(Kanan Devi)
১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাস। রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত হয়েছিল তিনদিনের রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কানন দেবী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় এবং রাজ্যের তৎকালীন মন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী। সম্মেলনের শুরুতেই উদ্বোধনী সঙ্গীত নিবেদন করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই সময়ে ওঁর বয়স এবং শরীরের কারণে গলায় ক্লান্তি! গানের শেষে একজন হেমন্ত অনুরাগী শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হেমন্তদা, আপনি কষ্ট করে গান করলে, আমাদেরও মনে কষ্ট হয়।’
সারা প্রেক্ষাগৃহে আলোড়ন! মুহূর্তের মধ্যে নানা কটু কথা এবং প্রতিবাদ বর্ষিত হতে শুরু করে জনৈক শ্রোতাটির উদ্দেশ্যে। মঞ্চে উঠে মাইক হাতে তীব্র প্রতিবাদী সুচিত্রা মিত্র বলেন, ‘আপনারা হেমন্তর গান বোঝেন না।’ উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে তাঁর কণ্ঠস্বর, চোখে জল! হেমন্তদাদুর দীর্ঘদিনের বন্ধু সুচিত্রা মিত্র ক্ষোভে আর কথাই বলতে পারছিলেন না।
আরও পড়ুন: রায়বাবুর সই করা চেক কখনও ব্যাঙ্কে ফেলেননি শংকর
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নির্বিকার, হাসিমুখ। এরপরে সবাইকে অবাক করে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেত্রী এবং সঙ্গীতশিল্পী এবং বাংলা ছবির প্রথম স্টার কানন দেবী শান্তভাবে শ্রোতাদের বললেন, ‘আপনারা অকারণেই একজন সঙ্গীতপ্রেমী শ্রোতাকে বকাবকি করছেন। ওঁর নিখাদ হেমন্তপ্রেম এবং ভালোবাসা থেকেই উনি কথাগুলি হেমন্তবাবুকে বলেছেন, অপমান করার জন্য নয়।’
যত দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, তত দ্রুতই পরিবেশ শান্ত হয়ে গেল! কী অসাধারণ অভিজাত্য আর স্নেহ দেখেছিলাম সেদিন কানন দেবীর মধ্যে। মাথায় ঘোমটা, হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে গ্রিনরুমে যতীন চক্রবর্তীকে নমস্কার জানিয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, ‘যতীনবাবু, টালিগঞ্জের দিকে গেলে, আমার বাড়িতে একদিন আসবেন।’

কানন দেবীর প্রতি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং সুচিত্রা মিত্রেরও ছিল অসীম শ্রদ্ধা। ওঁদের দুজনের সঙ্গেই রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেছিলেন কানন দেবী। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গেয়েছিলেন, ‘তৃষ্ণারও শান্তি’ আর সুচিত্রা মিত্রর সঙ্গে ‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’। কানন দেবী অভিনীত ‘মেজদিদি’ ছবিটি দেখে ভীষণ ভাল লেগেছিল। মনে মনে খুব শ্রদ্ধা করতাম ওঁকে। তাই রবীন্দ্রসদনে ওঁকে অত কাছ থেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
হেমন্তদাদুকেও বলতে শুনেছি, ‘কানন দেবীর মতো এমন মার্জিত আর গুণসম্পন্ন মহিলা খুব কমই দেখেছি।’ মা কলকাতা দূরদর্শনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ওঁর বাড়িতে গিয়েছিল সাক্ষাৎকার নিতে। মা যখন বাড়িতে ফিরত, তখন কানন দেবীর কথা শুনতে চাইতাম। শুনতাম কাজের ফাঁকে ওঁর আরাধ্য গৃহদেবতা গোপালের কতরকম গল্প করতেন কানন দেবী।
ওঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতার কথা শুনে উনি আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটি মায়ের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, আমাকে একদিন নিয়ে যেতে টালিগঞ্জে ওঁর সূর্যনগরের বাড়িতে। চিঠির শেষে লিখেছিলেন, ‘অরিজিৎ বাবা, তুমি মাকে খুব খুশি করবে। ইতি, কানন দিদা।’
ওঁর জীবনের অনেক কথা জানতে পেরেছিলাম কানন দেবীর আত্মজীবনী, ‘সবারে আমি নমি’ বইটি পড়ে। ওঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতার কথা শুনে উনি আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটি মায়ের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, আমাকে একদিন নিয়ে যেতে টালিগঞ্জে ওঁর সূর্যনগরের বাড়িতে। চিঠির শেষে লিখেছিলেন, ‘অরিজিৎ বাবা, তুমি মাকে খুব খুশি করবে। ইতি, কানন দিদা।’
তপনদা (তপন সিংহ) এবং ভারতী দেবীর কাছে কানন দেবীর সম্পর্কে অনেক গল্প শুনতাম। তপনদা বলেছিলেন, ‘টালিগঞ্জের ক্যালকাটা মুভিটন স্টুডিও তৈরি হয়েছিল কানন দেবীর জমির উপর। সেখানে তখন তপনদা ছাড়াও যাওয়া আসা করতেন অজয় কর, মৃণাল সেন, কানন দেবী এবং ওঁর স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য প্রমুখ। মাসে একটা করে ছবি দেখার আয়োজন হত। কোথা থেকে জানি না, মৃণালবাবু বিভিন্ন দেশের ছবি জোগাড় করে আনতেন, তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে। ছবি প্রোজেকশনের খরচ ছিল দশ টাকা। সেই যুগে দশ টাকারও মূল্য অনেক। কিন্তু কানন দেবী নিজের উপর সব দায়িত্ব তুলে নিয়ে বলেছিলেন, ‘যা খরচ লাগে, সব আমি দেব।’ দেশের মধ্যে বোধহয় নামহীন, গোত্রহীন ফিল্ম ক্লাব সেটাই ছিল।’

