Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

আজিজুন বাই ও অন্যান্যরা

Azizun Bai
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Azizun Bai)

জুন, ১৮৫৭। কানপুর— যাকে ব্রিটিশরা Cawnpore বলত— সেখানে আগুন জ্বলছে।

ভারতীয় সিপাহিরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছাউনি ঘেরাও করেছে। বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাস্তাঘাট। আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে, সমস্ত বিপদ উপেক্ষা করে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন একজন নারী।

পুরুষের পোশাক পরা, বুকে পদক আঁটা, কোমরে পিস্তল, হাতে তলোয়ার। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁকে দেখে থমকে গেছেন— একটু ভয়ে, একটু অবিশ্বাসে, একটু বিস্ময়ে। তিনি সৈনিক নন। অন্তত সরকারি খাতায় তো নন। কোনও পদ নেই, কোনও রেজিমেন্ট নেই, কোনও সামরিক নথিতে তাঁর নাম নেই।

তাঁর নাম আজিজুন বাই। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। সাম্রাজ্যের তলায় চাপা পড়া এক নাম।


আরও পড়ুন: ফিরে দেখা ‘আমার কথা’ – বই রিভিউ


আজিজুন বাই ছিলেন একজন পেশাদার গায়িকা, নৃত্যশিল্পী, বিনোদনকারী। সাগর ক্যান্টনমেন্ট থেকে অল্প বয়সে আসেন কানপুরে। ব্রিটিশদের চোখে যে সমাজকে ‘নিচু’ মনে হত, ভারতীয় সংস্কৃতিতে সেই সমাজই ছিল শিল্পের আসল আঁতুড়ঘর। আজিজুন ছিলেন সেই জগতের মানুষ— দ্বিতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর সিপাহিদের কাছের, বিশেষত শামসুদ্দিন খানের। আর বিদ্রোহের মাসগুলোয় তিনি হয়ে উঠেছিলেন এমন কেউ, যার কথা কেউ ভাবেনি।

বিদ্রোহ-পরবর্তী ব্রিটিশ তদন্তে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘দ্বিতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ’ এবং ‘ঘোড়সওয়ার সৈনিকদের সঙ্গে ঘোড়া চড়ার অভ্যাস আছে’ এমন একজন নারী হিসেবে। সত্যিই যখন গুলি শুরু হল, তখন তিনি সেই অবরোধের মধ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেন— সাজসজ্জায় নয়, অস্ত্র হাতে।

Azizun Bai
আজিজুন বাই ছিলেন একজন পেশাদার গায়িকা, নৃত্যশিল্পী, বিনোদনকারী। সাগর ক্যান্টনমেন্ট থেকে অল্প বয়সে আসেন কানপুরে।

তিনি ছিলেন গুপ্তচর, বার্তাবাহক, ষড়যন্ত্রকারী— পেশার অদৃশ্য সামাজিক ছাড়পত্র ব্যবহার করে তিনি যেখানে কোনও সৈনিক যেতে পারত না, সেখানে যেতেন। খবর বহন করতেন, প্রতিরোধকে বাঁচিয়ে রাখতেন। তবুও ১৮৫৭ সালের কোনও প্রামাণ্য ইতিহাসে তাঁর নাম নেই।
বাইজিরা আসলে কারা ছিলেন?

আজিজুন বাইকে বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে তাঁর জগৎটাকে— আর সেই জগৎ কীভাবে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে।

উপমহাদেশজুড়ে এই পেশাদার শিল্পীদের নানা নামে চেনা যেত— উত্তরে তওয়াইফ, দক্ষিণে দেবদাসী, বাংলায় বাইজি। ব্রিটিশরা সকলকে এক ঝাড়ে ‘নচ গার্লস’ বলে ডাকত। কিন্তু ব্রিটিশরা যা বুঝতে পারেনি— বা বুঝতে চায়নি— তা হল এই নারীরা ভারতীয় সমাজে কতটা জটিল ও ক্ষমতাশালী একটি স্থান অধিকার করে ছিলেন।

মুঘল দরবার-সংস্কৃতিতে তওয়াইফরা শুধু বিনোদনকারী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন রুচি ও পরিশীলতার মানদণ্ড, ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যের সংরক্ষক, শিষ্টাচারের শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত পরিবার তাঁদের কাছে সন্তানদের পাঠাতেন ‘তেহজীব’ শিখতে।

