(Eli Cohen)
এলেম নতুন দেশে
১৯৬০ সালের এক ডিসেম্বরের রোদ ঝলমলে সকালে মিনিস্ত্রো পিস্তারিনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে বুয়েনস এয়ার্সে পা দিতেই, ফেলে আসা আলেকজান্দ্রিয়াকে মনে পড়ে গেল এলির। দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গ্রীষ্মকাল। ইউরোপ আর সমুদ্রের সেই লোনা গন্ধ, শহরময় কেমন যেন রোস্টেড কফি আর কাবাবের সুবাস, দূর থেকে ভেসে আসা কাফের তুমুল হৈ-হুল্লোড়, হাসির শব্দ। পশ্চিম এশিয়ার অনেক শহরের মতো দমবন্ধ করা পরিবেশ নয়। একদম তাঁর প্রিয় আলেকজান্দ্রিয়া যেন। প্রথম দর্শনেই লা প্লাতা নদীর মোহনায়, চারশো বছর পুরনো ইউরোপীয় স্থাপত্যের, স্প্যানিশ মহানগরীর প্রেমে পড়ে গেলেন এলি।
রাজধানী বুয়েনস এয়ার্সের থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে, ১৯৪৯ সালে গড়ে উঠেছে মিনিস্ত্রো পিস্তারিনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আকাশপথে বহির্বিশ্বের সঙ্গে এই লাতিন আমেরিকান দেশটির যোগাযোগের প্রাণভোমরা হল মিনিস্ত্রো পিস্তারিনি। কিন্তু ওইসব কচকচির দিকে এলির মন ছিল না। তাঁর মন তখন বুয়েনস এয়ার্সের প্রেমে বিভোর।
আরও পড়ুন – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯)
আপাতত এলি তাঁর প্রাথমিক বিহ্বলতা নিয়ে মগ্ন থাকুন, আমরা বরং তাঁর আর্জেন্টিনা আসার প্রেক্ষাপটটা দেখে নিই।
মোসাদের পরিকল্পনা
মোসাদ যখন থেকে ঠিক করে, সিরিয়ার হাঁড়ির হাল জানতে তার অন্দরে এলিকে ঢোকাবে, তখন থেকেই ধাপে ধাপে পরিকল্পনা করা শুরু হয়। প্রথম ধাপ হল, এলি কোহেনের জন্য এক নতুন সিরীয় পরিচয় তৈরি করা। কারণ এলি স্বনামে সিরিয়া গেলে সেদেশের পুলিশ সহজেই ধরে ফেলবে। তাই সিরীয় ব্যবসায়ী কামেল আমিন থাবেতের ভেক ধরা, এলিকে শিখিয়ে পড়িয়ে পাক্কা সিরীয় করে তোলা।
শুধু তাই নয়, থাবেত হলেন সম্পন্ন ব্যবসায়ী। তাঁর চালচলন, বেশভূষার সঙ্গে মধ্যবিত্ত এলির আশমান-জমিন ফারাক। থাবেতকে অনুষ্ঠানের ধরন অনুসারে পোশাক পরতে হবে। কোন পার্টিতে থ্রি পিস স্যুট, কোন পার্টিতে নেকটাই পরা হয়, তা জানতে হবে। সেই সব স্যুটের কাপড় হবে এমন দামি যে, পার্টিতে কামেল আমিন থাবেত এলেই বোঝা যায়, কেউ এসেছে। এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দামি ফরাসি পারফিউম।

দ্বিতীয় ধাপ হল, ঘুরপথে এলিকে সিরিয়ায় ঢোকানো। ইজরায়েল থেকে কামেল আমিন থাবেত সরাসরি সিরিয়াতে ঢুকলে সহজেই সিরীয় গুপ্তচর সংস্থা জিয়াজ অল-মুখবরাত অল-আম্মার নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই ঠিক হল এলিকে রোম হয়ে আর্জেন্টিনা পাঠানো হবে। মোসাদের পরিকল্পনা হল, নতুন পরিচয়ে এলি বুয়েনস এয়ার্সে থাকা শুরু করলে, ক্লাব, কাফেতে ওখানকার সিরীয়দের সঙ্গে পরিচিত হবে। ফলে সেইসব পরিচয় যেমন পরে কাজে লাগবে, তেমনই কামেল আমিন থাবেতের যে অস্তিত্ব আছে, সেটাও সহজে প্রমাণ করা যাবে। পরে কোনও কাটাছেঁড়া হলে, কামেল আমিন থাবেতের অস্তিত্বের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে অনেকে থাকবেন।
