(Single Mother)
নারীশক্তির উত্থানের যুগে মেয়ে পাইলট, পুলিশ অফিসার, কুস্তিগীর, ট্যাক্সিচালক, টেনিস প্লেয়ার, মহাকাশচারীদের পাশাপাশি আরেক ধাঁচের গ্ল্যামার কুইনদের গল্প সনাতন ভারতবর্ষের ইতিহাসে আজও জ্বলজ্বলে। তখন যুগটা ছিল পিতৃতান্ত্রিক। অথচ, মহাকাব্যের পাতায় পাতায় এই মায়েরা সব ‘এক সে বড় কর এক’গ্লিটারেটি। সিঙ্গল মাদার আমাদের দেশে নতুন কনসেপ্ট নয়। চাকচিক্যময় মাদারহুডের বিজ্ঞাপনে মোটেও বেমানান নন এঁরা। আমাদের দেশের কিংবদন্তীর দলিল বলেছে এদের কথা।
ভারতীয় পুরাণের সিঙ্গল মাদারহুড নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ল বিশিষ্ট পুরাণবিদ দেবদূত পট্টনায়কের একটি কথা।— ‘A mother gives birth to a child, but did God give birth to a mother or did mother gives birth to a God?’
আসলে পুরাণে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান মন্দিরের গর্ভগৃহে। আবার, গর্ভ হল নারীর দেহের অভ্যন্তরের এক কক্ষ, যেখানে সন্তান ধারণ হয়। প্রতিটি নারীই প্রকৃতিস্বরূপিণী ও শস্য উৎপাদনে গর্ভ দান করে। মাটির যেমন ধারণ ক্ষমতা আছে, ঠিক তেমনি নারীরও আছে গর্ভধারণের ক্ষমতা। আর প্রকৃতিও আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে ঈশ্বর বৈকি। তাই মাতৃত্বলাভ এক ঐশ্বরিক ঘটনা। তা নিজের সন্তান হোক বা অন্য উপায়ে প্রাপ্ত সন্তানকে সম্পূর্ণ একা প্রতিপালন করেই হোক। আর সেখানেই পুরাণের নমস্য সব মায়েদের কৃতিত্ব। যাঁরা স্বামীর সাহায্য ছাড়াই স্বামীর সন্তানদের বড় করেছেন।
রামায়ণে গর্ভিণী সীতাকে লক্ষ্মণের সঙ্গে বাল্মিকীর আশ্রমে পাঠিয়ে দেন রাম। তারপরই লব-কুশের জন্ম। তাদের লালনপালন সীতা একা হাতে করেছেন। পরে রামের সঙ্গে এই দুই বালক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে রীতিমত কনফ্রন্ট করেছে। সেও আমাদের অজানা নয়। সেখানেই একক মা সীতার চারিত্রিক দৃঢ়তা জিতিয়ে দিয়েছে তাঁকে। সীতার মাতৃত্ব টপকে গিয়েছে রামের পিতৃত্বকে।

রাজা দুষ্যন্তের সঙ্গে গান্ধর্বমতে বিয়ের পর শকুন্তলার গর্ভের পুত্র ভরত লালিত হয় কণ্বমুনির আশ্রমেই। দুষ্যন্ত এই পুত্রকে অস্বীকার করেছিলেন। সেই অর্থে শকুন্তলাও একক মায়ের স্নেহ দিয়ে পালন করেছিলেন ভারতবর্ষের এই ভাবী রাজাকে। দুষ্যন্তের অবাঞ্ছিত পিতৃত্ব তাঁকে হারিয়ে দিলেও, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তাঁর পুত্র ভরতকে রাজত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেনি।
