(Pradeep Kumar)
সাল ১৯৬৩। রেডিও সিলন থেকে প্রচারিত সে সময়ের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “বিনাকা গীতমালা” যথারীতি জমে উঠেছে। হবে নাই বা কেন? সঙ্গীত নির্ভর বোম্বাই সিনেমা বরাবরই মাতিয়ে রেখেছে উপমহাদেশের দর্শককে। সিনেমায় প্লেব্যাক আসার তিন দশক পেরিয়ে গিয়েছে। গীতিকার, সুরকার এবং কণ্ঠশিল্পী– এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বলিউডের এক নিজস্ব ঘরানা। আর তারই বছরভর এক উদযাপন “বিনাকা গীতমালা”। সে বছরের উপরের দশটি গানের তালিকায় রয়েছে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে “তেরা মেরা প্যার অমর” (‘আসলি নকলি’), মহম্মদ রফির “এক ঘর বানাউয়াঙ্গা তেরে ঘর কে সামনে” (‘তেরে ঘর কি সামনে’), মুকেশের গাওয়া লোকগানের মেঠো সুরে ভরা “ও জানেওয়ালে হো সাকে তো লৌটকে আনা” (‘বন্দিনী’) এমনই সব মণিমুক্তো। (Pradeep Kumar)
সুরকার রউশান আর গীতিকার কবি সাহের লুধিয়ানভি জুটির দুটি গান সে বছর লড়াইয়ের ময়দানে! অবশেষে মান্না দের “লাগা চুনরি মে দাগ” (‘দিল হি তো হ্যায়’) কে পিছনে ফেলে প্রথম স্থানে উঠে এল লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফি গীত “তাজমহল” ছবির “জো ওয়াদা কিয়া ওহ নিভানা পরেগা”, যা এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও ভালবাসার মাধুর্য নিয়ে বসত করে আমাদের মনে। আর যে নায়কের মুখে শোনা যায় এই গান, ছায়াছবিতে তিনি অভিনেতা প্রদীপকুমার, সহশিল্পী নায়িকা বীণা রাই। (Pradeep Kumar)

বাংলার শিল্পীরা গানে, সুরে যেমন একটা দীর্ঘকাল বোম্বাইয়ের সিনেমা জগতকে মাতিয়ে রেখেছেন, তেমনই অভিনয়ে, পরিচালনায় ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। প্রদীপ কুমার বটব্যাল ছিলেন তেমনই এক অভিনেতা, যিনি অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন শহর কলকাতায় মাত্র ২২ বছর বয়সে। দেবকী বসু, ১৯৪৭ সালে রতন চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি “অলকানন্দা”–এ যিনি চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, স্বয়ং তাঁর হাতেই “শীতল” নামটি বদলে হয়ে যায় “প্রদীপকুমার”। (Pradeep Kumar)
এর আগে তিনি কলকাতার অরোরা স্টুডিওতে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সহকারী ক্যামেরাম্যান হিসেবে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯। ক্যামেরার পিছনে চোখ রেখে সিনেমার রঙিন জগৎকে (তখন অবশ্য সাদা কালো) অবলোকন করতে করতে একদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার বাসনা দানা বেঁধেছিল। (Pradeep Kumar)
জন্ম ১৯২৫ সালের, ৪ জানুয়ারি ভবানীপুর সর্দার শঙ্কর রোডের পণ্ডিতবাড়িতে। পিতৃদত্ত নাম ছিল শীতল বটব্যাল। তাঁর ঠাকুরদা বিদ্যালঙ্কার উমেশচন্দ্র ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
জন্ম ১৯২৫ সালের, ৪ জানুয়ারি ভবানীপুর সর্দার শঙ্কর রোডের পণ্ডিতবাড়িতে। পিতৃদত্ত নাম ছিল শীতল বটব্যাল। তাঁর ঠাকুরদা বিদ্যালঙ্কার উমেশচন্দ্র ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। গভর্মেন্ট আর্ট স্কুলের ছাত্র, শীতলের উৎসাহ ছিল সিনেমা মাধ্যমটির প্রতি। কিন্তু গোঁড়া হিন্দু পরিবারে সিনেমার রূপোলি জগতে পদার্পণ ছিল প্রায় বিধর্মী হওয়ার সমতুল্য এবং সেই কারণেই, অভিনয়ের জগতে আসতে তাঁকে পেরোতে হয়েছিল বহু বাধা-বিপত্তি। (Pradeep Kumar)
