(Swami Vivekananda)
নাম পড়েই চমকে উঠলেন নাকি? স্বামী বিবেকানন্দ ক্রিকেট খেলতেন?- এমনই কিছু ভাবছেন বোধহয়। তবে চমকের এখনও অনেক বাকি। আগে একটু গৌরচন্দ্রিকা করে নিই। (Swami Vivekananda)
খেলাধুলোর প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের বরাবর ঝোঁক ছিল। যে সময়ের কথা বলছি, তিনি তখন নেহাতই বালক। নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ডাকনাম বিলে। (Swami Vivekananda)
তাঁর জীবনীকার স্বামী গম্ভীরানন্দর লেখা থেকে জানা যায়, প্রবল মেধাবী হওয়ার কারণে, নরেন্দ্রনাথের খুব একটা বেশি পড়াশুনোর প্রয়োজন হত না। বালক বিলে বাকি সময় খেলাধুলোর মধ্যে ডুবে থাকতে চাইতেন। জলখাবারের পয়সা জমিয়ে ব্যাট-বল কিনতেন। এ হেন বিলে ভর্তি হলেন বিদ্যাসাগরের স্কুল মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে। (Swami Vivekananda)
আরও পড়ুন: রঞ্জু ভ্যালি, এক মনভোলানো অচিনগাঁও – প্রথম পর্ব
খেলাধুলো চলছিলই। বিশেষত ক্রিকেট। এখানে একটু খটকা লাগতে পারে। যিনি পরবর্তীকালে বলবেন, ‘ধর্মাচরণের পরিবর্তে ফুটবল খেলা ভালো’, তিনি হঠাৎ ক্রিকেটে মজলেন কেন? আসলে ফুটবলের আগেই বঙ্গদেশে ক্রিকেটের চল শুরু হয়েছিল। এই মওকায় একবার সেকালের কলকাত্তাইয়া ক্রিকেট পরিবেশ নিয়ে দু-চার কথা বলে নেওয়া দরকার। (Swami Vivekananda)
পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঝকঝকে সাহেব ছেলে-তরুণরা ভারতে আসতে শুরু করল রোজগারের ধান্দায়। কলকাতা তখন ক্যালকাটা। ভারতের রাজধানী। এখানেই কাজ, আমোদ আর শীতকালে ক্রিকেট। ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব সংক্ষেপে সিসিসি খোলা হল ১৭৯২ সালে। তারপর ডালহৌসি ক্লাব। গঙ্গার ধারে ইডেন গার্ডেনস মাঠটার মালিকানা নিল সিসিসি। খেলা চলত সেখানে। (Swami Vivekananda)

এদিকে বাঙালিরাও কম যায় না! তখন রীতিমতো নবজাগরণের ঢেউ উঠছে। সনাতন সব জীর্ণ আচার ছেড়ে যুক্তিতে বিচার করছে নব্য বাঙালি জাতি। রামমোহন সতীদাহ বন্ধ করেছেন শতকের প্রথম ভাগে। দ্বিতীয় ভাগের গোড়ায় বিদ্যাসাগর বিধবাদের পুনর্বিবাহ চালু করলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি আর গড়পারের রায়বাড়ি বঙ্গসমাজের দুই স্তম্ভ। এই রায়বাড়ির চার ভাই ক্রিকেট খেলেন। বড় ভাই সারদারঞ্জন রায় ভারতীয় ক্রিকেটের ডব্লিউ জি গ্রেস। বাকি ভাইদের মধ্যে মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন, প্রমোদারঞ্জনও ক্রিকেটার। এঁদেরই মেজো ভাই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। (Swami Vivekananda)
১৮৮৪ সালে সারদারঞ্জন রায় প্রতিষ্ঠা করলেন ক্যালকাটা টাউন ক্লাব। সেখানে খেলতে শুরু করলেন বঙ্গসন্তানরা।
১৮৮৪ সালে সারদারঞ্জন রায় প্রতিষ্ঠা করলেন ক্যালকাটা টাউন ক্লাব। সেখানে খেলতে শুরু করলেন বঙ্গসন্তানরা। ক্রিকেটের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রাম মিশে সে এক হৈহৈ কাণ্ড। (Swami Vivekananda)
বাঙালিদের মধ্যে ক্রিকেট খেলা দেখার ঝোঁকও বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প বলি। গল্পটি বাংলা রঞ্জি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক রাজু মুখার্জীর একটি বইয়ে পড়া। উনিশ শতকের শেষ দিকে অধিকাংশ বাঙালিদের ক্রিকেট দেখার প্রতি আকর্ষণের অন্য একটি কারণও ছিল। বাঙালির চিরন্তন ভালবাসা খাওয়াদাওয়া। এমনও নাকি স্লোগান ছিল- “খেলা দেখতে আসবেন। ভালো খাবারের ব্যবস্থাও আছে!” (Swami Vivekananda)
আরও পড়ুন: রঞ্জু ভ্যালি, এক মনভোলানো অচিনগাঁও – দ্বিতীয় পর্ব
টাউন ক্লাবে যোগ দিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। খেলা চলতে লাগল তরুণ বিলের। ১৮৮৪ সালেই ইডেন গার্ডেনসে খেলা পড়ল ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের সঙ্গে। (Swami Vivekananda)
‘লগান’ ছবির মতো মনে হচ্ছে? তাহলে বলি, এখানেও সাহেব বনাম ভারতীয় আবেগ ছিল। এবং ঠিক হয়েছিল, খেলা হবে পুরো ওভার আর্ম বল করে। টাউন ক্লাব রাজি হল। কিন্তু ঐভাবে বোলিং শেখাবেন কে? এগিয়ে এলেন ক্লাবেরই এক কর্মকর্তা, হেমবাবু। এখানে একটি নাম বিভ্রাট হয়। কিছু জায়গায় হেমেন্দ্রমোহন বসুর নাম বলা হয়ে থাকে। মানে যিনি ‘কুন্তলীন’ নামক মাথার তেল আবিষ্কার করেছিলেন, এবং প্রথম সাহিত্য পুরস্কার প্রদান চালু করেন। (Swami Vivekananda)
সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপন “কেশে দিন কুন্তলীন, ধন্য হোক হেমেন বোস”। কিন্তু তিনি সেই সময় টাউন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এক জায়গায় দেখলাম হেমচন্দ্র ঘোষের নাম বলা হচ্ছে, যিনি ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ নামক বিপ্লবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।
সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপন “কেশে দিন কুন্তলীন, ধন্য হোক হেমেন বোস”। কিন্তু তিনি সেই সময় টাউন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এক জায়গায় দেখলাম হেমচন্দ্র ঘোষের নাম বলা হচ্ছে, যিনি ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ নামক বিপ্লবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু হেমচন্দ্রের জন্ম ১৮৮৪ সালে। তাঁর পক্ষে বিবেকানন্দের কোচ হওয়া অসম্ভব। বিস্তর পুরোনো নথি এবং কাসুন্দি ঘেঁটে দেখলাম, জমিদার হেমেন্দ্রনাথ ঘোষ ছিলেন টাউন ক্লাবের কর্তা। তিনিই সেই সময় বাঙালি ছেলেদের হাত ঘুরিয়ে বোলিং শেখালেন। (Swami Vivekananda)