এই দ্বিতীয় ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, মোসাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রশিক্ষণের একটি পর্ব। বুয়েনস এয়ার্সে শুধু খবর জোগাড়েই এলির কাজ শেষ নয়, সেই খবর পাঠাতে হবে মোসাদের কাছে। তার জন্য মোসাদের স্থানীয় এজেন্টদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এমনভাবে, যাতে কেউ সন্দেহ না করতে পারে। প্রয়োজন হলে সাংকেতিক ভাষায় চিঠি লিখতে বা টেলিগ্রাম করতেও হতে পারে। অর্থাৎ, দামাস্কাসে চূড়ান্ত মিশনে যাওয়ার আগে বুয়েনস এয়ার্স হল এলির হাতে কলমে পাক্কা এজেন্ট হওয়ার পাঠ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ১৯৬০-এর আর্জেন্টিনা আদতে মিনি ইউরোপের আকার নিয়েছে। সবাই কোনও না কোনও কারণে দেশছাড়া। ফলে থাবেতের মতো কারওর বুয়েনস এয়ার্সে আসার মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই।
হঠাৎ এত দেশ থাকতে সুদূর আর্জেন্টিনা কেন? আসলে সিরীয়দের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার এই স্প্যানিশ দেশটির অন্য টান আছে। ইতিহাস বলে, ১৮৬০ সাল থেকে অটোমান অত্যাচারের জেরে আর উন্নত ভবিষ্যতের খোঁজে, হাজার হাজার সিরীয় আর লেবানিজ খ্রিস্টান দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, উরুগুয়ে আর আর্জেন্টিনায় আশ্রয় নেয়।
এই ঘটনার একশো বছর পর যখন এলি আর্জেন্টিনায় পা রাখলেন, তখন রাজধানীর দক্ষিণ ও মধ্যভাগের ওয়ান্স, ফ্লোরেস, ভিল্লা ক্রেসপো, সান ক্রিস্তোবাল, বারাকাসের মতো জায়গা সিরীয় ও লেবানিজে ভর্তি। এছাড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ১৯৬০-এর আর্জেন্টিনা আদতে মিনি ইউরোপের আকার নিয়েছে। সবাই কোনও না কোনও কারণে দেশছাড়া। ফলে থাবেতের মতো কারওর বুয়েনস এয়ার্সে আসার মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই।
এবার হাতে কলমে রূপায়ণ
মোসাদের পরিকল্পনামাফিক এলি সব দেখেশুনে ওয়ান্সে সিরীয় মহল্লায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। খানদানি রইসরা যেমন করে ফ্ল্যাট সাজায়, তেমন করে তাঁর আবাস হল। আসবাবপত্রের বাহুল্য নেই, কিন্তু যা আছে তা গৃহস্বামীর রুচির পরিচয় দেয়। ঘরে পার্সিয়ান কার্পেট, দেওয়ালে দামি তৈলচিত্র। ফোনোগ্রাফে আরবি আর পশ্চিমী বাদ্যসঙ্গীতের রেকর্ড মৃদুস্বরে বাজে। পড়শিরা লোকটার চলনেবলনে বুঝল যে, অর্থবান মানুষটার কোনও দেখনদারি নেই। বস্তুত, বুয়েনস এয়ার্স এদেরই চায়।
এলির ফ্ল্যাটের কাছেই সিরীয়দের অভিজাত ক্লাব। রয়েছে বেশ কয়েকটা কাফে, যেখানে সিরীয় আর লেবানিজদের নিত্য আনাগোনা। এলির মোসাদ হ্যান্ডলার ডেভিড লেভি তাঁকে পইপই করে বলে দিয়েছে, ‘বুয়েনস এয়ার্স হল খিচুড়ির মতো। নানা দেশের, নানা ধর্মের ও পেশার লোকজন অবাধে মেলামেশা করে। তুমিও এতে মিশে যাও। নিজেকে ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিপন্ন করাও। তাহলেই আসল খবর জোগাড় করতে পারবে।’
এলিকে পাক্কা ব্যবসায়ী হিসাবে তৈরি করা হয়েছে। শেখানো হয়েছে আমদানি-রফতানি ব্যবসার নানা পরিভাষা।
