(Sudipta Sengupta)
বছর দেড়েক আগের কথা। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর মাস। কলকাতায় তখন জোরদার আরজি কর আন্দোলন চলছে, ওদিকে তিরুবনন্তপুরমের ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্থ সায়েন্স স্টাডিজে (সংক্ষেপে এনসিইএসএস) ভারতের নারী ভূতত্ত্ববিদদের একটা তিনদিনব্যাপী কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছিল। এনসিইএসএস ছাড়াও আয়োজনের দায়িত্বে ছিল ভারতের ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক। ভারত ভূখণ্ডে ভূবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে (যার বয়স মোটামুটি দুশোরও বেশি) এমনধারা বিজ্ঞান সম্মেলন এই প্রথম।
নবীনা, প্রবীণা মিলিয়ে ৬৫ জন ভূতত্ত্ববিদ ও গবেষক আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির মধ্যে ছিলেন জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কেরালা ইউনিটের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারাল ভি. আম্বিলি, অধ্যাপক হেমা অচ্যুতন, আহমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী কুলজিৎ কৌর মারহাস, লখনউয়ের বীরবল সাহানি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক বন্দনা প্রসাদ, এমন আরও অনেকে। তবে খানিক সঙ্গত কারণেই জমায়েতের আবেগ-আকর্ষণ যাঁকে ঘিরে, তিনি আশি ছুঁইছুঁই এক বাঙালি— সুদীপ্তা সেনগুপ্ত।
অনেক বছর আগে, তখনও সোভিয়েত বেঁচে আছে, নয়া উদারনীতির হাত ধরে, বিশ্বায়ন মধ্যবিত্তের ঘরে ঢুকে পড়েনি, বাঙালিকে ‘আন্টার্কটিকা’ চিনিয়েছিলেন এই নারী ভূবিজ্ঞানী। প্রথমে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়, তারপর ১৯৮৭ সালে বই হিসেবে বার করে আনন্দ পাবলিশার্স। প্রাঞ্জল গদ্যভাষার সঙ্গে উপরি পাওনা ছিল ফোটোপেপারে ছাপা তুষার মহাদেশের ঝকঝকে রঙিন ছবি।
দক্ষিণ কলকাতার বাঙালি ঘরের মেয়ে, ভারতের প্রথম দুই নারী বিজ্ঞানীর একজন হিসেবে (অন্যজন সমুদ্রবিজ্ঞানী অদিতি পন্থ) পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছেন— এ ব্যাপারটা তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি মহলে যথেষ্ট আলোচনার বিষয় ছিল।

তবে সুখপাঠ্যতার গণ্ডি ছাড়িয়ে কোনও বইকে যদি তার পাঠ ব্যাপ্তি-বিচারের নিক্তিতে মাপতে বসি, তবেই সে বইয়ের আসল গুরুত্ব বোঝা সম্ভব। ইংরাজিতে যাকে বলে ‘সেমিনাল’, সুদীপ্তা সেনগুপ্তের ‘আন্টার্কটিকা’ সম্পর্কে সে বিশেষণটি স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করা যায়। বইয়ের সাহিত্যমূল্য নিয়ে সূক্ষ্ম বিচারের চেষ্টা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। স্বয়ং সাগরময় ঘোষ যেখানে নির্বাচক-সম্পাদক দুই-ই, সেখানে সন্দেহ প্রকাশ করার স্পর্ধা দেখানোও নেহাত ছেলেমানুষি।
সুদীপ্তা পেশাদার সাহিত্যিক নন, ভূবিজ্ঞানীর ব্যস্ততা সামলেই সবটা লেখা। অথচ, নিজস্ব ভ্রমণবৃত্তান্ত, আন্টার্কটিকা-অভিযানের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, তৎকালীন বিশ্বরাজনৈতিক পরিস্থিতি— সবটাই তাঁর বইতে ঝরঝরে চেহারায় উপস্থিত। আসলে সামগ্রিকতার যে সৎ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি আন্টার্কটিকাকে ধরেছেন, ওইটেই তাঁর বই ঘিরে (তাঁকে ঘিরে তো বটেই) এক অদ্বিতীয় রোমাঞ্চের জন্ম দিয়েছে। এই রোমাঞ্চ থেকেই পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভাবতে শিখেছে, ভূতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করলে আক্ষরিক অর্থেই এতদূর যাওয়া যায়।
এমন পরিস্থিতিতে নারী হয়েও ‘অতদূর চলে যাওয়া’ সুদীপ্তা সেনগুপ্তের প্রতিও বিরাট অংশের মানুষের কৌতূহল সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ, এটা স্পষ্টই প্রমাণিত।
