(Eli Cohen 12)
অটো অ্যাডল্ফ আইখম্যানকে ভূমধ্যসাগর, অতলান্তিক মহাসাগর পার করে সুদূর লাতিন আমেরিকায় গিয়ে ধরা যেমন নাটকীয় ছিল, তার চেয়ে কিছু কম নাটকীয় ছিল না, এই নাৎসি যুদ্বাপরাধীর খোঁজ পাওয়া। কারণ আইখম্যানের মতো হাতে গোনা কয়েকজনকেই মাত্র বিদেশ থেকে ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করা গিয়েছিল। যুদ্ধের পরে জার্মান-অস্ট্রিয় সীমান্তে শেষ যখন আইখম্যানকে দেখা যায়, তখন তার সঙ্গে ছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদি বন্দীদের উপর নারকীয় পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো ডাক্তার জোসেফ মেঙ্গেলে। ‘ডক্টর ডেথ’ নামে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে মোসাদ কিন্তু ধরতে পারেনি। পরে শোনা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়েতে সে মারা গিয়েছে। আর আইখম্যানের খোঁজ পেতেও বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল দীর্ঘ আট বছর ধরে।
আরও এক দিক দিয়ে আইখম্যান পর্ব ছিল মোসাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যে মোসাদ চিফ, ইসার হারেল সিরিয়ার অন্দরমহলে পাঠাচ্ছেন এলি কোহেনকে, তিনি নিজেই বুয়েন্স এয়ার্স উড়ে গিয়েছিলেন গ্যারিবল্ডি স্ট্রিট থেকে আইখম্যানকে ধরার অপারেশন পরিচালনা করতে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আইখম্যান অপারেশনের পর কোহেনকে সফলভাবে সিরিয়ায় পাঠানো ছিল হারেলের টুপিতে সাফল্যের আরেক পালক।
এখন অবশ্য রয়েছে আইখম্যানের খোঁজ পাওয়ায় প্রাণান্তকর প্রয়াসের কিছু ঝলক।
শুরু হল এলি কোহেন দ্বাদশ পর্ব
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১)
আর্জেন্টিনায় নাৎসি স্বাগতম
১৯৫০ সালের ১৪ জুলাই সকালে যখন গিওভানা সি জাহাজ থেকে সবেধন নীলমণি একটা সুটকেস নিয়ে অটো অ্যাডল্ফ আইখম্যান বুয়েন্স এয়ার্সে পা রাখল, তখন তাঁর পরিচয় ৩৭ বছর বয়সি ইতালীয় রিকার্দো ক্লিমেন্ত, যে কাজের খোঁজে লাতিন আমেরিকায় পা রেখেছে। পকেটে মাত্র ৪৮৫ পেসো।
এইরকম কপর্দকহীন অবস্থায় কেউ নতুন দেশে পা রাখলে তার কপালে যে অশেষ দুর্গতি অপেক্ষা করে, তা তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু আইখম্যানকে বাঁচাল যুদ্ধের পরে জার্মানি থেকে সে দেশে পালিয়ে আসা নাৎসিরা।
নাৎসিদের এই আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যাওয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও সমীক্ষাও হয়েছে। তাতে এটা পরিষ্কার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আর্জেন্টিনায় সামরিক উর্দি পরা জেনারেলরা প্রেসিডেন্ট পদে বসেও অক্ষ শক্তির প্রতি যথেষ্ট নরম ছিলেন। আর এই পক্ষপাতিত্ব প্রকট হয় দেশের প্রেসিডেন্ট জুয়ান ডোমিঙ্গো পেরনের জমানায়। যুদ্ধে বার্লিন পতন সুদূর বুয়েন্স এয়ার্সে মোটেও কোনও আনন্দ বয়ে নিয়ে যায়নি। নামমাত্র অভিবাসন প্রক্রিয়ার পরে দেশের দরজা খুলে যেত বিদেশিদের জন্য।

