(Sovan Lal Saha)
চলে গেলেন শোভনবাবু। ২০২৬ সালের ৮ই মার্চ গভীর রাতে বাংলার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক বিষণ্ণ অধ্যায়ের সূচনা হল। ‘হিন্দুস্থান রেকর্ড’-এর কর্ণধার শোভনলাল সাহার প্রয়াণে যেন একটি যুগের অবসান ঘটল। প্রায় এক শতাব্দী ধরে যে প্রতিষ্ঠান বাঙালি সংস্কৃতির হৃদস্পন্দনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই আঙিনায় নেমে এসেছে এক গভীর স্তব্ধতা।
শোভনবাবু কেবল একজন কর্পোরেট প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে ঐতিহ্যের প্রহরী, দূরদর্শী উদ্যোক্তা এবং সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাঁর বিশ্বাস ছিল— সঙ্গীত কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়। এটি একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের অংশ। তাই তাঁর চলে যাওয়া কেবল তাঁর পরিবার বা সহকর্মীদের ব্যক্তিগত শোক নয়; সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে এক গভীর ক্ষতি।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞাপনের ঋতু পরিবর্তন
শোভনলাল সাহার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য তাঁর দুটি ভিন্ন সত্তার অসাধারণ সমন্বয়। পেশাগত পরিচয়ে তিনি ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। সংখ্যার জগৎ, আর্থিক পরিকল্পনা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল তাঁর দৈনন্দিন কাজের অংশ। কিন্তু এই বাস্তবমুখী পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তাঁর হৃদয়ের গভীরে ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি নিবিড় অনুরাগ।
এই দ্বৈত সত্তাই তাঁর প্রকৃত শক্তি। সঙ্গীতের মতো সৃজনশীল অথচ অনিশ্চিত জগতে তিনি একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের বিচক্ষণতা, বাস্তববোধ এবং দূরদর্শিতা প্রয়োগ করেছিলেন। শিল্পের প্রতি ভালবাসা এবং ব্যবসায়িক শৃঙ্খলার এক অনন্য মেলবন্ধন তাঁর নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছিল।

বিশেষ করে গত কয়েক দশকে সঙ্গীত শিল্পে যে কঠিন সময় প্রতিফলিত হয়েছে, সেখানে শোভনবাবুর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাইরেসির দাপট, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং ডিজিটাল মাধ্যমের আগ্রাসনে বহু পুরনো রেকর্ড কোম্পানি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। সেই সময়ে তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব এবং পরিকল্পনাই হিন্দুস্থান রেকর্ডকে টিকিয়ে রেখেছিল এক ‘নিরাপদ এবং নির্বিকল্প ঠিকানা’ হিসেবে।
এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি কেবল ব্যবসায়িক সংস্থা হিসেবে দেখেননি। বরং এটি ছিল তাঁর কাছে এক ‘ভালবাসার ধন’। সেই কারণে বাণিজ্যিক লাভের জন্য কখনও সাংস্কৃতিক মর্যাদার সঙ্গে আপস করতে রাজি হননি। শিল্পের মর্যাদা এবং ঐতিহ্যের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর কাছে সর্বাগ্রে ছিল।
কখনও অতীতের স্মৃতির খাঁচায় বন্দি থাকতে চাননি তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল— ঐতিহ্যকে জীবিত রাখতে হলে তাকে বর্তমানের সঙ্গে সংলাপে থাকতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই তাঁর নেতৃত্বে হিন্দুস্থান রেকর্ড কেবল একটি সঙ্গীত সংস্থা হয়ে থাকেনি; ক্রমে পরিণত হয়েছে এক বহুমুখী সাংস্কৃতিক শক্তিতে।
