মন্ত্র পড়ে পুজো-আচ্চা নয়‚ ভক্তদের বাবা লোকনাথ বলেছিলেন তাঁকে ভক্তিভরে ডাকতে

6611

বঙ্গজীবনে বাবা লোকনাথের মহিমার প্রচার খুব বেশি পুরনো নয় | মোটামুটি আটের দশকের শেষ দিক থেকে লোকনাথ পুজো পালনের জনপ্রিয়তা বাড়ে | অথচ পঞ্জিকা-ইন্টারনেট বলছে এই ত্রিকালজ্ঞ মহাযোগীর জন্ম হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে | তাঁর ভক্তরা বলেন‚ সাধক নাকি নিজেই নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন প্রয়াণের একশো বছর পরে তাঁর লীলাকথা প্রচার করতে |

বেশিরভাগ সূত্র অনুযায়ী ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জন্মাষ্টমী তিথিতে তাঁর জন্ম | যদিও উইকি বলছে‚ তাঁর জন্ম ওই বছরের ৩০ জুন | যাই হোক‚ জন্মস্থান অনুমান করা হয় বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনার চাকলা বা কচুয়া গ্রামে |

তাঁর বাবা রামনারায়ণ ঘোষাল ছিলেন সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ | মা কমলা দেবীও ছিলেন ধর্ম পরায়ণা | রামনারায়ণ চেয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে গৃহী জীবন ছেড়ে সন্ন্যাসধর্ম পালন করবে |

কিন্তু কমলা দেবী প্রথম তিন পুত্রকে স্নেহের আঁচল থেকে যেতে দিতে পারেননি | হতুর্থ সন্তান লোকনাথকে অবশ্য বাঁধতে পারলেন না মাতৃস্নেহে | শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন উদাসী প্রকৃতির |

ছেলের ভাবগতিক বুঝে রামনারায়ণ তাঁকে সমর্পণ করলেন প্রতিবেশী ভগবান গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে | তিনি ছিলেন এক গৃহী সন্ন্যাসী | তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন লোকনাথ | মাত্র এগারো বছর বয়সে গুরুর সঙ্গে গৃহত্যাগ করেছিলেন তিনি | সঙ্গে আর এক বাল্যবন্ধু বেণীমাধব |

দুই শিষ্য লোকনাথ ও বেণীমাধবকে নিয়ে গুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমে এসেছিলেন সেকালের কলকাতার কালীঘাটে | কিছুদিন সেখানে যোগসাধনা করার পরে ত্রয়ী রওনা দিলেন দেশভ্রমণে | হিমালয়ে পৌঁছে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সেখানে কঠোর কৃচ্ছ্ব্রসাধনে চলল তপস্যা | ভক্তদের বিশ্বাস‚ এরপর দুই শিষ্যকে নিয়ে গুরু গিয়েছিলেন মধ্য এশিয়ায় | পদব্রজে তাঁরা পৌঁছেছিলেন আফগানিস্তান‚ পারস্য‚ ইজরায়েল‚ এমনকী মক্কায় | পাঠ করেছিলেন পবিত্র কোরান শরিফ |

বিশ্বভ্রমণ সেরে দেশে ফেরার মনস্থ করেন গুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায় | সশিষ্য পথ ধরেন ভারতের | পথে শিষ্য বেণীমাধব চলে যান কামরূপে | তিনি বাংলায় ফিরতে চাননি | গুরু ভগবান এসেছিলেন বাংলয় | কিন্তু বেশিদিন থাকেননি | চলে গিয়েছিলেন কাশীতে | সেখানেই দেহত্যাগ করেন |

অন্যদিকে যোগীপুরুষ লোকনাথ ফিরে এসেছিলেন তাঁর জন্মভূমিতে | সাক্ষাৎ করেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে | কিন্তু কৌপীন পরিহিত সাধককে গ্রামবাসীরা উপহাস করতে থাকেন | সেখান থেকে বাবা লোকনাথ চলে যান ত্রিপুরার দাউদকান্দি গ্রামে | বেশ কিছু বছর ছিলেন এক গুণমুগ্ধ ভক্তের বাড়িতে |

তারপর এসে পৌঁছন পূর্ব বাংলার বারদি গ্রামে ( এখন বাংলাদেশে ) | স্থানীয় জমিদার বংশ নাগ পরিবার তাঁর মাহাত্ম্যে উপকৃত হন | তাঁদের অনুরোধে বাবা লোকনাথ নিষ্কর জমিতে আশ্রম বানিয়ে থাকতে শুরু করেন | এখান থেকেই প্রচারিত ও প্রসারিত হয় তাঁর মহিমা |

বলা হয়‚ ১৬০ বছর বারদি গ্রামের আশ্রমে যোগ সাধনা করেছিলেন তিনি | প্রয়াত হয়েছিলেন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের দু তারিখে | ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১৯ জ্যৈষ্ঠ |

অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় প্রচার করতেন বাবা লোকনাথ | বলেছিলেন‚ ঘটা করে পুজো আচ্চার দরকার নেই | মনে ভক্তি নিয়ে তাঁকে ডাকলেই তিনি সাড়া দেবেন | রণে বনে জলে জঙ্গলে‚ যেখানে তাঁর ভক্ত বিপদে পড়বে | তাঁর পুজোর প্রসাদও সামান্য‚ মিছরি ও জল | দরিদ্র নরনারায়ণ সেবার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ভক্তদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এই সাধক | তাই যাঁরা তাঁর পুজো করেন‚ ১৯ জ্যৈষ্ঠ ( সাধারণত দোসরা বা তেসরা জুন হয় ) সামান্য হলেও জনসেবা করে থাকেন |

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.