আইখম্যান যখন আর্জেন্টিনায় পা রাখে তখন দেশের প্রেসিডেন্ট পেরন। বস্তুত পেরন ও তাঁর পরবর্তী শাসকদের নরম মনোভাবের জন্য আর্জেন্টিনা ইউরোপ থেকে পলাতক নাৎসি অফিসারদের প্রিয় গন্তব্যস্থল হয়ে ওঠে। একটা হিসাব বলছে প্রায় হাজার নয়েক নাৎসি অফিসার আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের চার বছরেই হাজার পাঁচেক নাৎসি অফিসার আর্জেটিনায় ঘাঁটি গাড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আর্জেন্টিনা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু এই ঘোষণার পিছনের আসল কারণ ফাঁস হয় ১৯৬৭ সালে পেরনের কথায়। দু’দফায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হওয়া পেরন বলেন, “কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও জার্মানির সঙ্গে ঠিকই সম্পর্ক বজায় ছিল। আদতে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে লাভ ছিল নাৎসিদের। কারণ যুদ্ধের শেষে শত্রু দেশে বিমান ও জাহাজ নিয়ে আর্জেন্টিনা ঢুকতে পারে। ফলে নাৎসিদের তা কাজে লাগে। আর্জেন্টাইন মার্চেন্ট এয়ার ফ্লিটের বিমান আর জাহাজে চেপে বহু নাৎসি আর্জেন্টিনা চলে আসতে পারে।”
১৯৪৪ সালে নাৎসিরা বুঝতে পারে হিটলারের গোয়ার্তুমিতে এই যু্দ্ধ জার্মানি হারতে চলেছে। তখন যে আতঙ্ক তাদের গ্রাস করে, তা হল ষাট লক্ষ ইহুদি হত্যার জন্য মিত্রপক্ষ তাদের ছেড়ে দেবে না। ধরতে পারলে ফায়ারিং স্কোয়াড হল নিশ্চিত পরিণাম।
১৯৬৯ সালে পেরন ফের পরিষ্কার করেন যে, জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা আদতে ছিল মিত্রপক্ষের চোখে ধুলো দেওয়া। যুদ্ধে আগাগোড়া নিরপেক্ষ থাকা বুয়েন্স এয়ার্স ওয়াশিংটনের প্রবল চাপে হিটলারের আত্মহত্যার মাসখানেক আগে নামকেওয়াস্তে মিত্রপক্ষে যোগ দেয়। এটা জার্মানিকে বেসরকারিভাবে বুঝিয়েও বলা হয়।
ওডেসার হাত
সরকারিভাবে অস্তিত্ব স্বীকার না করা হলেও যুদ্ধের পরে নাৎসিদের পালানো ও পুনর্বাসনে সাহায্য করার জন্য এক বিশাল গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। এই নেটওয়ার্কের মূল মাথা হিসাবে ওডেসা-এর নাম উঠে আসে। এ ব্যাপারে জার্মান কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফিরে আসা, লেখক ও নাৎসি হান্টার সাইমন উইজেনথালের ‘জাস্টিস নট ভেঞ্জেন্স’ আর লি সণ্ডার্সের ‘দ্য পাজল’ থেকে যা জানা যায় তা হল অনেকটা এই রকম— ১৯৪৪ সালে নাৎসিরা বুঝতে পারে হিটলারের গোয়ার্তুমিতে এই যু্দ্ধ জার্মানি হারতে চলেছে। তখন যে আতঙ্ক তাদের গ্রাস করে, তা হল ষাট লক্ষ ইহুদি হত্যার জন্য মিত্রপক্ষ তাদের ছেড়ে দেবে না। ধরতে পারলে ফায়ারিং স্কোয়াড হল নিশ্চিত পরিণাম।

