অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

Banglalive

 

কথায় বলে – বিনা মেঘে বজ্রপাত। কিন্তু এখন আর কেবল কথাতেই সে খবর আটকিয়ে নেই। কথায় কথায় বাজ পড়বার বহর, যেন সত্যি-সত্যি করেই – বাড়তে বাড়তে চলেছে নিত্যদিন। মেঘেরাও যে অবিশ্যি মাঠ ছেড়ে গিয়েছে এমনটা নয়। চিরকালের সেই বাজ-বিদুৎ জুটির সঙ্গেই এখনও যে তাদের সমান প্রীতির সম্পর্কটুকুই বিরাজমান – বিনা মেঘের কোনও বজ্রপাতের খবরও তাই শুনতে পাইনি কোথাও। তাহলে …

তবুও সেই মেঘেদের দল, যতটুকুই না তারা বর্ষাচ্ছে আজ – তার চাইতেও বোধহয় অনেক বেশী গর্জাচ্ছে দিনকে দিন। আকাশের মন আজ সত্যিই, ভালো নেই বলে সন্দেহ জাগে হঠাৎ। অথচ সেই হদিশ জানাবার মানুষ – সুনীল-সাগরের নীললোহিতও যে, কোনও নোটিশ ছাড়াই বহুবছর পার, হারিয়ে গিয়েছেন ঠিকানাহীন কোনও দিকশূন্যপুরেই। মন খারাপের খবরটাকেও তাই, সত্যি করেই জানাচ্ছেন না কেউ।

এবারে, পরিবেশ ও প্রকৃতির চৌদ্দটা বাজাতেই – আমরা তো ভাই হাত লাগিয়েছি সক্কলেই। কাজেই, আকাশের গায়ে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণটুকুও বাড়তে পারছে রোজ। আর ঠিক তেমনটাই – বিশ্ব-উষ্ণায়ণ এবং ক্লাইমেট চেঞ্জের বাস্তবতাটুকুকেও আমরা টের পেয়ে চলেছি নিত্যদিন। সেই সূত্রেই আবার দিল্লী বনাম কলকাতার আজব লড়াইটাও জমে গিয়েছে খুব। বাতাসের বুকে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ বিচারে – দিল্লী-শহর যতই বা আজ হাঁক পাড়তে পারছে, কলকাতাও যে তেড়েফুঁড়েই পালটা জবাব দিচ্ছে রোজ। সংখ্যার মারামারিতে কেউ কাউকেও এতটুকুও জমি ছাড়তে নারাজ। কাজেই, ২০১৯এর সেই ভোট-দামামার আগেই, কেন্দ্র ও রাজ্যের এই নূতনতর সংঘাতের খবরও, কাগজের পাতায় শিরোনাম হচ্ছে মাঝে মাঝেই। 

সত্যিই কি আজ পরিবেশের প্রভাবেই পালটিয়ে যেতে পারছে বাজ কিংবা বিদ্যুতের ধরণ-ধারণ ? আচরণ পাল্টাচ্ছে কালবৈশাখী অথবা ঝড়বৃষ্টির স্বাভাবিক সমস্ত বৈশিষ্টেরও ? বিজ্ঞানীরাই বা কী বলতে চাইছেন এ সমস্ত কিছুকে নিয়ে? এসব জানতেই তাই, চোখ রেখেছিলাম কয়েকটি গবেষণাপত্রের পাতায়। জানা-অজানার সে সমস্ত খবরকে নিয়েই আজকের প্রতিবেদন। 

তথ্য বলছে পৃথিবীর বুকে গড়ে প্রতি মাসেই – প্রায় ১০কোটিবার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। ছোট অথবা বড়, নানা শক্তিরই এ সমস্ত বজ্রপাতের ঘটনাই কিন্তু মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক। সাদা বুদ্ধিতে ধরে নেওয়াই যায় যে, এই সমস্ত বজ্রপাতের ঘটনার মূল কারণটিই হল মেঘেদের বুকে তড়িদাহত কণার শক্তি-সঞ্চয়। বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণাগুলিই এই শক্তি সঞ্চয়ের কারণ। এই শক্তি সঞ্চয়ের কারণেই তারা আধানপ্রাপ্ত হয় বা চার্জড হয়ে ওঠে। এবং সেই চার্জই যখন বৃষ্টি বা ঝড়ের সময়ে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে (বা ডিসচার্জড হয় বলতে পারেন) তখনই এই বিদ্যুৎ বা বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। 