এমন আরেক একক মা ছিলেন জবালা। বহু পুরুষের দ্বারা ভোগ্যা এই স্ত্রীলোকের গর্ভের সন্তান সত্যকাম। পিতৃপরিচয় অজানা। কৈশোরে উপনীত সত্যকামকে যখন তার মা গৌতমমুনির গৃহে অধ্যয়নে পাঠালেন, তখন মুনি দেখামাত্রই বালকের নাম, পিতৃপরিচয় ও গোত্র জানতে চাইলেন। সত্যকাম মাকে এসে জানাতেই জবালা দর্পের সঙ্গে ঋষির গৃহে গিয়ে বললেন, তিনিই শিশুর একমাত্র অভিভাবক। তাঁর পরিচয়েই শিশু বড় হয়েছে। জবালার পুত্রই তার একমাত্র পরিচয়। তাই, আজ থেকে জবালার পুত্রের নাম জবালী সত্যকাম। এমন উত্তরে মুনি যারপরনাই খুশি হয়ে, সত্যকামের অধ্যয়নের ভার নিলেন। বিদ্যায় বুদ্ধিতে এই পুত্র জ্ঞানের শিখরে উঠলেন।
পেশিবহুল সুদর্শন ভীমসেনকে দেখামাত্রই হিড়িম্বা প্রেমে পড়লেন। আলাপ জমে উঠল। সংহার করা দূরের কথা, তিনি কুটিরে গিয়ে পাণ্ডবভ্রাতা এবং মাতা কুন্তীর দর্শন পেয়ে যেন বর্তে গেলেন।
মহাভারতের আদিপর্বে এলেন আরেক তেজদৃপ্ত আদিবাসী রমণী। পাণ্ডবদের বনবাস পর্বে অরণ্যের মধ্যে ভীমের দেখা তাঁর সঙ্গে। তাঁর ভাই হিড়িম্ব, বোন হিড়িম্বাকে পাঠালেন পাণ্ডবদের বধ করে, তাদের মাংস নিয়ে আসার জন্য। হিড়িম্ব ভক্ষণ করবেন সেই নরমাংস।
দশাসই, পেশিবহুল সুদর্শন ভীমসেনকে দেখামাত্রই হিড়িম্বা প্রেমে পড়লেন। আলাপ জমে উঠল। সংহার করা দূরের কথা, তিনি কুটিরে গিয়ে পাণ্ডবভ্রাতা এবং মাতা কুন্তীর দর্শন পেয়ে যেন বর্তে গেলেন। আহা! ভীমের মতো স্বামী যদি পান তিনি!
শুধুমাত্র নিখাদ ভালবাসা দিয়ে পাণ্ডবদের সতর্ক করলেন আসন্ন বিপদের হাত থেকে। আর জানালেন তাঁর ভাইয়ের দুরভিসন্ধি। যেনতেনপ্রকারেণ তিনি তাদের হিড়িম্বের হাত থেকে রক্ষা করবেন বলে কথা দিলেন। অগত্যা ভীমসহ বাকিরাও মোহিত এই আদিবাসী কন্যার ব্যবহারে। রাজমাতা কুন্তীও সে যাত্রায় খুশি, পুত্রনাশের আশঙ্কায় ছেদ পড়ল বলে।

এদিকে হিড়িম্ব এই ঘটনাকে সমগ্র রাক্ষসকুলের চূড়ান্ত অপমান বলে মনে করলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে ভীমকে আক্রমণ করলেন, কিন্তু পরাজিত হয়ে প্রবল যুদ্ধে তার প্রাণ গেল। এরপর যথারীতি হিড়িম্বা ভীমকে বিবাহের উদ্দেশ্যে পাণ্ডবদের অনুসরণ করেন। তাঁদের বিয়ে হতে হিড়িম্বার গর্ভে বলবান, ঘটের ন্যায় শিরযুক্ত এক পুত্র হল, যে ঘটোৎকচ নামে পরিচিত।
হিড়িম্বার এহেন একটি পুত্রের জন্মে সবকিছু ঘুরে গেল। এমন এক ছেলে রাজ পরিবারে থাকলে কানাঘুষো চলতেই থাকবে। একে তো অনার্য এক রাক্ষুসী এই ছেলের মা, তায় সবার আগেই ভীমের ছেলে হয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে রাজ সিংহাসনের দাবিদার হতে পারে এই অনার্য পুত্র। অতএব, তাকে তার মায়ের সঙ্গেই থাকতে দেওয়া হোক। সপরিবারে মোটেও নয়। অরণ্যবাসী অনার্য কন্যা তার অসুন্দর পুত্র নিয়ে অরণ্যেই ফিরে যাক। ভক্তির পরাকাষ্ঠা, পঞ্চকন্যার সঙ্গে স্মরণীয়া কুন্তীদেবীর এমনই বিধান ছিল।
ঘটোত্কচের মৃত্যুর জন্য কেউ চোখের জল ফেলেনি। ঠিক যেমন হিড়িম্বার জন্যেও কেউ বিন্দুমাত্র ভাবেনি। সহজ সরল প্রেমের বিনিময়ে একদিন এই অনার্য স্ত্রীলোক পাণ্ডবদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কিন্তু এই একক মা হয়ে বেঁচে থেকে তার কি হল?
