(Emile Griffith)
“I kill a man and most people forgive me. However, I love a man and many say this makes me an evil person.”
কথাগুলো কী সহজ, কী সত্য, কী আশ্চর্য, কী সাংঘাতিক।
এ বাক্য আসলে এক সাতকাহন।
যার মুখবন্ধ লেখা শুরু হয়েছিল সম্ভবত ২৩ মার্চ।
১
২৩ মার্চ, ১৯৬২। রাতে নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে চেপে বাড়ি ফিরছিলেন এমিল, সঙ্গে এক বিশেষ বন্ধু। বয়ফ্রেন্ড। এমিল মাথার হ্যাটখানি একটু জোর করেই চোখের উপর টেনে রেখেছিলেন। হ্যাঁ, তিনি শুধু পরিচিতই ছিলেন না, বক্সার হিসেবে বেশ নামডাক ছিল। ফলে রাস্তাঘাটে বেরোলে একটু আড়াল প্রয়োজন হত বৈকি। কিন্তু সে রাতে আরও বেশি করেই যেন আশেপাশে একটা আড়াল তুলে রাখতে চাইছিলেন। কারও সঙ্গে চোখাচোখি হোক, চাইছিলেন না। তখন তাঁর একমাত্র পাখির চোখ, আগামী রাতের চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ। ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ওয়ার্ল্ড টাইটেল ফাইট। প্রতিদ্বন্দী, কিউবার বেনি পাহরেট। বেনির সঙ্গে এমিলের ছিল তিন নম্বর ফাইট। মাত্র মাস সাতেক আগে, বেনির কাছে পরাস্ত হয়ে এমিল হারিয়েছিলেন বিশ্ব খেতাব। ২৪-এর রাতে, সেই খেতাব ফিরে পাওয়ার সুযোগ।
বক্সিংয়ের নিয়ম, এমন ফাইটের আগে একটা ওয়ে-ইন হয়, অর্থাৎ প্রেস ও একটি ছোট্ট জমায়েতের উপস্থিতিতে দুই প্রতিপক্ষের ওজন মাপা হয়, এবং সর্বসমক্ষে তা ঘোষিত হয়। ২৪-এর সকাল শুরু হওয়ার কথা সেই ওয়ে-ইন দিয়ে। তার আগের রাতে, হঠাৎ মাঝপথে কী যে হল, এমিল ট্রেন থেকে নেমে পড়লেন। এমনকী তাঁর বন্ধুও প্রথমে বুঝতে পারেননি, কী হল সহসা। ফর্টি সেকেন্ড স্ট্রিটে নেমে হাঁটা লাগালেন এমিল। টাইমস স্কোয়ারের আশ্চর্য আলোর রাজ্যে অগুনতি সমকামী বন্ধু, ভক্তের আঘ্রাণ নিতে নিতে, আদরের ছোঁয়া পেতে পেতে এমিল সে রাতে এগিয়েছিলেন, যেন স্তম্ভিত করে দেওয়া কোনও ইতিহাসের দিকে। বা হয়তো অপেক্ষারত অতল খাদের দিকে…।
অন্য দিন হলে, আশপাশের এই বহুসংখ্যক সমকামী মানুষের অভিবাদনের প্রত্যুত্তরে এমিল তিনগুণ স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিতেন। কিন্তু, আজ সে সব করলেন না। শুধু শ্বাস চেপে এ সান্নিধ্য গ্রহণ করে নিলেন। আঁজলা ভরে কুড়িয়ে নিলেন মার্জিনের বাইরে কোনও ক্রমে টিকে থাকা সেই সব মানুষের ক্ষতচিহ্ন। তখনও এমিল সম্ভবত বুঝতে পারেননি, কুড়িয়ে নেওয়া এমন ক্ষতচিহ্ন আসলে কখনওই মোছে না। ম্যাকবেথের সেই হাতের রক্তের মতো জেগে থাকে, চিরকালীন। এমনকী না থেকেও।

২
বেলার দিকের সে ওয়ে-ইন যখন শুরু হয়, প্রতিপক্ষ বেনি পাহরেট অদ্ভুত এক কাণ্ড করে বসেন। অদ্ভুতই বা বলি কী করে! বেনি প্রথমে হেসেই কুটিপাটি এমিলের ‘পরী’র মতো তুলতুলে ওজন দেখে। তারপর কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করলেন। অর্থাৎ, পুরুষ এমিলের সঙ্গে সঙ্গম করলেই বরং চলত। লড়াই করা পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়— ভাবখানা এমন। এরপর বেনি এমিলকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করেন। এমিলের দোষ, তিনি সমকামী। মাথা ঝনঝন করে ওঠে এমিলের। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন সমকামী, কিন্তু প্রকাশ্যে সে কথা তো কাউকে জানাননি? যাকে বলে, হি ডিড নট কাম আউট…।
জীবনের রূঢ়তম আঘাতটি এবার এমিল করতে চাইলেন বেনিকে। কিন্তু এমিলের কোচ, দ্বিতীয় পিতাই বলা যায় প্রায়, গিল ক্ল্যান্সি চিৎকার করে আটকালেন। বললেন, ‘বাঁচিয়ে রাখো সমস্তটা, মোক্ষম ক্ষণের জন্য’। এমিলকে নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। এমিলের কানের কাছে তখন জটলা পাকিয়েছে। তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, প্রতিপক্ষ ও তাঁর দলবলের মশকরা— ওহে নোংরা সমকামী, নর্দমার কীট, একসঙ্গে কুচি কুচি করব তোমায়, তোমার ‘স্বামী’কেও! বক্সিংয়ের কলঙ্ক, নোংরা কীট তুমি!
