(Jyotirmoy Dutta)
জ্যোতিকাকা চলে গেলেন। খবরটা পেয়ে বেশ কিছুক্ষণই চুপ করে বসেছিলাম। একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিল, তাহলে আমাদের চারপাশে থাকলেন কে? গত ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ সাল অবধি যে ব্যক্তি প্রচন্ড সজীব, প্রাণচঞ্চল মানুষ ছিলেন, সেই তিনি একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন দেখে, মনের মধ্যে একটা প্রবল ঝাঁকুনি খেলাম। এবং তাতে এই প্রমাণ হল, যে আমার মধ্যে এখনও সব অনুভূতিগুলো শেষ হয়ে যায়নি। এখনও কোনও কোনও মানুষের চিরপ্রস্থানের খবরে গলার কাছটা মুচড়ে ওঠে, চোখের কোণ চিকচিক করে। (Jyotirmoy Dutta)
এখন যে সময় এসেছে তাতে মানুষের কোনও কিছুই আর গভীর, গোপন নেই, সবই মুক্ত, বাজারি। কিন্তু জ্যোতি কাকা তা হতে দিলেন না। তিনি এক ঝটকায় এক পুরনো পর্দা আমার সামনে থেকে সরিয়ে দিলেন। আমি সরাসরি দেখতে পেলাম, এক ঝকঝকে তাজা যুবককে। যিনি একটি ছোট গাড়ির মাথায় একটি বড়সড় প্যাকেট রেখে প্রাণখোলা হাসি হাসছেন, সেই হাসি সংক্রামিত হচ্ছে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষের মধ্যেও। তাঁরা আর কেউ নন, তাঁরা হলেন তাঁর সহধর্মিণী মীনাক্ষী কাকিমা ও তার অপর জন হলেন আমার বাবা প্রয়াত গৌরকিশোর ঘোষ। (Jyotirmoy Dutta)
আরও পড়ুন: বিস্মৃতির আড়ালে লালবিহারী দে
ছবিটি তোলা ৬৭-৬৮ সালের আমেরিকায়। সম্ভবত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতিকাকা থাকাকালীন এই ছবিটি তোলা। বাবা তখন কোনও কাজের সূত্রে আমেরিকাতে গিয়েছিলেন। এবং তাঁদের বাড়িতেও আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন। আর গাড়ির মাথায় রাখা ওই প্যাকেটটিতে ছিল আমাদের দুই বোনকে পাঠানো দুটি ফ্রক। তাঁদের উপহার দেওয়া ওই দুটি আমেরিকান ফ্রকই আমাদের প্রথম বিদেশ থেকে পাওয়া উপহার। (Jyotirmoy Dutta)
পরবর্তীকালে কম ফ্রক তো পরিনি, কিন্তু আমার এখনও সেই ফ্রকের উপর এক অন্যরকম ভালবাসা রয়ে গেছে যেমন রয়ে গেল তাঁর শেষদিন পর্যন্ত তাঁর প্রতি আমার এক অমোঘ আকর্ষণ।

তাঁর ওই আকর্ষণের জন্যই খুব কম হলেও যোধপুর পার্কের বাড়িতে গিয়েছি কয়েকবার, মিমি কাকিমা থাকাকালীন, মিমি কাকিমা না থাকাকালীনও। যোধপুর পার্কের এই বাড়ির আগে তাঁরা কলকাতার অনেক বাড়িতেই থাকতেন, আমি প্রায় সব বাড়িতেই গিয়েছি। তবে জ্যোতি কাকার এই শেষ অধ্যায়টি আমার কাছে খুবই হৃদয়বিদারক।
বহুদিন পর যেদিন প্রথম আমি তাঁকে যোধপুরের ওই বাড়িতে দেখি, তখন ওঁদের একমাত্র পুত্র গোগোল আর এই পৃথিবীতে নেই। আমেরিকাতে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। তখন জ্যোতিকাকারাও সম্ভবত আমেরিকাতেই থাকতেন। তারপর কলকাতায় এই বাড়িতে। সেদিন আমার তাঁকে দেখে মনে হয়েছে একটি প্রাণবন্ত গাছের উপর বাজ পড়লে যেমন হয়, তেমন আর কি! সত্যিই তো, আজীবন তাঁকে যে ঝড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, তেমন মানুষ সচারচর দেখা যায় না। (Jyotirmoy Dutta)
“জ্যোতিকাকা চলে গেলেন এক নতুন দিন শুরু হওয়ার আগে। বলা যায় ব্রাহ্মমুহূর্তেই পৃথিবী তাঁকে টেনে নিলেন। এই বসুন্ধরা তাঁর জীবনে অনেকখানি জুড়েই রয়েছেন।”
এক পালভাঙা নৌকার মাঝির মতন তাঁকে লাগছিল। তীব্র পারিবারিক শোক তাঁর উপর বারংবার আঘাত হানলেও তাঁকে কিন্তু নোওয়াতে পারেনি। আমি জ্যোতিকাকার এই অবস্থার সঙ্গে বাবার জীবনের শেষ অধ্যায়ের বেশ মিল খুঁজে পেয়েছি। বাবা বা জ্যোতিকাকাদের মতো দামালরা যেভাবে জীবনকে পায়ের ভৃত্যের মতো দেখতেন, তাতে কার কী এল গেল জানি না, আমার মতন নিতান্ত ছাপোষা মানুষদের জগৎ সবসময় আলো হয়ে থাকত।
