Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল – শত বর্ষের প্রান্তে

সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

মার্চ ২১, ২০২৬

Ballygunge Govt High School
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Ballygunge Govt High School)

“বর্ষে বর্ষে দলে দলে আসে বিদ্যামঠ তলে,
চলে যায় তারা কলরবে,
কৈশোরের কিশলয় পর্ণে পরিণতি হয়
যৌবনের শ্যামল গৌরবে।“ (‘ছাত্রধারা’, কালিদাস রায়)

‘যখন স্কুল ছেড়েছি তখন আমি ছিলাম পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি আর এবার যে ফিরে এলাম, এখন আমি প্রায় সাড়ে ছ’ফুট। স্কুল তো আছে যে কে সেই, বেড়েছি শুধু আমিই’, বলেছিলেন সত্যজিৎ রায়, তাঁর ছোটবেলায় দেখা বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল সম্পর্কে। ১৯৩৬ সালে এখান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্কুলেরও বয়স বাড়ে। আকারে, আয়তনে বদলে যায় তার চেহারা। এক দল ছাত্র আসে, অপর দল চলে যায়, স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে। বদলে যায় মাস্টারমশাইদের মুখ। তারপর একদিন সেই স্কুল এসে দাঁড়ায় শতবর্ষের প্রান্তে।


আরও পড়ুন: নাও ছাড়িয়া দে


১৯২৭ সালের ৩রা জানুয়ারি লর্ড লিটন, স্কুলের দ্বারোদঘাটন করতে এসে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯০৮ সাল নাগাদ। তখন কলেজ স্ট্রিটের ১১৫ নম্বর অ্যালবার্ট বিল্ডিং-এ ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাড়া বাড়ি থেকে স্থায়ী ঠিকানায় যাওয়া প্রয়োজন। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অধিকর্তা এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ এইচ.আর.জেমস কলেজটিকে ভবানীপুরের কাছাকাছি কোনও উপযুক্ত জায়গায় নিয়ে আসবার পাশাপাশি একটি প্র্যাকটিসিং স্কুল প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেন। তারপর হঠাৎ সবকিছু থিতিয়ে যায়।

কিছুকাল পর ১৯১৭ সালে স্যাডলার কমিশন তৈরি হয়। শিক্ষাবিদ স্যার এম.ই.স্যাডলার ছিলেন এর চেয়ারম্যান। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কমিশনের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় সদস্যের মধ্যে একজন। প্রস্তাবিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং সংলগ্ন প্র্যাকটিসিং স্কুলটি প্রতিষ্ঠার জন্য এবার তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন। আবার কিছু বাধার সম্মুখীন হয়ে প্রকল্পটি কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়।

Ballygunge Govt High School
১৯২৭ সালের ৩রা জানুয়ারি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল উদ্বোধন করেন

অবশেষে, সব বাধা অতিক্রম করে, তৎকালীন বাংলার গভর্নর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য লর্ড লিটন ১৯২৭ সালের ৩রা জানুয়ারি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল উদ্বোধন করেন। ল্যান্সডাউন রোড থেকে বেলতলা রোডের দিকে যেতে পুলিশ থানার লাগোয়া স্কুল, ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে হাঁটা পথ।

১৯২৭ সালে যখন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কোনও মর্নিং সেকশন ছিল না। ডে সেকশনটি তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন স্কুলের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা। সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা এখানে আসত ক্লাস নিতে। ১৯৩৪ সালে শিক্ষাবিদ ওয়াল্টার এলেন জেনকিন্স কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টকে একটি ‘মডেল স্কুল’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেন, যা সময়ের নিরিখে ছিল অনন্য। কিন্তু তারপরেই দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। স্কুল ও কলেজ দুটোরই পঠনপাঠন কয়েক বছরের জন্য বিপর্যস্ত হয়। অবশেষে ১৯৫৩ সালে স্কুল ফিরে আসে স্বস্থানে। সেই বছরেই মর্নিং সেকশন চালু হয়। ১৯৫৭ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি যুক্ত করা হয়। স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন নগেন্দ্রনাথ দত্ত (১৯২৭-১৯৩২)।

