বিষাক্ত বাতাস, নিঃশ্বাসে নিদারুণ বিষ – ৭০ লক্ষ মানুষের স্ট্যাটিসটিক্স

world environment day

আবারও একটা পরিবেশ দিবস। আবারও একটা ৫ই জুন। বিশ্বজোড়া হা-হুতাশের খবর। ভোটযুদ্ধ মিটে গিয়েছে। এখন তাই অন্য একটা নতুন লড়াইয়ের সময়। নির্বাচনী প্রচার শেষ হতে না হতেই – নেটিজেন এবং কিছু সংখ্যক সিটিজেন (বা নাগরিক সংগঠনগুলি) বেশ একটু আক্ষেপের সুরেই বলতে শুরু করেছিলেন যে, বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই নির্বাচনে, পরিবেশ বা ওই সংক্রান্ত ব্যাপারগুলিকে ইস্যু করে না কেউ। আসলে ১৩০ কোটি মানুষের ‘উন্নয়ন’ এবং তার সঙ্গে ‘কর্মসংস্থান’ ইত্যাদি ভারী ভারী বিষয়গুলি যেখানে জড়িত, সেখানে গাছ-নদী-জল-মাটি-আকাশের খবর যে যথেষ্ট পরিমাণে গুরুত্ব সহকারে জায়গা করে নিতে পারবে, এমনতরো আশা করাটাই অনুচিত। এমন হওয়াটাই আশ্চর্যের। এমনতর মানসিকতাকে ‘ইমপ্লিমেন্ট’ করাটাও শক্ত কাজ। তবু, কিছু কিছু খবর যে পড়তে হয় – কিছু খবরকে পড়াতে হয়। ভবিষ্যতের প্রয়োজনেই।

এবারের পরিবেশ দিবসকে পালন করবার সময়ে – রাষ্ট্রপুঞ্জ বিশেষ ভাবে বায়ুদূষণের বিষয়ে প্রচার করতে চেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর বক্তব্য অনুসারে কিছু তথ্যকে যদি সাজিয়ে দিই, আঁতকে উঠবেন না প্লীজ। হু-র বক্তব্য অনুসারে, পৃথিবীতে পারিপার্শ্বিক বা আমাদের চারপাশের পরিবেশের বায়ুদূষণের কারণে অসুস্থ হয়ে প্রতি বছর ৪২লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। গৃহস্থালীর কাজকর্মের সময় উনুনের ধোঁয়া এবং অন্যান্য কারণবশত, প্রতি বছরে ৩৮লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এবং শেষ হইয়াও হইলো না শেষ – আমাদের এই সসাগরা পৃথিবীর ৯১% মানুষ এমন জায়গাতে বাস করেন – যেখানকার বাতাস দূষিত – হু-র গাইডলাইন অনুযায়ী। আমরা তো মশাই আরশুলার বংশধর, সবতাতেই মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে ফুরফুরে হাওয়াতে, ফেসবুক-আঙিনাতে টুকটুকে হয়েই বেঁচে থাকি কেবল। আর মানুষ মরলে পরে তা হয় স্ট্যাটিসটিক্স।

টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনী বিরতিগুলোতে – চুলের রঙ, গায়ের সাবান, দীপিকা পাড়ুকোনের গাড়ি এবং রক্ত জল করা সেন্টের বিজ্ঞাপনগুলি ছাড়াও, আমরা যা দেখি – সেগুলি হলো পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গিয়ে স্কুলের নোটবই এবং মশা মারবার কয়েলের বিজ্ঞাপন। একটা সহজ প্রশ্ন করি এবার আপনাদের – যে জিনিসটি মশার পক্ষে ক্ষতিকারক, তা কি (শক্তিতে অল্প হলেও) আমাদের পক্ষেও ক্ষতিকারক নয় ? প্রাণকে বিনষ্ট করবার ক্ষমতা যার আছে, সে তো যে কোনও প্রাণকেই বিনষ্ট করতে পারে – তা মশারই হোক, কি মানুষের। ডোজের বা মাত্রার তারতম্য কেবল – এমনটাই শুধু বলতে পারেন। কিন্তু ক্ষতি করে। ক্ষতি করছে। বিশেষত মশা মারবার কয়েলগুলো তো বটেই।