তিরুবনন্তপুরমের ওই কনফারেন্সে জীবাশ্মবিদ স্ত্রীর সূত্রে আমারও শেষদিন প্রবেশের ছাড়পত্র মিলেছিল। তার মুখেই শোনা, একাধিক বাঙালি বিজ্ঞানী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তাঁদের ভূতত্ত্ব বেছে নেওয়ার পিছনে অনুপ্রেরণা ছিল ‘আন্টার্কটিকা’ই।
আর কেবল শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণিটাই তো নয়। কোনও এক গ্রামের তরুণী গৃহবধূ সুদীপ্তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, সুদীপ্তা এতদূর চলে গিয়েছেন, আর তিনি সামান্য চিঠিও ডাকবাক্সে ফেলতে গেলে একা যাওয়ার অনুমতি পান না! সময়টাও দেখতে হবে। উত্তর-ঔপনিবেশিক পশ্চিমবাংলায় কয়েকটা দশকের যা ঘটনাপ্রবাহ, তাতে জনমানসের আত্মবিশ্বাস খুব পাকাপোক্ত ছিল না। রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছাত্রযুবসমাজ জ্বলে উঠলেও সে আগুন চটজলদি কোনও আলোর সন্ধান দিতে পারেনি, বরং দহনের মাত্রাই ছিল বেশি।

ফলে সাধারণ মানুষ বরাবরই খুঁজতে চেয়েছে কোনও ব্যক্তিকে, যিনি সাধারণের চরিত্রকেই অস্তিত্বে ধারণ করবেন, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি দেবে আকাশে। উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখতে যে শহর থেকে মফসসলের হলে লোক ভেঙে পড়ত, কিংবা পিকে-চুনীর পায়ের জাদু দেখতে গ্যালারি উপচে পড়ত, সবই ওই আঁকড়ে ধরার আকুতি থেকে। এমন পরিস্থিতিতে নারী হয়েও ‘অতদূর চলে যাওয়া’ সুদীপ্তা সেনগুপ্তের প্রতিও বিরাট অংশের মানুষের কৌতূহল সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ, এটা স্পষ্টই প্রমাণিত।
এখন, সুদীপ্তা সেনগুপ্ত নিজে বিজ্ঞানী, অতএব তাঁর মূল্যায়নটিও বৈজ্ঞানিক চরিত্র দাবি করে—‘আন্টার্কটিকা’ ছাড়িয়ে তাঁর গুরুত্বকে সামগ্রিকভাবে খুঁড়ে দেখা। যে ভাষার গাঁথুনির কথা বলছি, সেটা পারিবারিক মেধাচর্চার সূত্রেই পাওয়া। তখনকার শিক্ষিত, প্রগতিশীল বাঙালি পরিবারে যা মোটামুটি সাধারণ ছিল। বাবা জ্যোতিরঞ্জন সেনগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের কর্মী, মা পুষ্পরাণী কড়া গৃহকর্ত্রী।
চারের দশকের দাঙ্গা, দেশভাগ, গান্ধী-হত্যার ক্ষত পেরিয়ে পাঁচের দশকে নতুন, পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় তখন অভ্যস্ত হচ্ছে বাঙালি, যদিও স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি দেরি হয়নি। ওরই মধ্যে রোকেয়া শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন সুদীপ্তারা।
দু’দিকের পরিবার শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ঠাকুরদা মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত ছিলেন স্বদেশি, বরিশাল শহরে স্বদেশি স্কুল করেছিলেন। ওদিকে দাদামশাই শশধর মজুমদারও ছিলেন অসমের এক সরকারি স্কুলের প্রিন্সিপাল। সুদীপ্তা-সহ তিন মেয়ের পড়াশোনার দিকেই বাবা-মায়ের ছিল তীক্ষ্ণ নজর।
বাবার চাকরি সূত্রে তিন বোনের ছোটবেলা কেটেছিল কলকাতা, কাঠমাণ্ডু মিলিয়ে। চারের দশকের দাঙ্গা, দেশভাগ, গান্ধী-হত্যার ক্ষত পেরিয়ে পাঁচের দশকে নতুন, পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় তখন অভ্যস্ত হচ্ছে বাঙালি, যদিও স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি দেরি হয়নি। ওরই মধ্যে রোকেয়া শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন সুদীপ্তারা। স্কুল পাশের বছরে বন্ধুরা মিলে ইডেন গার্ডেন্সে ভারতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড-জয়ও দেখেছেন। আলগা নিরাপত্তার সে যুগে ইডেনের পিচে বসেই সামনে থেকে দেখেছেন পলি উমরিগর, টাইগার পতৌদি, চাঁদু বোর্ডে, সেলিম দুরানি, ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার, আর সেদিনের নায়ক এম. এল. জয়সিংহকে।

