ঠিক করলেন আর কোনদিন নামের আগে ‘শ্রী’ ব্যবহার করবেন না‚ কোন শোকে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন রবীন্দ্রনাথ?

3550

চেনা কবি অচেনা রবি ( )

১৯১১। ডিসেম্বর মাস। শীতের সকাল। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে চিঠিতে জানালেন, কলকাতায় এসেছেন। উপলক্ষ্য কন্যা মীরার একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। নবাগত দৌহিত্রকে কবি আদর করে ‘নিতাই’ নামেই ডাকতে শুরু করলেন। যদিও তাঁর নামকরণ নিয়ে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে খুব আপত্তি উঠল। নীতীন্দ্রনাথ নামটি না হলেই ভালো। কারণ, কবির বড়দাদা, দ্বিজেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্রের নাম ছিল নীতীন্দ্রনাথ। পারিবারিক মতবিরোধ যখন তুঙ্গে, তখন কবি আমেরিকা থেকে জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে ১৯১৩ সালের ১৬ ফেব্রয়ারি মাসে নীতীন্দ্রনাথ নামকরণের সপক্ষে সরাসরি একটি চিঠি লিখে জানালেন,

মীরা লিখেছে তোমার ছেলের নাম নীতু রাখলে কেউ কেউ তার নাম উচ্চারণ করতে পারবে না। এ কথার কোনো মূল্য নেই। ওঁরা কি রবি সিংহের নাম করেন না? মেজদাদার নামের সঙ্গে সত্যর নামের যোগ আছে বলে কি মেয়েরা সত্যকে আর কিছু বলে ডাকে? বাবামশায়ের নাম তো খুব সাধারণ, সে নাম কি কেউ উচ্চারণ করে না?…”

শেষ পর্যন্ত কবির ইচ্ছেই মান পেল। ছোট্ট নীতীন্দ্রনাথকে এমন ভাবেই কবি ভালোবাসতেন। সে কতটা ভালোবাসা তা নীতীন্দ্রনাথের জীবনের ছোট ছোট নানা ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সেবারই কবি যখন লন্ডনে, ঘরে নীতুর ছবি যত্ন করে রেখে, কন্যা মীরাকে লিখেছিলেন,

মীরু, তোর খোকার হাঁ করা হাবলা ছবিটা Mantel Piece –এর উপর আছে — সেটা প্রায়ই আমার নজরে পড়ে। “

শুধু এইটুকু বলেই থেমে যাননি। স্বীকার করেছেন ছোট্ট নাতিটিকে দেখতে তাঁর মন বড়ো উতলা হয়ে ওঠে। মীরাদেবীর এই ছেলেটি ছোট থেকেই রুগ্ন ছিল। তাঁর একজিমা ছিল, ফলে অল্পেতেই অসুখবিসুখ করত। কবি এই কারণে উদ্বিগ্ন থাকতেন। মীরাদেবীকে চিঠিতে চিকিৎসার পরামর্শ দিতেন। যেমন,

…Sulplur 200 আনিয়ে নিয়ে দুটো বড়ি খোকাকে খাইয়ে দিস। তারপর আবার একমাস অপেক্ষা করে আবার খাওয়াস। Eczema যদি বসে গিয়ে থাকে তবে Sulphur –এ সেই দোষ নিবারণ করবে।…”

কবির এই কনিষ্ঠ কন্যার বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য দুশ্চিন্তার কোনো অন্ত ছিল না। মীরাদেবী এবং নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পর্ক দিনের পর দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছিল। ফলে নীতীন্দ্রনাথের শৈশবটি খুবই অস্থিরতার মধ্যে কেটেছে। কবি তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। শুধু তাঁকেই নয় মীরাদেবীর কন্যা নন্দিতাকেও এনেছিলেন। কবির ইচ্ছে ছিল, শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে তাঁদের শিক্ষা হোক। সেইমতো নীতীন্দ্রনাথকে ভর্তিও করিয়ে দেন। কবির এই ইচ্ছেকে নগেন্দ্রনাথ মানতে না পেরে পুত্রকে নিজের কাছে রাখার উদ্যোগ করেন। নিজের নানা কর্মস্থলে, যেমন কলকাতা, পুনে, হায়দ্রাবাদ নানা জায়গায় নিয়ে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। কবি তখন অসহায়। নিরুপায়। অথচ মীরা দেবী কিন্তু চাইতেন পুত্র কন্যা নিয়ে শান্তিনিকেতনে থাকতে।

বাপমায়ের এই টানাপোড়েনে নীতীন্দ্রনাথের জীবন গড়ার ভিতটি একেবারে তছনছ হয়ে যায়। অথচ তাঁর অনেক গুণ ছিল।

কবির এই নাতিটি ছোট থেকেই গানে অভিনয়ে পারদর্শী হয়ে উঠেছিল। ১৯২১ সালের ২ অক্টোবর শান্তিনিকেতনে ‘ঋণশোধ’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ‘দি ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ’ পত্রিকাতে সেই নাটকে নীতীন্দ্রনাথের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল,