শোভনলাল সাহা যখন হিন্দুস্থান রেকর্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন কেবল একটি কোম্পানির পরিচালনার দায়িত্বই পাননি; কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ৯৪ বছরের ঐতিহাসিক এক উত্তরাধিকার। গত শতকের শেষ পর্ব থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি হিন্দুস্থান রেকর্ড এবং ইনরেকো এন্টারটেইনমেন্টকে নানা পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে সঙ্গীত জগৎ আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ৭৮ আরপিএম রেকর্ড থেকে শুরু করে ভিনাইল, ক্যাসেট, কম্প্যাক্ট ডিস্ক— অবশেষে আজকের ডিজিটাল স্ট্রিমিং— প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে এই শিল্প। আর প্রতি পর্যায়ে শোভনবাবু ছিলেন এক অবিচল কাণ্ডারি, যিনি জানতেন কীভাবে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, অথচ নিজের শিকড়কে অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়।

কখনও অতীতের স্মৃতির খাঁচায় বন্দি থাকতে চাননি তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল— ঐতিহ্যকে জীবিত রাখতে হলে তাকে বর্তমানের সঙ্গে সংলাপে থাকতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই তাঁর নেতৃত্বে হিন্দুস্থান রেকর্ড কেবল একটি সঙ্গীত সংস্থা হয়ে থাকেনি; ক্রমে পরিণত হয়েছে এক বহুমুখী সাংস্কৃতিক শক্তিতে।
২০১৮ সালে তাঁর উদ্যোগে হিন্দুস্থান রেকর্ডের ঐতিহাসিক রেকর্ডিং স্টুডিয়োর আধুনিকীকরণ হয়। এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতীকী পদক্ষেপ। কারণ এই স্টুডিওর দেওয়ালগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় সঙ্গীতের বহু মহীরুহের স্মৃতি— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কে.এল.সায়গল, শচীন দেব বর্মন, দেবব্রত বিশ্বাসের মতো শিল্পীদের সুরসৃষ্টি এখানেই ধ্বনিত হয়েছে একদিন। এই ঐতিহাসিক পরিবেশের মাঝেই তিনি যুক্ত করেছিলেন একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। ফলে অতীতের ঐতিহ্য এবং বর্তমানের প্রযুক্তির এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটেছিল সেখানে। আজও বহু সমকালীন শিল্পী সেই স্টুডিওতে গান রেকর্ড করতে এসে অনুভব করেন এক বিশেষ অনুপ্রেরণা— যেন অতীতের সুরেরা নীরবে তাদের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে।
আর্কাইভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হিন্দুস্থান রেকর্ড এবং ইনরেকোর কাছে যে বিপুল রেকর্ডিং ভাণ্ডার রয়েছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়; এটি ভারতীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যের এক অমূল্য ধনভাণ্ডার। শোভনবাবু এই সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই বিপুল সংগ্রহকে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। তাঁর দূরদর্শিতার ফলেই বহু অমূল্য রেকর্ডিং আজও ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রয়েছে।
সঙ্গীতের গণ্ডির বাইরে গিয়েও শোভনবাবুর চিন্তা বিস্তৃত হয়েছিল। তাঁর সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ছিল একটি বই প্রকাশনা বিভাগ গড়ে তোলা। এই বিভাগের মাধ্যমে বাংলার বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীদের জীবন, কর্ম এবং সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
এই কাজ নিছক প্রকাশনার ব্যবসা নয়; বরং এটি বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাস সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। কারণ তিনি বুঝতেন— যদি শিল্পীদের জীবনকথা লিপিবদ্ধ না হয়, তবে একসময় সেই ইতিহাস হারিয়ে যেতে পারে। তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত বইগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।