১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু সেদিক থেকে দক্ষিণ কলকাতা খানিক পিছিয়ে ছিল। সুতরাং, ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল তৈরির সরকারি সিদ্ধান্ত একটি মাইলস্টোন।

যে সময়ে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট শুরু হয়েছিল, তার আগের একশো বছরে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নানাধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গেছে। গতানুগতিক দেশীয় পঠনপাঠনের রীতি পদ্ধতি থেকে মুখ ঘুরিয়ে সমাজের একটা বিরাট অংশ তখন পশ্চিমের আধুনিক শিক্ষার দিকে ফিরে তাকায়। বাংলার নবজাগরণের আবহে বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, ডেভিড হেয়ার, রাজা রামমোহন রায়, রেভারেন্ড আলেকজান্ডার ডাফ এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি মনীষীদের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল সেই পরিবর্তনে।

এই দীর্ঘ সময়ে উত্তর ও মধ্য কলকাতা জুড়ে তখন বহু সংখ্যক স্কুল, কলেজ তৈরি হয়— ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু সেদিক থেকে দক্ষিণ কলকাতা খানিক পিছিয়ে ছিল। সুতরাং, ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল তৈরির সরকারি সিদ্ধান্ত একটি মাইলস্টোন।

Ballygunge Govt High School
শালপাতার ঠোঙায় এক পয়সার কাঠি গোঁজা আলুর দম আর ‘হ্যাপি বয়’ আইস ক্রিম ছিল হট ফেভারিট!

সত্যজিৎ রায়ের লেখায় তাঁর ফেলে আসা স্কুলের কথা ফিরে এসেছে। সময়ের হিসেবে স্কুল শুরু হওয়ার প্রায় পরে পরেই তিনি ভর্তি হয়েছিলেন সেখানে। এবং সেই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, আজকের স্কুলের চেহারার সঙ্গে তার বহু অমিল। তাঁর সময়ে ছাত্রদের কোনও ইউনিফর্ম ছিল না— হাফ প্যান্ট, ধুতির সঙ্গে শার্ট, পায়জামার চলন ছিল। টিফিনের এক ঘণ্টার মধ্যে খাওয়া ও খেলা দুইই চলত। শালপাতার ঠোঙায় এক পয়সার কাঠি গোঁজা আলুর দম আর ‘হ্যাপি বয়’ আইস ক্রিম ছিল হট ফেভারিট!

কোনও স্কুল সম্পর্কে বলতে গেলে সেখানকার শিক্ষকদের কথা উঠে আসবেই। নিজ চরিত্র গুণ বা দোষে তাঁদের কেউ কেউ থেকে যান ছাত্রদের স্মৃতিতে। সত্যজিতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

অনাদিকাল থেকেই বোধহয় স্কুলের ছাত্রদের উৎকট আনন্দ শিক্ষকদের অর্থহীন অদ্ভুত নামে অভিহিত করা।’ সত্যজিতের ছাত্রাবস্থায় সেকেন্ড পণ্ডিত মশাইয়ের নাম ‘ভ্যান পণ্ডিত’, হেড মাস্টারমশাই নগেন মজুমদারের নাম ‘নগা’ এবং পরের হেড মাস্টারমশাই যোগেশবাবুর নাম হয়েছিল ‘গাঁজা’।

যেমন ইংরিজির শিক্ষক ব্রজেনবাবু।

ব্রজেনবাবু ক্লাসে ছেলেরা গোলমাল করলে তিনি হাঁক পারতেন, ‘Cease talking, cease talking!’

