অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

আবহাওয়ার খামখেয়াল যে কতদূর অবধি বেয়াড়া হয়ে উঠতে পারে – বাঙালি এবারের দীপাবলিতেই তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। কেবল কি বাংলায়, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গাতেই এখন ত্রাহি ত্রাহি রব – ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবন। অনিয়মিত বর্ষণ, অতিবৃষ্টি কিংবা ঘোর অনাবৃষ্টির মেজাজ সইছে এখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ। আর সবার অলক্ষেই আমাদের ঘরের কাছের সুন্দরবনেই নিঃশব্দে লেখা হচ্ছে ইতিহাস – না কি বলবো অশনি-সংকেত? এবারের লেখাটিতে আর আপনাদের দৈনন্দিন হেঁশেলের গল্প শোনাবো না, বরং শোনাতে চাইবো আমাদের ঘরের কাছেই নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা একটি বিপদ-সংকেতের – তাবড় বিশ্বনেতাদের যে বিষয়টাতে খুব দ্রুতই নজর দেওয়া উচিত।

Banglalive

১৯৯০ সালে বিশ্বের ছোটো ছোটো দ্বীপগুলির সংগঠন হিসাবে তৈরি হয় Alliance of Small Island States, বিশ্ব-উষ্ণায়নের বিষয়ে বৃহৎ দেশগুলির মঞ্চসমূহে ছোটো দ্বীপগুলির অবস্থান ও সেগুলিতে উষ্ণায়নের ফলে উদ্ভূত সমস্যাগুলির কথা তুলে ধরবার প্রয়োজনে। বৃহৎ শক্তিগুলি আজ দ্বিধাবিভক্ত। বিশ্ব-উষ্ণায়নের সত্যতা বিচারেই তারা উৎসাহী বেশি – এবং সমস্যাটি স্বীকার করতে পর্যন্ত তাদের একটি শ্রেণীর ঘোর আপত্তি বিদ্যমান। এমতাবস্থায় সমাধানের দিকটি অলক্ষেই অন্ধকারে পড়ে রয়েছে। অথচ উষ্ণায়ন কিন্তু থেমে নেই। সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। ২০৫০ সালের ভিতরেই একাধিক সমুদ্র-উপকূলবর্তী স্থানের অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন। লাল সতর্কতার প্রহর গুণছে, সুন্দরবন।

এবারের কালীপুজোর সময়েই খবরে দেখছিলাম, পাথরপ্রতিমায় বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামে জল ঢোকবার দৃশ্য। একেকটা বাড়ির গা ঘেঁষে জল ফুঁসে উঠছে, বাসিন্দারা আশঙ্কায় – আর বর্ষায় বুঝি এটাও যাবে নদীর গর্ভে। বঙ্গোপসাগরের জলস্তর বাড়া নিয়ে একাধিক গবেষণা-লব্ধ তথ্যই আজ প্রকাশিত। তবু, যে স্তরে সচেতনতাটা আসা উচিত – সে-স্তরে সামান্যতম নড়াচড়াটুকুও পরিলক্ষিত হতে পারছে না। আজ বিশেষ একখানি দ্বীপের নাম বলি আপনাদের। কলকাতা থেকে মাত্রই ৯২কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত সে দ্বীপ, নাম ঘোড়ামারা আইল্যান্ড। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ একাধিক গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যে জানা যাচ্ছে যে গত ত্রিশ বছরে ঘোড়ামারা দ্বীপের প্রায় ৫০% সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। ৩০ বছরে সমুদ্রের নোনা জলে তলিয়ে গিয়েছে প্রায় ৮০বর্গকিমি পরিমাণ জমি, উদ্বাস্তু হয়েছে ৬০০টিরও বেশি পরিবার। বিশ্ব-উষ্ণায়নের প্রভাব এসেছে বাংলায়।

আরও পড়ুন:  হোমোসেক্সুয়ালিটি আমাদের এখানে ক্রিমিনালাইজড : ঋদ্ধি সেন

ঘোড়ামারার আদি জনসংখ্যা ছিলো প্রায় ৪০,০০০ – ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী এখন সে দ্বীপের বাসিন্দা-সংখ্যা এসে ঠেকেছে ৩০০০-এর কোঠায়। রাষ্ট্রপুঞ্জের ভাষায় এমন ভূমিহারাদের একটি সুন্দর নাম আছে। সাহেবরা বলেন “ক্লাইমেট রেফিউজিস” বা “আবহাওয়া-উদ্বাস্তু”র দল। আফ্রিকার ঊষর প্রান্তে দীর্ঘমেয়াদী খরার ফলে ভিটে-ছেড়ে-যাওয়া আদিবাসী, অথবা ঘোড়ামারা-র জলে সব-হারানো বাঙালি পরিবার – এরা সবাই আজ “ক্লাইমেট রেফিউজি”দের তালিকাভুক্ত। এরা আবহাওয়া-বিষয়ক আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলিতে পরিসংখ্যান যোগান দিয়ে থাকে।

