‘ভবিষ্যতের ভূত’ নিয়ে একটি ভীরু প্রতিবেদন

রূপকথার গল্পের সেই দুষ্টু দর্পনটার কথা মানে করুন একবার, সেই আয়নায় বেশি সুন্দর লাগে, যদি সে ভালো মানুষ হয় | কিন্তু খারাপ লোককে সেই আয়না সুন্দর বানায় না | সে যা, তাই দেখায় | এক রানীর দুই কন্যা | একজন ও রূপবতী নয় | ছোটকন্যা গুণবতী, দয়াবতী | সে নিজেকে আয়নায় দেখে, আয়না তাকে খুব সুন্দর করে দেখায় | বড়কন্যা হিংসুটে, নির্দয়া, কুচুটে | সে আয়নায় নিজেকে দেখে, রেগে গিয়ে আয়নাটাকেই ভেঙে দেয় |

অনীক দত্ত ভবিষ্যতের ভূত চলচ্চিত্রে এরকম একটা আয়না হাজির করেছেন, যেখানে অনেকে নিজেদের দেখতে পেয়ে আয়না ভাঙার চেষ্টা করছেন | কিন্তু এটা কাঁচের আয়না নয় | এলগরিদমের ডিজিটাল ভাষায় এটা থেকে যায় | প্রদর্শন বন্ধের জন্য ওঁরা অভূতপূর্ব উপায় গ্রহণের চেষ্টা চালাতেই পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূতের ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হয় না | ভূত মানে যা হয়ে গেছে, ঘটে গেছে | ভবিষ্যৎ মানে যা ঘটবে বা ঘটার সম্ভাবনা আছে | আজ যেটা বর্তমান, গতকাল সেটা ভবিষ্যৎ ছিল, আগামীকাল সেটা ভূত হয়ে যাবে |

পরশুরামের বিরিঞ্চিবাবাকে স্মরণ করুন | সত্যজিৎ রায় এই গল্পটি অবলম্বনে নির্মাণ করেছিলেন মহাপুরুষ নাম এক অসাধারণ চলচ্চিত্র | ওখানে চারুপ্রকাশ ঘোষ বিরিঞ্চিবাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন | বাঁ হাত ঘোরাচ্ছিলেন ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে, মানে ভূত | ডান হাত ঘড়ির কাঁটার দিকে | মানে ভবিষ্যৎ | মাঝখানের বর্তমানই ভবিষ্যতের ভূত | এই বর্তমান, বা একটু আগেকার ভূত এখানে নানা ভাবে এসেছে | একটা ঘটনা প্রবাহের প্যাকেজিং অবশ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করনে রয়েছে, সেটা সুগোল কোনও ব্যাপার নয় | হতে পারে গোদারিয়ান স্টাইল | এখানে পরিচালক এবং প্রযোজকের মধ্যে গোদার কথাটা এসেছে দু এক বার |

শুরুতে একটা পরিচালক প্রযোজকের সংলাপে প্রযোজক বলছেন একটা বেশ গদারের হরর ভূতের ফিল্ম চাই | মানুষ আজকাল ভগবানকে ভয় না করলেও ভূতকে ভয় করছে | এবার ভূতের ছবি করা নিয়ে চিন্তা ভাবনা, এবং সেই বিষয়গুলিই ছবিতে এসেছে একে একে | ভূতের জন্ম স্বাভাবিক মৃত্যুতে হয় না | অস্বাভাবিক মৃত্যু হাতে হবে | এবার নানা রকমের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা |

একটা লেনিন স্ট্যালিন শোভিত বামপন্থীদের ঠেক দেখানো হল, যেখানে পক্ককেশ প্রৌঢ় এবং বৃদ্ধরা বসে তাত্ত্বিক কচকচি করেন | বসে বসে আত্মসমালোচনা করেন |

বাড়িওয়ালার মৃত্যুর পর তস্যপুত্র বাড়ি ছেড়ে দিতে হুকুম করে | বৃদ্ধ বামপন্থীরা নীতিগত আপত্তির কথা বললে বাড়িওয়ালা পুত্র অনুপ্রাণিত বাহিনী নামিয়ে ভাঙচুর করে | জনৈক কমরেডের কাছা টেনে খুলে দেয় এবং সে একাকী ওই শ্যাল ওভারকাম গাইতে গাইতে হার্টফেল করে মারা যায় | পেস্টিসাইড খেয়ে সুইসাইড করা আতঙ্কগ্রস্ত চাষীও মিলিত হয় মৃত কমরেডের সঙ্গে | তোলাবাজিতে রেষারেষির কারণে মৃত একজন, একজন ক্যাবারে ড্যান্সার, যে খুন হয়েছিল, একজন টাইপিস্ট, কম্পিউটারের কারণে যে রোজগার হারিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, তারাও জড়ো হয় এক পরিত্যক্ত সিনেমাহলে | এখানে দেখার শুধু ব্যক্তি নয়, একটা যুগ বাতিল হয়ে যায় | টেকনোলজি বাতিল হয়ে যায় | অভ্যাস বাতিল হয়ে যায় | বাতিল হয়ে যাওয়া মানে ভূত হয়ে যাওয়া | বলা যায়, ভূতপূর্ব হয়ে যাওয়া | যেমন ক্যাবারে নাচিয়েরা ভূতপূর্ব হয়ে গেল, মোবাইলে সহজে নীলে পৌঁছানো গেল বলে | টাইপ মেশিন ভূত হয়ে গেল কম্পিউটারের কারণে | যাত্রাপালার নটসূর্যরা ভূত হয়ে গেল – ‘ সোহাগী বউ ‘, ‘ বাবা দিগম্বর ‘, ‘ চোখের জালে বুক ভাসে ধরনের যাত্রাপালা-প্রায় টিভি সিরিয়ালগুলোর কারণে |