শুধু তাই নয়, পড়শি দেশগুলোও ইহুদিদের থেকে লুঠ করা কয়েক লক্ষ কোটি ডলারের ধনসম্পদও মিত্রপক্ষের হাতে পড়বে। অর্থাৎ কোনও ব্যবস্থা না নিলে নাৎসিদের ধনপ্রাণ সবই যাবে।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালের ১০ অগস্ট স্ট্রসবার্গের মাইসন রুজ হোটেলে নাৎসি সমর্থক শিল্পপতি আর ব্যাঙ্কাররা এক গোপন বৈঠকে বসেন। নাৎসিদের পক্ষ থেকে বলা হয় যুদ্ধের পরে দলের প্রথম সারির নেতাদের যে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে বিচারের মুখোমুখি হতে পারে, তা দল জানে। তাই দ্বিতীয় সারির নেতাদের বিভিন্ন সংস্থায় ‘টেকনিক্যাল এক্সপার্ট’ হিসাবে যোগ দিতে বলা হচ্ছে। দল তার সমর্থক প্রত্যেক শিল্পপতিকে অর্থ দেবে, যাতে বিদেশে তারা সংস্থা খুলতে পারে। এতে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফের জার্মান রাইখ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।
এই বৈঠক থেকেই জন্ম নিল অর্গানাইজেশন ডার ইয়েমালিগান এসএস আনগোহোহেভেন (যার অর্থ প্রাক্তন এসএস সদস্যদের সংগঠন যার সংক্ষিপ্ত নাম ওডেসা) সংগঠন যে ভুয়ো কাগজপত্র তৈরি করে নাৎসি অফিসারদের শুধু বিদেশেই পালাতে সাহায্য করত না, তাদের নতুন নামে নতুন জীবন শুরু করতেও সাহায্য করত।
বিভিন্ন ক্যাথলিক চার্চ এই সময় এই সব পলাতক নাৎসি অপরাধীদের তাদের মঠে আত্মগোপন করতে দিত। এই ভাবে পর পর কয়েকটা চার্চে আত্মগোপন করে তারা ইতালিতে পৌঁছাত। জার্মানি-অস্ট্রিয়ার ব্রেনার সীমান্ত দিয়ে ঢুকে এই ‘ক্যাথলিক রুট’ অবলম্বন করেই ইতালির জেনোয়ায় পৌঁছায় আইখম্যান।
এবং এই সাহায্যও হত ওডেসার নানা শাখাপ্রশাখার মাধ্যমে অত্যন্ত সংগঠিতভাবে। যেমন ‘স্পাইডার’ সংগঠনের কাজ ছিল, নতুন নামে ভুয়ো পাসপোর্ট, ভিসা তৈরি করা, পালাতে উদ্যত এসএস অফিসারের জন্য সেফ হাউস ঠিক করা যেখানে আত্মগোপন করতে পারে। এমনকি পলাতককে নতুন দেশে নতুনভাবে জীবিকাও জোগাড় করে দিত স্পাইডার।
জার্মান-সুইজারল্যাণ্ড সীমান্ত মোটের উপর অরক্ষিতই ছিল। পলায়নপর এসএস অফিসাররা তাই এই সীমান্তই ব্যবহার করত। সুইজারল্যান্ডে পৌঁছিয়ে পলাতকরা ‘ক্যাথলিক রুটে’র সাহায্য নিত। বিভিন্ন ক্যাথলিক চার্চ এই সময় এই সব পলাতক নাৎসি অপরাধীদের তাদের মঠে আত্মগোপন করতে দিত। এই ভাবে পর পর কয়েকটা চার্চে আত্মগোপন করে তারা ইতালিতে পৌঁছাত। জার্মানি-অস্ট্রিয়ার ব্রেনার সীমান্ত দিয়ে ঢুকে এই ‘ক্যাথলিক রুট’ অবলম্বন করেই ইতালির জেনোয়ায় পৌঁছায় আইখম্যান।

এরপর আসে অন্যদেশে নাৎসি অফিসারকে পাচার করার বিষয়টি। ইতালি থেকে জিব্রাল্টার হয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় তখন নিয়মিত যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল করত। ওডেসা সেই সুযোগটাই নিল। দলে দলে নাৎসি এই পথে দক্ষিণ আমেরিকা পালাল। জেনোয়া থেকে বুয়েন্স এয়ার্স জাহাজযাত্রা পরিচিত হয়েই গেল ‘ratliner’ নামে। আইখম্যান তো বটেই, পরে তার স্ত্রী ভেরোনিকাও তার তিন ছেলকে নিয়ে এই পথেই আর্জেন্টিনা পালায়। বলা হয় পেরনের তথ্য দফতরের অধিকর্তা জার্মান বংশোদ্ভূত রুডল্ফ ফ্রডে ওডেসার সঙ্গে জড়িত ছিল। নাৎসিদের ইউরোপ থেকে আর্জেন্টিনায় আনার ব্যাপারে প্রভূত সাহায্যও সে করেছে।
ফলে ১৯৫০ সালে বুয়েন্স এয়ার্সে পৌঁছিয়ে আইখম্যান মোটেই জলে পড়েনি। পলাতক নাৎসিরা তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। ফ্রডের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী কার্লোস ফান্ডার আইখম্যানের থাকা, খাওয়া, চাকরির ব্যবস্থা করে। কয়েকটা ছোটখাটো কাজের পর আর্জেন্টনীয় রাজধানীর অদূরে মার্সিডিজ বেঞ্জের কারখানায় কাজ পেয়ে যায় আইখম্যান।
