Tags Posts tagged with "কলকাতা বইমেলা"

কলকাতা বইমেলা

বান্ধবীর বাড়ির ছাদ

আমার এক বান্ধবীর বাড়িতে, তার ছাদটুকু ভারী চমৎকার। উত্তর কলকাতার সেই পা ছড়ানো দুপুর, সিমেন্ট ঢালাই করা পুরু দেওয়াল। মেঝেতে তাপ ওঠে। চিলেকোঠার পাঁচিলগুলোর থেকে নকশাকাটা জমিতে রোদ। আকাশে ঘুড়ির দেখা মেলে। পা মেলে দিয়ে বসতে ইচ্ছে হয়। বইমেলার সাথেও আমার সম্পর্কটা ঠিক সেই রকম। ঠিক একইরকম ভালোবাসার, ভালো লাগার …

১০০বছর আগেও ছিলো ‘বুক-ফেয়ার’

যদিও ‘বুক-ফেয়ার’ বা ‘বইমেলা’ শব্দটি তখনও চালু ছিলো না। ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে, বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের উদ্যোগে এক-সপ্তাহব্যাপী একটি শিক্ষা-সপ্তাহ পালন করা হয়। তারই অংশ হিসেবে একটি শিল্প-প্রদর্শনী ও একটি বই-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে – খুব সম্ভবত সেটিই কলকাতা শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘বুক-একজিবিশন’। ‘কলিকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা’র সূচনা হতে তখনও বাকি অনেক দিন। ১৯১৮র পরে কেটে যাবে ৫৮টা বছর, ১৯৭৬এ শুরু হবে পাবলিশার্স এন্ড বুক-সেলার্স গিল্ডের ব্যবস্থাপনায় ‘কলকাতা বুক-ফেয়ার’।

বইমেলা-ধুলো, গার্গী-শ্রেয়সী – চেনা মুখগুলো, পরিচিত হাসি …

সে ছিলো ময়দানে বইমেলার যুগ। তখন আমাদের যা বয়স, গার্গী বা শ্রেয়সীর থেকেও অরণ্যদেব-কি-ম্যানড্রেকেই আমাদের উৎসাহ ছিলো বেশি।নির্মল বুক এজেন্সি থেকে কিনতুম ‘দুই বাংলার ১০০ গোয়েন্দা গল্প’, আবদার করতুম হাসির সিরিজটার জন্যেও। দক্ষভারতী থেকে রঙচঙে একটি টুপি উপহার পেতুম। বইমেলাতে যাবার জন্য বরাদ্দ থাকতো কেবল একটি দিন। অথচ বইমেলা ফুরোতেই দেখতুম, কোন জাদুবলে যেন বুক এজেন্সির হাসির সিরিজটিও বিছানার পাশটিতে এসে হাজির। মা যেতেন ফ্যামিলী বুকশপের ভরা দোকানটায়। কিনতেন সঞ্জীব কাপুরের খানা-খাজানার বই। আমার জন্য বেছে আনতেন এনীড ব্লাইটন – সিক্রেট সেভেন। হাত ধরে ধরেই বাবা চেনাতেন সন্দেশ আর নিউস্ক্রীপ্ট। চিনতে শিখতুম নলিনী দাশের গন্ডালু অথবা সত্যজিতের বাতিকবাবুকে। অনিল ভৌমিকের সৃষ্ট চরিত্র ফ্রান্সিসের তখন একটার পরে একটা নতুন বই বেরুচ্চে। সোনার ঘণ্টা – হীরের পাহাড়ের গল্পেতেই বুঁদ হয়ে থাকতুম। তবু, আজ এতদিন পরেও, চন্দ্রবিন্দুর গানটাই যেন বারেবারেই – সেই ময়দানের দিনগুলোকে মনে পড়ায়।

সাহসী চুম্বন, আজও কাউকে দেবার সৌভাগ্য হয়নি … হয়তো বা, তার অপেক্ষা আরও কয়েকটা দিনের।

প্রথম দেখা শর্মিলা ঠাকুর / রুশদিকে ফেরালো কলকাতা

২০১২তে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে শুরু হয় ‘কলম’, কলকাতার প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। বইমেলার মঞ্চে তার অন্যতম টাইটেল স্পনসর হিসেবে যোগ দেয় গুগলের মতো নামজাদা সংস্থা। ততদিনে বইমেলা সরে গিয়েছে মিলন মেলাতে। ২০১২তেই প্রয়াত হন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ২০১৩তে প্রথম দেখি সাহিত্য উৎসব।

এখন কলকাতায় অন্তত তিনটি বড় সাহিত্য উৎসব চলে। জানুয়ারির গোড়াতেই পার্ক গোষ্ঠীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল। ‘কলম’ এখন গুগল আর বইমেলা দুটির সাথেই সংশ্রব চুকিয়ে, টাটা স্টীল এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের যৌথ ব্যবস্থাপনাতে ২৬শে জানুয়ারির সপ্তাহে শহর জুড়ে বিভিন্ন জায়গাতেই উদযাপিত হয়। সবশেষে, বইমেলাতেই দ্বিতীয় সপ্তাহে উদযাপিত হয় কলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল। উৎসবের মহোৎসব বলাই যায়।

