হলুদ চশমা থেকে পাঞ্জাবিতে মদনজ্বর ফেসবুকে‚ জনপ্রিয়তার মিত্রশক্তি ভোটেও কাজ করবে ?

সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি ছাড়াও একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাঁর নামে। প্রায় দু’বছর পর্যন্ত ছিলেন জেল হেফাজতে। জেলের কথায় নিজেকে নেতাজির সঙ্গে তুলনা করেন। সম্প্রতি বললেন, নেলসন ম্যান্ডেলাও ৪২ বছর জেলে থাকার পর রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন।

মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। কিন্তু কিছুই যেন হারাননি তিনি। দাপুটে নেতা প্রভাব প্রতিপত্তি খুইয়ে প্রায় নির্বাসনেই ছিলেন । তবে কিছুদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে ফিনিক্স পাখির মতো উড়ে এসে মগডালে বসেছেন। তলিয়ে যাওয়া মদন মিত্র এখন ফেসবুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

দিনে বার চারেক লাইভে এসে মদন এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ‘দশ মিনিটে লাইভে আসছি, সরি ফর দ্য
ইন কনভিনিয়েন্স’। মানুষ তাঁর জন্য অপেক্ষা করে। সময়ে যদি লাইভে আসতে না পারেন, তখন বলেন ‘সরি ফর দ্য ইনকনভিনিয়েন্স’। আর লাইভে আসার ঠিক দশ মিনিট আগে আপডেট দেন; যেন তারা তৈরি থাকেন। ‘আমি মানুষকে প্রতারিত করতে চাই না। আই ডোন্ট লাইক টু প্লে উইথ দেয়ার ইমোশনস। এটাও বলছি, ঈশ্বর যদি আমায় অবকাশ দেন, আমি মৃত্যুর আগেও আপডেট দেব। লাইভে আসছি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে। ভীষ্মের কেন শুধু ইচ্ছামৃত্যু হবে? আমার ভগবত গীতায় লেখা ইচ্ছামৃত্যু আমারও হবে’।

মদন-ভক্তদের হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট…
‘মদন মিত্র অ্যাট আনইউজুয়াল প্লেসেস…’ পেজের ফলোয়ার লিস্টে আপনি আছেন?
মদনঃ আমি ফলোয়ার নই। কিন্তু খবর পাই। 
কী খবর?
মদনঃ  যিশু খ্রিস্টের পাশে মদন। মেসির পাশে মদন। আমি ভেবে দেখেছি, ঈশ্বরকে আমরা কোথায় না বসাই? যেখানে যখন খুশি বসিয়ে দিচ্ছে। ঈশ্বরকে বসাতে পারছে, আমায় বসালে কীই বা আসে? আমি কি ঈশ্বরের থেকে বড়? আমার কিন্তু ওই পেজের মিমগুলোর মধ্যে আমিষ কিছু চোখে পড়েনি। সব নিরামিষই লেগেছে।
নিজের কোনও মিম দেখে হেসেছেন?
মদনঃ গান্ধীজি, জওহরলাল নেহরু, সরোজিনী নাইডু। গান্ধী আর মানস সরোবরের শিব প্রায় কাছাকাছি। তাদের পাশে আমি। আর মালাটা এমন ভাবে সরোজিনী নাইডু হাতে ধরেছেন, যেন আমাকেই পরিয়ে দেবেন!

আমাকে অনেকে বলে যে দাদা আপনাকে বেচে খাচ্ছে, কিছু করুন। তার উত্তরে আমি বললাম মা কালী-শিব-জগন্নাথকে বেচে কতজন খাচ্ছে। তারাও তো নীরব মোদি হয়ে গেছে। আমি আর সরব কী ভাবে থাকব ?এককথায় সবাই মদন লাইভে কাবু। মদন মিত্র ফাটাফাটি বলে একটা গ্রুপ তৈরি হয়েছে। তাঁকে নিয়ে তৈরি হওয়া একটি মিম পেজও কয়েক সপ্তাহ ধরে মাতিয়ে রেখেছে সোশ্যাল মিডিয়ার বাজার। তাঁর লাইভ ভিডিও, সেখানে রাখা তাঁর বক্তব্য সবকিছুই নেটিজেনদের আলোচনার শীর্ষে।

আচ্ছা দাদা গোলপোস্টে গোল হয় না কেন?
মদনঃ এটা আমারও প্রশ্ন। টি, ও-তে ‘টু’ হয় কিন্তু জি আর ও তে ওইটা হয় না।

আমার কিছু হয়েছে; সব কিছুতেই খালি মদনাকে দেখতে পাচ্ছি ?
মদনঃ এটা একটা রোগ। মেগ্যালোম্যানিয়া।
মদনদা, মহাকাশে যান পাঠাচ্ছে ; আপনি যাবেন ?
মদনঃ  মহাকাশে তো যেতে হবেই। আজ নয় তো কাল। যান লাগবে না।