মায়ের সঙ্গে একদিন গেলাম ওঁর বাড়িতে। বাড়ির নাম ‘শ্রীমতি’, ওঁদের প্রোডাকশন সংস্থা, ‘শ্রীমতি’ পিকচার্স-এর নামেই সম্ভবত বাড়ির নাম রেখেছিলেন। অনেক আদর, স্নেহ আর আশীর্বাদের পরে যত্ন করে খাওয়ালেন। বিকেল চারটের সময় শুনলাম তখনও উনি খাননি! বললেন ওঁর পুত্রবধূ এবং উনি গোপাল সেবা করে উঠে তারপরে খাবেন। প্রায়ই নাকি এমন হয়!
হেমন্তদাদু চলে যাওয়ার পরে বেশ কিছু মানুষের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল, ‘হেমন্ত স্মৃতি সংসদ’। যুক্ত ছিলেন বেলা মুখোপাধ্যায়, গ্রামাফোন কোম্পানির বিমান ঘোষ, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ক্ষিতিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের জামাই কবি এবং অধ্যাপক ড. পলাশ মিত্র প্রমুখ। সবার ইচ্ছে ছিল হেমন্ত স্মৃতি সংসদের সভানেত্রী হোন কানন দেবী। একদিন সকালে আমি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভাই তারাজ্যোতি মুখোপাধ্যায়, আমার মা মধুশ্রী মৈত্র এবং অধ্যাপক পলাশ মিত্র কানন দেবীর ১/১ রিজেন্ট গ্রোভের বাড়িতে গেলাম। সবার অনুরোধে উনি এক কথায় রাজি হলেন। লিখিত সম্মতিপত্রও দিলেন।
নিজের বাড়ির কাজকর্ম সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না! আমরা যখন যেতাম, দেখতাম প্রতিটি তরকারি জলে ধোওয়ার পরে একটা কাপড় দিয়ে মুছে ফ্রিজে তুলছেন। মা কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন, ভিজে অবস্থায় সবজি ফ্রিজে তুলে রাখলে খারাপ হয়ে যায়!
ছবিতে অভিনয় করেছেন, গানও করেছেন, ছবির প্রযোজনা করেছেন, কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে এসবের পাশাপাশি নিজের বাড়ির কাজকর্ম সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না! আমরা যখন যেতাম, দেখতাম প্রতিটি তরকারি জলে ধোওয়ার পরে একটা কাপড় দিয়ে মুছে ফ্রিজে তুলছেন। মা কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন, ভিজে অবস্থায় সবজি ফ্রিজে তুলে রাখলে খারাপ হয়ে যায়!
হেমন্ত স্মৃতি সংসদের সভাপতি হিসেবে, হেমন্তদাদুর প্রয়াণের পরে প্রথম জন্মদিন পালনে অংশগ্রহণ করতে রবীন্দ্রসদনে এসেছিলেন। আমি ওঁকে নিয়ে আসি টালিগঞ্জের বাড়ি থেকে। আসার পথে গাড়িতে বসে অনেক গল্প করছিলেন। শুনেছিলাম, রবীন্দ্রনাথকে দেখার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা।

ওঁদের বাড়িতে কানন দেবীর স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্যকে দেখেছিলাম। বেশ সুপুরুষ চেহারা। আমি একসময় অরবিন্দ আশ্রমে কর্মরত ছিলাম, তখন মাঝে-মধ্যেই সেখানে হরিদাস ভট্টাচার্য আসতেন। পরিচয় হয়ে গিয়েছিল, বসে বেশ গল্পও করতেন। কিন্তু অবাক লাগত এই দেখে যে এতরকম বিষয় নিয়ে কথা বললেও কানন দেবীর সম্পর্কে কিছুই বলতেন না! কী কারণ জানতাম না।
আক্ষেপ হয় এই ভেবে যে, তখন স্মার্টফোনের যুগ ছিল না, সেই কারণে কানন দেবীর মতো কিংবদন্তীর সঙ্গে কোনও ছবি তোলা হয়নি! তবে ওঁকে খুব কাছ থেকে দেখা, ওঁর স্নেহ-ভালবাসার স্পর্শ আজও মনের এক কোনায় রয়ে গেছে।
চিত্রঋণ: উইকিমিডিয়া কমনস
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অরিজিৎ মৈত্র পেশায় সাংবাদিক। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অরিজিৎ পুরনো কলকাতা নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন। নিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই: অনুভবে তপন সিনহা, ছায়ালোকের নীরব পথিক বিমল রায়, চিরপথের সঙ্গী - সত্য সাই বাবা, বন্দনা, কাছে রবে ইত্যাদি।
