Tags Posts tagged with "নাসিরুদ্দিন শাহ"

নাসিরুদ্দিন শাহ

জনাব নাসিরুদ্দিন শাহ,

আমি আপনার ডাই হার্ড ফ্যান। আপনার রাগী, প্রতিবাদী ইমেজটাই আপনার প্রতি আমার টান, আকর্ষণ বাড়িয়েছেঅন্যায়ের প্রতিবাদ যে ঠিকমতো করতে পারে, আমার মতো সাধারণ তো তাঁরই বীর পুজোকরে। কারণ, আমার মনের জমা অসন্তোষ, রাগ, ঘৃণা কত অনায়াসে আপনি বলে দেন! হোক না সেটা রুপোলি পর্দা। তবু তো আমার প্রতিবাদের ভাষা, আমার প্রতিরোধের আগুন প্রকাশ পায়!

আপনার অ্যালবার্ট পিন্টো কো কিঁউ গুসসা আতা হ্যায়আমি দেখেছি। দেখে মনে হয়েছিল, এই ক্রোধ যেন শুধু আপনাকেই মানায়। সম্প্রতি, আবারও আপনার গুসসাদেখলাম। রুপোলি পর্দার বাইরে। গো-রক্ষার মতো বাস্তব সমস্যা নিয়ে বাস্তবে জ্বলে উঠলেন আপনি। সত্তর পেরিয়ে আসা এক মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ হলে মুখ খোলেন? সেটাও অনুভব করতে পেরেছি। জানি, আপনি একেবারেই অন্যায় সহ্য করতে পারেন না। বলিউড এবং আপনার একাধিক সাক্ষাৎকার বলে, আপনি বরাবরের বড্ড সিরিয়াস। প্রতিবাদী, রাগী স্পষ্ট কথায় একটুও কষ্ট নেই আপনার। এবং বলতে গলা কাঁপে না। জিভও জড়িয়ে যায় না। খন্ডহর’, ‘মির্চ মশালা’, ‘পার’, ‘আক্রোশ’, ‘ইরাদা’, ‘অর্ধসত্য’, ‘ত্রিকাল’—প্রত্যেক ছবিতেই তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, বলেছেন। আপনার ছবি দেখে আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটাই বিশ্বাস বা ধারণা জন্মেছে, যেখানেই বিপ্লব সেখানেই কমন ম্যাননাসির।

এই তো, কিছুদিন আগে বুলন্দ শহরে গো-রক্ষার অজুহাতে বুলেটে ঝাঁঝরা হলেন পুলিশ আধিকারিক। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথ আপ্রাণ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন সেই ন্যক্কারজনক ঘটনা। তারপরেই আপনি তুললেন তুফান। আ ওয়েডনেস ডে ছবির যে কমনম্যানদেশ বাঁচাতে পর্দায় নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল বাস্তবে সে-ই কুঁকড়ে গেল ভয়েসন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে মুখ খুলতেই পর্দার সুপারম্যানবাস্তবে হয়ে গেলেন স্টুপিড! কেউ কেন বোঝে না বলুন তো, পর্দা কাঁপানো রাগী মানুষটার মধ্যেও ঘুমিয়ে থাকে পিতৃত্ব। যে সন্তানের শুভ চিন্তায় স্বন্ত্রস্ত হতেই পারে 

আমি জানি, আপনিই ঠিক। তারপরেও বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে, ২০১২-য় যখন জয়পুর সাহিত্য সম্মেলন থেকে বাদ পড়লেন সলমন রুশদি তাঁর একটি লেখার জন্য, তখন আপনি কোথায় ছিলেন? সেদিন দেশের আন্ডার ওয়ার্ল্ড রুশদিকে পেলেই কাটবএমন হুমকি দিয়েছিল। সেই ভয়ে আমন্ত্রিত হয়েও দেশে আসতে পারেননি আন্তর্জাতিক মাপের সাহিত্যিক। সেদিনও সাহিত্যের আঙিনায় মাথা গলিয়েছিল ধর্মভেদ, অসহিষ্ণুতা, রাজনীতি। আপনি কিন্তু প্রতিবাদ জানাননি।

