পাথর কুঁদে কুঁদে হে মহাজীবন

আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের পদবি যদি ঠাকুর না হয়ে অন্য কিছু হত, কেমন হত? আর উনি যদি ক্লিন-শেভড থাকতেন আজীবন? গুরুতর এসব কথায় যাবার আগে আসুন চিনে নিই কিছু প্রাথমিক শব্দ-সংখ্যা।

একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ পেরিয়ে এসে আপনি শুনে ফেলবেন ‘রবীন্দ্রপক্ষ’ শব্দটি। বস্তুটি আর কিছুই নয়, রবীন্দ্র জন্মদিন থেকে শুরু করে দিন পনেরোর এক থোড়বড়িখাড়া। যে বাঙালির ঐতিহ্য ছিল দোল-দুর্গোৎসব-কালীপুজো, তার দোল হয়ে গেছে হোলি হ্যায়, দুর্গোৎসবকে গিলে নিয়েছে শারদ সম্মান, কালীপুজো হয়ে গেছে দিওয়ালি। রইল পড়ে রবীন্দ্রনাথ। শারদোৎসবের সময়ে যেমন আমরা চালু শুক্ল-কৃষ্ণ মার্কা আটপৌরে শব্দদের থেকে রেহাই নিই, পিতৃপক্ষ দেবীপক্ষ উচ্চারণে, তেমনি, এ হল গিয়ে রবীন্দ্রপক্ষ।

এত কিছু লিখছি, এসবের শুরু কিন্তু করে দিয়ে গেছিলেন স্বয়ং তিনিই। এমনকী রবীন্দ্রনাথ নিজেই শেষ বৈশাখে অসম্ভব গরমের কবল থেকে এই জন্মদিন পালনোৎসবকে সরিয়ে এনেছিলেন পয়লা বৈশাখে। যাতে রাঙামাটির শান্তিনিকেতনে সকলে একটু শান্তিতে মেতে উঠতে পারে।

কনসেপ্টটা নতুন কিছু নয়। ভাবুন, ধর্মভীরু বাঙালির কি মানা আছে কালীপুজো বা সরস্বতী পুজোর দিন ব্যতিরেকে বাকি দিনগুলোয় ধুমধামিয়ে পুজো করতে? নেই তো? তবুও বছরে একটা করে দিন দাগিয়ে দেওয়া। হাতে পাঁজি মঙ্গলবার থেকে শুরু করে পরের সোমবার পর্যন্ত সপ্তাহটিকে এভাবেই পণ্ডিতম্মন্যরা পাঁজি দিয়ে ফর্ম্যাট করে দিয়েছিলেন। ব্যাকড্রপে রেখেছিলেন পৌরাণিক কিছু খুঁটিনাটি।

দেখবেন, রাষ্ট্রপুঞ্জ দ্বারা ঘোষিত বিশেষ দিনগুলি নিয়ে অনেকের জ্বালা আছে। হঃ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, মা দিবস, গুষ্টির ষষ্ঠী দিবস বলে তাঁরা খুব চিড়বিড়োন। বোঝেন না, ইস্যুগুলো একটি করে দিনে গেঁথে দেওয়া বই ও আর কিছু নয়। তেমনি, রবীন্দ্রজয়ন্তী।

মানুষ হুজুগপ্রিয়। অনেকে বলেন বাঙালি বেশি হুজুগে। আমি বিস্তর অবাঙালিদেরও দেখি, হরেক মজা খুঁজে দিব্যি ধেইধেই মানাচ্ছে। বাঙালিও বৈশাখী সন্ধেয় সেজেগুজে বাড়ির ছাদে বা পাড়ার ক্লাবের তৈরি মঞ্চে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করতে শুরু করে। কিছু ছোটদের আবৃত্তি, কিছু বড়দের আবৃত্তি, কিছু ছোটদের গান, কিছু বড়দের গান, একটি নৃত্যনাট্য, নমস্কার। তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।