কীরকম ব্যবসায়ী? পুরনো ডায়েরিটা খুলে আরেকবার ঝালিয়ে নিলেন এলি। সিরীয় ব্যবসায়ী কামেল আমিন থাবেতের মূল ব্যবসা পশ্চিম এশিয়ার পণ্য বহির্বিশ্বে রফতানি করা। সেই কথা মাথায় রেখেই বুয়েনস এয়ার্সের বিজনেস ডিস্ট্রিক্টে অফিস পর্যন্ত নিয়েছেন। কামেল আমিন থাবেতের পরিচয়ের প্রেক্ষাপট নিশ্ছিদ্র করতে মোসাদ ভুয়ো আমদানি-রফতানির কাগজ ও অন্যান্য নথি তৈরি করেছে।
এলিকে পাক্কা ব্যবসায়ী হিসাবে তৈরি করা হয়েছে। শেখানো হয়েছে আমদানি-রফতানি ব্যবসার নানা পরিভাষা। কাস্টমস থেকে নিজের মাল খালাস করার পাশাপাশি ব্যবসার হাজারও খুঁটিনাটি শেখানো হয়েছে, যাতে স্বচ্ছন্দে এসব নিয়ে তর্কাতর্কি করতে পারেন। (Eli Cohen)
এবার সময় কামেল আমিন থাবেতের জনসমক্ষে আসার।

আর সেই কাজ এলি শুরু করলেন সিরীয় রেস্তোরাঁ অল-হাকায়তির ভারি মেহগনি কাঠের দরজা ঠেলে ঢুকে। স্থানীয় সিরীয়দের আড্ডা আর খানাপিনার অত্যন্ত জনপ্রিয় রেস্তোঁরা এই অল-হাকায়তি। চারিদিকে ম-ম করছে চেনা সিরীয় রান্নার মশলার গন্ধে। দেওয়ালে সিরিয়ার স্থাপত্যের ছবি। উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক, গমগম করছে হাসি আর গল্পের মৌতাতে। ঠিক যেন ছোট্ট সিরিয়া। (Eli Cohen)
রেস্তোরাঁর মালিক রশিদের সব খদ্দেরই পরিচিত। তাই অচেনা এলিকে দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে সে নবাগত। হাসিমুখে এলিকে স্বাগত জানিয়ে রশিদ বলল, ‘আপনাকে আগে তো দেখিনি। এ তল্লাটে নতুন বুঝি?’ (Eli Cohen)
এলির টেবিলে আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগল সিরিয়া থেকে চলে আসা মানুষরা। নতুন দেশে এসে নতুন ব্যবসা দাঁড় করাতে যে কষ্ট, পরিশ্রম ও যন্ত্রণা, তার বিবরণ মেলে ধরতে লাগল এলির সামনে। মাস দুয়েক এভাবেই কাটল।
স্মিত হেসে ছদ্মবেশী এলি বললেন, ‘তল্লাট না। এ দেশেই নতুন। ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে। শুনলাম আপনার এখানে আমার দেশওয়ালিদের জবরদস্ত আড্ডা হয়। সেই আড্ডার লোভে চলে এলাম।’ (Eli Cohen)
রশিদ কথাটা শুনে যে ব্যাপক খুশি হল, তা সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণে বোঝা গেল। ‘আরে আসুন আসুন। আপনি একদম ঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন। প্রচুর বন্ধুবান্ধব পেয়ে যাবেন।’
বলতে বলতে এলির হাত ধরে একটা ফাঁকা টেবিলে বসালেন রশিদ। তাঁর ইশারায় এলির টেবিলে চলে এল পশ্চিম এশিয়ার তুমুল জনপ্রিয় খাবার ফালাফেল আর মিন্ট চা।
রশিদ যে ভুল বলেননি, তা একটু পরেই এলি বুঝলেন। এলির টেবিলে আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগল সিরিয়া থেকে চলে আসা মানুষরা। নতুন দেশে এসে নতুন ব্যবসা দাঁড় করাতে যে কষ্ট, পরিশ্রম ও যন্ত্রণা, তার বিবরণ মেলে ধরতে লাগল এলির সামনে। মাস দুয়েক এভাবেই কাটল। এই সময়ে এলি যত না বললেন, শুনলেন তার ঢের বেশি। এলি জানলেন, কোন সিরীয় জেনারেলের সঙ্গে কোন সিরীয় ব্যবসায়ীর দহরম মহরম রয়েছে, কোন সিরীয় ব্যবসায়ী আবার তলে তলে মিশরীয়দের সাহায্য করে, কোন চোরাকারবারি আবার সীমান্তে মাল পাচার করে এসে পেটে দু’পাত্তর পড়তেই সব বলে দিচ্ছে। (Eli Cohen)
টালমাটাল সিরিয়া