এখানে ব্যক্তি ভূত এবং ভূতপূর্ব প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিনিধিত্ব করে এমন ব্যক্তি বা ভূতেরা একত্র হয়েছে এক ভূত হয়ে যাওয়া সাবেক সিনেমা হলে |

সিনেমাটির মধ্যে যে সিনেমাটি রয়েছে সেখানে ভূতেদের রিয়ালিটি শো | সেখানে ভূতেরা বিচারক | অস্থি দিয়ে করোটির মাথায় বিচারকরা ঘা মারলে শূন্য চক্ষুগহ্বরে আলো জ্বলে ওঠে | ভূত হয়ে যাওয়া বামপন্থী তাত্ত্বিকের পরামর্শে ভূতেরা গণসংযোগের ব্যাপারে এগোয় | মানে মানুষের সঙ্গে | কৃষি জমি অধিগ্রহণ করে সিনেমা সিটি বানানোর বিরুদ্ধে তরুণ ছাত্ররা কৃষকদের নিয়ে আন্দোলনে নামলে পুলিশ এবং গুণ্ডাবাহিনীর ছাত্র কৃষকদের পক্ষ নেয় |এর মধ্যেই মাঝে গুঁজে দেওয়া আছে স্টিং অপারেশনে পাওয়া নেতা আমলাদের নেয়া, আধশোয়া অবস্থায় তোয়ালে পেঁচিয়ে টাকা রাখা | জনৈক রাজনৈতিক মদতপুষ্ট তোলাবাজ অম্বুবাচী দত্তর কীর্তিকলাপ রয়েছে, এবং আছে জনৈক দেওয়ালে নীল সাদা রং করার কারিগরের চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার ইচ্ছা | সে পর্ন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকে | এবার কিছু ছবিও বিক্রি করার চেষ্টা করলে জানে ছবির দামের সঙ্গে ক্ষমতার একটা সুসম্পর্ক আছে |

সংলাপের মধ্যে কয়েকবার রয়েছে ছেলের মা, মা মাটি মানুষ ইত্যাদি শব্দবন্ধ | চড়াম চড়াম, মাথায় অক্সিজেন কম যাওয়া এইসব শব্দগুলি আমাদের বর্তমান শাসকদলের কিছু ক্ষমতাশালীর সরল মানে ব্যথা উৎপাদন করেছে, ফলে ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করার জন্য হল মালিকদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং চাপ মানতেও হয়েছে | এই ব্যাপারটাও কিন্তু পলিটিক্যাল স্যাটায়ার হিসেবে আগামীতে উঠে আসা উচিত |

ছবির শেষ দৃশ্যে একটা হোৎকা নেতা আবির্ভূত হন যে কিনা রিপোর্ট পাচ্ছে এই ছবিতে অনেক আনসান ডায়লগ আছে, শুটিং বন্ধ করে দিতে হবে | পরিচালক বলে সরকারি পারমিশন রয়েছে | নেতা বলে আমি ই পারমিশন, আমার ইচ্ছেতেই এই তল্লাট চলে এবার ভাঙচুর চালানো হাতে থাকে | তখন ক্যামেরাগুলি স্ট্যান্ড থেকে উপরে উঠে যায় এবং এই সন্ত্রাসের ছবি তুলতে থাকে, ধাওয়া করতে থাকে |

বোঝাই যাচ্ছে এটা ভূতের ভবিষ্যৎ সিনেমাটির পরবর্তী অংশ নয় | সম্পূর্ণ আলাদা একটা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার | বাম ডানের কাউকেই ছাড়েননি অনীক | আর এস এসের প্রতীক হাফপ্যান্ট ও যেমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে এসেছে, বামনেতাদের তত্বকথাও তেমন | শাসকদলও স্যাটায়ারিক |

কিন্তু অনেক বেশি কথা বলেছে অনীক | দ্ব্যর্থক সংলাপ | বড্ড ভারী হয়ে যায় | অনেক চরিত্র | শিল্পগত ভাবে এটা খুব উঁচুদরের নয় | ভূতের ভবিষ্যৎ আরো অনেক ভালো সিনেমা ছিল | কিন্তু এরকম একটা ছবির খুব দরকার ছিল | অভিনয় টভিনয় নিয়ে কিছু বলছি না | সবাই জানেন কারা অভিনয় করেছেন, এবং ওরা ভালো করবেন জানা কথা | শুধু বলার এরকম ছবি করতে বুকের শক্ত পাটা লাগে | সাহস লাগে | সাবাশ অনীক !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.