অনার্য, উপজাতীয় রমণী বলে হিড়িম্বাকে একক মাতৃত্ব বরণ করতে হয়েছিল। স্বেচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়ে। সে চেয়েছিল ভীমসেনের সঙ্গে আলাদা ঘর বাঁধতে। অথবা, এক যৌথ পরিবারের সদস্য হয়ে আজীবন থাকতে। তবে এই একক মাতৃত্ব হিড়িম্বার মধ্যে সর্বদা একটা আলাদা ইগো তৈরি করেছিল। সে বা তার পুত্র কোনও অংশে কম নয়… এই বিশ্বাস দৃঢ়চেতা হিড়িম্বা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল বারেবারে।
হয়তো কুন্তী ভয় পেয়েছিলেন, পাণ্ডবকুলের প্রথম রাজবধূ হয়ে হিড়িম্বা যদি রাজমহিষীর পদ অভিষিক্ত করতে চায়, অথবা তার পুত্র ঘটোত্কচকে রাজা করতে চায়। অতএব, হিড়িম্বা একক মাতা হয়েই রয়ে গেলেন মহাভারতে কাব্যে উপেক্ষিতার মতো।

উপকারীর উপকার মনে রাখেনি মহাভারত। পুত্রের মৃত্যুর পর হিড়িম্বাকেও কেউ হাজির করেনি আর। ঘটোত্কচের মৃত্যুর জন্য কেউ চোখের জল ফেলেনি। ঠিক যেমন হিড়িম্বার জন্যেও কেউ বিন্দুমাত্র ভাবেনি। সহজ সরল প্রেমের বিনিময়ে একদিন এই অনার্য স্ত্রীলোক পাণ্ডবদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কিন্তু এই একক মা হয়ে বেঁচে থেকে তার কী হল? সারাজীবন যার জন্য পড়ে রইল জঙ্গলমহল, একার সংসারে নিজের সঙ্গে নিজের টানাপোড়েন। পুরুষবর্জিত জীবনে একা হাতে লালন করলেন ভীমের পুত্র ঘটোত্কচকে। নিজের ভাগ্য নিজেই জয় করলেন তিনি। যাঁর নিজের জন্য বেঁচে রইল না এক ফোঁটা স্বপ্ন, কিংবা চকিতে জ্বলে উঠল না এক বিন্দু আশার আলো।
মহাভারতের সব কটি নারী চরিত্রের মধ্যে বিশুদ্ধতম এবং নিঃস্বার্থ ভালবাসার আদর্শস্বরূপ হয়ে বেঁচে রইলেন স্বাধীন জেনানা হিড়িম্বা। কে জানে, কথাকার ব্যাসদেব হয়তো দ্রৌপদীকেই মহান করতে চেয়েছিলেন, তাই হিড়িম্বা থেকে গেল ব্রাত্য। বংশের প্রথম সন্তান হয়েও রাজত্ব পাওয়া দূরের কথা, তাঁর সন্তান ডিস্ক্রিমিনেটেড হয়েই রইল। আর সুযোগ বুঝে তাঁকে কাজে লাগানো হল। কোথায় গেল মহাভারতের কাহিনিকার, আদর্শবান রাজা, কূটনৈতিক, বিদূষক, যুক্তিবাদী বাক্যবাগীশদের বাক্যবাণ?