এই আলোকময়, বর্ণময় জীবনগুলোর প্রতিটি অধ্যায় আমার কাছে অনন্ত বীরগাথা হয়ে রয়ে গেল। (Jyotirmoy Dutta)
জ্যোতিকাকা চলে গেলেন এক নতুন দিন শুরু হওয়ার আগে। বলা যায় ব্রাহ্মমুহূর্তেই পৃথিবী তাঁকে টেনে নিলেন। এই বসুন্ধরা তাঁর জীবনে অনেকখানি জুড়েই রয়েছেন। আমি তাঁদের আমোদপুরের বাড়িতে গেছি। সেই বাড়িটিও ভারি চমৎকার। সেই বাড়ির নামও ‘বসুন্ধরা’। ওইরকম এক গ্রামের ভিতর যে এক অসাধারণ ডিজাইনের এমন বাড়ি থাকতে পারে, তা আমি ভাবতে পারিনি। এই বাড়িটি তৈরি ও ইন্টিরিয়ার করেছিলেন তাঁরই পরের ভাই আলোকময়। ভোলানাথ দত্ত ও ঊষা দত্তর বহু সন্তানের মধ্যে জ্যোতি কাকা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তবে তাঁদের প্রায় সব সন্তানই ছিলেন বহুমুখী গুণের অধিকারী। (Jyotirmoy Dutta)
আরও পড়ুন: বিস্মৃত পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন
জ্যেতিকাকার যে কয়টি গুণের আমি পরম ভক্ত ছিলাম, তাঁর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল তাঁর বাচনভঙ্গি। খুব সহজ কথা তিনি যেরকমভাবে বুনে যেতে পারতেন, তা আমার সামনে এক রঙিন কার্পেটের মতো ভেসে উঠত। তাঁর অ্যাডভেন্চারাস জীবনের ওই ম্যাজিক কার্পেট চড়েই আমি ভেসে গেছি কখনও মণিমেখলা করে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে, কখনও কনটিকি রেস্তোঁরায়, কখনও বা মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু নেতা রঙ্গলাল গোলদারের ডেরায়। চারিদিকেই ছিল তাঁর নানাবিধ কীর্তির সাক্ষর। অবাধ যাতায়াত ছিল সর্বত্র। ফলে তিনি যে সাহিত্যের বাগানেও অনায়াসে ফুল ফোটাবেন এ বলাই বাহুল্য। তাঁর কীরকম শক্তিশালী গদ্য ছিল, সে প্রমাণ বারংবার দিয়েছেন তাঁর সাংবাদিক জীবনে। (Jyotirmoy Dutta)
এমনকি তাঁর যৌবনের কবিতাগুলোতেও তিনি স্বতন্ত্রতার পরিচয় রেখে গেছেন। সাংবাদিক জ্যোতি দত্তর জীবন শুরু হয় অমৃতবাজার পত্রিকায়, সেখান থেকে স্টেটসম্যান পত্রিকায়। ইংরাজি বা বাংলা দুই ভাষাতেই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ, সব্যসাচী। যা সংবাদপত্রের জগতে খুবই বিরল। বাংলা সংবাদপত্র জগতেও তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন বারংবার।

তাঁর মতন দুর্জয় সাহসও আমি কম দেখেছি। ভারতের জরুরি অবস্থার সময় বাবা ও জ্যোতিকাকা মিলে কলকাতা পত্রিকার মাধ্যমে যেভাবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন তাতে আমাদের এই বাংলার মসনদে বসে থাকা স্বৈরতান্ত্রিক শাসকটির চেয়ারও প্রায় কেঁপে উঠেছিল। (Jyotirmoy Dutta)
পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি যেভাবে এই শহরে ঘুরে বেড়াতেন, তা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। দু’জনের কপালেই তখন ইনাম হিসাবে জোটে কারাগার। তাতে কী বা এল গেল, তাঁরা যে উভয়েই বাক স্বাধীনতার পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, তা জরুরি অবস্থা চলাকালীন অকুতোভয়ে নানাভাবে বলে গিয়েছিলেন। কোনও অবস্থাতেই এই দুই ব্যক্তিকে দিয়ে জরুরি অবস্থার সপক্ষে তদানীন্তন সরকার কিছুই লেখাতে বা সই করাতে পারে নি। আমি সেই সময় তাঁর আর বাবার মধ্যে যে জিনিসটি খুঁজে পেয়েছিলাম, তা হল পারস্পরিক এক নির্ভরতা, এক বোঝাপড়া। তাঁদের সেদিনের সংগ্রামের ক্ষেত্রে এই দুটি অব্যর্থ অস্ত্রই তাঁদের দীর্ঘদিনের এক সংগ্রামকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করেছিল। (Jyotirmoy Dutta)