তবে গুপ্ত সংগঠন ওডেসার নাম দুনিয়াভর লোক জানে সম্পূর্ণ অন্য কারণে। বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ফ্রেডারিখ ফোরসাইথ ১৯৭২ সালের থ্রিলার ‘দ্য ওডেসা ফাইল’ লেখেন এই নাৎসি পাচার চক্রকে নিয়ে। গাই ওয়াল্টার্স তাঁর ২০০৯ সালের নাৎসি অনুসন্ধান নিয়ে লেখা ‘হান্টিং ইভিল’-এ লিখেছেন, ফোরসাইথের এই থ্রিলার কিন্তু পুরো কাল্পনিক নয়। উপন্যাসটি লেখার আগে কাহিনির মালমশলা জোগাড়ের জন্য ফোরসাইথ লিভারপুলের লর্ড রাসেলের সঙ্গে দেখা করেন।
উইজেনথাল একটি ফাইল দেন ফোরসাইথকে। ফাইল খুলে ফোরসাইথ দেখেন সেটা লাতভিয়ার রিগার কনসেনস্ট্রেশন ক্যাম্পের দুই নম্বর কর্তা ছিল এডোয়ার্ড রসম্যান। ‘রিগার কসাই’ নামে কুখ্যাত এই পলাতক নাৎসি অফিসারের হাত ৩৫ হাজার ইহুদি বন্দীর রক্তে রঞ্জিত। ফোরসাইথের কাহিনীতে এই রসম্যানকেই আনা হয়েছে।
লর্ড রাসেল আবার যে সে লোক নন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যে নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য গঠিত সব সামরিক আদালতেই সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন তিনি। নাৎসিদের যুদ্ধাপরাধের বিশদ বর্ণনা দিয়ে ১৯৫৪ সালে লেখেন বেস্টসেলার বই ‘দ্য স্কোয়ার্জ অফ দ্য সস্তিকা’। রাসেলই ফোরসাইথকে বলেন নাৎসি হান্টার সাইমন উইজেনথালের সঙ্গে দেখা করতে। একটা সুপারিশ চিঠিও লিখে দিলেন লর্ড রাসেল।
লর্ড রাসেলের সুপারিশ নিয়ে সাইমন উইজেনথালের সঙ্গে ফোরসাইথ দেখা করতে গেলেন। ভিয়েনার এক কানাগলিতে উইজেনথালের ছোট্ট অফিস। নাৎসি হান্টার তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন তাঁর কাহিনির বিষয় নিয়ে। ফোরসাইথ জানান এক জার্মান সাংবাদিক পিটার মিলার এক পলাতক নাৎসি অফিসারকে খুঁজছেন। এই নাৎসি, কনসেন্ট্রেশন কাম্পের দায়িত্বে ছিল। তার নিষ্ঠুরতা অকল্পনীয়। কিন্তু যুদ্ধের পরে তার আর কোনও খোঁজ নেই।

বলা বাহুল্য মিলার এবং পলাতক নাৎসি অফিসার এই দুই চরিত্রই কল্পিত। উইজেনথাল তখন বলেন কল্পিত নাৎসি অফিসার চরিত্র খুঁজতে হবে কেন? তাঁর কাছেই এই ধরনের কুখ্যাত নাৎসি অফিসারের খোঁজ রয়েছে। উইজেনথাল একটি ফাইল দেন ফোরসাইথকে। ফাইল খুলে ফোরসাইথ দেখেন সেটা লাতভিয়ার রিগার কনসেনস্ট্রেশন ক্যাম্পের দুই নম্বর কর্তা ছিল এডোয়ার্ড রসম্যান। ‘রিগার কসাই’ নামে কুখ্যাত এই পলাতক নাৎসি অফিসারের হাত ৩৫ হাজার ইহুদি বন্দীর রক্তে রঞ্জিত। ফোরসাইথের কাহিনীতে এই রসম্যানকেই আনা হয়েছে।
এখানে বলে রাখা ভাল যুদ্ধ শেষে দু’দুবার রসম্যানকে গ্রেফতার করা হলেও প্রতিবারই সে পালায়। একবার তো কারাগার থেকে পালায়। ১৯৪৮ সালে জেনোয়া থেকে জাহাজে চেপে সে আর্জেন্টিনায় পালায়। ‘ফ্রেদেরিকো ওয়েগেনার’ নামে আর্জেন্টিনার নাগরিকত্বও পায়। এই সবই যে সে করতে পেরেছিল ওডেসার সাহায্যে, তা বলাই বাহুল্য। আর্জেন্টিনায় কাঠের ব্যবসাও শুরু করে রসম্যান। বেশ কিছুদিন করেও তা। ইতিমধ্যে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে রিগার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদি গণহত্যা নিয়ে শোরগোল শুরু হয়।
