন হাতের পাঞ্জার ছাপ নিয়ে কাজ করতে করতে হার্শেল বুঝলেন‚ আসল রহস্য লুকিয়ে নখদর্পণে | অর্থাৎ‚ শুধু বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হলেই প্রয়োজন মিটবে | কারণ এক জনের আঙুলের ছাপ অন্যজনের আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলবে না | হার্শেল চাইলেন‚ প্রশাসনিক স্তরে এই চিহ্ন ব্যবহৃত হোক প্রমাণস্বরূপ | কিন্তু তাঁর দাবি মঞ্জুর হল না |

১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে হার্শেল হুগলির ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হলেন | এ বার তিনি নিয়ম করে দিলেন | পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ বাধ্যতামূলক | যাতে একজনের বদলে অন্য কেউ অবসরকালীন ভাতা নিতে না পারে | ধীরে ধীরে টিপসই এর প্রচলন শুরু হল অপরাধী শনাক্তকরণে | যাতে একজনের পরিবর্তে অন্য কেউ টাকার বিনিময়ে জেল খাটতে না পারে | 

হুগলির ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার পরে মাত্র এক বছর ভারতে ছিলেন হার্শেল সাহেব | ১৮৭৮ সালে ফিরে যান জন্মভূমি ইংল্যান্ডে | তবে ফিরতে হয় স্ত্রীকে ছাড়াই | চতুর্থ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান এম্মা হ্যালডেন | সারে-এর অভিজাত পুরুষ আলেকজান্ডার স্টুয়ার্ট হার্ডক্যাসলের কনিষ্ঠা কন্যা এম্মাকে হার্শেল বিয়ে করেছিলেন ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে | ন’ বছরের দাম্পত্য ফুরোয় ১৮৭৩-এ | সে বছরেই জন্ম চতুর্থ সন্তান তথা দ্বিতীয় পুত্র আর্থার এডওয়ার্ডের | তার আগে আরও দুই মেয়ে মার্গারেট ও ডরোথি এবং এক ছেলে জন | বড় ছেলে হিসেবে তিনিই বাবার পরে ব্যারনেট শিরোপার উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন | 

ব্রিটিশ প্রশাসক উইলিয়ম জেমস হার্শেলের সমসাময়িক ছিলেন স্কটিশ চিকিৎসক ও মিশনারি হেনরি ফল্ডস | তিনি ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে কাজ করছিলেন জাপানে | আঙুলের ছাপ যে অপরাধী শনাক্তকরণে হাতিয়ার হতে পারে‚ তা নিয়ে ফল্ডস প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘ নেচার’ পত্রিকায়‚ ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে | প্রত্যুত্তরে আরও একটি প্রবন্ধ লেখেন হার্শেল | যা প্রকাশিত হয় ‘নেচার’ পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় | সেখানে তিনি জানান‚ ১৮৬০ সাল থেকে তিনি এই বিষয়ে কাজ করছেন | এবং এই বিষয়ে তিনিই প্রথম প্রবক্তা |

হার্শেল-ফল্ডস বিতণ্ডা আরও বারো বছর পরে‚ ১৮৯২ সালে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফ্রান্সিস গ্যাল্টনের | চার্লস ডারউইনের তুতো ভাই গ্যাল্টন এই বিতর্কে মান্যতা দেন উইলিয়াম জেমস হার্শেলকেই | লক্ষণীয়‚ বিতর্কের সূত্রপাত নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হার্শেলের সেই চিঠি ঘিরে‚ যা তিনি লিখেছিলেন‚ যাতে প্রায় একশো বছর পরে বৈঠকখানার তক্তপোশের সামনে সিধুজ্যাঠার কাছে পরীক্ষায় সসম্মানে উতরোতে পারে তাঁর আদরের ভাইপো | যাতে সপ্রতিভ উত্তরে খুশি হয়ে সবজান্তা জ্যাঠা ভাইপোর আঙুলগুলো চেয়ে বলতে পারেন‚ ‘ জিতে রহো বচ্চে !’ 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

pakhi

ওরে বিহঙ্গ

বাঙালির কাছে পাখি মানে টুনটুনি, শ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে, বড়িয়া ‘পখ্শি’ জটায়ু। এরা বাঙালির আইকন। নিছক পাখি নয়। অবশ্য আরও কেউ কেউ