(Nilima Sanyal)
আকাশবাণী, খবর পড়ছি নীলিমা সান্যাল। এই ক’টা শব্দ শোনেননি এমন বাঙালি বোধহয় খুব কমই আছেন। দিল্লির শীতে কাকভোরে যখন তিনি খবর পড়তে যেতেন, তখন একবার দেখা হত। আবার খবর পড়ে বাড়ি ফেরার সময় তিনি আমার জন্য হয় চকোলেট নয় আইসক্রিম, কিছু একটা নিয়ে এসে ডাক দিতেন! তাঁর মতো জনপ্রিয় সংবাদপাঠিকাকে অত নিকট থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, কারণ তিনি ছিলেন আমার দাদু কবি-গীতিকার অমিয় বাগচীর পিসতুতো বোন, মানে আমার মায়ের পিসি। (Nilima Sanyal)
আরও পড়ুন: সিনেমার আজ, কাল ও শ্যাম বেনেগাল
ছোট থেকেই দেখতাম, নীলিমা সান্যালকে বাড়ির সবাই বিশেষ করে ছোটরা ‘নানা’ বলে ডাকত। বাবা-মাও তাঁকে ওই নামেই ডাকতেন আর তাঁদের দেখা-দেখি আমিও নানা বলতাম। সেই শব্দটির বাংলায় কোনও অর্থ হয় কী না আমার জানা নেই। শৈশব থেকে তাঁকে দিল্লিতেই বসবাস করতে দেখেছি। মাঝে-মধ্যে কোনও সামাজিক কাজে কলকাতায় আসতেন। (Nilima Sanyal)

প্রতি শীতের ছুটিতে আমরা দিল্লি যেতাম আর থাকতাম মাসখানেক করে। ভীষণ ভালবাসতেন বেড়াতে। যখন আমরা দিল্লিতে থাকতাম, তখন আমাদের সকলকে নিয়ে দিল্লির অদূরেই বাদখাল লেক, সুরজকুন্ড ইত্যাদি জায়গায় ঘুরতে যেতেন। ক্যানিং রোডের পাতাউদি হাউজের সুসজ্জিত বৈঠকখানায় সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই পার্টির আয়োজন করতেন। সেখানেই দেশি-বিদেশি অতিথিদের মধ্যে দেখেছিলাম অশোক সেন, প্রণব মুখোপাধ্যায়কে। (Nilima Sanyal)
একবার সম্ভবত মার্চ মাসে দিল্লিতে থাকার সময়ে উনি একদিন বললেন, রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে তৈরি থাকিস, পালাম এয়ারপোর্ট যাব, কারণ হেমন্ত আসছে (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)। গেলাম ওঁর সঙ্গে বিমানবন্দরে, হেমন্তদাদুকে আনতে। মনে আছে সেই একবারই হেমন্তদাদুকে দেখেছিলাম প্যান্ট পরতে! নানা, মানে নীলিমা সান্যালের ব্যক্তিত্ব ছিল প্রবল। বড়দের পার্টিতে ছোটদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। টেবিল ম্যানার্স শেখাতেন সবসময়। (Nilima Sanyal)

এখন হাসি পায়, কিন্তু তখন খুব ভয় পেতাম ওঁকে। পাউরুটির ধারটা খেতে খুব একটা ভাল লাগত না, কিন্তু ওঁর ভয়ে খেয়ে নিতাম। ওঁর প্রবল ব্যক্তিত্বের আড়ালে একটা কোমল হৃদয় ছিল। শাসন আর ভালবাসা, দুটোই ওঁর ভেতর যেন পাশাপাশি বাস করত। ওঁর বাড়িতেই দেখেছিলাম, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রেম সায়গলকে। ভীষণ সচেতন ছিলেন নিজের আত্মসম্মান সম্পর্কে। (Nilima Sanyal)
প্রণববাবুর স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায় প্রায়ই আসতেন। একবার কোনও এক অনুষ্ঠানে নানাকে নিয়ে যেতে প্রণববাবুর বাড়ি থেকে গাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু বেশ কিছুটা দেরিতে গাড়ি আসার জন্য, উনি সেদিন প্রণববাবুর বাড়িতে কিছুতেই গেলেন না। অবশ্য সেটার জন্য প্রণববাবুর পরিবারের সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক কোনওদিনও নষ্ট হয়নি। পরবর্তীকালে প্রণববাবুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝেছিলাম, নীলিমা সান্যালের প্রতি ওঁর শ্রদ্ধা কতখানি ছিল। (Nilima Sanyal)