ওই বছরেই চিন-ভারত যুদ্ধ লেগেছে, সুদীপ্তা এসে পৌঁছেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইচ্ছা ছিল, পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়বেন। অবসরে বেড়াতে ভালোবাসেন শুনে ভূতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান শিবসুন্দর দেব বলেছিলেন, বেড়াতে ভালোবাসলে জিওলজিতে এসো। ওই একটি কথাতেই দ্রুত সিদ্ধান্ত বদল। সেবারের ব্যাচে অন্য ছাত্রীটি ছিলেন সুদীপ্তারই স্কুলের এক সহপাঠিনী।
মাত্র ছ’বছর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা পেয়েছে যাদবপুর, খনিজবিদ শিবসুন্দর দেব যাদবপুরের পূর্বসূরি বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছে ভূতত্ত্ব বিভাগ। স্বদেশি ভাবনার পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে যার পথচলা শুরু, স্বাধীনতা-পরবর্তীতে সেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠছে মননচর্চার নতুন এক কেন্দ্র, যা অনেক বেশি আধুনিক, অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তি-বান্ধব। শিবসুন্দর দেব সেই ভাবনারই শরিক, ফলে তিনিও চাইতেন, ভূতত্ত্ব পড়তে এগিয়ে আসুক মেয়েরাও। সুদীপ্তা সেনগুপ্ত ওই উন্নত সময়ভাবনারই উজ্জ্বল ফসল।
বৈজ্ঞানিক অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এল ১৯৯১ সালে, যখন ভারত সরকারের তরফে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার পেলেন সুদীপ্তা। পুরস্কারের প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৯ জন নারী প্রাপকের (পুরুষ প্রাপকের সংখ্যা ৫৫২) একজন তিনি।
তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র গঠন-সম্পর্কীয় ভূবিদ্যা বা স্ট্রাকচারাল জিওলজি। পাথরের গায়ে বিচিত্র গাঠনিক বিকৃতি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে ভাঁজ (ফোল্ড), চ্যুতি (ফল্ট), ফাটল (ফ্র্যাকচার), সন্ধি (জয়েন্ট), নানা ধরনের পাললিক গঠন (সেডিমেন্টারি স্ট্রাকচার)। এই ধরনের গাঠনিক বিকৃতির চর্চাই, গঠন-সম্পর্কীয় ভূবিদ্যার বিষয়-আশয়। সুদীপ্তা সেনগুপ্তের দীর্ঘ কাজের পরিসরে জায়গা পেয়েছে নুড়ি বিকৃতি (পেবেল ডিফরমেশন), বুডিনাজ (সম্প্রসারণের ফলে তৈরি হওয়া একধরনের ভূতাত্ত্বিক গঠন) স্তরের ফোল্ডিং, সুপারপোজড ফোল্ডিং, ছেদন ক্ষেত্রে (শিয়ার জোন) তৈরি হওয়া নানা ভূতাত্ত্বিক গঠনের মতো একাধিক বিষয়।
বৈজ্ঞানিক অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এল ১৯৯১ সালে, যখন ভারত সরকারের তরফে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার পেলেন সুদীপ্তা। পুরস্কারের প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৯ জন নারী প্রাপকের (পুরুষ প্রাপকের সংখ্যা ৫৫২) একজন তিনি।
তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজের আলোচনায় উল্লেখ করতে হবে সুবীরকুমার ঘোষের নামও— ভারতে গঠন-সম্পর্কীয় ভূবিদ্যার অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। সুদীপ্তা সেনগুপ্ত এঁর তত্ত্বাবধানেই পিএইচডি করেন, পরে তাঁরা সহকর্মীও হন। এই দু’জনের হাত ধরে যাদবপুরে গড়ে উঠেছিল ভারতের প্রথম গঠন-সম্পর্কীয় ভূবিদ্যার পরীক্ষাগার। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করেছেন এই শিক্ষক-ছাত্রীর জুটি। ভারতের বাইরেও সুদীপ্তা সেনগুপ্ত গবেষণা করেছেন লন্ডনের এম্পিরিয়াল কলেজ, সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্কটিশ হাইল্যান্ডস, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ক্যালেডোনাইডসের উপর তাঁর বিস্তারিত কাজ রয়েছে। এসব জায়গায় তাঁর কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছেন জেনেট ওয়াটসন, জন র্যামসে, হ্যান্স র্যামবার্গের মতো বিজ্ঞানীরা। পূর্ব আন্টার্কটিকার শির্মাকার পাহাড় অঞ্চলে তাঁর কাজটিই (১৯৮৩ ও ১৯৮৯, দু’বারের সফরে কাজটা শেষ করেন) তো ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।