এবারে যদি সহজ কথাতেই – পরিবেশ ও প্রকৃতির বুকে নিত্যই হয়ে চলা নিয়ত পরিবর্তনগুলির স্বাপেক্ষেতেই আরও একটুও বাড়িয়ে ভাবতে চাই, আমরা বোধহয় তখন নির্দ্বিধাতেই দাবি করতে পারব যে, বাতাসের বুকে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ এখন পালটিয়ে যেতে পেরেছে অনেকটাই। কেবল পরিমাণ পালটিয়েছে বললেও, আমাদের ভুল হবে বোধহয়, কারণ বর্তমানে তাদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যেও বেশ কিছুটা বদল আসতে পেরেছে। শহর এবং শিল্প-এলাকার নতুন ধরণের সমস্ত বর্জ্য এবং কণা-পদার্থও বিনা-বাধাতেই পরিবেশে মিশতে পারছে আজ। এছাড়াও, অনিয়ন্ত্রিত উষ্ণতা পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায়, পালটিয়ে যেতে পারছে কণাগুলির চার্জ-ধারণ ক্ষমতা – বদলাচ্ছে  সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ। দৈনন্দিন বাজ পড়বার ঘটনাও, এ সমস্ত কারণেতেই, পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারছে তাই।

বিজ্ঞানীর বলছেন, বিশ্ব-উষ্ণায়নের কারণে আজ যে কেবল পরিবেশের উষ্ণতা বেড়েছে তাই নয়, প্রতি ডিগ্রীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণবশতই, ১২% অবধি বজ্রপাতের হার বৃদ্ধির একটা আশঙ্কাও তৈরী হতে পেরেছে। পরিবেশ-পরিবর্তন সম্পর্কিত রাষ্ট্রপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেলও, পরিবেশ পরিবর্তনের ফলস্বরূপ বজ্রপাত বৃদ্ধির ঘটনার বিষয়েতে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিনা মেঘে না হলেও, বাজ পড়ছে এবং পড়বে রোজ। 

গ্রীহাউস গ্যাস এবং কার্বন-ঘটিত যৌগের বায়ুমণ্ডলে নিষ্ক্রমণ – পরিবেশের উষ্ণতা বাড়ায়, ডেকে আনে গ্লোবাল-ওয়ার্মিং-এর বিপদ। এর ফলে বাড়ে বজ্রপাত, কমতে পারে বৃষ্টির পরিমাণ – এবং এর সূত্রেই বাড়তে পারে দাবানল এমনকি হারিকেন বা টর্নেডোর মতো আকস্মিক সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনাও। এ বছরের হিসেব অনুযায়ী, কলকাতা ও তৎসংলগ্ন এলাকাতে জুন মাস অবধি বজ্রপাতের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি বোধহয়। বিশেষজ্ঞেরা কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যে শেষ কবেই বা তাঁরা এমন সংখ্যাতে কলকাতায় বজ্রপাত এবং সে কারণে মৃত্যুর ঘটনাও চাক্ষুষ করতে পেরেছেন – স্মরণে আসছে না কারোর। 

সবচেয়ে বড় কথাই হলো, চিন্তা বাড়াচ্ছে রোজকার পরিবেশের খামখেয়ালি আচরণ। বৈশাখের গরমেও তেমনটা গা-পোড়ালো না কোথাও – অথচ জুনের ১৫তেও তাপমাত্রা উঠলো ৪০ ডিগ্রীর উপর। বর্ষার আগমন হয়ে গেলো নির্ধারিত সময়েই, এবং তার সপ্তাহকাল পরেও – তাপপ্রবাহের নজির দেখল শহর। খামখেয়ালটুকুই যেন বা আজ পরিবেশ এবং আবহাওয়ার নিত্যকার দস্তুর হয়ে দাঁড়াতে পেরেছে অবলীলায়। 

সত্যজিতের সিনেমায়, কোষাগারের বাঘ দেখেই যেমন, গীতিকার গোপীনাথ গেয়ে উঠেছিলেন – “বাঘা রে, এ যে বিনা মেঘে পড়ে বাজ” – পারিপার্শ্বের পরিবেশ সম্পর্কেও আমরা যদি বা আজ, এইবারেও সতর্ক না হই – আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়বার সুযোগটুকু আসতেও দেরী হবে না বিশেষ। উঠতি ক্রিকেটার দেবব্রত পালেরাও হারিয়ে যাবেন অকালেই। হাসপাতাল, ডাক্তার বা প্রযুক্তির জটিলতা নয় – অর্জিত কোনও জ্ঞানভাণ্ডারের আতম্ভরিতা নয়, সহজ প্রকৃতিকে সম্মান করেই – প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই আজ লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাজ পড়বার আগেই, সতর্ক হোন আপনারাও।

আরও পড়ুন:  মেকআপ কিট কি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করেন? এখনই অভ্যাস পাল্টান‚ অজান্তেই ডেকে আনছেন অসুখ

1 COMMENT

  1. Khub Valo Vai… Eta notun Janlam… tor lekhar humor ta khub valo r dahralo hoche, ebar parle arektu baro lekhay mon de, serious probleme loker dristi akorson korte tor moto humerus haoa khub joruri… Khub valo…