সংবাদমাধ্যম ততক্ষণে বুঝে উঠতে পারছে না, ঠিক কীভাবে এমিলকে বর্ণনা করা হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখল— এমিল গ্রিফিথকে বেনি পাহরেট ‘আন-ম্যান’ বলেছেন…। তারা আসলে খানিক ভদ্রতাই করে এ শব্দ ব্যবহার করেছিল। এ দেখে, অবশ্য বিখ্যাত প্রতিবেদক হাওয়ার্ড টাকনার বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন— আন-ম্যান? কী অর্থ এর?
৩
এমিল অনেকক্ষণ বুঝে উঠতে পারেননি, কেন এ রূপ লাঞ্ছনা তাঁর প্রাপ্য। স্রেফ পুরুষদেরও ভালবাসেন বলে? ভালবাসা কবে থেকে এমন অকল্পনীয় এক পাপ হল, বুঝে উঠতে পারেননি। এমিল তো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন, তখন তো কেউ ভীতু বলেনি, আজ বেনি স্রেফ তাঁর যৌন পছন্দকে উদ্দেশ করে এমনভাবে দাগিয়ে দিলেন? ভীতু? কেন?
সংবাদমাধ্যম ততক্ষণে বুঝে উঠতে পারছে না, ঠিক কীভাবে এমিলকে বর্ণনা করা হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখল— এমিল গ্রিফিথকে বেনি পাহরেট ‘আন-ম্যান’ বলেছেন…। তারা আসলে খানিক ভদ্রতাই করে এ শব্দ ব্যবহার করেছিল। এ দেখে, অবশ্য বিখ্যাত প্রতিবেদক হাওয়ার্ড টাকনার বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন— আন-ম্যান? কী অর্থ এর? যে মানুষ নয়? সে তো প্রজাপতিও মানুষ নয়, পাথরের চাঁই, মানুষ নয় সেও…। অসহ্য, অশালীন এই আন-ম্যান কথাটা…। এমিল আর যাই হোক, আন-ম্যান নয়…।

৪
রাত হল, ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে শুরু হল এক অত্যাশ্চর্য লড়াই। বেনিকে এমিল এমন মারলেন, মারতেই থাকলেন, না থেমে এমনভাবে প্রহারপর্ব চালালেন যে, দশ দিন পর, বেনি কোমা থেকে আর ফিরলেন না। রিংয়ে বেনির অবস্থা দেখে কিছু অভিজ্ঞ চোখ বুঝে গিয়েছিল, শরীরে আর প্রাণ নেই। এমিল ওই অবস্থায় ঠাওর করতে পারেননি কী ঘটে গেছে। তাঁকে আবার রিং সাইডে এনে স্লো-মোশনে দেখানো হয়, মারের সেই মুহূর্ত। ধারাভাষ্যকার এক জন এমিলকে স্লো-মোশন দেখিয়ে বলছিলেন, ‘ওই দেখো, আহা, কী অনবদ্য জ্যাব, কী অপূর্ব আপার-কাট…। দেখো, কেমন মুখ থুবড়ে পড়ে গেল বেনি। ওহ ওহ… বিউটিফুল…’
এমিল ঝাপসা চোখে দেখছিলেন, আর দেখে বুঝতে পারছিলেন, কিছু বোধ হয় ঘটে গেছে ইতিমধ্যে। কিন্তু কী, বোঝা হয়নি।
গোটা রাতের ঘটনার আকস্মিকতায় এমিল স্তব্ধ হলেন। বিশ্বখেতাব ফিরে পেলেন। ‘অনবদ্য’ লড়াইয়ের জন্য বন্দিতও হলেন। তার পর সেই দশ দিন কাটল। বেনি প্রয়াত হলেন। সারা জীবনের জন্য বদলে গেলেন এমিল।
তিনি দোরে দোরে গিয়ে প্রায়ই বলতে থাকলেন, ‘আমি অমন কুৎসিত আক্রমণে বিচলিত হয়েছিলাম, অসম্ভব ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু বেনিকে কখনওই মারতে চাইনি। বিশ্বাস করুন…।’
আশ্চর্য হলেন সে দিন, ২০০৫ সালে যে দিন, প্রকাশ্য বললেন, হ্যাঁ, আমি সমকামী। দীর্ঘ দিন তিনি অন্তরে এ সত্যকে প্রাণভোমরার মতো আগলে রেখেছিলেন। পেট উথলে উঠে এসেছে যতবার এ নিপাট বাস্তব, ততবার বুকে কিল মেরে এমিল দাবিয়ে রেখেছিলেন যে তিনি সমকামী।
তবে কেউই প্রায় এমিলের সে সব আর্তি শুনল না। গ্রাহ্যই করল না, কারণ তাঁকে তো কেউ এতটুকু দোষই দিচ্ছিল না। ভাবখানা এমন যেন, ও কী হয়েছে! রিংয়ের মধ্যে, একটু-আধটু তো অমন হতেই পারে! ও নিয়ে কেউ ভাবে, অন্তত ও নিয়ে কি নতুন খেতাবধারীর ভাবলে চলে?