শুধু ভূতাত্ত্বিক গবেষণাই নয়, পড়াশোনা করতে করতেই সুদীপ্তা পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়েছেন, তাও খোদ তেনজিং নোরগে আর নোয়াং গোম্বুর (প্রথম পর্বতারোহী, যিনি দু’বার মাউন্ট এভারেস্টে ওঠেন) কাছে। গাড়োয়াল হিমালয়ে রন্টি শৃঙ্গ অভিযান করেছেন, লাহুল অঞ্চলের নতুন এক শৃঙ্গ জয় করে তার নাম দিয়েছেন ‘ললনা’ (সম্পূর্ণ মেয়েদের নিয়ে তৈরি এই দলের কমলা সাহা আর দলনেত্রী সুজয়া গুহ ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান)। বস্তুত, সুদীপ্তা যে সময়ে ভূতত্ত্ব পড়তে এসেছেন, ততদিনে ভারতীয় বিজ্ঞানজগত কমলা সোহনী (জীব-রসায়ন), অসীমা চ্যাটার্জী (জৈব রসায়ন), পূর্ণিমা সিংহ (পদার্থবিদ্যা), বিভা চৌধুরীদের (কণা পদার্থবিদ্যা) পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু, ভূতত্ত্বের মতো ক্ষেত্রসমীক্ষা-কেন্দ্রিক বিজ্ঞান শাখায় মেয়েদের প্রবেশ তখনও প্রায় নেই।
পেশাগত জীবনের যে গুটিকয়েক বছর সুদীপ্তা জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় ছিলেন, তখন নারী ভূবিজ্ঞানীর সংখ্যা ছিল মাত্র তিন। পরে দ্রুত সিদ্ধান্তে জিএসআই ছেড়েও দিয়েছেন লিঙ্গবৈষম্যের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে। সেরকম এক সমাজে ভূবিজ্ঞান-গবেষণায় তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, কেবল ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি পেয়েছেন, আজ যে অন্তত জিএসআইতে নারী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে (এখনও খনিজ-উত্তোলন বা অন্যান্য ফিল্ড-কেন্দ্রিক পরিসরে নারীরা অনেকাংশেই ব্রাত্য), সেখানে কমলা সোহনী বা অসীমা চ্যাটার্জীদের পাশেই বসবে তাঁর নাম।
২০২৪-এ প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় বই, ‘Breaking Rocks and Barriers: Memoirs of a Geologist and Mountaineer’-এ সুদীপ্তা সেনগুপ্ত ভূতত্ত্ব সম্পর্কে বললেন, ‘ভূতত্ত্ব আসলে পৃথিবীর পাথরের স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা সঙ্গীত।…বিখ্যাত জার্মান ভূবিজ্ঞানী হান্স ক্লুস বলতেন, পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের সংলাপে যেতে হবে। নীরব পাথরই সব কথা বলে।’
সুবীরকুমার ঘোষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ যে পথচলা, সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভূতত্ত্বের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দু’জনেই এক গভীর, বহুমুখী দর্শনকে ধারণ করেন। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো ভূবিজ্ঞানে তাত্ত্বিক অগ্রগতি তেমন হয়নি। ‘গঠন-সম্পর্কীয় ভূবিদ্যা’-র মুখবন্ধে সেই খামতির কথা মনে করিয়ে দিতে গিয়ে সুবীরকুমার ঘোষ উল্লেখ করেন, ‘যে যার নিজের উপত্যকায় কারারুদ্ধ।’ আর ২০২৪-এ প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় বই, ‘Breaking Rocks and Barriers: Memoirs of a Geologist and Mountaineer’-এ সুদীপ্তা সেনগুপ্ত ভূতত্ত্ব সম্পর্কে বললেন, ‘ভূতত্ত্ব আসলে পৃথিবীর পাথরের স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা সঙ্গীত।…বিখ্যাত জার্মান ভূবিজ্ঞানী হান্স ক্লুস বলতেন, পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের সংলাপে যেতে হবে। নীরব পাথরই সব কথা বলে।’
আসলে, নারী এবং বিজ্ঞানী, এই দুই পরিচয়ের ভার নিয়েই সুদীপ্তা সেনগুপ্তের দীর্ঘ চলন, ওই সামগ্রিকতাই তাঁকে বিশিষ্ট করেছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সোহম দাসের পড়াশোনা ভূতত্ত্ব নিয়ে। পেশা গবেষণা, লেখালেখি, অনুবাদ। তথ্যচিত্র-নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত, অন্যান্য দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমেও কাজ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞান সংযোগ নিয়েও কাজ শুরু করেছেন। লেখার ক্ষেত্রে প্রিয় মাধ্যম প্রবন্ধ ও ছোটোগল্প। দুটি গল্পের অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন।
