কেন এত বিতর্কিত ? কী আছে বৈদিক যুগে বাৎস্যায়ন বিরচিত কামসূত্রে ?

2331

মানবজীবনে চারটি লক্ষ্যের মধ্যে অন্যতম কাম | এখন দুই অক্ষর সম্বলিত এই শব্দের অর্থ সঙ্কুচিত হতে হতে নিকৃষ্টতম পর্যায়ে পর্যবসিত হয়েছে | কিন্তু বাৎস্যায়ন যখন কামসূত্র রচনা করেছিলেন তখন কাম শব্দের অর্থ আরও বিস্তৃত ছিল | ইহজীবনের কামনার প্রতীক ছিল কাম | কামনা থেকেই কাম | সেই কামনা নিয়ে বলতে গিয়েই কামসূত্রের অবতারণা করেছিলেন আচার্য বাৎস্যায়ন | বৈদিক যুগে সূত্র বোঝাত আজকের দিনে ফর্মুলা স্বরূপ | কারণ সূত্র হল সেই জিনিস যা ধারক ও বাহক | গ্রন্থিত করে রাখে | 

কামসূত্র বৈদিক যুগের কালজয়ী সৃষ্টি অবশ্যই | তথাপি এই গ্রন্থের সঙ্গে আজ একাত্ম হয়ে গেছে যৌনতা | কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যৌনতার প্রসঙ্গ এখানে শুরু ও শেষ নয় | যৌনতা আছে গ্রন্থের মাত্র ২০ শতাংশ বিষয়বস্তু জুড়ে | বাকি অংশে আছে প্রেমের প্রকৃতি‚ পারিবারিক জীবন এবং সুখ‚ ইংরেজিতে যার যোগ্য প্রতিশব্দ ‘Desire’  | 

মূলত এই গ্রন্থ হল প্রেমের প্রকৃতি‚ ধরণ ও দর্শন নিয়ে | আলোচিত হয়েছে প্রেম যদি জাগতিক না হয়‚ তবে তার থেকে কি মোহ জন্ম নেয় ? প্রেম দ্বারা কি মোক্ষের নিবৃত্তি সম্ভব ? ইত্যাদি | এই প্রবৃত্তি এবং তার নিবৃত্তি ঘটানো কি ইহলোকের জন্য ভাল‚ না মন্দ ?

হিন্দু দর্শনের ন্যায় মুক্তধারা আজ অবধি জগতে বিরল | সেই খোলা পরিবেশে কামনা বা কাম ( যৌনতা নয় ) নিয়ে অনেক পণ্ডিত কাজ করেছেন | ঋষি বাৎস্যায়নের পূর্বেও | তাঁদের ধারাকেই সমৃদ্ধ করেছিলেন বাৎস্যায়ন | কামসূত্র গ্রন্থের ভূমিকায় পূর্বজদের স্মরণ করে শ্রদ্ধাও জ্ঞাপন করেছেন তিনি |

পাশ্চাত্যের গবেষকদের মতে‚ বাৎস্যায়নের কামসূত্রকে বিভক্ত করা যায় মোট সাত ভাগে | তার ভিতরে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হল জীবনের লক্ষ্য‚ জ্ঞান আহরণ‚ জীবনের নানা পদে প্রেমাস্পদের প্রতি আদর্শ কর্তব্য | 

দশটি অধ্যায় উৎসর্গ করা হয়েছে কামনার অনুঘটক‚ আলিঙ্গনের প্রকারভেদ‚ চুম্বনের প্রকৃতি‚ নখরাঘাত‚ দন্তস্পর্শ ইত্যাদি ইত্যাদি | এই অংশেই আলোচিত হয়েছে কামশাস্ত্রের বহু কথিত চৌষট্টি কলা নিয়ে | সেইসঙ্গে আছে যৌনক্রীড়ার আগে ও পরে কী করা উচিত সেই অবশ্য কর্তব্য নিয়ে |

পাঁচটি অনুচ্ছেদ আছে প্রেয়সীর প্রতি প্রণয়ীর এবং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য নিয়ে | দুটো অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে স্বামী ও পুরো গৃহের প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য | মুখ্য স্ত্রী এবং সতীনদের কর্তব্য পৃথক ভাবে দেওয়া হয়েছে | এছাড়াও বাকি বিভিন্ন অংশে চর্চিত হয়েছে পরস্ত্রীর প্রতি কর্তব্য‚ কীভাবে প্রেমিক পছন্দ করতে হবে‚ কীভাবে শরীরী আকর্ষণ বাড়াতে হবে‚ এমনকী রাজা তাঁর নর্তকীদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবেন‚ তাও আছে | আছে জীবিকাসন্ধান ও অর্থোপার্জনের নানা উপায় | কিন্তু সেসব চাপা পড়ে গেছে পর্দার অন্তরালে |

বাৎস্যায়ন যে দর্শনে বিশ্বাস করতেন তা হল মানবজীবনে চারটি পুরুষার্থ সক্রিয় | কাম‚ অর্থ‚ ধর্ম এবং মোক্ষ | এই চার একে অপরের সঙ্গে জড়িত | আদর্শ জীবনে চারটি সম পরিমাণে থাকা বাঞ্ছনীয় | ভারসাম্য বিনষ্ট হলে অর্থহীন ইহজীবন | কামসূত্রে চারটি পুরুষার্থ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা আছে | কিন্তু কাম অতিকায় হয়ে ঢেকে দিয়েছে অর্থ‚ ধর্ম ও মোক্ষকে |

কামসূত্র পাঠ করলে পদে পদে আপত্তি অসন্তোষ জন্মাতে পারে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পাঠকের মনে | কিন্তু এটা স্মর্তব্য যে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে যে সামাজিক প্রেক্ষাপটে কামসূত্র রচিত হয়েছিল‚ তার সঙ্গে বর্তমান পটভূমির কোনও তুলনা হতে পারে না | পরিশেষে আবারও বলব‚ কামসূত্র অশ্লীল নয় | নগণ্য কামশাস্ত্রও নয় | বরং জীবনদর্শন |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.