(Gangasagar)
কথায় বলে সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার। প্রতি বছরই তাই জীবনে অন্তত একবার গঙ্গাসাগরে ডুব দিয়ে আত্মশুদ্ধির আশায় বহু কষ্ট সহ্য করে, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। এবারও তার অন্যথা হল না। বাবুঘাটের ট্রানজিট ক্যাম্পের এক নাগা সাধুর কথা মনে আসে, ‘বাবা, এ পৃথিবীর তিন ভাগ জল, আর এক ভাগ স্থল। এই স্থল হল সুখ, আর জল হল দুঃখ।(
আরও পড়ুন: শ্রদ্ধাভরে শেষকৃত্য করান ‘শ্মশান বন্ধু’ টুম্পা দাস
হিন্দু ধর্মে মকর সংক্রান্তির উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গঙ্গা-স্নান এবং দান করা অত্যন্ত শুভ ও ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। মকর সংক্রান্তির দিন সূর্য ধনু রাশি ছেড়ে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। সূর্যের গমনকে বলা হয় সংক্রান্তি এবং মকর রাশিতে প্রবেশ করে বলে, একে মকর সংক্রান্তি বলা হয়। কথিত আছে, মকর সংক্রান্তির দিনই ঋষি কপিলের আশ্রমের সম্মুখ দিয়ে নদী সমুদ্রে মিলিত হয়েছিল।
নিশ্চিন্তপুর পেরিয়ে গিয়েছে আর এক ষ্টেশন বাদেই তেভাগা আন্দোলনের আঁতুড়ঘর কাকদ্বীপ। আড়মোড়া ভেঙে, এক ট্রেন ভারতবর্ষের এগোনোর পালা। ভিনদেশীরা কেউ মাথায়, কেউ কাঁখে, কেউ ঘাড়ে বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে ষ্টেশনের বাইরে।
পরিচিতদের প্রশ্ন ‘ধম্মো করতে যাচ্ছিস’-কে ফুঁৎকারে উড়িয়ে, ট্রেন ধরতে কুয়াশামাখা সকালে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। গন্তব্য নামখানা। শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরে আট থেকে আশি দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থী মানুষের বেদম ভিড়। স্টেশনের আলোছায়ায় আধঘুমো, ঝিমোনো প্ল্যাটফর্ম। কেউ কেউ প্ল্যাটফর্মের পালঙ্কে হাত-পা ছড়িয়ে শতছিন্ন কম্বল গায়ে, কেউ বা শীতে কুকুরকুন্ডলী পাকিয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে।

তাঁদেরকে ড্রিবল করতে করতে মাঝেমধ্যে ভিড়ে ভাসতে ভাসতে এগোনো নামখানা লোকালের দিকে। এই ক্ষ্যাপা জনস্রোতই আমাদের তুলে দেয় ট্রেনের কামরার ভিতর। ভাগ্যক্রমে বসার জায়গা পেয়ে যাওয়া দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার যাত্রায়, আর কী চাই! ট্রেন ছাড়ল। কথার কলকলানি ও ট্রেনের দুলুনির মধ্যে কেউ কেউ দিয়ে উঠলেন উলুধ্বনি।

নিশ্চিন্তপুর পেরিয়ে গিয়েছে, আর এক স্টেশন বাদেই তেভাগা আন্দোলনের আঁতুড়ঘর কাকদ্বীপ। আড়মোড়া ভেঙে, এক ট্রেন ভারতবর্ষের এগোনোর পালা। ভিনদেশীরা কেউ মাথায়, কেউ কাঁখে, কেউ ঘাড়ে বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে স্টেশনের বাইরে। এরপর টোটো করে তিন-চার কিমি গেলে হারউড পয়েন্ট ৮ নম্বর জেটি, এখন আগের মতো লাইন দিয়ে ভেসেলের টিকিটের লাইনে দাঁড়াতে হয় না। যাওয়া আসার টিকিট স্টেশনের বাইরে ক্যাম্প করে বিক্রি হয় ভিড় এড়াতে। মুড়িগঙ্গায় জোয়ার এলে তবে পাড়ি দিয়ে ওপারে কচুবেড়িয়া। না শেষ না এখানেই, এরপর বাস বা ভাড়া গাড়িতে ৩০ কিমি গেলে গঙ্গাসাগর। সাধে কী বলে- ‘সব তীর্থ বার বার গঙ্গাসাগর একবার’। (Gangasagar)

“পি এইছ ই” আগাম অনুমতি পত্র দেখিয়ে ঘর পেলাম। উচ্চগ্রামে কীর্তন চলছে আশপাশের মাইকে। ব্যাগ-ব্যাগেজ রেখেই ক্যামেরা হাতে করে বেরিয়ে পড়া। পাশেই ভারত সেবাশ্রম সংঘের আশ্রমে থিকথিক করছে যাত্রী। গেটের বাইরে একমুখী জনস্রোত। কারও বা আশ্রয় আছে, কেউ বা আশ্রয় নেবে সরকারি বা বিভিন্ন আশ্রমের প্লাস্টিক বা হোগলার ছাউনিতে। এছাড়াও স্থানীয়রা এই সময় ছাউনি বানিয়ে বিক্রি করে চড়া দামে। (Gangasagar)

যে রাস্তা দিয়ে এখন হাঁটছি, সে রাস্তার দু’দিকে স্থায়ী দোকান আর সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বাংলো। এখন সরকার আধুনিক হ্যাঙ্গার করেছেন প্রচুর পরিমাণ লোকের থাকার জন্য। আসার ক্লান্তি ছিলই, আবার এসেই ছবির নেশায় ঘোরাঘুরির জন্য রাতে খেয়েই বিশ্রাম করা ঠিক হল কারণ, আগামীকাল মকর সংক্রান্তি, রাত থাকতেই ছবি তুলতে বেরোতে হবে। (Gangasagar)