এতকিছুর পরেও মনের মণিকোঠাতে থেকে গিয়েছে সেই ২০১৩ সাল। সাহিত্য উৎসবের একটি দিনে ভাষণ দিয়েছিলেন অমর্ত্য সেন। আরেকটি দিনের অনুষ্ঠানে, আলোচনার বিষয় ছিল : ‘সত্যজিতের নায়িকারা’, উপস্থাপনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ, অংশগ্রহণে – অপর্ণা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং শর্মিলা ঠাকুর। সেই প্রথম কাছ থেকে দেখেছিলাম, অপুর অপর্ণাকে। অটোগ্রাফও পেয়েছিলাম। সেই উৎসবেই ‘শীন্ডলার্স লিস্ট’-খ্যাত বুকারজয়ী সাহিত্যিক থমাস কেনেলীর সঙ্গেও আলাপের সৌভাগ্য হয়েছিলো। আর লজ্জার সাথে শুনেছিলাম, ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ শীর্ষক একটি আলোচনায় স্বয়ং সলমন রুশদির আসবার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার তাঁকে আটকে দিয়েছেন। আলো-অন্ধকারের সেই প্রথম সাহিত্য উৎসবটুকুকেই মনে থেকে গিয়েছে। মনে থাকবেই চিরটাকাল।

আকাশছোঁয়া বহুতল – কলকাতার স্কাইলাইন

কলকাতাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। কলকাতার বইমেলাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। ২০১৫তে রোজ বইমেলা যেতুম। ফেরবার সময়ে, মিলনমেলার ৩নং গেটের বাইরেটা থেকেই সরকারি বাস ছাড়তো পার্ক সার্কাসের। বিনামূল্যের সেই বাস-সফরটা ছিলো খুবই সুবিধাজনক। একটু আগে থাকতে বেরিয়েই, উঠে পড়ে একটা জানলার ধার দখল করে নিতুম। পাশে দেখতুম সুউচ্চ আইটিসির হোটেল-ইমারত। তখনও তৈরি হচ্ছে। এখনও কাজ শেষ হয়নি পুরোটা। উঁচু উঁচু স্টীলের ভারাতে সার্চলাইট। মাথার উপরে সার্চলাইটের আলোতে চিরছে বইমেলার চত্বর। হয়তো বা খুঁজছে আমার-আপনার মতো কারোর প্রেয়সীকেই। গান বাজত বইমেলায়। কখনো বা ফোক, বা কখনো রক। বইমেলার মুক্তমঞ্চেই শুনেছিলুম দোহারের গান – কালিকাপ্রসাদের মন মাতানো পারফর্ম্যান্স। আমার বইমেলাতেই, আমার সবটুকু ভালোবাসা। বছরে মাত্র একটিবার আমার সেই প্রেয়সীটির, কলকাতাতে আসার সময় হয়।

মিত্র ঘোষ, এম সি সরকার, সুবর্ণরেখা ও লিটল ম্যাগ …

মদের রসিক চাইবে নতুন বোতলে পুরানো মদ। বইপ্রেমীরা খুঁজবে নতুন মলাটে পুরানো বই। চক্রবর্তী-চ্যাটার্জীর স্টলে গিয়ে খুঁজতে চাইবে শঙ্করের ‘কত অজানারে’কে। ঘেঁটে দেখবে সুবর্ণরেখা-র পুরানো সমস্ত মণি-মানিক। মিত্র-ঘোষের দোকানটিতে গিয়েই খোঁজ নেবে ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’র ব্যপারে, এম সি সরকারে গিয়ে খুঁজতে চাইবে উৎপল দত্তের ‘অঙ্গার’ অথবা ‘টিনের তলোয়ার’-এর একক সংস্করণ। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বেঁচে থাকবে আমাদের লিটল ম্যাগ। সারি সারি টেবিলেতে অপেক্ষমান ভবিষ্যতের নামজাদা হয়ে-উঠনেওয়ালারা। অথবা রিটায়ার্ড স্বামী-স্ত্রীর প্রকাশন। পাশাপাশি, অথবা একই টেবিলে ভাগাভাগি – দুটি পাশেই। কি প্রচন্ড আবেগ যে এই লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়নটিতে জমা হয়ে থাকে এই ১২টা দিন, ভিতর থেকে না জানলে তা উপলব্ধি করা যায় না। বিডন স্ট্রীট শুভম নাট্যগোষ্ঠীর নাট্যপত্রটিকে বইপ্রেমীদের হাতে পৌঁছিয়ে দেবার জন্য খুদে সদস্যদের কি প্রচন্ড হুড়োহুড়ি পড়ে যায় – সে এক আশ্চর্য আনন্দের সময়। বইমেলাই জানে আমার প্রথম সব কিছু …

মিলন হবে কতদিনে …

আবার সেই বান্ধবীর বাড়ির ছাদ। বইমেলা শুরু হতে আর এক হপ্তাও বাকি নেই বোধহয়। শুধোলুম তাকে, ‘বইমেলা যাবি, আমার সঙ্গে একটা দিন ?’ কোনও উত্তর পেলুম না। আমার প্রেয়সী আমার কাছেই থাকুক। এবারের গন্তব্য সেন্ট্রাল পার্ক, ১ থেকে ১১ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ – বইমেলা এসে গেছে, আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই …

ওভার এন্ড আউট, দেখা হবে বইমেলায়, পারলে রোজ, না পারলেও তাই … আর, প্রেয়সী তোমার জন্য, ‘বইমেলা ’১৯’।

error: Content is protected !!