শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলা সাহিত্যপ্রেমী। পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক। জন্ম, বেড়ে ওঠা, থাকাথাকি সবই হাওড়া জেলার এক বর্ধিষ্ণু মফস্‌সল জনপদে। পছন্দের ক্ষেত্র মূলত গদ্য। চারপাশে ঘটে চলা আর হারিয়ে যাওয়া সময়। মজার মিশেল অথবা অন্যভাবে ভাবা। গল্প লেখার ব্যাপারে আলসেমি। এখনো অবধি একমাত্র প্রকাশিত গল্পের বই 'জেড মাইনাস' (২০১৪)। পেশাগত ভাবে একটি অগ্রণী ইংরাজি প্রকাশনা সংস্থায় যুক্ত।

১৯ নভেম্বর ২০১৭ তারিখটা এসেই গেল। পালাবার পথ নেই। কেন? ও তোর যম আছে পিছে।

Holi Hai

খবরের মাঝে মাঝে আকাল পড়ে। আমাদের রাজ্যে বা দেশেই নয় শুধু, সারা পৃথিবীতেই। তখন ভুসভুসিয়ে উঠে আসে হলুদ খবর। পৃথিবীর কথা থাকুক, আসুন কাছের কথায়।

দেখবেন, খবরের কাগজের প্রথম পাতা এবং নিউজ চ্যানেলের প্রাইম টাইম সম্মানের নিরিখে এক হলেও সারবস্তুর নিরিখে সম্পূর্ণ বিপরীত। পরিষ্কার হল না? বেশ। তার আগে, খবরের আকাল ব্যাপারটা একটু বুঝে নিই। আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক খবরই মূল খবর। এখন সেই খবরের জোগান কোনওভাবে কম হলে আসে আকাল। আকালের দিনগুলিতে খবরের কাগজের প্রথম পাতা কিছুমিছু একটু কম ভারের রাজনৈতিক খবরই ছাপে। ছবিছাবা দিয়ে পাতা ভরিয়ে দেয়। হয়তো প্রখর দাবদাহে মাটি টুটিফুটি, বা শ্রাবণের ধারার মতো কিছুর ছবি। রাজনৈতিক নেতানেত্রীর পিসতুতো বোনপো কী সুন্দর সবেদা ফলিয়েছে, তার ছবি। বা নেতানেত্রী হয়তো কোনও গ্রামে গিয়ে সেখানের এ পাড়া ও পাড়া ফুটবল ম্যাচে জয়ী দলের হাতে শিল্ড তুলে দিচ্ছেন, ছোট করে সেই খবর, সঙ্গে ছবি ইত্যাদি।  

খবরের আকাল চলছে, আর আপনি প্রাইম টাইমে নিউজ চ্যানেল চালিয়েছেন টিভিতে। দেখবেন শুরু হয়ে গেছে প্যানিক নিউজ। আলোচনা চক্রে উপস্থিত কুশীলবেরা বলবেন — খোলা জায়গায় নিঃশ্বাস নেবেন না। নিঃশ্বাস একান্তই যদি নিতে হয়, তো আগে নিজেকে সক্কলের চোখের আড়ালে নিয়ে আসুন। চট করে চারবার নিঃশ্বাস নিয়েই আবার বন্ধ করুন নিঃশ্বাস নেওয়া। ভাত দিয়ে ডাল খাবেন না। রুটি দিয়ে কুমড়োর ছক্কা খান নাকি! ছাড়ুন এসব। বরং রুটি দিয়ে অল্প ভাত পাকিয়ে পাইপের মতো বাগিয়ে খেয়ে মুখ ধুয়ে নিন। অথবা ডালের মধ্যে কুমড়োর ছক্কা ফেলে ঘেঁটে নিয়ে, তাতে দু’ফোঁটা আয়ুর্বেদিক মধু মিশিয়ে ঢকঢক খেয়ে নিন। অনেক খাদ্যগুণ ওর। নিজের মুড়ো বাঁচাতে চাইলে মাছের মুড়ো খাওয়া ছাড়ুন। সবজি কিনেই আগে তাদের আপাদমস্তক চান করান, সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে যতেক বিষ তুলুন সবজিগুলির গা থেকে। মুরগি খাবেন না মোট্টেও। বরং মুরগিদের দত্তক নিন। আপনার পদবি পেয়ে দেখবেন ওদের ঝিমভাব কেটে যাবে। তরক্কি করে দেখাবে ওরাও। অ্যালুমিনিয়ম ফয়েলে খাবার মুড়ে আপিসে বা ইশকুলে পাঠান আপনি! করেছেন কী! এক কাজ করুন। এবার থেকে ওগুলো প্ল্যাটিনাম ফয়েলে র‍্যাপ-আপ করুন, কিম্বা সোনার চাদরে। একটু দামী এগুলি, কিন্তু বিশুদ্ধ স্বাস্থ্যকর।

আরও পড়ুন:  সরস্বতী কতটা সতী? ব্রহ্মার কামনা, পতিতালয়ে বারাঙ্গনা!