ইতিহাসবিদ প্রাণ নেভিলের গবেষণায় (Nautch Girls of India: Dancers, Singers, Playmates, 1996) এই সূক্ষ্মতা ধরা পড়ে। মুঘল দরবার-সংস্কৃতিতে তওয়াইফরা শুধু বিনোদনকারী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন রুচি ও পরিশীলতার মানদণ্ড, ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যের সংরক্ষক, শিষ্টাচারের শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত পরিবার তাঁদের কাছে সন্তানদের পাঠাতেন ‘তেহজীব’ শিখতে। ‘তেহজীব’ অর্থাৎ আদব-কায়দা, কবিতা, কথোপকথনের শিল্প। তখনকার দিনে কোনও বিখ্যাত তওয়াইফের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা লজ্জার নয়, সংস্কৃতিমনের প্রমাণ।

সেরা তওয়াইফরা— ‘দরবারি তওয়াইফ’— দাবি করতেন, তাঁরা সরাসরি মুঘল রাজদরবারের পরিবেশনার ধারা থেকে এসেছেন। তাঁদের কোঠা— সুসজ্জিত সেই মজলিশঘর— ছিল কবিদের আড্ডা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর, একটি শহরের সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দন। পতিতালয় নয়, এগুলি ছিল প্রতিষ্ঠান।
ধীরে ধীরে মুছে ফেলা

Azizun Bai
তাঁরা ছিলেন রুচি ও পরিশীলতার মানদণ্ড, ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যের সংরক্ষক, শিষ্টাচারের শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত পরিবার তাঁদের কাছে সন্তানদের পাঠাতেন ‘তেহজীব’ শিখতে।

তারপর ব্রিটিশরা এল— সব কিছু ভাঙতে শুরু করল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যত রাজ্য গ্রাস করল, তওয়াইফদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা তত শুকিয়ে গেল। মুঘল সাম্রাজ্য পড়ে যাওয়ার পর ক্ষমতার কেন্দ্র সরে গেল অযোধ্যার লখনউতে— সেখানেও কিছুকাল টিকে ছিল এই সংস্কৃতি, উজ্জ্বলভাবে। কিন্তু ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশরা অযোধ্যাও গ্রাস করল, আর রাতারাতি ধসে পড়ল তওয়াইফ পৃষ্ঠপোষকতার শেষ কেন্দ্র।
বিদ্রোহ ও বিদ্রোহ-পরবর্তী দলিলগুলো বলে দেয় সাম্রাজ্য কীভাবে নতুন করে ইতিহাস লেখে।

কায়সারবাগ প্রাসাদের নারীকক্ষ থেকে বাজেয়াপ্ত সম্পদের তালিকা প্রায় বিশ পৃষ্ঠা দীর্ঘ— মূল্যবান পাথরখচিত সোনার গয়না, কাশ্মিরি শাল, রত্নখচিত টুপি ও জুতো, রূপোর বাসন, জেড পাথরের পানপাত্র, হুঁকো, দামি আসবাব। একটি সভ্যতার সংক্ষিপ্তসার— ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ বীনা ওল্ডেনবার্গ ১৮৫৮ থেকে ১৮৭৭ সালের পৌর করের নথি ঘেঁটে চমকে দেওয়া একটি তথ্য পেয়েছিলেন— লখনউতে সবচেয়ে বেশি আয় করতেন তওয়াইফরা। সর্বোচ্চ করের বন্ধনীতে ছিলেন তাঁরা। সম্পত্তির মালিক, প্রভাবশালী, অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম।

ব্রিটিশরা এটা জানত। আর তারা তাঁদের শাস্তি দিল।


আরও পড়ুন: দোলের রংবদল – রণিতা চট্টোপাধ্যায়


ওল্ডেনবার্গ লিখেছেন, ব্রিটিশ সৈন্যরা কোঠায় তল্লাশির পরোয়ানা নিয়ে এসে সব লণ্ডভণ্ড করত— পর্দা টেনে ছিঁড়ত, আসবাব ভাঙত। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হত। বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেওয়া, অর্থ জোগানো, ষড়যন্ত্রে মদত দেওয়ার অভিযোগে নারীদের বিচার হত— যে অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে সত্যিও ছিল, কারণ সেটা তাঁরা সজ্ঞানে ও সাহসিকতার সঙ্গে করেছিলেন।