‘তাতে সবসময় যে খুব কাজ হত তা নয়। একবার এই অবস্থায় আর থাকতে না পেরে ব্রজেনবাবু একজন ছাত্রের দিকে চেয়ে হাঁকলেন, “অ্যাই, তুই উঠে আয় এখানে।” শাস্তিটা কি হবে জানা নেই; হয়তো ক্লাসরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হবে। ছাত্রটি উঠে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ অলোক নামে আরেক পড়ুয়া তার জায়গা ছেড়ে উঠে গিয়ে ব্রজেনবাবুকে জড়িয়ে ধরল।

Ballygunge Govt High School
আরেক মজাদার ব্যাপার ছিল মাস্টারমশাইদের বিটকেল নামকরণ

“স্যার, আজকের দিনটা ওকে মাপ করে দিন, স্যার!” ব্রজেনবাবুর রাগ তখনও পড়েনি, তবে এই অপ্রত্যাশিত বাধাতে কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে বললেন “কেন, আজকের দিনটা কেন?”

“আজ মার্চেন্ট (বিজয়) সেঞ্চুরি করেছে, স্যার!”’

এছাড়াও আরেক মজাদার ব্যাপার ছিল মাস্টারমশাইদের বিটকেল নামকরণ। সেই নাম কালান্তরে প্রবাহিত হত ব্যাচের পর ব্যাচ। প্রাক্তনী তপন রায়চৌধুরী লিখেছিলেন ‘অনাদিকাল থেকেই বোধহয় স্কুলের ছাত্রদের উৎকট আনন্দ শিক্ষকদের অর্থহীন অদ্ভুত নামে অভিহিত করা।’ সত্যজিতের ছাত্রাবস্থায় সেকেন্ড পণ্ডিত মশাইয়ের নাম ‘ভ্যান পণ্ডিত’, হেড মাস্টারমশাই নগেন মজুমদারের নাম ‘নগা’ এবং পরের হেড মাস্টারমশাই যোগেশবাবুর নাম হয়েছিল ‘গাঁজা’।

শৃঙ্খলারক্ষায় খুব কড়া এই মানুষটির নাম হয়েছিল ‘কাপালিক’। বাংলার শিবদাসবাবু প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কোনও অজ্ঞাত কারণে তাঁর নাম হয়ে গেছিল ‘মাঝি’! তপন সাহা পড়াতেন জীববিজ্ঞান। ব্ল্যাক বোর্ডে রঙিন চক দিয়ে অসাধারণ কোষকলার ছবি আঁকতেন স্যার। আর প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে চুল আঁচড়ে আসতেন। তাই বোধহয় ছাত্রমহলে ওঁর নাম হয়ে গিয়েছিল ‘বহুরুপী’!

১৯৭৪ ব্যাচের প্রাক্তনী নীলাঞ্জন রায়ের কথায়, পরেও এই ধরনের মজার ব্যাপারস্যাপার লেগেই থাকত। ক্রাফট টিচার ছিলেন বিকাশবাবু যাঁর গোলগাল মুখমণ্ডলের জন্য নাম হয়েছিল ‘ডিম’! ছিলেন ‘ছোট সুনীল বাবু’ এবং ‘বড় সুনীল বাবু’। প্রথম জন অঙ্কের মাস্টারমশাই; কে সি নাগের পাটিগণিতের বই তাঁর পুরোটাই ছিল মুখস্থ! বই না দেখেই অনায়াসে বলে দিতেন ‘দশ নম্বর প্রশ্নমালার তেরো নম্বর অঙ্ক কষে আনবি বাড়ি থেকে আর তার আগে ২০৫ পাতার তিন নম্বর উদাহরণটা একবার ভাল করে দেখে নিবি!’

১৯৮২ সালের ছাত্র সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় পাওয়া যায় অমরবাবুর কথা। শৃঙ্খলারক্ষায় খুব কড়া এই মানুষটির নাম হয়েছিল ‘কাপালিক’। বাংলার শিবদাসবাবু প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কোনও অজ্ঞাত কারণে তাঁর নাম হয়ে গেছিল ‘মাঝি’! তপন সাহা পড়াতেন জীববিজ্ঞান। ব্ল্যাক বোর্ডে রঙিন চক দিয়ে অসাধারণ কোষকলার ছবি আঁকতেন স্যার। আর প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে চুল আঁচড়ে আসতেন। তাই বোধহয় ছাত্রমহলে ওঁর নাম হয়ে গিয়েছিল ‘বহুরুপী’!