সিরিয়াতে তখন চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা। ১৯৫৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি মিশরের প্রেসিডেন্ট গামেল নাসের সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট শুকরি অল-কোয়াতিলের সঙ্গে চুক্তি করে মিশর আর সিরিয়ার মধ্যে এক কনফেডারেশন গঠন করেন। নাম হয় অল-জামুরিয়াত অল-আরবিয়া অল-মুত্তাহিদা বা ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক বা সংক্ষেপে ইউএআর। (Eli Cohen)
শেষমেশ ১৯৬১-র মাঝামাঝি পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাল যখন, নাসের সিরিয়ার সব প্রাদেশিক সরকারকে বরখাস্ত করে নিজের হাতে ক্ষমতা নিলেন।
কিন্তু সিরীয়রা সবিস্ময়ে দেখল যে, নামেই কনফেডারেশন, আদতে সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াচ্ছে কায়রো। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামরিক, সবক্ষেত্রেই তারা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতির চাপে সিরিয়া ক্রমশ মিশরের অধীনস্থ হয়ে পড়ছে। স্বাধীনভাবে সিরিয়ার পক্ষে কথা বলাই দুরূহ হয়ে উঠছে। সিরিয়ার রাজনৈতিক মূল ধারায় থাকা বাথ পার্টি, বামপন্থী বা ইসলামী দলগুলিও অপাঙক্তেয় হতে শুরু করল। ফলে এই কনফেডারেশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে লাগল। সেনাবাহিনীতেও মিশরীয়রা এসে উচ্চপদে বসতে থাকল। সিরীয় সেনাও ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। (Eli Cohen)

শেষমেশ ১৯৬১-র মাঝামাঝি পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাল যখন, নাসের সিরিয়ার সব প্রাদেশিক সরকারকে বরখাস্ত করে নিজের হাতে ক্ষমতা নিলেন। ওই বছরের ২৮শে সেপ্টেম্বর লেফটেনেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নহলাহির নেতৃত্বাধীন সেনা অভুত্থানে (যাদের পরবর্তীকালে অল-শয়ম রূপে পরিচিত করা হয়, যার অর্থ অল-শয়মের মানুষ। এখানে অল-শয়ম বলতে বৃহত্তর সিরিয়াও বোঝায়, যার মধ্যে প্যালেস্তাইন, জর্ডন, লেবানন আর দক্ষিণ তুরস্ক পড়ে। আবার, অল-শয়ম বলতে দামাস্কাসের মানুষও বলা যায়, কারণ সিরীয় রাজধানীর স্থানীয় নাম অল-শয়ম) কায়রোপন্থী সব সেনা অফিসার ও প্রশাসনিক কর্তাকে বন্দী করে ফেলা হয়। (Eli Cohen)
সিরিয়া তারপর মিশরের সঙ্গে কনফেডারেশন থেকে বেরিয়ে আসে। বহু বছর বাদে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত আব্দুল করিম অল-নহলাহি তাঁর অভুত্থানকে সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘সিরিয়ার মানুষ তো সোনার থালায় করে তাদের দেশ নাসেরকে উপহার দিয়েছিল। নিজের অপদার্থতার কারণে নাসের তা ধরে রাখতে পারেনি। সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব বাঁচানোর জন্যই অভুত্থান দরকার ছিল।’ (Eli Cohen)
বুয়েনস এয়ার্সে এলির থাকার সময়কাল ছিল ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর থেকে, ১৯৬১ সালের আগস্ট মাস। অর্থাৎ দামাস্কাস অভুত্থানের সলতে পাকানোর সময়টাই আর্জেন্টিনার রাজধানীতে ছদ্মপরিচয়ে কাটিয়েছেন এলি। এক্ষেত্রে রশিদের রেস্তোরাঁ তাঁর পরিচিতি বাড়ানোর মঞ্চ হয়ে উঠল। যত দিন যেতে লাগল, তত বেশি বন্ধুবান্ধব জুটতে লাগল। (Eli Cohen)