কায়সারবাগ প্রাসাদের নারীকক্ষ থেকে বাজেয়াপ্ত সম্পদের তালিকা প্রায় বিশ পৃষ্ঠা দীর্ঘ— মূল্যবান পাথরখচিত সোনার গয়না, কাশ্মিরি শাল, রত্নখচিত টুপি ও জুতো, রূপোর বাসন, জেড পাথরের পানপাত্র, হুঁকো, দামি আসবাব। একটি সভ্যতার সংক্ষিপ্তসার— ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
যাঁরা লড়েছিলেন

আজিজুন বাই একা ছিলেন না। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে বারবার তওয়াইফদের নাম উঠে আসে— ব্রিটিশ রিপোর্টের প্রান্তে, জবানবন্দির ফাঁকে ফাঁকে, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে যেন অনিচ্ছায়।

স্বামী যখন নির্বাসনে, তখন লখনউতে তিনিই প্রতিরোধের মূর্তি হয়ে উঠলেন। বিদ্রোহীদের সংগঠিত করলেন, শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেন কিছুকাল, পুত্র বিরজিস কদরকে রাজা ঘোষণা করলেন।

হুসেইনি নামে এক নিম্নশ্রেণির তওয়াইফ বিবি গরদিন হত্যাকাণ্ডে— যেখানে একশোরও বেশি ব্রিটিশ নারী ও শিশু মারা যায়— জড়িত থাকার অভিযোগে চিহ্নিত হন। সেই অভিযোগ কতটা সত্য, কতটা সুবিধামতো দায় চাপানো, সেই প্রশ্ন ইতিহাস কখনও সৎভাবে করেনি।

বেগম হজরত মহল ১৮৫৭-র সবচেয়ে পরিচিত নারী মুখ। তাঁর পরিচয় নিয়ে ইতিহাসে এখনও বিতর্ক। কোনও কোনও বিবরণ মতে, অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শাহকে বিয়ের আগে তিনিও একজন তওয়াইফ ছিলেন। স্বামী যখন নির্বাসনে, তখন লখনউতে তিনিই প্রতিরোধের মূর্তি হয়ে উঠলেন। বিদ্রোহীদের সংগঠিত করলেন, শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেন কিছুকাল, পুত্র বিরজিস কদরকে রাজা ঘোষণা করলেন। ব্রিটিশরা ফের দখল নিলে, ১৮৫৮ সালে তিনি নেপালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন। মৃত্যু হল ১৮৭৯ সালে— নির্বাসনে, পরাজিতের মতো নয়, অটলের মতো।
আরও অনেক নাম আছে, যাঁরা পুরোপুরি হারিয়ে গেছেন। বিদ্রোহের সময় রাস্তায় নেমে সিপাহিদের পাশে লড়াই করা নারীদের বিবরণ এতটাই খণ্ডিত যে, নাম আর বের করা সম্ভব নয়।

ভিক্টোরিয়ান নীতিবোধের শেষ আঘাত।

Azizun Bai
বিদ্রোহের সময় রাস্তায় নেমে সিপাহিদের পাশে লড়াই করা নারীদের বিবরণ এতটাই খণ্ডিত যে, নাম আর বের করা সম্ভব নয়।

১৮৫৭-র পর সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শাসনে এল ভারত, আর তার সঙ্গে এল সামরিক শাসনের চেয়েও কুটিল কিছু— ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার সংস্কার প্রকল্প।

১৮৬৪ সালের ‘কনটাজিয়াস ডিজিজেজ অ্যাক্ট’— যা মূলত ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে যৌনরোগ ঠেকাতে তৈরি— মেনে বাইজি ও যৌনকর্মীদের এক বন্ধনীতে ফেলে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হল। শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক পার্থক্য রাতারাতি মুছে গেল এক আইনি ঘোষণায়। খ্রিষ্টান মিশনারি ও ভারতীয় সমাজসংস্কারকরা একজোট হলেন ‘নচ গার্ল’ বিরোধী আন্দোলনে— আর উনিশ শতকের শেষে জনমত পুরোপুরি ঘুরে গেল তাঁদের বিরুদ্ধে। যাঁরা এক প্রজন্ম আগেও ছিলেন ধ্রুপদী সংস্কৃতির অভিভাবক।