এই তালিকায় নয়া সংযোজন : ২০১৭-এর ১৯ নভেম্বর ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের এই পৃথিবী। হাতে মাত্র এক দিন। এক দিন না বলে, এখনকার খুব ‘ইন’ একটা শব্দ ব্যবহার করি, কার্যত। তাহলে বাক্যটা দাঁড়াল গিয়ে, হাতে কার্যত কয়েক ঘণ্টা! এটুকু সময়ে কোন কাজটা করে নেব আর কোন কাজটা ছেড়ে দেব, বুঝতে বুঝতেই তো ফক্কা।

মানুষের ভয় এক বিপুল বাণিজ্য সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করে। যেভাবে হরর মুভি দেখে মানুষ ‘আনন্দ’ পায়, সেভাবেই ভয়ের খবর জেনে আমাদের দুঃখ কষ্ট চিন্তা উদ্বেগ যত হয়, তার বহুগুণ হয় অবদমিত ‘আনন্দ’। মানুষের মস্তিষ্কের অচেতন সত্তা এই আনন্দের দখল নেয়, মুখোশ পরিয়ে দেয় সচেতন সত্তার মুখে। সে মুখ বলাবলি করে, ‘হে আল্লা ভগবান! ওহ মাই গড! হায় হায় কী হবে গো!’

টিভি নিউজ চ্যানেল হয়তো একবার সম্প্রচার করল এইসব ‘জুজু’ খবর। রইল পড়ে ভাইরাল পথ। হাটের মাঝে সদাই ফাটছে হাঁড়ি। ফুটছে নতুন খবর কুঁড়ি। ইন্টারনেটে ছবি, ভিডিওর ছড়াছড়ি। লোকের মুখে মুখে তা পল্লবিত হচ্ছে। মুখে মুখে আর কথা হয় কই! কথা হচ্ছে ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে, আরও যত ভার্চুয়াল অলিতে গলিতে সড়কে।

নাকি আকাশ কালো করে আসবে। ধ্বংস হবে যখন সবাই রাতে ঘুমোবে। প্রবল জলোচ্ছ্বাস হবে। বিরাট ভূমিকম্প হবে ইত্যাদি।

পৃথিবী ধ্বংসের প্রথম খবর জেনেছিলাম, তখন সদ্য তরুণ। ১৯৯৭ সাল। মহান নস্ট্রাডামুস নাকি কবেই আঁক কষে বলে গেছিলেন, ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই শেষ। প্রায় বছর কুড়ি পরে এ কালের আরেক মহান স্টিফেন হকিং-ও জানিয়ে দিয়েছেন, এই গ্রহ আর মানুষের বাসযোগ্য থাকবে না বেশিদিন। দ্রুত মানুষকে পালটাতে হবে নিজের ঠিকানা। না হলে সমূহ বিপদ। সঙ্গে আরও কথা বলেছেন, বক্তব্যকে যুক্তিনিষ্ঠ করতে। কিন্তু অত কথা শোনার সময় আছে নাকি মানুষের! মানুষ বরাবরই ‘কাকে কান নিয়ে গেছে’ শুনেই দৌড় লাগায় কাকের পিছনে। কান সত্যিই আছে কি নেই পরখ করে না।

আরও পড়ুন:  বইমেলার দূষণ, দূষণের বইমেলা

যেমন এই ধ্বংসকথন। ইন্টারনেটে খুঁজে দেখুন – ১৯ নভেম্বর ২০১৭ কি পৃথিবীর শেষ দিন – লিখে। অনেকগুলি নিউজ-সাইট এসে যাবে। পড়তে শুরু করুন। শুরুতেই ভয়ানক হুড়ুম দুড়ুম বাক্যবাণ ফুঁড়ে ফেলবে আপনাকে। সহ্য করুন, এগিয়ে চলুন। কিছু ছবি আসবে, মর্মান্তিক কিছু ঠোকাঠুকির। কিছু আতঙ্ক-নীল ভিডিও-ও। স্নায়ু শক্ত রেখে আরেকটু এগোলেই পাবেন আপাত-আলোর দিশা। ছোট্ট একটি স্তবক :  বিশিষ্ট বিজ্ঞানীজনেরা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অমুক-অমুক সংস্থারা যদিও মনে করছেন না এই খবর বিশ্বাসযোগ্য, বা আদৌ এমন কিছু হতে চলেছে। অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ। সেই ট্র্যাডিশন আজও।   

যাক! নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। কী বলেন?