রসম্যান যে নাম ভাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনায় রয়েছে তাও বার্লিনের গোচরে আসে। ১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে বুয়েন্স এয়ার্সের পশ্চিম জার্মান দূতাবাস আর্জেন্টিনার কাছে রসম্যানকে ফেরত চায়। যদিও পশ্চিম জার্মানি-আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি ছিল না, কিন্তু তাও তৎকালীন হোর্সে রাফায়েল ভিদেলা প্রশাসন বিষয়টি দেখার প্রতিশ্রুতি দেয়। গতিক সুবিধার নয় বুঝে পড়শি দেশ প্যারাগুয়েতে পালায় রসম্যান। কিন্তু সেখানেও শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৭৭ সালের ৮ অগস্ট প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনে এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির মরদেহ মেলে। পরে তা রসম্যানের বলে শনাক্ত করা হয়।
উইজেনথাল দৌঁড়ালেন অস্ট্রিয়ায় আলট্রসেতে- যেখানে আইখম্যানজায়া ছেলেদের নিয়ে ভাড়া থাকতেন। অস্ট্রীয় পুলিশের সাহায্য নিয়ে সোজা পৌঁছে গেলেন ৮ নম্বর ফিশারডর্ফ ঠিকানায়, পড়শিদের সঙ্গে কথা বললেন। বাড়িওয়ালা বলল তার বিন্দুবিসর্গ ধারণা নেই, ভেরোনিকা আইখম্যান ছেলেদের নিয়ে কোথায় গিয়েছে। এমনকি ভাড়ার চু্ক্তিও বাতিল হয়নি। বাড়িতে উইজেনথাল দেখলেন কোনও জিনিসপত্র নেই।
তবে এখানে আর এগোনোর আগে একটা কথা বলে রাখা ভাল। মোসাদ নিশ্চয়ই আন্দাজ করেছিল যে ইউরোপে যখন তন্ন তন্ন করে খোঁজ করে আইখম্যানের সন্ধান মিলল না, তখন সে নিশ্চয়ই লাতিন আমেরিকায় গা ঢাকা দিয়েছে। আর পেরন জমানায় আর্জেন্টিনা তখন ফেরারি নাৎসিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বুয়েন্স এয়ার্স সন্দেহের তালিকায় প্রথম দিকেই ছিল। কিন্তু কোনও যুৎসই সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না।
মোসাদ হাল ছাড়েনি। আরও ঠিক করে বললে হাল ছাড়েননি সাইমন উইজেনথাল। মূলত তাঁরই প্রচেষ্টায় প্রথম আশার আলো দেখা গেল বছর দু’য়েক বাদে, ১৯৫২ সালে।
“মিসেস আইখম্যান কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে”

১৯৫২ সালের জুলাই মাসে উইজেনথালের কাছে একটা ফোন এল- “মিসেস আইখম্যান আর তার তিন ছেলের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।” উইজেনথাল দৌঁড়ালেন অস্ট্রিয়ায় আলট্রসেতে- যেখানে আইখম্যানজায়া ছেলেদের নিয়ে ভাড়া থাকতেন। অস্ট্রীয় পুলিশের সাহায্য নিয়ে সোজা পৌঁছে গেলেন ৮ নম্বর ফিশারডর্ফ ঠিকানায়, পড়শিদের সঙ্গে কথা বললেন। বাড়িওয়ালা বলল তার বিন্দুবিসর্গ ধারণা নেই, ভেরোনিকা আইখম্যান ছেলেদের নিয়ে কোথায় গিয়েছে। এমনকি ভাড়ার চু্ক্তিও বাতিল হয়নি। বাড়িতে উইজেনথাল দেখলেন কোনও জিনিসপত্র নেই।