এই মশা মারবার কয়েলগুলোতে যা থাকে – তার একটা হিসেব দিই আপনাদের। এগুলিতে থাকে এ্যালুমিনিয়াম, ক্রোমিয়াম এবং টিন। সিগারেটের ধোঁয়াতে থাকে তামা, দস্তা, ম্যাঙ্গানীজ, নিকেল এবং সীসার মতো বিষ। আমরা দেশের ভবিষ্যতকে ফুঁকে ওড়াই। আর, আগেও বলেছি – একাধিকবার একাধিক জায়গাতে বিজ্ঞানীরা বলেছেন – দীপাবলির আতসবাজি, আর ফসল ঘরে তুলে নেবার পরে কাটা গাছের গোড়াগুলিকে জ্বালিয়ে দেবার ফল যে কতখানি মারাত্মক, আমরা তা বুঝেও, না বোঝার ভান করে থাকি। ঘরের শত্রু বিভীষণ, থুড়ি -মশা আর সিগারেট। আর বাইরের শত্রু ওই উড়নতুবড়ি আর রংমশাল। আমরা বাজি পোড়াই, সিগারেট খেয়ে ক্যানসারকে আহ্বান জানাই, নিজের জন্যও – নিজের পাশের মানুষটির জন্যও। আর ভাইফোঁটা মিটে গেলেই, ফেসবুকে দিল্লী ভার্সেস কলকাতার, বায়ুদূষণ সূচকের মুর্গা-লড়াই লাগিয়ে দেই। আমাদের আনন্দময়ী সভ্যতা! আনন্দস্বরূপিণী ঈশ্বর তখন মিটিমিটি হেসে চেয়ে থাকেন।

সুভাষ দত্তকে আমরা অনেকেই গালাগাল দিতে পছন্দ করি। মাথায় টাক, চোখে সেই কালো ফ্রেমের গোল-ছাঁদের প্যাঁশনে চশমার মানুষটি, কলকাতার ফুসফুস আর কলকাতার গঙ্গাকে বাঁচানোর প্রয়োজনে, প্রায় নীলকণ্ঠ হয়েই কাজ করে চলেছেন। যে বছরে ময়দান থেকে বইমেলা সরে গেলো, আমি তখন স্কুলপড়ুয়া ডেঁপো ছোকরা ছিলাম – অর্কুটের এ্যাকাউন্ট ছিলো না, কাজেই বাড়ির খাবার টেবলেই তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ফরাসী বিপ্লবের জোরদার হল্লা চালিয়েছিলাম। কেবল তখন এটা বুঝিনি যে – মেলাটা সরে গেলো বটে, কিন্তু ময়দানটা বেঁচে গেলো। অনেকে হয়তো বলবেন, যে এখনও রাজনৈতিক দলগুলির কারণে সামান্যতম দূষণটুকুও কমতে পারেনি, বরং বেড়েই চলেছে। তবু, তাদেরকেও আমি বলতে পারি যে – কোথাও তো একটা শুরু করতে হবে আমাদের। ময়দানে মেলা করাটা বন্ধ হয়েছে। একদিন নিশ্চয়ই সভা-সমাবেশগুলিও বন্ধ হতে পারবে। সুভাষ দত্ত না হলেও আরও কোনও নতুন পরিবেশকর্মীর হাত ধরেই। আমরা জোট বাঁধি বরং – গাছ আর মুক্ত বাতাসের প্রয়োজনেই।