সুদর্শন এই যুবার রুচি, রসবোধ, চৌম্বকীয় ব্যক্তিত্ব তাঁকে যে কোনও পার্টির শো স্টপার করে তুলল। অচিরে শহরের সিরীয়দের মধ্যে কামেল আমিন থাবেতের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হল।
হিউম্যান নেটওয়ার্ক
এই সময় রশিদ ছাড়াও সমির নামেও আরেকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু হল এলির। কিছুদিন পরেই এলি বুঝলেন, সমিরের সঙ্গে সিরীয় সামরিক বাহিনীর উঁচু মহলে চেনাশোনা আছে। কথায় কথায় মাঝে মধ্যেই সমির সিরীয় সেনার মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষের কথা বলত। মিশরীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দামাস্কাসের সেনা অফিসারদের তলে তলে বিদ্রোহের প্রস্তুতির কথাও বলত। এই সব তথ্য জানার ফাঁকে এলিও ধীরে ধীরে একটা সারসত্য বুঝতে শুরু করলেন। তা হল, বিশ্বাস আর আস্থা অর্জন করলেই একমাত্র সঠিক তথ্যের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। (Eli Cohen)
রশিদের রেস্তোরাঁ ছাড়াও ক্রমে অভিজাত সিরীয় লেবানিজ ক্লাবের দরজা খুলে গেল কামেল আমিন থাবেতের জন্য। আমন্ত্রণ ছাড়া এই ক্লাবের সদস্য হওয়া যায় না। সেই আমন্ত্রণ জুটিয়ে ক্লাবের সদস্য হতে বেশি সময় লাগল না এলির। অচিরেই ক্লাবের মূল আড্ডার জায়গা, বারে তার জন্য চেয়ারও নির্দিষ্ট হয়ে গেল। ক্লাবে শহরের কেষ্টবিষ্টুরা হাজির। সেখানে শুধু বুয়েনস এয়ার্স নয়, দামাস্কাস, বেইরুটের টাটকা খবর উপচে পড়ছে। (Eli Cohen)

তবে আস্থা আর বিশ্বাস অর্জনের জন্য শুধু কাফে আর রেস্তোরাঁয় গেলে হবে না। আরও অন্তরঙ্গভাবে মিশতে হবে। তাই বুয়েনস এয়ার্সের নামজাদা সিরীয়দের অভিজাত পার্টিতে নিয়মিত দেখা যেতে লাগল দীর্ঘকায় দোহারা চেহারার এলিকে। এলি নিজেও গোটা কয়েক পার্টি দিলেন। সুদর্শন এই যুবার রুচি, রসবোধ, চৌম্বকীয় ব্যক্তিত্ব তাঁকে যে কোনও পার্টির শো স্টপার করে তুলল। অচিরে শহরের সিরীয়দের মধ্যে কামেল আমিন থাবেতের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হল। গুপ্তচরের আলো-আঁধারি দুনিয়ার পরিভাষায় এই ধরনের জনসংযোগকে হিউম্যান নেটওয়ার্কিং বলে। (Eli Cohen)
বস্তুত, বুয়েনস এয়ার্সে এলি যে ধরনের হিউম্যান নেটওয়ার্কিং করে দেখালেন, তা পরবর্তীকালে মোসাদ তার প্রশিক্ষণ সিলেবাসে শিক্ষণীয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রভাব বিস্তারের জন্য এলি কোনও তাড়াহুড়ো করেননি। বরং যা করেছেন, তা ধীরে ধীরে। যেমন কোনও ব্যবসায়ীর মাল বন্দরে আটকে গিয়েছে। থাবেতের এক ফোনে তার সমাধান হয়ে গেল। এক সিনিয়র সিরীয় কূটনীতিকের স্ত্রীয়ের ফরাসী পারফিউম বড় পছন্দ। কামেল আমিন থাবেতের বন্ধু আছে তো প্যারিসে। অতলান্তিক পেরিয়ে বুয়েনস এয়ার্সে চলে এল পারফিউম। এলি কারোর সঙ্গে আলাপ জমানোর আগে তাঁর ঠিকুজি কুষ্টি জেনে নিতেন। তাই প্রাথমিক আলাপের পর হয়তো কাউকে বলে বসলেন, ‘আরে বেইরুটে আপনি জর্ডনিগুলোকে যেভাবে সামলেছিলেন, তা তো ওখানে এখন লোকের মুখে মুখে।’ স্বাভাবিকভাবেই যাঁকে বলা, সে তো গদগদ। (Eli Cohen)