এরপরের পর্যায়ে হেমেন গুপ্তের পরিচালনায় পরপর দুটি ছবিতে প্রদীপ কুমারের অভিনয় সকলের মনে দাগ কাটল। ছবি দুটি হল ‘ভুলি নাই’ (১৯৪৮) এবং ‘৪২’ (১৯৫১)। ১৯৪৯ সালে অভিনয় করলেন তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘সন্দীপন পাঠশালা’-তে। ১৯৫১ সালের পরে তিনি কলকাতা ছেড়ে পা রাখেন বোম্বাইয়ের ফিল্মি জগতে। এবারও তাঁর পাশে হেমেন গুপ্ত। প্রখ্যাত প্রযোজক শশধর মুখার্জির ফিল্মিস্তান চিত্র সংস্থার সঙ্গে, পাকাপাকিভাবে প্রদীপকুমার পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেন। শুরু হল তাঁর জীবনে হিন্দি ছায়াছবির অধ্যায়। (Pradeep Kumar)

একের পর এক ছবি করে গেছেন। যার মধ্যে ‘আনন্দ মঠ’, ‘চিত্রলেখা’, ‘নুরজাহান’, ‘মিট্টি মে সোনা’, ‘আরতি’, ‘বহু বেগম’, ‘নয়া জামানা’, ‘আনারকলি’, ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘মিস ইন্ডিয়া’, ‘আদালত’, ‘গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া’, ‘রাজহাট’, ‘নাগিন’, ‘বাদশাহ’, ‘ঘুংঘট’, ‘মেরি সুরত তেরি আঁখে’, ‘রাখি’, ‘মহাভারত’ এবং অবশ্যই ‘তাজমহল’ প্রদীপ কুমারকে নিয়ে গিয়েছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। একজন বাঙালি শিল্পীর বোম্বাইয়ের চিত্র জগতে নায়ক হয়ে ওঠার ঘটনা হয়তো বা সেই প্রথম। মীনা কুমারী, নার্গিস, মধুবালা, গীতাবালি, শাকিলা, বৈজয়ন্তীমালা, আশা পারেখ, মালা সিনহা, পদ্মিনী, বীণা রাই, অনীতা গুহ, ওহাদিয়া রহমানের মতো ৫০ এবং ৬০ এর দশকের প্রথম সারির নায়িকাদের বিপরীতে প্রায় ১১৫টি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন প্রদীপকুমার, যার মধ্যে মীনা কুমারী ও মালা সিনহার সঙ্গে তাঁর ছবির সংখ্যা যথাক্রমে সাত এবং আট। মীনা কুমারী সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার কথা। মীনা কুমারীর অকাল জীবনাবসানে তিনি হারিয়েছিলেন এক নিকট বন্ধুকে। (Pradeep Kumar)
৭০ এর দশকের পর থেকে প্রদীপ অভিনীত “লোক পরলোক”, “ক্রান্তি”, “চম্বল কি কসম”, “রাজিয়া সুলতান”, “খাটটা মিঠা”, “ধরম বীর” প্রভৃতি ছবি দেখলে বোঝা যায়, তিনি ক্রমশ নায়কের আসন ছেড়ে সরে আসেন পার্শ্ব চরিত্রের রূপদানে।
৭০ এর দশকের পর থেকে প্রদীপ অভিনীত “লোক পরলোক”, “ক্রান্তি”, “চম্বল কি কসম”, “রাজিয়া সুলতান”, “খাটটা মিঠা”, “ধরম বীর” প্রভৃতি ছবি দেখলে বোঝা যায়, তিনি ক্রমশ নায়কের আসন ছেড়ে সরে আসেন পার্শ্ব চরিত্রের রূপদানে। তার মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে ডেভিড অ্যাটেনবরো পরিচালিত হলিউডের ছবি “গান্ধী” (১৯৮২)-তে, তাঁর অভিনয়। যদিও ছবিতে গুটিকয়েক দৃশ্যে তাঁর সংলাপহীন উপস্থিতি ছিল মাত্র, তবুও পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক সিনেমা হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত “গান্ধী” আটটি একাডেমি পুরস্কারে (অস্কার) ভূষিত হলে, তার হাত ধরে প্রদীপকুমার স্বীকৃতি লাভ করেন তাঁর একমাত্র হলিউড কাজের জন্য। ভারতীয় দর্শকের কাছে এটি উল্লেখযোগ্য, কারণ ৫০ ও ৬০-এর দশকের একজন মেইন স্ট্রিম সিনেমাভিনেতার এই উত্তরণ, সেই সময়ের নিরিখে ছিল এক বড় পাওয়া। (Pradeep Kumar)