নানার নিকট বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুন্ধতি দেবী, ছায়া দেবী, সঞ্জীবকুমার, গ্রামোফোন কোম্পানির তৎকালীন কর্ণধার বিমান ঘোষ, কলকাতা দূরদর্শনের প্রথম অধিকর্তা মীরা মজুমদার, ওয়াহিদা রহমান প্রমুখ। আর সেই তালিকায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তো ছিলেনই। বড় হয়ে শুনেছিলাম, একজন আইএএস অফিসার লাভকুমার মালহোত্রার সঙ্গে নানার বিয়ে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, সেই বিবাহিত জীবন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে বন্ধুত্ব অটুট ছিল। শ্রী মালহোত্রা একসময় লখনৌ আকাশবাণী কেন্দ্রের অধিকর্তা ছিলেন। শুনেছিলাম উনিই ‘আখতারি বাঈ’ নামটি পরিবর্তন করে ‘বেগম আখতার’ রেখেছিলেন। (Nilima Sanyal)
নীলিমা সান্যাল, এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী হলেও, ভীষণ ভূতের ভয় ছিল! দিল্লির সরকারি বাংলোতে একা থাকলেও কলকাতায় কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটের বাড়িতে যখন আসতেন, তখন প্রকাশ পেত তাঁর ভূতের ভয়! একবার নানার মুখে জানতে পারি, তিনি আকাশবাণীর পুরোনো অফিস গারস্টিন প্লেসের বাড়ির তিনতলায় অশরীরীর উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন। (Nilima Sanyal)

মায়ের কাছে শুনেছি, এককালে নীলিমা সান্যাল আর জয়ন্ত চৌধুরী জুটির নাটক বেতারে ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। নীলিমা সান্যালের অভিনয় সম্পর্কে রাজা সেন নির্মিত সুচিত্রা মিত্র বিষয়ক এক তথ্যচিত্রে, উৎপল দত্ত তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, কলকাতার নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহে রবীন্দ্রনাথের তপতি নাটকে বিকাশ রায়, নীলিমা সান্যাল এবং সুচিত্রা মিত্রের অভিনয় ছিল মনে রাখার মতো। ওই নাটকে তাপস সেনের অনুপস্থিতিতে উৎপল দত্তই আলোর কাজটি করেছিলেন। (Nilima Sanyal)
নীলিমা সান্যালের জনপ্রিয়তা যে কতটা, বুঝতে পেরেছিলাম তাঁর জীবনাবসানের পরে। হেন প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ছিল না, যেখানে তাঁর চলে যাওয়ার খবর প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়নি! অনেকেই হয়তো জানেন না যে, অতীতে তিনি বিবিসিতেও সংবাদ পরিবেশন করেছেন। (Nilima Sanyal)

একটা বিশেষ ঘটনার কথা বলে আজকের স্মৃতিচারণ শেষ করব। ছোট থেকেই দেখেছি, দেশি-বিদেশি বহু অখ্যাত-প্রখ্যাত মানুষের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু কাউকেই খুব একটা সমীহ করে চলার মানুষ নীলিমা সান্যাল ছিলেন না। কিন্তু আকাশবাণী থেকে অবসরের পরে একটি বিশেষ কারণে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে রীতিমতো নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন! একথা তাঁর কাছেই শোনা। (Nilima Sanyal)
চিত্র ঋণ- লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অরিজিৎ মৈত্র পেশায় সাংবাদিক। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অরিজিৎ পুরনো কলকাতা নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন। নিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই: অনুভবে তপন সিনহা, ছায়ালোকের নীরব পথিক বিমল রায়, চিরপথের সঙ্গী - সত্য সাই বাবা, বন্দনা, কাছে রবে ইত্যাদি।