নিষ্ঠুর পরিহাস এখানেই— জীবিকা ধ্বংস হওয়ায় অনেক তওয়াইফ বাঁচার তাগিদে সরাসরি যৌনকর্মে নামতে বাধ্য হলেন। সেটাই হল তাঁদের বিরুদ্ধে তোলা প্রতিটি অভিযোগের ‘প্রমাণ’। ফাঁদটা আগে থেকেই পাতা ছিল, তাই পালানোর পথ ছিল না।

নিষ্ঠুর পরিহাস এখানেই— জীবিকা ধ্বংস হওয়ায় অনেক তওয়াইফ বাঁচার তাগিদে সরাসরি যৌনকর্মে নামতে বাধ্য হলেন। সেটাই হল তাঁদের বিরুদ্ধে তোলা প্রতিটি অভিযোগের ‘প্রমাণ’। ফাঁদটা আগে থেকেই পাতা ছিল, তাই পালানোর পথ ছিল না।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক

বিশের দশকে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময় তওয়াইফদের আগের সেই সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান অনেকটাই ম্লান। কিন্তু জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা তাঁদের মরেনি।


আরও পড়ুন: সাধের দেশ থেকে কী পেলেন সুহাসিনী? – রজত চক্রবর্তী


গওহরজান— সেই গায়িকা, যাঁর গ্রামোফোন রেকর্ড ভারতের প্রথম গণমাধ্যম তারকা বানিয়েছিল— গান্ধীর কাছ থেকে অনুরোধ পেলেন স্বরাজ তহবিলে অনুদান দিতে। রাজি হলেন, কিন্তু শর্ত দিলেন, গান্ধীজিকে নিজে তাঁর অনুষ্ঠানে আসতে হবে। গান্ধীজি আসতে পারলেন না। গওহরজান তবু সংগৃহীত ২৪,০০০ টাকার অর্ধেক ১২,০০০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন তাঁর কাছে।

বারাণসীতে একদল বাইজি তৈরি করলেন ‘তওয়াইফ সভা’— ঘোষণা করলেন সোনার গয়নার বদলে লোহার শিকল পরবেন, বিদেশি পণ্য বর্জন করবেন। অমৃতলাল নগরের ‘ইয়ে কোঠেওয়ালিয়াঁ’ (১৯৫৮) গ্রন্থে বিদ্যাধর বাই-এর একটি চিঠি আছে— বারাণসীতে গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা লেখা সেই চিঠিতে। গান্ধীজির পরামর্শে কয়েকজন বাইজি ঠিক করলেন, সংগীত চালিয়ে যাবেন, কিন্তু শুধু জাতীয়তাবাদী গান গাইবেন। এমনই একটি গান ‘চুন চুন কে ফুল লে লো’ সংকলনে জায়গা পেয়েছে।
কিন্তু গান্ধীজি একটা সীমারেখা টেনে দিলেন।

তওয়াইফ, বাইজি, দেবদাসী— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই সঙ্গীত, কবিতা, নৃত্য বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, যা আজ আমরা ভারতীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতি বলে গর্ব করি। তাঁদের কোঠাতেই উর্দু কবিতা পরিশোধিত হয়েছে, ঠুমরি ও কত্থক বিকশিত হয়েছে, টিকে ছিল একটি সভ্যতার সৌন্দর্যবোধ।

বরিশাল (বর্তমান বাংলাদেশ) ও কাকিনাড়া (অন্ধ্রপ্রদেশ)-র যৌনকর্মীরা যখন কংগ্রেসে যোগ দিতে চাইলেন, গান্ধীজি তাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন। তারপর বললেন, আগে এই কাজ ছাড়তে হবে, চরকায় সুতো কাটতে হবে, তবে জায়গা হবে আন্দোলনে। ১৯২৫ সালের জুনে তাঁর সাপ্তাহিক পত্রিকা ইয়ং ইন্ডিয়া-র সম্পাদকীয়তে গান্ধীজি লিখলেন: ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যতক্ষণ তাঁরা লজ্জার জীবন চালিয়ে যাবেন, ততক্ষণ তাঁদের দান বা সেবা গ্রহণ করা, তাঁদের প্রতিনিধিত্ব স্বীকার করা বা কংগ্রেসে যোগ দিতে উৎসাহ দেওয়া আমাদের পক্ষে ভুল।’