শ্রীমান নীতীন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি, কবির পৌত্র, উপেন্দ্রর ভূমিকায় অতি সুন্দর অভিনয় করিয়া অভিনয়ের আত্মাকে বিকশিত করিয়া তুলিয়াছিলেন। তাঁহার বয়সের পক্ষে তাঁহার অভিনয় পরিণত স্তরের হইয়াছিল।।…”

এছাড়া, তাঁর গুণের কদর করে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ও, সেটি ১৩২৯ সনের ৩ আশ্বিনের খবর। ‘শারদোৎসব ‘ নাটক প্রসঙ্গে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র পাতায় লেখা হয়,

…‘বিশ্বভারতী’র উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব ‘ নাটিকা গত সোমবার পুনরায় ম্যাডন থিয়েটারে অভিনীত হইয়াছিল। এবারও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সন্ন্যাসীর ভূমিকায় অভিনয় করিয়াছিলেন। অভিনয় চমৎকার হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজে ২টি গানও গাহিয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত জগদানন্দ রায় ও শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিনয় খুব স্বাভাবিক হইয়াছিল। কিন্তু সকলের চেয়ে আমাদের ভাল লাগিল উপানন্দের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্রের অভিনয়। এমন মধুর অভিনয় আমরা খুব কমই দেখিয়াছি। বালকবালিকাদিগের ‘কোরাসের’ গানগুলিও ভাল হইয়াছিল।…”

এছাড়া বালক নীতুর কথা এল্মহার্স্টের ডায়েরির পাতাতেও আছে। ১৯২১ সালে, শান্তিনিকেতনে ২২ জানুয়ারি পিয়ারসনের বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণে একটি সান্ধ্য চাপানের আসর বসেছিল। সেদিন ওই আসরে ছিলেন সস্ত্রীক সিলভা লেভি।শ্রীমতী মেরি ফান ইঘেন, রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, মৃণালিনী চট্টোপাধ্যায়, পদ্মজা নাইডু প্রমুখ অনেকেই। এল্মহার্স্ট লিখেছিলেন,

সূর্যাস্তের পর মীরা দেবীর পুত্র নীতু, রবীন্দ্রনাথ ও শ্রীমতী ইঘেন সংগীত পরিবেশন করেন।…”

এই স্মৃতিচারণা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে বারো বছরের নীতীন্দ্রনাথের সংগীতকন্ঠ সাধারণের থেকে নিঃসন্দেহে অনেক উচ্চস্তরের ছিল। তা যদি না হত, তবে রবীন্দ্রনাথ নিজের সঙ্গে তাঁকে এক আসরে সম্মানিত অতিথিদের সামনে কিছুতেই গাইবার অনুমতি দিতেন না।

কবির এই প্রিয় নাতিটি শেষ পর্যন্ত কবির চৌহিদ্দির মধ্যে থাকতে পারেন নি। একূলে ওকূলে এঘাটে ওঘাটে ধাক্কা খেতে খেতে একসময় জার্মানিতে গেলেন মুদ্রাযন্ত্র ও প্রকাশনা শিল্প বিষয়ে পড়াশোনা করতে। সেখানে গিয়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ খবর শোনার পর মীরাদেবীকে কবি জার্মানিতে পাঠিয়ে দেন। শেষের কটা দিন নীতীন্দ্রনাথ মায়ের সেবা পেয়েছিলেন। অবশেষে ১৩৩৯ সনের শ্রাবণ মাসে জার্মানিতে থেকে একটি শোকের খবর এসে পৌঁছাল শান্তিনিকেতনে।

তাঁর জীবনে শোকের যে অন্ত নেই!! ছেলেবেলা থেকে মৃত্যুর মিছিল আজীবন তাঁকে মৌন করে রেখেছিল! জীবনের একাত্তর বছরে নেমে এল এক চরম শোক!! অদ্ভুত ব্যাপার, সেই দিনটিও ছিল বাইশে শ্রাবণ!! হঠাৎ খবর এল তাঁর আদরের নাতিটি আর নেই!! ‘ প্রাণের পরে চলে গেলসে একেবারে না বলে, না কয়ে…!! কত অনুষ্ঠানে যে গান করার জন্য তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন তিনি!! এর আগেও তো এমন অনেক অকাল প্রয়াণ তিনি দেখেছেন, সহ্য করেছেন!! তবু সকলের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করে লজ্জিত করেননি।

মীরাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজের পুত্রশোকের কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন,

শমী যে রাত্রে চলে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি — সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর মধ্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে।…”

পুত্রকে হারিয়েও তিনি সেদিন সামলে ছিলেন শোক, কিন্তু তা বলে নাতির প্রয়াণ?? সেই চরম শোকের মধ্যে সেদিন কবি হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন, যা কিনা আশ্চর্যের শুধু নয়, একেবারে অভিনবও। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের নামের আগে আর কখনও শ্রীব্যবহার করবেন না!! ওই বছরের শ্রাবণ সংখ্যা পর্যন্ত প্রবাসীপত্রিকায় প্রকাশিত সমস্ত রচনায় শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরলেখা ছাপা হয়েছিল!! আশ্বিন সংখ্যা থেকে শ্রীছাড়াই লেখা প্রকাশিত হতে লাগল!! বাকি জীবনে তিনি নিজের নামের আগে আর কখনওই শ্রীব্যবহার করেননি!!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.