আবারও একটা ৫ই জুন। এবারের বিষয় বায়ুদূষণ। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে ভারত-চীন একাত্মা হয়ে রয়েছে। শ্বাসকষ্ট আর ধোঁয়াশার নিরিখে বেজিং বলছে আমায় দ্যাখ, দিল্লী বলছে আমায়। কলকাতা বলছে, আমিও বা পেছিয়ে থাকবো কেন ? ভিক্টোরিয়ার পরীর কাঁধেও অক্সিজেন সিলিন্ডার। মানুষের মুখ ঢেকেছে মুখোশে, সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর সত্তর লক্ষ মানুষের মৃতুর খবর। ভয় দেখাচ্ছি আপনাদের। ছাদের বাগানে অন্তত মানিপ্ল্যান্ট লাগান। সিগারেট না পুড়িয়ে বাড়িতে জানলা খোলবার ব্যবস্থা করুন। বাইরের হাওয়া আসতে দিন। এসিতে বসে ঠান্ডা না হয়ে, বাইরের পৃথিবীটাকে একটিবারের জন্য হলেও উপভোগ করুন। নচেৎ, কিন্তু ঘোর বিপদেরই পূর্বাভাস। দম আটকে আসছে কি আপনাদের ? ভারতবর্ষে এই মূহুর্তে প্রতি সাতটি মৃত্যুর পরে অষ্টম মৃত্যুটির কারণ কিন্তু বায়ুদূষণ। হলিউডের স্ক্রীপ্ট নয় – বিজ্ঞানীদের স্ট্যাটিসটিক্স।

“প্রেম ছাড়া কি দিনবদলের গান শোনানো যায় ?” … অনেকদিন পর, সেদিন – কলকাতা ময়দানে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ বসেছিলাম। আমার পাশে ছিলেন আরেকজন। আমরা সেদিন সূর্যাস্ত দেখছিলাম। ঘাসগুলোকে দেখছিলাম। ফুরফুরে বাতাসটাকেই উপভোগ করছিলাম। ঘুড়ির সুতো হাতে প্রাণপণে ছুটতে থাকা শিশুটিকেই দেখছিলাম। যখন গাড়ি চলে – ভকভকে কালো ধোঁয়ায় শিশুটির মুখ ঢেকে যায়, তার নিঃশ্বাসে বিষ ঢোকে – আমরা কাব্যি করি, উপন্যাস লিখি তখন। বায়ুদূষণ যে ফেসবুকের নিউজফীডকে ছাপিয়েও ভীষণভাবে বাস্তব এখন – সেটাকে দীপাবলি আর নিউইয়ার্সের সময়টুকুকে বাদ দিয়েও, বছরের বাকি সময়গুলোতেও উপলব্ধি করতে হবে। সাচ্চা পরিবর্তন কেবল তখনই ঘটতে পারবে – কাগজ-কলম বা বিধানসভাতে নয়, মানুষের মনে বা সমাজে – মানুষের মনস্তত্ত্ব’তেও। আমরা হাতে হাত রাখি – আকাশটাকে ধোঁয়াচ্ছন্ন বলে মনে হলেও, আকাশের উপরে যে আকাশ, সেইটুকুর কল্পনাকেই – কল্পনা করে নিতে ইচ্ছে হয়। ভয় থাকুক, বায়ুদূষণ বরং ভয় ধরাক – তবেই তো আমরা সাহস করে গীটার বাজাবো, মানুষকে ডেকে ডেকে বলতে চাইবো, উই শ্যাল ওভারকাম … ৫ই জুন আমাদের শপথ নেবার দিন।

সূত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরকারি নথিপত্র এবং ডাউন টু আর্থ

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

1 COMMENT

  1. খুব ভালো ভাষা ভাই, মূল বক্তব্য অবশ্যই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং খুবই সুন্দর ভাবে ব‍্যাক্ত হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে ও আরও সর্বজনস্বীকৃত সংবাদপত্রে এরকম অনেক লেখা শীঘ্রই পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here