প্রদীপকুমারকে যে সময়ে বোম্বের ছবিতে নায়ক হিসেবে দেখা গেছে, সেটি আসলে হিন্দি ফিল্ম সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও স্বর্ণযুগ। শুধু “তাজমহল” ছবির গানই নয়, প্রদীপ কুমার অভিনীত বহু ছবিরই সম্পদ ছিল এমন সব গান, যা আজও কালজয়ী। রোশনের সুর করা এবং মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীদের গাওয়া গানগুলি ছিল মাস্টারপিস, যার মধ্যে রয়েছে “আপনে ইয়াদ দিলায়া তো মুঝে ইয়াদ আয়া”, “আব কেয়া মিসাল দুঁ ম্যায় তুমহারে শাবাব কি”, “বাহারোঁ কি মঞ্জিল রাহি”, “দুনিয়া করে সাওয়াল”, “হাম ইন্তেজার করেঙ্গে”, “দিল যো না কহে সকা” প্রভৃতি। (Pradeep Kumar)
এখানে ১৯৬৬ সালে প্রদীপকুমার অভিনীত “সলমা” ছবিটির কথা বলা প্রয়োজন। ওমর খাইয়াম সাহারানপুরি পরিচালনায় ছবিটির অমূল্য সম্পদ ছিল তার গান, যার সুরকার ছিলেন মদন মোহন। ছবিটি মুক্তি না পাওয়ায় হারিয়ে গেল সেই গান এবং অদ্ভুতভাবে ১৯৮২ সালে “দিদার–ই-ইয়ার” ছবিতে পাওয়া গেল “সলমা”-র কাহিনিসূত্র। (Pradeep Kumar)
ফিরে আসি কলকাতায়। যে শহর প্রদীপকুমারকে পাদপ্রদীপের আলোর সামনে নিয়ে এসেছিল একদিন, তার সঙ্গে তাঁর সংযোগ কোনওদিনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি।
ফিরে আসি কলকাতায়। যে শহর প্রদীপকুমারকে পাদপ্রদীপের আলোর সামনে নিয়ে এসেছিল একদিন, তার সঙ্গে তাঁর সংযোগ কোনওদিনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। অভিনয় করেছেন “দেবী চৌধুরানী’’, ‘‘স্বামী’’, ‘‘বিষ্ণুপ্রিয়া’’, ‘‘সন্ধ্যাবেলার রূপকথা’’, ‘‘অপবাদ’’, ‘‘পলাতক’’, ‘‘স্পর্শমণি’’, “দস্যু মোহন”, “একদিন রাত্রে”, “রায় বাহাদুর”, “তমসা”, “বধূবরণ”, “প্রথম প্রেম”, “ত্রয়ী” প্রভৃতি ছবিতে। তবে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় ছবিটি অবশ্যই সুচিত্রা সেনের বিপরীতে ‘‘গৃহদাহ’’ যার নায়ক “মহিম”-এর চরিত্রে ছিলেন উত্তম কুমার স্বয়ং। (Pradeep Kumar)
৯০-এর দশকে প্রদীপ কুমারকে দেখা যায় দূরদর্শনে। “মঝধার” (সিরিজ ১৯৯১), “ইয়ে আগ কব বুঝেগি” (টেলিফিল্ম, ১৯৯৩) এবং “দ্য গ্রেট মুঘলস” (সিরিজ ১৯৯৯-২০০০)-এ তিনি অভিনয় করেছিলেন। (Pradeep Kumar)

জীবনের শেষ দিকটা তিনি কাটিয়েছিলেন কলকাতাতেই। সেখানে এক শুভানুধ্যায়ীর জন্যই তিনি বেঁচেছিলেন। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। বারবার তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল। শেষে ২০০১ সালের, ২৭ অক্টোবর প্রদীপ কুমারের জীবনাবসান হয়। (Pradeep Kumar)
প্রদীপ কুমারের অভিনেতা জীবনের সঠিক মূল্যায়ন করা শক্ত। কারণ তিনি এমন একটা সময়ে বাংলার মাটি ছেড়ে আরব সাগরের পাড়ে, সদ্য স্বাধীন হওয়া এক দেশের, মেক বিলিভের রাজধানীতে গিয়ে নিজের অধ্যবসায়ের জোড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার কোনও তুলনা নেই। আর এখানেই তাঁর দক্ষতা– এক যথার্থ শিল্পী মনের পরিচয়। (Pradeep Kumar)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সপ্তর্ষি রায় বর্ধনের জন্ম, কর্ম এবং বর্তমান ঠাঁই তার প্রাণের শহর কলকাতায়। প্রথাগত ছাত্রজীবন কেটেছে কলকাতার পাঠভবন স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। লেখাজোকা, ছবি তোলা, নাট্যাভিনয় আর হেরিটেজের সুলুক সন্ধানের নেশায় মশগুল। সঙ্গে বই পড়া, গান বাজনা শোনা আর আকাশ পাতাল ভাবনার অদম্য বাসনা। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন- "রূপকথার মতো- স্মৃতিকথায় প্রণতি রায়", "খেয়ালের খেরোখাতা" এবং "চব্য চোষ্য লেহ্য পেয়"।