Ballygunge Govt High School
সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিতে ধরা দিয়েছে সেই স্কুলের মাস্টারমশাইদের কথাও

৫০ এবং ৬০-এর দশকে দক্ষিণ কলকাতায় স্কুলের সংখ্যা ছিল কম। ছেলেদের স্কুল হিসেবে তখন আশেপাশে সেন্ট লরেন্স, মিত্র ইনস্টিটিউশন, জগবন্ধু ইনস্টিটিউশন, সাউথ পয়েন্ট এবং শহরতলিতে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন। ‘এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেষারেষি ছিল আমাদের সেন্ট লরেন্স-এর সঙ্গে, বললেন আরেক প্রাক্তনী অভীপ্রসূন চট্টোপাধ্যায় (১৯৭৭)। ‘কারণটা হল ওদের যে খেলার মাঠ, সেটা চারটে ফুটবল ফিল্ডের সমান— আমাদেরটা অনেক ছোট সেই তুলনায়’।

এই খেলার মাঠকে ঘিরেই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে প্রজন্মান্তরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আবেগ এবং প্রতিযোগিতা জেতার উন্মাদনা। অভীপ্রসূনবাবু যেন এক ঝলক তাঁর চোখের সামনে দেখতে পান মাঠটাকে। ‘আমাদের জড়িয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় জায়গা ছিল মাঠটা।

সে সময়ে হকিতেও বেশ ভাল টিম ছিল স্কুলের, জানালেন ১৯৭৯ ব্যাচের অরুণালোক ভট্টাচার্য। ‘ফুটবলে যেমন তীর্থপতির (ইনস্টিটিউশন) সঙ্গে জিতেছে স্কুল, তেমনই খালসার (স্কুল) হকি টিমের সঙ্গে আমাদের হাড্ডা হাড্ডি লড়াই হয়েছে।’ তাঁর মতে, এই খেলাধুলোর ব্যাপারটা আসলে নির্ভর করত প্রধান শিক্ষক, গেমস টিচার এবং অবশ্যই সরকারি নীতিনিয়মের উপরে।

টিফিন টাইমের আধ ঘণ্টায় “ইস্টবেঙ্গল” আর “মোহনবাগান” নাম নিয়েই নেমে পড়ত পাঁচটা ক্লাসের ছেলেপুলেরা। প্রত্যেক ক্লাসের আবার তিনটে করে সেকশন। সুতরাং একই সময়ে কতগুলো টিম মাঠে। গোলকিপারদের অবস্থা শোচনীয়— বিভিন্ন দিক থেকে তাদের কাছে ছুটে আসছে বল, কোনটা যে তার “আসল” প্রতিপক্ষের সেটা যাচ্ছে গুলিয়ে!’ আর এটাও নাকি হামেশাই হত— টিফিনের শেষে ‘ম্যাচটা শেষ হয়নি স্যার’ এই অজুহাতে পরের পিরিয়ডে মাস্টারমশাইয়ের ছাড়পত্র আদায় করে স্টাফ রুমের সামনে থেকেই আবার মাঠে ফিরে যাওয়া।

সে সময়ে হকিতেও বেশ ভাল টিম ছিল স্কুলের, জানালেন ১৯৭৯ ব্যাচের অরুণালোক ভট্টাচার্য। ‘ফুটবলে যেমন তীর্থপতির (ইনস্টিটিউশন) সঙ্গে জিতেছে স্কুল, তেমনই খালসার (স্কুল) হকি টিমের সঙ্গে আমাদের হাড্ডা হাড্ডি লড়াই হয়েছে।’ তাঁর মতে, এই খেলাধুলোর ব্যাপারটা আসলে নির্ভর করত প্রধান শিক্ষক, গেমস টিচার এবং অবশ্যই সরকারি নীতিনিয়মের উপরে।

Ballygunge Govt High School
‘যখন ছোট ছিলাম’-এর পাতায় ফিরে এসেছে সত্যজিতের স্কুল-স্মৃতি