অতিথি অভ্যাগতদের তালিকায় এমন সব ব্যবসায়ী আর সামরিক অফিসাররা থাকেন, যাঁদের সঙ্গে দামাস্কাসের নিবিড় সম্পর্ক। অতিথিরা রুচিশীল ফ্ল্যাটে এসে চমৎকৃত হন।
আবার কোনও লাইব্রেরির বুকশেলফ দরকার। থাবেতের চেক বই আছে তো! মেধাবী দুঃস্থ পড়ুয়াদের তহবিল গড়ার কাজেও কামেল আমিন থাবেত হাজির। মাঝে মধ্যেই থাবেতের ফ্ল্যাটে পার্টি হয়। অতিথি অভ্যাগতদের তালিকায় এমন সব ব্যবসায়ী আর সামরিক অফিসাররা থাকেন, যাঁদের সঙ্গে দামাস্কাসের নিবিড় সম্পর্ক। অতিথিরা রুচিশীল ফ্ল্যাটে এসে চমৎকৃত হন। ফরাসি, ইংরাজি, আরবি বইয়ের সম্ভার দেখে থাবেত যে বহু ভাষাবিদ, তা বুঝতে তাদের অসুবিধা হয় না। ডিনার টেবিলে পর্যাপ্ত আয়োজন ছাপিয়েও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে আড্ডা। (Eli Cohen)
বুয়েনস এয়ার্সের সিরীয় লেবানিজ সমাজে সবাই মোটামুটি সবাইকে চেনে। তাই বেশি সময় লাগল না, এমন পরোপকারী দিলদার কামেল আমিন থাবেতের নাম ছড়াতে। থাবেত যে ভবিষ্যতে বড় কেউ হবেন, তা নিয়ে সবাই একপ্রকার নিশ্চিত। মোসাদ ঠিক এটাই চেয়েছিল। এক ছায়া মানুষ যেন কল্পিত কায়া পায়।(Eli Cohen)
অতিথিরা রুচিশীল ফ্ল্যাটে এসে চমৎকৃত হন। ফরাসি, ইংরাজি, আরবি বইয়ের সম্ভার দেখে থাবেত যে বহু ভাষাবিদ, তা বুঝতে তাদের অসুবিধা হয় না।
তবে এলির হিউম্যান নেটওয়ার্কিংয়ের সাফল্যের শীর্ষবিন্দু আমিন অল-হাফিজ। তৎকালীন সিরীয় প্রেসিডেন্ট নাজিম অল-কুদসির প্রশাসন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে মেজর হাফিজকে বুয়েনস এয়ার্সের সিরীয় দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাচে করে পাঠান। দূতাবাসের এক পার্টিতে হাফিজের সঙ্গে দেখা হল কামেল আমিন থাবেতের।
‘সিরিয়ার সমস্যা কী জানেন? তার সৎ, পরিশ্রমী, নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য মানুষরা দেশের বাইরে।’ এই মন্তব্যের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। কামেল আমিন থাবেতের বন্ধু হয়ে গেলেন হাফিজ। ১৯৬৩-এর জুলাই মাসে হাফিজের বন্ধুদের সামরিক অভুত্থানে কুদসি সরকারের পতন হয়। দেশে ফিরে হাফিজ সিরিয়ার পঞ্চদশ প্রেসিডেন্ট হন। পরবর্তীকালে যখন এলি সিরিয়ায় যান, তখন সামরিক ও প্রশাসনিক অনেক দরজাই খুলে যায় প্রেসিডেন্টের বন্ধু হওয়ার সুবাদে। (Eli Cohen)
গোপনে শহরের সেফ হাউসে মোসাদ এজেন্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আবার অনেকসময় এমনভাবে চিঠি লিখে খবর জানানো হয় যে, মোসাদ ছাড়া কেউ ধরতেই পারে না তার আসল অর্থ।
এরই পাশাপাশি সমান তালে চলল এইসব পার্টির আনাচকানাচের পিএনপিসি-র থেকে খবর নামক মুক্ত সংগ্রহ ও স্থানীয় মোসাদ এজেন্টদের সঙ্গে দেখা করে সেটা দেওয়া। গোপনে শহরের সেফ হাউসে মোসাদ এজেন্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আবার অনেকসময় এমনভাবে চিঠি লিখে খবর জানানো হয় যে, মোসাদ ছাড়া কেউ ধরতেই পারে না তার আসল অর্থ। এ ছাড়া অদৃশ্য কালিতে চিঠি লেখা তো আছেই। (Eli Cohen)