আর্কাইভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হিন্দুস্থান রেকর্ড এবং ইনরেকোর কাছে যে বিপুল রেকর্ডিং ভাণ্ডার রয়েছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়; এটি ভারতীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যের এক অমূল্য ধনভাণ্ডার। শোভনবাবু এই সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই বিপুল সংগ্রহকে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। তাঁর দূরদর্শিতার ফলেই বহু অমূল্য রেকর্ডিং আজও ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রয়েছে।
আজকের কঠিন প্রতিযোগিতামূলক সময়েও হিন্দুস্থান রেকর্ড যে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে, তার পেছনে রয়েছে শোভনলাল সাহার নিষ্ঠা, শ্রম এবং সহকর্মীদের প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস। কর্মীদের তিনি কেবল কর্মচারী হিসেবে দেখতেন না; বরং একটি বৃহত্তর পরিবারের সদস্য ভাবতেন।
বাংলা আজ কেবল একজন সফল ব্যবসায়ীকে হারায়নি। বাংলা হারিয়েছে একজন শিল্পপৃষ্ঠপোষক, সাংস্কৃতিক দূরদর্শী এবং সুরের ঐতিহ্যের এক অতন্দ্র প্রহরীকে। তবে, অক্রূর দত্ত লেনের সেই আধুনিক স্টুডিওর নীরব ঘরে, প্রকাশিত বইগুলোর পাতায় এবং হিন্দুস্থান ও ইনরেকোর হাজার হাজার রেকর্ডিংয়ের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।
শোভনলাল সাহা ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি সঙ্গীতকে নিছক বাজারজাত পণ্যের চোখে দেখেননি। তাঁর কাছে সঙ্গীত ছিল এক পবিত্র দায়িত্ব— যা রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
এই কারণেই তিনি যেন এক সেতুবন্ধন হয়ে উঠেছিলেন— মতিলাল সাহা ও চণ্ডীচরণ সাহার যুগের ঐতিহ্যের সঙ্গে ২০২৬ সালের ডিজিটাল যুগের বাস্তবতার মধ্যে।

বাংলা আজ কেবল একজন সফল ব্যবসায়ীকে হারায়নি। বাংলা হারিয়েছে একজন শিল্পপৃষ্ঠপোষক, সাংস্কৃতিক দূরদর্শী এবং সুরের ঐতিহ্যের এক অতন্দ্র প্রহরীকে। তবে, অক্রূর দত্ত লেনের সেই আধুনিক স্টুডিওর নীরব ঘরে, প্রকাশিত বইগুলোর পাতায় এবং হিন্দুস্থান ও ইনরেকোর হাজার হাজার রেকর্ডিংয়ের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।
বাংলার সুর যতদিন অনুরণিত হবে— ততদিন সেই সুরের গভীরে মিশে থাকবে এক কবিহৃদয় পেশাদারের কথা, সারা জীবন ধরে যিনি সুরের ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছিলেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সুতীর্থ দাশ জন্ম হরিয়ানার শিল্পনগরী ফরিদাবাদে। পিতার কর্মসূত্রে বাল্য-কৈশোর কেটেছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের একাধিক শহরে। কলকাতায় এসে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে শিল্পশিক্ষার পাঠ নেওয়ার পর বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি। দীর্ঘ ১২ বছর বিজ্ঞাপনের পেশায় থাকার পর, পেশা বদল করে আসেন বেসরকারি রেডিও প্রোগ্রামিং’য়ের চাকরিতে। সেখানে আরও ১৮ বছর কাটিয়ে বর্তমানে ভারতের এক স্বনামধন্য মিউজিক কম্পানিতে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের কাজে যুক্ত।
পেশাগত কাজকর্মের পাশাপাশি ভালোবাসেন ছবি আঁকতে এবং লিখতেও। নিজের শিল্পীমন দিয়ে তিনি লেখেন গ্রাম-শহরের নানা কাহিনি। ছোট ছোট গল্পের জাল বুনে তিনি লিখে চলেন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা কাহিনি।
অজস্র প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই তিনি লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি বইও। সেগুলোর মধ্যে শহর কলকাতার বিভিন্ন আখ্যান নিয়ে লেখা ‘তিলোত্তমার গর্ভজাত’ পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়াও জাগিয়েছে। রেডিয়ো নিয়ে তাঁর প্রথম বই ‘তরঙ্গে অন্তরঙ্গে – কলকাতা বেতারের উপকথা’ ইতিমধ্যে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