আরও একটি দ্বীপ, সুন্দরবনেরই লোহাচরা আইল্যান্ড। ১৯৮০-র দশকেই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, ২০০৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা-পত্রের মাধ্যমে বিষয়টি সকলের দৃষ্টিগোচরে আনা হলে পরে – আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টিকে নিয়ে সাড়া পড়ে। দ্বীপটির তলিয়ে যাওয়ার পিছনে কারণ হিসাবে ভূমিক্ষয় নাকি সত্যিই বঙ্গোপসাগরের জলস্তর-বৃদ্ধি – সে বিষয়ে গবেষণা চলছে। আবহাওয়ার খামখেয়ালে সমুদ্র কি সত্যিই তবে এগিয়ে আসছে? প্রশ্ন থেকেই যায়।

আবহাওয়া যে পাল্টাচ্ছে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, তার এই ক্রমবর্ধমান খামখেয়ালিপনা – বর্ষার আসা-যাওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট করে আর কিছুই বলা যাচ্ছে না, সামুদ্রিক ঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে। এর ফলে যেমন স্বল্পমেয়াদে জীবন ও সম্পত্তিহানির ঘটনা ঘটছে, তার সঙ্গে সঙ্গেই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির প্রভাব পড়ছে আরও ভয়ানক ভাবেই। আয়লা-র পরবর্তীতে বিস্তীর্ণ এলাকার চাষজমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে সমুদ্রের নোনাজলের কারণে। চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে, উদ্বাস্তু সংখ্যা বাড়ছে। ঘোড়ামারা পর কোন দ্বীপ – প্রশ্ন করছে সন্ত্রস্ত মানুষ। গবেষণা বলছে, ২০০০ সাল অবধি যেখানে বঙ্গোপসাগরের জলস্তর-বৃদ্ধির হার ছিলো বছরে ৩ মিমি, গত এক দশকে সেটি বেড়ে হয়েছে ৫। এই মুহূর্তে সুন্দরবনের অন্ততঃ ১০টি দ্বীপ তলিয়ে যাবার অপেক্ষায়। গবেষণা বলছে, এই মাত্রায় সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পেলে, ২০৫০ সালের ভিতরে তার পরিমাণ দাঁড়াবে ১মিটার, বাংলাদেশ উপকূলের ১৮% জমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে – আর সেই সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে উদ্বাস্তু হবেন প্রায় ২কোটি মানুষ। আবহাওয়া-পরিবর্তন প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রচার নয় – বাস্তব – এটা সর্বোতভাবে বুঝবার সময় হয়েছে। 

আরও পড়ুন:  উচ্ছে চিংড়ি

প্রশ্ন থেকে যায় যে, সরকার উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন দিচ্ছে। নদী বা সমুদ্রবাঁধগুলিকে মেরামতের চেষ্টা করছে – কিন্তু এ সবই দেখতে গেলে বলতে হয়, এগুলি মূলত স্বল্পমেয়াদী ক্ষতি-ভিত্তিক সমাধান। সমুদ্রকে ঠেকাবার বা সে অর্থে পরিবেশ-রক্ষার বড় উপকরণ সুন্দরবনের যে ম্যানগ্রোভ অরণ্য – তাকে ধ্বংসের চেষ্টা শুরু হয়েছিল সেই ২০০বছর আগেই। আজও সে অবস্থার সামান্যটুকুও বদলিয়ে উঠতে পারেনি। সেসময় আর এসময়ে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের কারণগুলি আলাদা হলেও, ধ্বংসের অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটেনি। মন্দাক্রান্তা সেনের লেখা কয়েকটি লাইন মনে পড়ছে, সামান্য অপ্রাসঙ্গিক হলেও উদ্ধৃতির লোভ সংবরণ করতে পারছি না, “… বাঁচবে না আর অন্য নদীও, এবং সবাই জেনে রেখে দিও, নদী না বাঁচলে – বাঁচে না মানুষ …” নদী-পাহাড়-অরণ্য-সমুদ্রকে আমরা বোধহয় বড্ড বেশিরকম ভাবেই আপন খেয়ালমতে নিংড়ে নিয়ে চলেছি। ভুলে যেতে কার্পণ্য করছিনা যে, প্রকৃতির প্রতিশোধ কী ভয়ানকভাবেই অমোঘ হয়ে উঠতে পারে। আমাদের পাউন্ড-ডলার-স্মার্টফোনের সভ্যতা তার কাছে শিশুর চেয়েও তুচ্ছ।

প্রবন্ধটি লেখবার উদ্দেশ্য এটিই যে, পরিবেশ বা আবহাওয়ার পরিবর্তন আজ আর মার্কিন গবেষণাপত্রের পাতাতেই কেবল সীমাবদ্ধ হয়ে নেই। আমাদের আপন দুয়ারেই তার আগমনী বেজে গিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি ছোটো ছোটো দ্বীপ, উপকূল-সমৃদ্ধ দেশ সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি নিয়ে চরম উদ্বেগে, উৎকণ্ঠায় দিনযাপন করছে। অনিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশ-বিরোধী শিল্প-প্রতিযোগিতা, দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ লুণ্ঠন, বন-ধ্বংসকরণ – ইত্যাদির বিরুদ্ধে মনোজ্ঞ প্রতিবাদ ও পর্যালোচনার প্রয়োজন। শিশুর মুখে সেই আবৃত্তিটাই আজ শুনতে ইচ্ছে করে, “অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান, প্রাণের প্রথম জাগরণে – তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ, উচ্চশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা – ছন্দহীন পাষাণের বক্ষ-পরে আনিলে বেদনা – নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে …” কল্যাণ হোক।

NO COMMENTS