তসলিমা নাসরিন। যিনি মনে-মুখে এক। যেটাই ভাবেন, সেটাই বলেন। এবং লিখেও ফেলেন। সেই লেখা পড়ে একদিকে ‘গেল গেল’ রব ওঠে। অন্যদিকে সেই লেখা পড়েই নতুন দিশা দেখার সাহসে বুক বাঁধে একুশের নারী। জাতের নামে বজ্জাতি তসলিমা কোনোদিনই সহ্য করেননি। সেই দোষে তাঁর বাক স্বাধীনতা নেই। নিজের দেশ ত্যাগ করেছে তাঁকে। তসলিমার লেখার ঝাঁঝে তাঁকে ঠাঁইনাড়া করতে বাধ্য হয়েছে ভারতও। প্রায় একঘরে হয়ে পড়ে আছেন লেখিকা। তাঁর পাশে আপনি কই নাসির?  

আরেকটা অঘটনের কথা মনে করাই? বেশিদিন নয়, ২০১৭-র ১১ জুলাইয়ের ঘটনা। ১৭ বছরের একটি ছেলে হজরত মহম্মদের কার্টুন এঁকেছিল ফেসবুকে। তার জেরে রক্তগঙ্গা বয়েছিল বসিরহাট, তেঁতুলিয়ায়। ছবির সূত্র ধরে বাইরে থেকে আসা অচেনা একদল আতঙ্কবাদী দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল। আপনি সেদিনও স্থবির! কী করে একের পর এক ঘটে যাওয়া হিংসা মুখ বুজে সইলেন?      

আপনি কি তখন অন্যায়গুলো গিলছিলেন? আর সেই অনুভূতিগুলোই কি আ ওয়েডনেস ডেকে জীবন্ত করার রসদ জুগিয়েছিল? আমি কি ঠিক বলছি জনাব? কিন্তু নিন্দুকদের তো আপনি জানেনই স্যার। তারা এতশত বোঝে না। সবার পেছনে, সব কিছুতেই ছিদ্রখোঁজে। আপনি কী করে তার থেকে রেহাই পাবেন? তাই আপনি মুখ খুলতে না খুলতেই কেমন রে রে করে উঠেছে নব নির্মাণ সেনা। ওরা নাকি আপনাকে পাকিস্তানে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছিল? টিকিটও নাকি কেটে ফেলব ফেলব করছিল! নির্ঘাত আপনার সরফরোসদেখেছেন সংগঠনের নেতারা। ওই ছবিতেই তো আপনি পাক গুপ্তচর সেজেছিলেন? তাই দেখে ওঁরা বোধহয় আসল-নকল গুলিয়ে ফেলেছেন! ছিঃ ছিঃ, কী লজ্জা!

আপনাকেই বা কী বলি? গো-রক্ষা নিয়ে বলার পর খামোখা সহকর্মী-বন্ধু অনুপম খেরকে দুষলেন কেন? না জেনেশুনে আলটপকা মন্তব্য করলেন, অনুপম নাকি জীবনে কাশ্মীরে না থেকেই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন! কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে সেই জায়গার বাসিন্দা হতে হয় নাকি? অনুপম কাশ্মীরে না থাকলেও পণ্ডিতদের অপমান তাঁকে বিঁধেছিল। আপনিই কি বুলন্দ শহরের বাসিন্দা? তা না হয়েও যদি মুখ খুলতে পারেন তাহলে অনুপম নয় কেন? ফল কি হল? এতদিনের বন্ধু সহকর্মী অনুপম ব্যাপারটা সহ্য করতে না পেরে মুহ্ তোড় জবাব দিয়েছেন, ‘এদেশে ফৌজকে গালাগাল দিয়ে পাথর ছোঁড়া আছে। আর কত স্বাধীনতা দরকার আপনার?’ অলিম্পিকের রুপোজয়ী কুস্তিগীর যোগেশ্বর দত্ত ট্যুইট করেছেন, ‘বুলন্দ শহরের ঘটনায় নিহতদের জন্য আমরা দুঃখিত। কিন্তু এর আগে খুন আর দাঙ্গার সময় আপনার বুক কাঁপেনি! আপনি তাহলে কার পক্ষে নাসির!