ইডেনে খেলা শুরু হল। দুর্দান্ত বল করলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ডান হাতে মিডিয়াম পেস বল। মাত্র কুড়ি রান দিয়ে তুলে নিলেন সাতটি উইকেট। ইডেন গার্ডেনসে রচিত হল দেশপ্রেমের এক নতুন অধ্যায়। (Swami Vivekananda)
স্বামী বিবেকানন্দের ক্রীড়াপ্রীতি তাঁর ভক্ত এবং শিষ্যদের মাধ্যমে ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়ে পরবর্তী প্রজন্মেও। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনে খেলাধুলোর চল রয়েছে। এস বেঙ্কটরাঘবন, ভিভি কুমার, লক্ষণ শিবরামকৃষ্ণন, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত, মুরলী বিজয়, লক্ষ্মীপতি বালাজী, হেমাঙ্গ বাদানী, অভিনব মুকুন্দ-রা কোনও না কোনওভাবে রামকৃষ্ণ মিশন বা বিবেকানন্দ কলেজের ছাত্র। (Swami Vivekananda)
দুঃখজনক বিষয়, নরেন্দ্রনাথ দত্তর সাত উইকেট নেওয়া ম্যাচটির স্কোরকার্ড হারিয়ে গিয়েছে। আসলে, তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে আমরা বাঙালিরা কোনওদিনই খুব একটা উৎসাহী নই।
দুঃখজনক বিষয়, নরেন্দ্রনাথ দত্তর সাত উইকেট নেওয়া ম্যাচটির স্কোরকার্ড হারিয়ে গিয়েছে। আসলে, তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে আমরা বাঙালিরা কোনওদিনই খুব একটা উৎসাহী নই। বহু স্কোরকার্ড হারিয়ে গিয়েছে। সাহেবদের সৌজন্যেই কিছু পুরনো স্কোরকার্ড পাওয়া যায়। (Swami Vivekananda)

হুগলি নদীর পশ্চিমে যখন সূর্য ঢলে পড়ে, সেই সময় কান পাতলে শোনা যায়, সুন্দরী ইডেন গার্ডেনস গল্প বলছে হুগলি নদীর কাছে। ক্রিকেট সেখানে মিলে যায় দেশপ্রেমের সঙ্গে।
মিলিয়েছিলেন, তিনি মিলিয়েছিলেন। (Swami Vivekananda)
তথ্যসূত্র:
১। যুগনায়ক বিবেকানন্দ- স্বামী গম্ভীরানন্দ
২। Eden Gardens: Legend & Romance- Raju Mukherjee
৩। বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ- শঙ্করীপ্রসাদ বসু
৪। দ্যা ট্রিবিউন
ছবি সৌজন্য: লেখক
পেশায় তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, নেশা বই-বেড়ানো-ছবি-ক্রিকেট। তবে আড্ডার অছিলায় বাকি সব কাজ শিকেয় তুলে রাখাই পছন্দ। প্রবল গেঁজুড়ে। ভালো লিকার চা সঙ্গে থাকলে আর কথা নেই। মাঝেমধ্যেই কীবোর্ড থেকে অবাধ্য আঙুল সফটওয়্যার আর্কিটেকচার অথবা এক্সেল শিট থেকে Alt + Tab মেরে চলে যায় লেখার পাতায়।