খেলাধুলোর ব্যাপারে বিশিষ্টতার দাবি রাখেন বিনোদবিহারীবাবু বা দীপক দাশের মতো গেম টিচাররা। আশির দশকের শেষ অবধি তাঁরা খেলার ময়দানে স্কুলকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। ‘আমাদের গেমস রুম একসময় ঠাসা ছিল নানা ধরনের খেলার দামি সরঞ্জামে, যা হয়তো ব্যবহার করবার মতো অবকাশ ছিলই না স্কুলের চৌহদ্দিতে।’ পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগে দুই প্রাক্তনী অজয় বিশ্বাস এবং সুকোমল ঘোষের পায়ে ছিল খেলার জাদু, তাঁদের কাছ থেকে জেনেছিলেন অরুণালোকবাবু।

তবে স্কুল জীবনে করা দুষ্টুমির স্মৃতি বোধহয় সবথেকে সুখকর। কাছেই ভবানীপুর— হাজরার সিনেমাপাড়ার অমোঘ আকর্ষণ। কিন্তু পকেটের রেস্ত নেই, বাড়িতেও সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্য পয়সা চাওয়া চাপের ব্যাপার। ‘অতঃপর পায়রার বাসাতেই হাত দিতে হল!’ এক মুখ হাসি নিয়ে বললেন অভীপ্রসূন চট্টোপাধ্যায়, ‘বাসা থেকে পায়রা ধরে সেগুলোকে বেচে দিয়ে পয়সা জোগাড় করা হল সিনেমা টিকিটের!’

স্যার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। এবার অতনু ব্যাখ্যা শুরু করল, ভগবান বুদ্ধ তো বিম্বিসারের আগে মারা গেছিলেন, তাই স্বর্গ থেকে নেমে এলেন। “তুই এত জানিস? তোকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার পাপ হবে। তুই যা।”

যেহেতু স্কুলের লাগোয়া বাড়ি হল বেলতলা থানা। সুতরাং তার ভিতর দিয়ে, পাঁচিল ডিঙিয়ে যাতায়াত করাটা একটা নিয়মের মধ্যেই পড়ত। আর স্কুল পালানোর রুটও ওটাই ছিল। ‘আমরা পিছনের জানালা থেকে কার্নিশে নেমে, সেখান থেকে পাঁচিল পেরিয়ে পালিয়ে যেতাম, আর সেই কাজে আমাদের সঙ্গী হত থানার বড়বাবুর ছেলে পুষ্পেন, সেও পড়ত আমাদের ক্লাসে!’ স্মৃতির ঝাঁপি হাতড়ে বললেন নীলাঞ্জন রায়।

১৯৭৭ ব্যাচের সুগত সিংহের মহার্ঘ রচনা ‘প্যান্ডোরার স্কুল বক্স’ খুললে পাওয়া যায় তাঁদের স্কুল জীবনের নানা ধরনের কীর্তিকাহিনি, যা প্রায় পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়স নিয়ে এখনও তরতাজা। খানিক স্বাদ নেওয়া যাক।

‘বাংলার ভাইভা। অমরবাবু ‘পূজারিণী’ কবিতা থেকে অতনুকে আট লাইন মুখস্থ বলতে বললেন। অতনু শুরু করল।—

“নৃপতি বিম্বিসার
নামিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইল
পদনখকণা তাঁর…”

“নামিয়া মানে? কে নেমে এলো?”

“ভগবান বুদ্ধ স্যার”

Ballygunge Govt High School
বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ধীরে ধীরে এসে দাঁড়িয়েছে আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায়

“কোথা থেকে নেমে এলেন?”