মোসাদকে পাঠানো সেইসব চিঠিতে বিশদে থাকত বুয়েনস এয়ার্সের সঙ্গে দামাস্কাস আর বেইরুটের আসল নেটওয়ার্কের কাহিনি। কোন কেষ্টবিষ্টুর টিঁকি কোথায় বাঁধা। ফলে, কাকে কতটা বিশ্বাস করা যাবে মোসাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
প্রথম দিকে এলির দেওয়া খবর তেমন গুরুত্ব দিত না মোসাদ। কিন্তু সিরিয়ার ভিতরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির সঙ্গে যখন আগে থেকে এলির বলে দেওয়া বয়ান মিলতে শুরু করল, তখন মোসাদ বাধ্য হল দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে। পরে দেখা গিয়েছে, ১৯৬১-এর সেনা অভুত্থান নিয়ে এলির সংবাদের উপরই মোসাদ প্রধানত নির্ভর করেছে। তৎকালীন সিরিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক অন্দরমহলের অনেকটাই এলি তাঁর হিউম্যান নেটওয়ার্ক দিয়ে উন্মোচিত করে ফেলেছিলেন, পরে যার ফসল মোসাদ তুলেছিল। সেই অর্থে আর্জেন্টিনার পরীক্ষায় এলি প্রবলভাবে সফল। (Eli Cohen)
১৯৬১-এর টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থায় কয়েক হাজার মাইল দূরে বুয়েনস এয়ার্সে থাকা সিরীয়রা অস্থির হয়ে উঠল। অনেকেই এলিকে অনুরোধ করছিল, দেশের এই ক্রান্তিকালে সিরিয়াতে ফিরে গিয়ে সাহায্য করতে। এলিও ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। তাই প্রথমে না-না করলেও পরে রাজি হয়ে গেলেন। স্থানীয় সিরীয়রা মহা ধুমধাম করে এলিকে বিদায় সম্বর্ধনা দিল। পরদিন বুয়েনস এয়ার্সের কাগজে বড় বড় করে বেরলো— ‘বিখ্যাত ব্যবসায়ী দামাস্কাস যাচ্ছেন পুনর্গঠনে অংশ নিতে।’ (Eli Cohen)
মোসাদ এটাই চেয়েছিল। এলির ছায়া থেকে বেরিয়ে কামেল আমিন থাবেতের রূপ ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে।
কাস্টমস অফিসার হেসে বলল— বুয়েন ভিয়াকে, সেনর থাবেত অর্থাৎ আপনার যাত্রা শুভ হোক সেনর থাবেত। এলিও স্মিত হেসে জবাব দিলেন— গ্র্যাসিয়াস অ্যামিগো অর্থাৎ ধন্যবাদ বন্ধু।
বিদায়ের সকালে ফুলে ভরা পথে হাঁটলেন এলি। কেমন যেন মায়া পড়ে গিয়েছে এই সুন্দর শহরটার উপর। এলি বিদায়ও নিলেন সেই মিনিস্ত্রো পিস্তারিনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। কাস্টমস অফিসার হেসে বলল— বুয়েন ভিয়াকে, সেনর থাবেত অর্থাৎ আপনার যাত্রা শুভ হোক সেনর থাবেত। এলিও স্মিত হেসে জবাব দিলেন— গ্র্যাসিয়াস অ্যামিগো অর্থাৎ ধন্যবাদ বন্ধু। (Eli Cohen)
বিমান টেক অফ করেছে। নীচে লা প্লাতা নদীর জল রোদ্দুর পড়ে ইস্পাতের ফলা লাগছে।
এলি জানেন দূর দিগন্তের বুকে রয়েছে দামাস্কাস। তাঁর চূড়ান্ত মিশন। বুয়েনস এয়ার্সে তো নেট প্র্যাকটিস হল কেবল।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস- ইজরায়েল-আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে- এলি কোহেন-দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মূলত শিল্প বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাংবাদিকতায় ব্যপ্ত বিগত তিন দশক। তবে সুযোগ পেলে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়া বা অন্য ধরনের লেখাতে প্রাণের আরাম খোঁজার চেষ্টাও চলে