এসবের মধ্যেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী করেছেন। রাজ্যের প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী মদন মিত্রের কথায়, ‘বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিলাম, ভাটপাড়ায় প্রার্থী হওয়া ভারতরত্ন পাওয়ার মতো সম্মান’। ফেসবুক লাইভে মদন মিত্রই জানিয়েছেন, ‘কামারহাটি আমার কৈশোরের বৃন্দাবন, আর ভাটপাড়া বার্ধক্যের বারাণসী’। পাশাপাশি এও জানিয়েছেন, ‘ আপাতত অ্যালাইভ থাকছি ভাটপাড়ায়, ফের লাইভে আসব ২৩ শে মে। কামারহাটির বাসিন্দারা কোনও সমস্যায় পড়লে আগের মতোই ফোন করতে পারেন। তবে সভায় ব্যস্ত থাকলে ফোন ধরতে পারব না’।

অনুগামীদের মধ্যে শোকের আবহ । সম্ভবত সেটা বুঝতে পেরেই মদন লিখলেন, ‘রাহা জিন্দেগি, তো ফির মিলেঙ্গে’। আবার ফেটে পড়ল জনতা। কানফাটা হাততালির মধ্যে সানগ্লাস চোখে রওনা দিলেন মদন মিত্র। সানগ্লাসের কথায় মদন লিখেছেন, ‘অনেকে ভাবে মদন মিত্রর সানগ্লাস মানেই কার্টিয়ের বা আর্মানির হবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন এটার দাম মাত্র ২০০-৩০০ টাকা। যেমন রাস্তার কুকুরকে রোডেশিয়ান বলে, এটা ইটালিয়ান স্যালোঁর মতো, ইটালিয়ান চশমা। রাস্তায় রাখা ইটের উপর বিক্রি হয়। যখন প্রথম পরেছিলাম, এত টাইট ছিল যে চোখের পাশে দাগ হয়ে গিয়েছিল। তাই দু’সাইড দিয়ে টেনে চওড়া করে নিয়েছি। এখন ফুল ফিটিং’।

২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পর বিষ্ণুপুর উপনির্বাচনে জয়লাভ করেন মদন মিত্র। সেই শুরু, তারপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১১ সালের সুনামিতে বামেরা ভেসে গেলে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। ক্রীড়া দফতরের দায়িত্ব যায় দাপুটে মদনের হাতে। তারপর পরিবহণ দফতর । কিন্তু সারদা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে জেল। শ্রীঘরে বসেই কামারহাটি বিধানসভা ভোট লড়েছেন কিন্তু হেরেছেন। দীর্ঘদিন পর জামিন পেয়েছেন। তারপর তৃণমূলে থাকলেও, ভোটের ময়দানে দেখা যায়নি তাঁকে।

তবে কামারহাটির সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল নিবিড়। এবার সেই অপেক্ষার অবসান। অর্জুন সিংহের দলত্যাগে, ভাটপাড়া কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী মদন মিত্র। ভাটপাড়ায় মদন বনাম অর্জুন লড়াই ক্রমশই জমে উঠছে। যদিও অর্জুন নিজে ব্যারাকপুর লোকসভায় বিজেপি প্রার্থী। তবু ভাটপাড়া উপনির্বাচনের লড়াইতে অর্জুনই বিজেপির তাস আর বিপক্ষে তৃণমূলের পোড়খাওয়া নেতা মদন মিত্র। অর্জুন সিং এর গড়ে মদন মিত্রকে দাঁড় করিয়ে মমতা বড় চাল চেলেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মদন মিত্র সেই গড় কি উদ্ধার করতে পারবেন?

প্রচারে মদন মিত্রই অঙ্গীকার করেছেন; তিনি বাঘ সিংহ মেরে দেবেন। আর জিততে না পারলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেবেন, কিন্তু আত্মসমর্পণ করবেন না । ১৯ মে লোকসভা নির্বাচন পরিসরে হাইভোল্টেজ ম্যাচ হবে ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে। যেখানে খাতায়কলমে বিজেপির প্রার্থী পবনকুমার সিং। বস্তুতপক্ষে পুত্র পবনের বকলমে বারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন তৃণমূল হেভিওয়েট অর্জুন সিং-ই লড়ছেন পোড়খাওয়া তৃণমূল নেতা মদন মিত্রর বিরুদ্ধে । ভাটপাড়া অর্জুনের গড়। মদনও তৃণমূলের ডাকসাইটে নেতা, ফেসবুকের কল্যাণে তিনি এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

অন্তর্জাল দুনিয়ার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ধারণা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে সোশ্যাল মিডিয়া। ইন্টারনেট অ্যান্ড মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ২৪ শতাংশ কেন্দ্রে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ব্যাপক। ‌অর্থাৎ গড়ে ৪টির মধ্যে একটি আসনের হার-জিত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাতে । পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৭০টি কেন্দ্রের রাজনৈতিক মনোভাব ও পরিস্থিতির উপর ব্যাপক হারে প্রভাব ফেলেছে সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানে মদন মিত্রের ফেসবুক ফলোয়ার সংখ্যা আড়াই লক্ষাধিক, একটি মন্তব্যে হাজার হাজার লাইক।

Advertisements

2 COMMENTS

  1. লেখাটি সর্বগুণে গুণান্বিত মদন গোপাল মিত্রকে নিয়ে হলেও পড়ে এক ধরনের মজাই পেলাম।

  2. সোশ্যাল মিডিয়া ভোটে হার-জিত নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সত্যিই কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? লেখাটি পড়ে প্রশ্নটি মনে এল লেখকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী। আমার মনে হয় না পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.