উঠোনে এক জায়গায় খোঁড়া। কোনও নথি বা টাকাপয়সা বার করা হয়েছে। ছেলেদের স্কুলে গিয়ে জানা গেল, বলা নেই কওয়া নেই দুম করে ওরা স্কুলে আসছে না। কোনওরকমের সার্টিফিকেটও নেয়নি। এক পড়শি বলল, এক ব্রাজিলীয়কে বিয়ে করে ভেরোনিকা ব্রাজিল চলে গিয়েছে। ভেরোনিকার বোন আবার সেই খবর খণ্ডন করে বলল, তার বোন ফের এক জার্মানকে বিয়ে করে সে দেশে চলে গিয়েছে। তবে ভেরোনিকার জার্মান বরকে তার বোন দেখেনি।
গ্রাজের জার্মান কনস্যুলেটে খোঁজ করতে বেরোল আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভেরোনিকা তার বিয়ের আগের পদবীতে জার্মান পাসপোর্ট নিয়েছে। দুই ছেলে হর্ট্স আর ডিটের নাবালক বলে তাদের মায়ের পাসপোর্টেই কাজ চালাতে পারবে। বড় ছেলে ক্ল্যসকে অবশ্য নিজের নামে পাসপোর্ট নিতে হয়েছে।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল উইজেনথালের। কোথায় এবার খুঁজবেন আইখম্যানকে? এ ছাড়া ক্রমে তিনি ও তাঁর সহকারী তুবিহা ফ্রিডম্যান বুঝতে পারলেন, তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে নাৎসিদের খুঁজতে কেউই তেমন আর উৎসাহী নয়। নাম ভাঁড়িয়ে নাৎসিরা পুলিশে, সরকারি দফতরে চাকরি করছে। কেউ তাদের অতীত ইতিহাস খতিয়ে পর্যন্ত দেখতে রাজি নয়।
উইজেনথালের আবছা ধারণা ছিল যে অনেক নাৎসির মতো আইখম্যানও লাতিন আমেরিকার কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে। ভেরোনিকার ফাঁকা ঘরে দাঁড়িয়ে সেই ধারণা প্রত্যয় পেল। ভেরোনিকা ছেলেদের নিয়ে পলাতক স্বামীর কাছেই গিয়েছে।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল উইজেনথালের। কোথায় এবার খুঁজবেন আইখম্যানকে? এ ছাড়া ক্রমে তিনি ও তাঁর সহকারী তুবিহা ফ্রিডম্যান বুঝতে পারলেন, তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে নাৎসিদের খুঁজতে কেউই তেমন আর উৎসাহী নয়। নাম ভাঁড়িয়ে নাৎসিরা পুলিশে, সরকারি দফতরে চাকরি করছে। কেউ তাদের অতীত ইতিহাস খতিয়ে পর্যন্ত দেখতে রাজি নয়। ক্রমে মানসিক অবসাদ গ্রাস করল উইজেনথালকে। তাঁরই মতো হলোকাস্ট থেকে বেঁচে আসা স্ত্রী শিলাকে বললেন, “নাৎসিরা যুদ্ধ হারল, আর আমরা যুদ্ধ পরবর্তী অধ্যায় হারছি।” ফ্রিডম্যানকে তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা বললেন, অত ইহুদির দুঃখে নিজেকে না ভাসিয়ে নিজের ভবিষ্যত দেখতে।
এইসময় ব্যক্তিগত কারণে বাধ্য হয়ে, ফ্রিডম্যান হাইফা চলে যান। কিন্তু আইখম্যানের অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের প্রচেষ্টায় কোনও খামতি দেননি ফ্রিডম্যান। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত তিনি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাস্থিত ডকুমেন্টাল সেন্টারের ডিরেক্টর হিসাবে নাৎসিদের যুদ্ধাপরাধের তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে হাইফার ইনস্টিটিউট অফ ডকুমেন্টাটেশন অফ নাৎসি ওয়ার ক্রাইমের ডিরেক্টরও হন। ১৯৬০ সালের ২০শে মে বুয়েন্স এয়ার্স থেকে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী অ্যাডল্ফ আইখম্যানকে নিয়ে আসার প্রথমে ৯ মাস উত্তর ইজরায়েলের ইয়াগুর কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়। এখানে আইখম্যানকে লাগাতার যে জেরা করা হয় তার মূল ভিত্তিই ছিল ফ্রিডম্যানের সংগৃহীত তথ্য। ফ্রিডম্যান হয়তো আইখম্যানকে ধরায় তেমন সহায়তা করতে পারেননি কিন্তু পরবর্তী তাঁর সংগৃহীত তথ্যই আইখম্যানকে ফাঁসির দড়ি পরায়।