“উপর থেকে।”

স্যার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। এবার অতনু ব্যাখ্যা শুরু করল, ভগবান বুদ্ধ তো বিম্বিসারের আগে মারা গেছিলেন, তাই স্বর্গ থেকে নেমে এলেন।

“তুই এত জানিস? তোকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার পাপ হবে। তুই যা।”

বেলতলার বাঙালিয়ানার ভোল বদলে গেলেও আজও কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে, স্কুলের দারোয়ান রামশরণের ঘণ্টার শব্দ অথবা বিমলদা, হীরালালদা বা জোসেফের বাসের হর্ন অথবা এক নিমেষে দেখা যাবে গেটের বাইরে কাল্লু মাস্তান শরবতওয়ালাকে, যাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো তৃষ্ণার্ত ঘামে ভেজা শরীর।

এই ভাবেই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ধীরে ধীরে এসে দাঁড়িয়েছে আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায়, যার স্মৃতি বিছানো পথে পথে রয়ে গেছে বহু শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী এবং ছাত্রদের কথা। স্কুল বাড়ি যেমনটা ছিল তার থেকে সে হয়তো খানিক বেড়েছে কলেবরে, কিন্তু রয়ে গেছে সেই গেটের পাশে বেদি বাঁধানো বটগাছ, সবুজে ভরা খেলার মাঠ আর বিশাল হল ঘর।

বেলতলার বাঙালিয়ানার ভোল বদলে গেলেও আজও কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে, স্কুলের দারোয়ান রামশরণের ঘণ্টার শব্দ অথবা বিমলদা, হীরালালদা বা জোসেফের বাসের হর্ন অথবা এক নিমেষে দেখা যাবে গেটের বাইরে কাল্লু মাস্তান শরবতওয়ালাকে, যাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো তৃষ্ণার্ত ঘামে ভেজা শরীর।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Author Saptarshi Roy Bardhan

সপ্তর্ষি রায় বর্ধনের জন্ম, কর্ম এবং বর্তমান ঠাঁই তার প্রাণের শহর কলকাতায়। প্রথাগত ছাত্রজীবন কেটেছে কলকাতার পাঠভবন স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। লেখাজোকা, ছবি তোলা, নাট্যাভিনয় আর হেরিটেজের সুলুক সন্ধানের নেশায় মশগুল। সঙ্গে বই পড়া, গান বাজনা শোনা আর আকাশ পাতাল ভাবনার অদম্য বাসনা। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন- "রূপকথার মতো- স্মৃতিকথায় প্রণতি রায়", "খেয়ালের খেরোখাতা" এবং "চব্য চোষ্য লেহ্য পেয়"।

Picture of সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

সপ্তর্ষি রায় বর্ধনের জন্ম, কর্ম এবং বর্তমান ঠাঁই তার প্রাণের শহর কলকাতায়। প্রথাগত ছাত্রজীবন কেটেছে কলকাতার পাঠভবন স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। লেখাজোকা, ছবি তোলা, নাট্যাভিনয় আর হেরিটেজের সুলুক সন্ধানের নেশায় মশগুল। সঙ্গে বই পড়া, গান বাজনা শোনা আর আকাশ পাতাল ভাবনার অদম্য বাসনা। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন- "রূপকথার মতো- স্মৃতিকথায় প্রণতি রায়", "খেয়ালের খেরোখাতা" এবং "চব্য চোষ্য লেহ্য পেয়"।
Picture of সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

সপ্তর্ষি রায় বর্ধনের জন্ম, কর্ম এবং বর্তমান ঠাঁই তার প্রাণের শহর কলকাতায়। প্রথাগত ছাত্রজীবন কেটেছে কলকাতার পাঠভবন স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে। লেখাজোকা, ছবি তোলা, নাট্যাভিনয় আর হেরিটেজের সুলুক সন্ধানের নেশায় মশগুল। সঙ্গে বই পড়া, গান বাজনা শোনা আর আকাশ পাতাল ভাবনার অদম্য বাসনা। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন- "রূপকথার মতো- স্মৃতিকথায় প্রণতি রায়", "খেয়ালের খেরোখাতা" এবং "চব্য চোষ্য লেহ্য পেয়"।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

বিতস্তা ঘোষাল
জীবনানন্দ দাশ

সংস্কৃতি

আহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
অমৃতা ভট্টাচার্য
শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায়

বিহার

সুমিত্রা দেবনাথ
কাকলি মজুমদার
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

কলমকারী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী
অরিজিৎ মৈত্র
অনির্বাণ ভট্টাচার্য

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com