চিত্রটা বদলাতে থাকে ক্রমে। পঁচিশের সকাল থেকে ভিড় শুরু হত জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্র সদন চত্বরে, এ অনেক আগে থেকেই। তার সরাসরি সম্প্রচার শুরু করল কলকাতা দূরদর্শন। নব্বইয়ের দশকে। আরেব্বাপ! এমনও হয়! বাঙালি মাথা খাটাতে শুরু করে দিল।

বিস্তর ঘেমেনেয়ে চিন্তাশীল আম-বাঙালি এক অভাবনীয় জোট গড়ল। রবীন্দ্র-নজরুল। একজন পঁচিশ বৈশাখ, অন্যজন এগারো জ্যৈষ্ঠ। দুটিই লালরঙা ছুটির দিন নয়। তাই এই দুই তারিখের মাঝে সুবিধেমতো ছুটির দিন দেখে, সপ্তাহান্তে, যেভাবে বিদেশে বসবাসকারী বাঙালি দুর্গাপুজো করে, সেভাবেই শুরু হল অনন্য রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা।

উৎসাহেই শেষ হয় না সব, অতি উৎসাহীরাও থাকে ঘাপটি মেরে। ঝোপ বুঝে মারে কোপ। বিপুল ভেবেচিন্তে তারা জুড়ে দিল শ্রাবণের শেষ বা ভাদ্রের শুরুর লগ্নে জন্মগ্রহণ করা, অকালপ্রয়াত, সুকান্তকেও, এই দুই মহীরুহের সঙ্গে। একজন বৈশাখ শেষে এসেছিলেন, আরেকজন জ্যৈষ্ঠের শুরুতে, তৃতীয়জন অনেকটা গ্যাপে। জোট বেশ জট পাকিয়ে হয়ে যায় রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত সন্ধ্যা। এ সন্ধ্যা শীতের দীর্ঘকায় নয়। এ অনুষ্ঠান লারেলাপ্পাও নয়, যে রাত বাকি, বাত বাকি, চলবে ধাঁইধপাধপ রাত দুটো-আড়াইটে অবদি। তাই দিনের আলো ফুরোতেই সন্ধে সাত। সাতটায় হারমোনিয়ামে প্যাঁপোঁ আর তবলায় তাল ঠোকা দিয়ে শুরু, আর সব ফুরোলে পরে নমস্কার বলার সময় সামনে আসন ফাঁকাই প্রায়, ওই নিজেদের জনা পাঁচেক…

আরেক ছবি আমরা পেয়েছিলাম নচিকেতার বাংলা র‍্যাপ গানে।

পঁচিশে বৈশাখ কৃষ্টি মিছিলে
দামি শ্যাম্পেন সুধা আকণ্ঠ গিলে

যখন শুনেছি গানটি প্রথমে, তেমন ধারণা করার বয়স ছিল না সেটা, ছিল অবাক হবার। পরে এমন দেখেছি কিছু পার্টিতে, অপরিমেয় সুরা-আয়োজন, সঙ্গতে খোলা গলায় অসীম রবীন্দ্রগান, শুধুই রবীন্দ্রসঙ্গীত। তারপর এ গানের কথার সঙ্গে ও গানের কথা জড়িয়েমড়িয়ে, এর গানের সঙ্গে ওর গানের সুর মিলেমিশে… হ্যাঁ, পঁচিশেই।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশাতেই দেখে ফেলেছেন ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখালিখির বাণিজ্যিক সাফল্য। নিজের আশ্চর্য সব মণিমুক্তো, সাহিত্য শিল্পের হরেক শাখায় ছড়ানো সৌরভ যেন কিঞ্চিৎ ম্লান লাগে রবীন্দ্রনাথের। শোনা যায়, শরতের এই সাফল্যে নাকি তিনি ঈর্ষাকাতর হতেন, গোপনে। কিন্তু তিনি যে লম্বা রেসের ঘোড়া, অন্য গ্যালাক্সিতে তাঁর বিচরণ।