“জ্যোতিকাকার মেয়ে তিতির যার পোশাকি নাম কঙ্কাবতী, সে আমার সমবয়সী। ফলে আমাদের দু’জনের সম্পর্কটা কোনও এককালে ভালোবাসার গভীর সুতোয় বাঁধা পড়ে।”
আমাদের থেকেও জ্যোতিকাকার বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি, অবান্তর জিজ্ঞাসাবাদ ঘনঘন ঘটেছিল। তাঁর স্ত্রী মীনাক্ষী দত্তকে অনেক বেশি কঠোর বাস্তবের সম্মুখীন হতে হয়। তাঁর কিশোরী কন্যা তিতিরকেও পুলিশ নানাবিধ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পিছপা হয়নি। এইসব জ্বলন্ত ঘটনা সেইসময়ের থেকেও এইসময়ে যখন সরাসরি মাথায় ধাক্কা মারে তখন প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করতে পারি কী এক গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের মধ্যে দিয়ে এখন যাচ্ছি। ভীষণভাবেই তাঁদের অভাব বোধ করি। আমি জানি আমি ছাড়াও আরও বহুজনই তাঁদের মতো এইরকম ঋজু ব্যক্তিত্বদের মিস করেন।

বাবা আর জ্যোতিকাকার মারকাটারি আড্ডার নানা টুকরো স্মৃতি মণিমুক্তোর মতন ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। জ্যোতিকাকার মেয়ে তিতির যার পোশাকি নাম কঙ্কাবতী, সে আমার সমবয়সী। ফলে আমাদের দু’জনের সম্পর্কটা কোনও এককালে ভালবাসার গভীর সুতোয় বাঁধা পড়ে। তারই ডাকে জ্যোতিকাকার শেষ জীবনে তাঁর কাছে কয়েকবার গেছি। কথা কম হয়েছে নীরবতাই বেশি ছিল সেইসব সন্ধ্যায়। বাড়ি ফেরার পথে হিসাব মেলাতে মেলাতে ফিরতাম। ভাবতাম এই জ্যোতিকাকাই কি সেই স্টাইলিস্ট, বাকপটু, সদাহাস্যময় আমার জীবনের এক অন্যরকম প্রিয় পুরুষ ছিলেন? যিনি আবার বুদ্ধদেব বসু- প্রতিভা বসুর জ্যেষ্ঠ জামাতাও ছিলেন। এক ক্ষীণ, ম্লান মুখটির দিকে তাকাতে তাকাতে, ভাবতে চেষ্টা করতাম, ইনিই কি চিরপ্রেমিক হিসাবে আমার কৈশোরের মনোবাগানে অনেকখানি জুড়ে ছিলেন?
তাঁর আর মীনাক্ষীর সাড়াজাগানো প্রেম কাহিনি তাঁদের সময়েই ছিল বেশ চর্চিত, আমাদের সময়েও যা ছিল চরম রোমান্টিক। (Jyotirmoy Dutta)
আরও পড়ুন: কাছে ছিলে দূরে গেলে
কিন্তু বাস্তব বাস্তবিকই খুব কঠিন। আর কঠিন বলেই জ্যেতিকাকার জন্য এক প্রচণ্ড উদ্বেগে ও চিন্তায় দিন কাটাতাম। শেষের কয়েকটা দিন তিতিরকে ফোন করিনি। পরে তার মুখেই শুনলাম শেষটা তিতিরের কাছেই ছিলেন। আগেরদিনও তারা আড্ডা, গানে গল্পে সন্ধ্যা কাটিয়েছেন। পরের দিন সকালেই চলে গেলেন বসুন্ধরার কোলে। তাঁকে দু’হাত বাড়িয়ে সস্নেহে কাছে টেনে নিলেন তিনি। নিমেষে আমাদের সব উদ্বেগের অবসান ঘটে গেল। (Jyotirmoy Dutta)
আমি ভাবছিলাম এইসব রঙিন মানুষরা যখন আমাদের ত্যাগ করে চিরকালের জন্য বিদায় নেন, চারিদিক কেমন বর্ণহীন হয়ে পড়ে, কিছুই ভাল লাগে না তখন। আমায় এটাও ইদানিং খুবই ভাবায় যেসব ব্যক্তি এইসব মানুষের স্পর্শ পেলেন না, জানতেই পারলেন না, তাঁদের পাহাড়প্রমাণ খ্যাপামির মধ্যে দিয়ে মানুষকে চেনার ক্ষমতার কথা, তারা কি হতভাগ্য?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সহানা নাগচৌধুরী একজন স্বতন্ত্র সাংবাদিক, লেখিকা ও সমাজকর্মী। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তিনি 'বর্তমান' পত্রিকার সঙ্গে রিপোর্টার, সাব-এডিটর ও সিনিয়র এডিটর হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নারী ও শিশু বিষয়ক সমস্যা, স্বাস্থ্য এবং বিনোদন জগতের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ওয়েব প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