বনবাসে অর্জুন তাঁকে বিয়ে করে সন্তান দিয়ে চলে গেলেন। এই নাগকন্যা আজীবন লালন করেছেন অর্জুনপুত্র ইরাবানকে। প্রয়োজনে অর্জুনকে সাহায্য করেছেন।
আবার অর্জুনের চার স্ত্রীর মধ্যে অন্যতম সর্পকন্যা উলুপি। এই পন্নাগনন্দিনী উলুপি প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তো একাই ছিলেন পিতৃগৃহে। কিন্তু, বনবাসে অর্জুন তাঁকে বিয়ে করে সন্তান দিয়ে চলে গেলেন। এই নাগকন্যা আজীবন লালন করেছেন অর্জুনপুত্র ইরাবানকে। প্রয়োজনে অর্জুনকে সাহায্য করেছেন। সপত্নী চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহনকেও লালন করেছেন সন্তানস্নেহে। কিন্তু বিধবা উলুপির পূর্বপতির ক্ষেত্রজ পুত্র যে ইরাবান, তা-ই মহাভারতের মূলস্রোতে কলকে পেল না। অথচ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন ইরাবানকে কাজে লাগালেন। সে আরেক অন্য গল্প। পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানে যাওয়া পর্যন্ত উলুপি পাণ্ডবদের সঙ্গেই ছিলেন। পাণ্ডবরা চলে গেলে তিনি আবার গঙ্গা-গর্ভে ফিরে যান, কিন্তু পরার্থে উলুপির একক মাতৃত্ব যাপন ভুলে গেলে চলবে না।

সবশেষে, ভাগবতপুরাণের আরেক একক মায়ের কথা না বললেই নয়, যার নাম দেবাহুতি। স্বয়ম্ভু মনুর ঔরসে শতরূপার গর্ভজাত সন্তানদের মধ্যে দেবাহুতি ছিলেন রাজা প্রিয়ব্রতের ভগিনী। কর্দম ঋষির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, আর বিষ্ণু ধর্ম ও জ্ঞান বিষয়ক উপদেশ দানের জন্য দেবাহুতির গর্ভে নয়জন কন্যাসহ ঋষি কপিলের জন্ম হয়। কিন্তু, সুখের সংসার ও স্ত্রীর ভক্তি শ্রদ্ধা প্রাপ্তির পরেও বৈরাগ্য জন্মায় ঋষি কর্দমের। তিনি সংসার ত্যাগ করে বনবাসে চলে যান তপস্যায়। একা জননী দেবাহুতি সন্তানদের প্রতিপালনে অনড় ছিলেন। কর্দম সন্তান চাননি, কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষেরা মোক্ষলাভের জন্য তাঁকে বলেছিলেন সন্তানের পিতা হতে। তাই তিনি সন্তানদের প্রতিপালনের দায়িত্ব নিতে চাইলেন না। ভারতীয় সাংখ্যদর্শনের প্রবক্তা কপিলমুনির এহেন পিতা ঋষি কর্দমের মোক্ষলাভ হল সবশেষে বনবাসে গিয়ে।
তথ্যসুত্র – Devlok – Devdutt Pattanayak, পুরাণকোষ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
চিত্রঋণ: উইকিমিডিয়া কমনস, রাজা রবিবর্মা
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
রসায়নের ছাত্রী ইন্দিরা আদ্যোপান্ত হোমমেকার। তবে গত এক দশকেরও বেশি সময় যাবৎ সাহিত্যচর্চা করছেন নিয়মিত। প্রথম গল্প দেশ পত্রিকায় এবং প্রথম উপন্যাস সানন্দায় প্রকাশিত হয়। বেশ কিছু বইও প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যেই। সব নামীদামি পত্রিকা এবং ই-ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখেন ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, রম্যরচনা ও প্রবন্ধ।