চারিদিকে হতাশা আর ফ্রিডম্যানের চলে যাওয়ার পর অবসাদ কাটাতে পুরোনো হবি ডাকটিকিট জমানো ফের শুরু করলেন উইজেনথাল। এই সূ্ত্রেই হঠাৎ এক ঝলক আশার আলো দেখা গেল। অস্ট্রিয়ার ইন্সব্রুকে তাঁর বন্ধু ব্যারন মাস্টও ডাকটিকিট সংগ্রহকারী। ১৯৫৩ এর শেষদিকে এক আড্ডায় ব্যারন আর্জেন্টিনা থেকে আসা একটা খাম বার করলেন। নাৎসি বিমানবাহিনী লুফ্ততাফের এক বিমানচালক আর্জেন্টিনায় পালিয়েছে।
সেখান থেকে সে ব্যারনকে চিঠিতে লিখছে- “এখানে অনেকেই আছে যাদের আমরা দু’জনেই চিনি। অনেককে আবার আপনি চেনেনও না। এখন যা বলছি তা জানলে আপনি চমকে যাবেন। ইহুদিদের মৃত্যমুখে ঠেলে দেওয়া সেই বরাহনন্দন আইখম্যান। বার দু’য়েক কথাও হয়েছে তার সঙ্গে। একটা জলের সংস্থায় সে এখন কাজ করে, থাকে বুয়েন্স এয়ার্সের কাছেই।”
সত্যি বলতে কি আইখম্যানের খবরটা নিয়ে সিআইএ-র দরজায় কড়াও নাড়লেন উইজেনথাল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। দুনিয়া তখন কোরিয়া যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত।
বজ্রপাত হলেও এতটা চমকাতেন না উইজেনথাল। কোনও কালক্ষেপ না ইজরায়েলি দূতাবাসে সবটুকু জানান। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হল না। এক পলাতকের চিঠির ভিত্তিতে মোসাদ নড়ল না। তার নড়ার জন্য প্রয়োজন আরও বড় কোনও প্রমাণ। সত্যি বলতে কি আইখম্যানের খবরটা নিয়ে সিআইএ-র দরজায় কড়াও নাড়লেন উইজেনথাল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। দুনিয়া তখন কোরিয়া যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। কোন এক পলাতক খুনি নাৎসি সন্ধানের প্রসঙ্গ তখন অনেক কম গুরুত্বের। আইখম্যান সন্ধান তাই আপাতত ধামাচাপা পড়ল।
বছর দু’য়েক বাদে সেই পর্ব ফের আলোতে এল। এবং তা এল এক প্রেমকাহিনির জেরে।
তথ্যসূত্র – (১) ড্যানিয়েল গর্ডিস-ইজরায়েল-আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন, (২) জ্যাক্সন হ্যালে-এলি কোহেন-দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার, (৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস, (৪) নীল বসকম্ব-হান্টিং আইখম্যান-চেজিং ডাউন দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট নটোরিয়াস নাৎসি, (৫) গাই ওয়াল্টার্স- হান্টিং ইভিল, (৬) উকি গোনি-হাউ নাৎসি ওয়্যার ক্রিমিনালস এসকেপড ইউরোপ, (৭) সাইমন উইজেনথাল- জাস্টিস নট ভেঞ্জেন্স, (৮) লি সন্ডার্স- দ্য পাজল
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মূলত শিল্প বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাংবাদিকতায় ব্যপ্ত বিগত তিন দশক। তবে সুযোগ পেলে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়া বা অন্য ধরনের লেখাতে প্রাণের আরাম খোঁজার চেষ্টাও চলে