আন্দোলনের মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রমহিলা’রাও বললেন, তওয়াইফদের কাছে যেতে তাঁরা রাজি নন। পাশাপাশি ওঠাবসা— এসবই তাঁদের কাছে আপত্তির কারণ। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সম্মাননীয় রাজনীতি— যা অনেকটাই ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধের আদলে গড়া, যা ধ্বংস করেছিল তওয়াইফ সংস্কৃতিকে— সতী, গৃহী, ভদ্র, ভারতীয় নারীর ছাঁচে মিলছে না এমন কাউকে সেই রাজনীতিতে জায়গা দেওয়ার কথা ভাবাই হয়নি।

ফেরা যাক কানপুরে, জুন ১৮৫৭-এ

ধোঁয়ার মধ্যে ঘোড়ার পিঠে সেই নারীর কাছে, যাঁর বুকের পদক রোদে ঝলমল করছে।

Azizun Bai
তাঁর জগতের নারীরা— তওয়াইফ, বাইজি, দেবদাসী— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই সঙ্গীত, কবিতা, নৃত্য বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, যা আজ আমরা ভারতীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতি বলে গর্ব করি।

আজিজুন বাই নিজের পছন্দে একটা যুদ্ধে নামলেন, যেখানে তাঁর কোনও আনুষ্ঠানিক দায় ছিল না। তিনি বাইজি, সিপাহি নন। কোনও শপথ নেই, কোনও অধিনায়ক নেই, কোনও সামরিক দায়িত্ব নেই। তবুও তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে সেই অবরোধের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

তাঁর জগতের নারীরা— তওয়াইফ, বাইজি, দেবদাসী— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই সঙ্গীত, কবিতা, নৃত্য বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, যা আজ আমরা ভারতীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতি বলে গর্ব করি। তাঁদের কোঠাতেই উর্দু কবিতা পরিশোধিত হয়েছে, ঠুমরি ও কত্থক বিকশিত হয়েছে, টিকে ছিল একটি সভ্যতার সৌন্দর্যবোধ। যখন সেই জগৎ ধ্বংস হতে থাকল— ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাতে, ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার হাতে, সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের হাতে, সেই জাতীয়তাবাদের হাতে যাকে তাঁরা সমর্থন করতে চেয়েছিলেন— তখন তা চিরতরে হারিয়ে গেল। আর ফেরানো গেল না।

আমরা তাঁদের সব নিয়ে নিয়েছি। তাঁদের শিল্প, জীবিকা, সম্মান। গল্পে তাঁদের স্থানও। কিন্তু একটি বারও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিনি।

ইতিহাস ক্ষমতাবানদের দীর্ঘদিন মনে রাখে। আমাদের মনে রাখতে হবে মুছে ফেলা মানুষদের জন্য স্মৃতি, আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য।

এখন অন্তত এটুকু করতে পারি— মনে রাখি। কানপুরের ধোঁয়ায় আজিজুন বাইকে মনে রাখি। বেগম হজরত মহলকে মনে রাখি, যিনি একটা শহরকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। গওহর জানকে মনে রাখি, যিনি অর্ধেক উপার্জন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এমন একটি আন্দোলনে, যা তাঁকে মুশকিলে পড়লে তবেই স্বীকার করত। মনে রাখি বারাণসীর সেই বাইজিদের, যাঁরা সোনার বদলে লোহা পরেছিলেন।

ইতিহাস ক্ষমতাবানদের দীর্ঘদিন মনে রাখে। আমাদের মনে রাখতে হবে মুছে ফেলা মানুষদের জন্য স্মৃতি, আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Anindya Bandyopadhyay

অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় জন্ম ১৯৫৮ সালে, কলকাতায়। সংগীতের শিক্ষা প্রথমে মা আরাধনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। পরে সরোদের শিক্ষা ধ্যানেশ খান, আশীষ খান,বাহাদুর খান,নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ও আলি আকবর খানের কাছে। সংগীত পরিবেশন করেছেন দেশ ও বিদেশে। সরোদ ছাড়াও বিরল যন্ত্র 'সুরশৃঙ্গার'-এ পারদর্শী এবং ভারত সরকারের 'সিনিয়র ফেলোশিপ' অর্জন করেন ২০০১ সালে।
কলকাতার দু-টি ইংরেজি দৈনিকে দীর্ঘকাল সংগীত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাঁচটি তথ্যচিত্র পরিচালনাসহ চলচ্চিত্রে ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ— ‘আপনাদের সেবায়’, ‘আমার জীবনী’, ‘সুরের গুরু আলাউদ্দিন’, ‘প্রসঙ্গ ঠুংরি’, ‘উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে হিন্দুস্থানী সংগীত’, ‘সৌমিত্রদার কথা গানগপ্পো’, ‘সেতার সরোদ চর্চার ইতিহাস’। মুম্বাইয়ের 'সুরমণি', বিশাখাপত্তমের 'সরোদ বিদ্বান', কলকাতার 'চিদাকাশ' ও 'গুরুশ্রী' সম্মানে ভূষিত। ছবি সৌজন্য: সঞ্জিত চৌধুরী

Picture of অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় জন্ম ১৯৫৮ সালে, কলকাতায়। সংগীতের শিক্ষা প্রথমে মা আরাধনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। পরে সরোদের শিক্ষা ধ্যানেশ খান, আশীষ খান,বাহাদুর খান,নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ও আলি আকবর খানের কাছে। সংগীত পরিবেশন করেছেন দেশ ও বিদেশে। সরোদ ছাড়াও বিরল যন্ত্র 'সুরশৃঙ্গার'-এ পারদর্শী এবং ভারত সরকারের 'সিনিয়র ফেলোশিপ' অর্জন করেন ২০০১ সালে। কলকাতার দু-টি ইংরেজি দৈনিকে দীর্ঘকাল সংগীত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাঁচটি তথ্যচিত্র পরিচালনাসহ চলচ্চিত্রে ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ— ‘আপনাদের সেবায়’, ‘আমার জীবনী’, ‘সুরের গুরু আলাউদ্দিন’, ‘প্রসঙ্গ ঠুংরি’, ‘উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে হিন্দুস্থানী সংগীত’, ‘সৌমিত্রদার কথা গানগপ্পো’, ‘সেতার সরোদ চর্চার ইতিহাস’। মুম্বাইয়ের 'সুরমণি', বিশাখাপত্তমের 'সরোদ বিদ্বান', কলকাতার 'চিদাকাশ' ও 'গুরুশ্রী' সম্মানে ভূষিত। ছবি সৌজন্য: সঞ্জিত চৌধুরী
Picture of অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় জন্ম ১৯৫৮ সালে, কলকাতায়। সংগীতের শিক্ষা প্রথমে মা আরাধনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। পরে সরোদের শিক্ষা ধ্যানেশ খান, আশীষ খান,বাহাদুর খান,নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ও আলি আকবর খানের কাছে। সংগীত পরিবেশন করেছেন দেশ ও বিদেশে। সরোদ ছাড়াও বিরল যন্ত্র 'সুরশৃঙ্গার'-এ পারদর্শী এবং ভারত সরকারের 'সিনিয়র ফেলোশিপ' অর্জন করেন ২০০১ সালে। কলকাতার দু-টি ইংরেজি দৈনিকে দীর্ঘকাল সংগীত সমালোচকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাঁচটি তথ্যচিত্র পরিচালনাসহ চলচ্চিত্রে ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ— ‘আপনাদের সেবায়’, ‘আমার জীবনী’, ‘সুরের গুরু আলাউদ্দিন’, ‘প্রসঙ্গ ঠুংরি’, ‘উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে হিন্দুস্থানী সংগীত’, ‘সৌমিত্রদার কথা গানগপ্পো’, ‘সেতার সরোদ চর্চার ইতিহাস’। মুম্বাইয়ের 'সুরমণি', বিশাখাপত্তমের 'সরোদ বিদ্বান', কলকাতার 'চিদাকাশ' ও 'গুরুশ্রী' সম্মানে ভূষিত। ছবি সৌজন্য: সঞ্জিত চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

জীবনানন্দ দাশ

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কাকলি মজুমদার
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ
নির্মাল্য চ্যাটার্জি

কলমকারী

আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com