লিখে বা গান বেঁধে আয় করতে হয়নি রবীন্দ্রনাথকে। তিনি জমিদার, মামুলি নয়, বেশ ওজনদার। এসবে পরোয়া কীসের? সঙ্গে শোণিতে আছে একদিকে দ্বারকানাথের বাণিজ্যবুদ্ধি, অন্যদিকে দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মমার্গ। তিনি ক্রমে বুঝছেন, থাকলে থেকে যাবে তাঁর গান। সেই গানও আবার স্পষ্ট দুই ধারার। একটি সর্বজনপ্রিয়। অন্যটি রসিকজনের, উচ্চকোটির। বিস্ময়ের, তিনি দুই ধারাতেই সমান স্বচ্ছন্দ, চূড়ান্ত সফল।

আস্তিনের নীচে লুকনো তাসটিকে তিনি ছাড়লেন তাঁর ইচ্ছাপত্রে। আমার রাত পোহাল শারদ প্রাতে / বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে। শিল্পসম্ভারের স্বত্বাধিকার রবীন্দ্রনাথ নিজের কাছে না রেখে, বংশের কারওকে না দিয়ে, দিলেন বিশ্বভারতীকে। সুরক্ষিত হল মহান থেকে কম-মহান প্রতিটি শিল্পকর্ম। তদুপরি, রবীন্দ্র-সাহিত্য থেকে যে আয় হয়ে চলেছে আজও, আমি নিশ্চিত, তার কয়েক গুণ বেশি আয় হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে। শুধু তাই নয়, বাণিজ্য করল একাধারে বিশ্বভারতী, রেকর্ড কোম্পানি, অগণিত না হলেও অনেক শিল্পী ও সহকারীরা। থেকে গেল গান, মানুষের মনে।

যে প্রশ্ন দুটি দিয়ে এ আখ্যানের সূত্রপাত, আবার চলুন সে কথায় ফিরি। দেবেন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরে-পরের একটি ছবিতে দেখা যায় তো রবীন্দ্রনাথকে, কামানোজুমনো। দিব্যকান্তি, মননশীল, স্মার্ট। যে বিভাজনের জন্ম তাঁর জীবদ্দশায় হয়নি সেভাবে, সেই পপুলিস্ট ও এলিটিস্ট ঘরানার দ্বন্দ্বে, মনে হয় তাঁর ওই দাড়িগোঁফহীন লুক দ্বিতীয় এলিটিস্ট ঘরানাতেই সিলমোহর লাগায়। তথাপি তিনি সেই লুক ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ফেলে আসা কচি দাড়ির জগতে। সে দাড়ি আর কচি নেই। রবীন্দ্রনাথ বড় হচ্ছেন। অনাদরে নয়, পরমাদরে বেড়ে উঠছে সেই বিস্রস্ত দাড়ি, মাথার কেশরাজি। ক্রমে পাক ধরছে তাতে। মনে পড়ছে, সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন, উনি তখন শান্তিনিকেতনে আবাসিক ছাত্র। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তো ওঁর সকাল-সন্ধে দেখা হবার সম্ভাবনা নেই তখন। তবে গুরুদেবের আশ্রমে থাকা আর না থাকা স্পষ্ট বোঝা যেত। আর বোঝা যেত, উনি স্নান করছেন। ওই বিশাল কেশরাজি, দাড়ি নিরন্তর পরিমার্জনা করতেন তিনি। কোনও পেজ থ্রি নেই, টিভিতে সান্ধ্য মুখ দেখানো নেই, সোশ্যাল সাইট নেই, তথাপি এত কিছু, এত যত্নে! কবিযশোপ্রার্থী কোনও এলেবেলে বা বাসনারহিত কোনও সাধকের রূপচর্চা নয় এ।

রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন নিজের সৃষ্টি নিয়ে নিরন্তর ঘষামাজা করে যেতে, নিরন্তর যাপন করেছিলেন সেই সৃষ্টিকে সাথে করেই। তাঁর কুড়ি বছরের সময়কার লেখালিখি আর পঞ্চাশ বছর বয়সের লেখালিখিতে যোজন ফারাক। ছিল বিবিধ দেশ ভ্রমণ। মধ্য-যৌবন থেকেই চিন্তায় আসছে বিশ্বচেতনা, অন্তর্যামী এক পরম শক্তির উপস্থিতি, গভীর অন্তর্লীন মানবদর্শন। বুদ্ধদেব বসু তাঁর এক লেখায় বলছেন, রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গানের সঙ্গে প্রেম পর্যায়ের গান মিলেমিশে যায়, স্পষ্ট আলাদা করা যায় না ওদের। ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে’, ‘আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে’, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’, ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’, ‘তাই তোমার আনন্দ আমার ’পর’ — এমন কত আর উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায়।

এইসব লেখার সঙ্গে বিলকুল ম্যাচ করে যায় ওই ঋষিপ্রতিম লুক, আয়ত আপাত নির্মোহ দৃষ্টি, ওই আলখাল্লার মতো পোশাক। গানগুলি তখন কীভাবে যেন আপনি-আপনিই স্তোত্র হয়ে ওঠে, ব্যপ্ত হতে থাকে চরাচরে। আর খেটে খাওয়া, সংস্কৃতি থেকে কিছুটা দূরে থাকা আম-বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক পদবি তাঁর জমিদারি, তাঁর আভিজাত্য, তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির যাবতীয় আগল ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার পক্ষে চূড়ান্ত হাওয়া যে টেনেছে, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় তাঁর মূর্তিপুজো। অনেক পরে, মহানগরীর প্রায় প্রতি ট্রাফিক সিগনালে শুরু হয়ে যাবে তাঁর গান। আসা-যাওয়ার পথের ধারে / গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন / যাবার বেলায় দেব কারে…

আজকে যে বেপরোয়া বিচ্ছু যুবকযুবতীর দল, কেরিয়ার নিয়ে জবরদস্ত ফোকাসড, বাড়তি টাইম স্পেন্ড করে ফেভারিট হ্যাংআউট জোন মানে কোনও কফিশপ বা শপিং মলে, উইকএন্ডে মালটিপ্লেক্সে মুভি দেখে বয় বা গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে, মোবাইল সেটে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ সদা অন ঝলমলাচ্ছে। বাংলাকে সে পাত্তাই দেয় না সেভাবে। ওই মা-বাবার সঙ্গে, রিলেটিভদের সঙ্গে কথাবার্তায় যেটুকু কুঁতিয়ে বলা। সেও তার আইপ্যাডে এই পঁচিশে বৈশাখে কয়েকটি রবি ঠাকুরের গান, হয়তো শ্রাবণী-সোমলতা, পীযূষকান্তি-শ্রীকান্ত কিম্বা বিক্রম সিং খাঙ্গুরার কণ্ঠে, ডাউনলোড করে সেভ করে নেবে। রবিবাবুই পারেন, আজও এমন তুলতুলে অন্তর্ঘাত চালাতে।

মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, এই বছরব্যাপী বিস্মরণের মাঝে হঠাৎ ক’দিনের ধুমধাড়াক্কা সেলিব্রেশনে মজাই পেতেন, শ্মশ্রুমণ্ডিত অধরে লুকনো হাসি ফুটে উঠত তাঁর। হয়তো, এমনটাই তিনি চেয়েছিলেন। রইল বলে রাখলে কারে, হুকুম তোমার ফলবে কবে? / তোমার টানাটানি টিঁকবে না ভাই, রবার যেটা সেটাই রবে।।

Advertisements

1 COMMENT

  1. অত্যন্ত মিতবাক, সরস লেখা। লেখাটির বড় গুণ, রবিজীবনীর এমন অংশে আলো ফেলা হয়েছে, যা আলোচিত বা চর্চিত হয় না তেমন। রবীন্দ্রজয়ন্তীর উপযুক্ত লেখা। সঙ্গের ছবিগুলিও সুন্দর ও সাযুজ্যপূর্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.