মানুষের অমন ভাবনাপ্রবাহে, ব্যবহারে আশ্চর্য হয়েছিলেন এমিল?
উবু হয়ে বসে নিভৃতে কেঁদেছিলেন?
কে জানে…

৫
আশ্চর্য হলেন সে দিন, ২০০৫ সালে যে দিন, প্রকাশ্য বললেন, হ্যাঁ, আমি সমকামী। দীর্ঘ দিন তিনি অন্তরে এ সত্যকে প্রাণভোমরার মতো আগলে রেখেছিলেন। পেট উথলে উঠে এসেছে যতবার এ নিপাট বাস্তব, ততবার বুকে কিল মেরে এমিল দাবিয়ে রেখেছিলেন যে তিনি সমকামী। জানত শুধু ওই অল্প কিছু ভিতরজনই। বুঝত অবশ্য তাঁকে দেখে বেনির মতো আরও অনেকেই। তবুও তো প্রকাশ্যে এ সত্য ততদিনেও বেরোয়নি। বেরোলে যে কঠোর কারাদণ্ডও হত…।
বেনির ‘রক্ত’ যেন হাতে লেগে রইল এমিলের। কিছুতেই ধুয়েমুছে ফেলতে পারা গেল না। তখন আর না পেরে, এমিল বলে ফেললেন সমকামিতার কথা। দীর্ঘ দিন ধরেই তো এক অতীব কষ্টকর বোঝা বয়ে চলেছিলেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন সেই রক্তক্ষয়ী বোঝা। সামলাতে পারে না এ সব বাঘা কোনও খেতাবধারীও।
খেদ একটাই, মৃত্যুর ঠিক আগেই আর এক নামজাদা বক্সার অর্ল্যান্ডো ক্রুজ় এমিলের সঙ্গে একটু দেখা করতে চেয়েছিলেন। দেখা করে বলতে চেয়েছিলেন, স্যর, আপনার মতো আমি-ও একজন বক্সার, খেতাবধারী, এবং সমকামী।
২০১৩ সালে ডিমেনশিয়ায় ভুগে, স্রেফ ভাষাহীন চোখে দেওয়ালে তাকিয়ে থেকে থেকেই এমিল পেরোলেন এ প্রান্তর। অন্য কোনও রিংয়ে হয়তো। তার আগে অবশ্য তিনি শ্বাস চেপে দেখা করেছিলেন বেনি পাহরেটের সন্তানের সঙ্গে। নীরবে ক্ষমাপ্রার্থনার সে মুহূর্তে, আমরা না হয় ভাগ না-ই বা বসালাম। শুধু খেদ একটাই, মৃত্যুর ঠিক আগেই আর এক নামজাদা বক্সার অর্ল্যান্ডো ক্রুজ় এমিলের সঙ্গে একটু দেখা করতে চেয়েছিলেন। দেখা করে বলতে চেয়েছিলেন, স্যর, আপনার মতো আমি-ও একজন বক্সার, খেতাবধারী, এবং সমকামী। আমি সদ্য, মন খুলে সবাইকে তা জানিয়েছি। এত দিনের চেপে রাখা সত্যি বের হলে, ঠিক কেমন লাগে, তা আপনার থেকে একটু শুনতাম, একটু বলতাম…।
খেদ এইটাই যে, সে দেখা আর হল না। বক্সিং রিংয়ে কারওকে তীব্র আঘাত করেও, কোমল পাপড়ির মতো নিশ্চয়ই থেকে যেতে পারবেন অর্ল্যান্ডো ক্রুজ়’রা…।
আশা।
ঠিক যে রূপ ভিতর ভিতর বেঁচেছিলেন এ জগতে একদা এমিল গ্রিফিথ…।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কর্মসূত্রে সাংবাদিক। কিন্তু তা বাদে অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, অডিয়ো গল্পের লেখক ও পরিচালকও। প্রকাশিত হয়েছে তিনটি গ্রন্থ। ইতিহাসের ছাত্র, তাই খুঁজে বেড়ানোর ঝোঁক সেই সব পুরনো অলিগলি। ঘোর পেসিমিস্ট, আবার জাত অপটিমিস্টও যে!