আচ্ছা, ‘আপাত-আলো’ কেন? মানে, ‘আপাত’ শব্দ প্রয়োগের কারণ? এবার সে কথায় আসি।

পৃথিবীর ক্রম-উষ্ণায়ন। জলবায়ুর বিপুল পরিবর্তন। গ্রিন হাউস এফেক্ট। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। বাতাসকে কলুষিত বেশি করছে কোন রাষ্ট্র? কম করে যেসব রাষ্ট্র কলুষিত করছে, তারা কি অন্যায় করছে না?

আয়লা। সুনামি। মুম্বই এবং চেন্নাই শহর ভেসে গেল প্রবল বর্ষণে। নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়ে গেল। ইরাক ইরানে হয়ে গেল সাঙ্ঘাতিক ভূমিকম্প। দিল্লিতে বিষ-ধোঁয়াশা। তার আঁচ পাচ্ছে কলকাতাও।

চেনা চেনা ঠেকল কথাগুলি। কিন্তু এসব নিয়ে কে ভাবে? আমাদের দেশজ রাজনীতিতে পরিবেশ একটা আবশ্যিক পদ মাত্র। একটি মন্ত্রী রাখতেই হয়। তাঁর একটি দপ্তর না রাখলেই নয়।

আর আমরা? জনগণেশ কী করি? ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর পেরিয়ে এসেছি। ২০১৭ সালের নভেম্বরও হয়তো পেরিয়ে যাব। আমরা  দৈনন্দিন জীবনে বাজারে ব্যাগ নিয়ে যাব না, ফলে নিষিদ্ধ মাপের প্লাস্টিক ব্যবহার চলবেই। কালীপুজোয় পটকা দোদমা ফুলঝুরি মশাল নিয়ে দেদার মজা করব। একটু সচ্ছল হলে দু’চাকা কিনব ভাবলে কেউ সাইকেলের পরামর্শ দিলে অপমানিত হব। মোটরবাইক কিনব, পেট্রলে চলবে। ওইসব ইলেকট্রিক স্কুটার ফক্কিকরি, আয় দেবে না, উপদেশ শুনে বিশ্বাস করব। বাইক চালিয়ে বাতাসে ঠুসে দেব পেট্রলের ধোঁয়া। দরকার না হলেও হর্ন বাজাবো বেশটি করে। আরেকটু অবস্থার উন্নতিতে চার চাকাও কিনব ভেবেছি। সেও পেট্রল বা ডিজেল ইঞ্জিনের। ট্রাম উঠেই যাওয়া ভালো কলকাতা থেকে, বলে হেঁড়ে গলায় সওয়াল করব। ফালতু সেন্টিমেন্ট দেখিয়ে শহরটার গতি কমিয়ে দেবেন না, বলব।

আরও পড়ুন:  স্বাধীনতা দিবস হতে হতে ২৬ জানুয়ারি হয়ে গেল প্রজাতন্ত্র দিবস !

আর অপেক্ষা করব। আবার কবে কোনও খবরে আরেক তারিখ দেগে দেবে, ভয় পাব বেশ। তারিয়ে পড়ব দেখব সেই সব খবর। ছড়িয়ে দেব চেনা কম-চেনা সকলের মধ্যে।

পালে বাঘ যে দিন পড়বে সত্যি, ভয় হয়, মানুষের কথা তখন বিশ্বাসযোগ্য থাকবে তো? একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারব তো? বিশ্বাস করুন, এভাবে চললে বাঘ পড়বেই পালে। চকিত জাদুতে হুশ করে ধ্বংস হয়তো হবে না গোটা পৃথিবীটা। তিলে তিলে, দগ্ধে দগ্ধে। নরক যন্ত্রণায়।

আর সে খবরের মুচমুচে, ঝাল, নোনতা কিছু স্বাদ থাকবে না, যা দিয়ে নিউজ চ্যানেলের টিআরপি বাড়ে বা নিউজ সাইটের হিট।

যাতে এভাবে না চলে, তার জন্য, কিছু করুন। যা যেমন পারেন। আজ থেকেই।

NO COMMENTS