পারদ নামছে হু হু করে। প্রবল ঠাণ্ডায় জবুথবু গোটা বাংলা। ঠাণ্ডায় কাঁপছে গঙ্গাসাগর। তবে ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার আগে থেকে পুণ্যার্থীরা সাগরে ডুব দিতে শুরু করেছেন। একদিকে হরিনাম, অন্যদিকে অনুপ জালোটার মীরার ভজন। মোক্ষলাভের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক লক্ষ পুণ্যার্থী গঙ্গাসাগরে উপস্থিত হয়েছেন। চলছে বৈতরণী পার হওয়ার হিড়িক। মিলছে স্বর্গে যাওয়ার টিকিট। ছোট বাছুরের লেজ মুচড়ে দিলেই চলে যাওয়া যাবে স্বর্গে। গরুর লেজ ধরে সাগর থেকে বৈতরণী পার হচ্ছেন। (Gangasagar)

বৈতরণী পার করা বলতে গরুড় পুরাণে বলা আছে, জীবদ্দশায় যারা খারাপ কাজ করে, মৃত্যুর পর বৈতরণী পেরোতে তাদের অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। যমদূতরা যখন কোনও পাপী আত্মাকে বৈতরণী পার করায়, তখন সেই নদী টগবগ করে ফুটতে শুরু করে। যে ব্যক্তি জীবনে কখনও ভাল কাজ করেনি, অসহায়কে সাহায্য করেনি, বৈতরণী পেরোতে তাকে মারাত্মক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মৃত আত্মাকে নরক থেকে উদ্ধার করে স্বর্গে বা পরপারে নিয়ে যাওয়াকে বোঝায়, যা সাধারণত একটি কঠিন ও ভয়ংকর নদী পার হওয়ার প্রতীক এবং পূণ্যকর্ম বা দান (বিশেষত গরু দান) দ্বারা এই বাধা দূর হয়। (Gangasagar)

ভিড়ে থেকে থেকেই চোখে পড়ছে, ছোট আকারের গরুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে, সিঁদুর-চন্দন মাখিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পুরোহিতরা। গরুর লেজ ধরেই পুণ্যার্থীদের নাম-গোত্র উল্লেখ করে, দেওয়া হচ্ছে পুজো। আর তাতেই টিকিট মিলছে পূর্বপুরুষদের। জুতো মেরে গরুদানের কথা শোনা যায় নানা প্রসঙ্গে। কিন্তু গরুর লেজ মুচড়ে তা ‘দান’ করে যে বৈতরণীর জুতোয় পা গলানো যায়, গঙ্গাসাগর না এলে তা হয়তো জানা হত না। (Gangasagar)

পুরোহিতরা ডাকছেন, ‘গৌদান কিজিয়ে, গৌদান কিজিয়ে, চলিয়ে বৈতরণী পার করেঙ্গে…!’ পুরোহিতের হাতে টাকা দিলে হাতে আসছে গরুর লেজ ধরার সুযোগ। সেই লেজেই ম্যাজিক। বৈতরণী পার হওয়ার টিকিট। অন্তত এমনটাই বিশ্বাস পুণ্যার্থীদের। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা বৈতরণী পার করাতেই সাগরতট জুড়ে ঘুরছে কয়েক হাজার বকনা বাছুর। গোমাতা। (Gangasagar)

সব গরুর কান ফুটো করে নম্বরও লাগানো আছে। সরকারিভাবে গরুগুলিকে রেজিস্ট্রেশন করালে এই নম্বর মেলে। এ জন্য গরু পিছু একটা অঙ্কের টাকাও নেয় দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন। সাগর, নামখানা, কাকদ্বীপ এলাকা থেকে সপ্তাহখানেকের জন্য এসব গরু ভাড়া করে নিয়ে এসে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন পুরোহিতরা। গরুর মালিককে দিয়েছেন টাকা। তার বিনিময়ে এই ক’দিন গরুকে পুজো করাবেন তাঁরা। তারপর ফেরত দিয়ে দেবেন মালিককে। (Gangasagar)

মাইকে বাজছে ‘ও মা পতিত পাবনি গঙ্গে…’ সারা মেলায় আলোর বন্যা। বালির চরেই কাঠের জ্বালে রান্না চলছে সেইসঙ্গে গল্পগুজব। আগামিকাল খুব ভোরে ট্রেন ধরব। একা এসে দাঁড়ালাম বালুতটে। তারাদের মিটমিটে আলো। তীব্র ঠাণ্ডায় উছলে পড়া আনন্দ নিভে গিয়ে সঙ্গমতট শ্রান্ত অবসন্ন।

সমবেত কথোপকথন, শঙ্খ, শিঙা, খোল-করতালের বিচিত্র সুর ভাসছে বাতাসে। এবার মেলায় পরিষেবার সুবন্দোবস্ত ছিল, যাতে পুণ্যার্থীদের কোনও সমস্যা না হয়। ছিল সুরক্ষার কড়া প্রহরা। সে সবই উঠে এল ক্যামেরায়। সেই এক টুকরো গঙ্গাসাগরই ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা। (Gangasagar)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
নেশা ও পেশা ফটোগ্রাফি। ডকুমেন্টারি স্টোরি টেলিং, স্ট্রিট ও ট্র্যাভেল ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী।