আপনি তো বোঝেন, আদর্শ ব্যক্তিত্বের গায়ে টোল পড়লে কতটা আঘাত পায় তাঁকে আঁকড়ে চলা মানুষটি? আমার হয়েছে সেই দশা। তবু মন্দের ভালো, আপনার কথার রেশ ধরে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মুখ খুলতেই আপনি ধমকে থামিয়েছেন তাঁকে। পড়শিকে ছেড়ে নিজের দেশের ভালোমন্দ বোঝার সু-পরামর্শ দিয়েছেন। কে জানে, এভাবেই বোধহয় জন্মভূমির ঋণ শোধ করলেন।

ইতি,

আপনারই এক গুণমুগ্ধ দেশবাসী            

লিখেছেন -
0 305
আশুতোষ রাণা, নাসিরুদ্দিন শাহ

সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের মতামত প্রকাশ করে রোষের শিকার নাসিরুদ্দিন শাহ | একটি সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন যদি তাঁর সন্তানদের একদল উত্তেজিত জনতা ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করে তাঁদের ধর্ম কী ‚ হিন্দু না মুসলমান ‚ তাহলে তাঁরা তো কিছুই উত্তর দিতে পারবেন না | তারপরে তাঁদের সঙ্গে কী ঘটতে পারে সেই নিয়ে চিন্তিত তিনি | কারণ তাঁর সন্তানদেরকে কখনই ধর্মগত বিভাজনের শিক্ষা দেওয়া হয়নি | তাই তিনি নিজেদের সন্তানদের সম্পর্কে তিনি চিন্তিত | তিনি আরও বলেন যে সারা ভারতে এখন ধর্ম নিয়ে দাঙ্গার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে | আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে যেকোনও অপরাধ করবার ক্ষেত্রে এখন ছাড় পাওয়া যায় | আজকের ভারতবর্ষে একজন পুলিশ অফিসারের মৃত্যুর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি গরুর মৃত্যুর ঘটনা |

এই মন্তব্য করার পরেই গেরুয়া রোষ এসে পড়ে তাঁর ওপর | নানা পরিচিত নেতা ও মন্ত্রীরা সরব হয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহের বিরূদ্ধে এবং ধিক্কার জানিয়েছেন তাঁর এই চিন্তাকে | তাঁকে সমর্থন ও বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট দুটি দল | এই সমালোচনার মুহূর্তে তাঁকে সমর্থন জানিয়ে সরব হয়েছেন বলিউড অভিনেতা আশুতোষ রানা | 

আশুতোষ বলেন স্বাধীন দেশে প্রত্যেক নাগরিকেরই নিজের মতামত জানানোর অধিকার আছে | ব্যক্তিগত বক্তব্যকে নিয়ে সামাজিক বিচারের খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে তাঁর প্রতি হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালানো অত্যন্ত নিন্দনীয় | কেউ তাঁর ব্যক্তিগত বিরূদ্ধ মতামত জানালেই তাঁর বিরূদ্ধে খড়্গহস্ত হতে হবে এত অসহনশীলতা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে | আশুতোষ বলেন বরং আমাদের উচিত তাঁর কথা ও ভাবনচিন্তা মন দিয়ে শুনে তারপরে বিচার করা | কেউ যদি নিজের মতামত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন এবং তাতে যদি তর্ক হয় ‚ সেই তর্কের মারফত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি বই অবনতি হবে না বলেই মনে করেন তিনি | তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় নাসিরুদ্দিন শাহের মতামতের বিরোধিতা করার বদলে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মানুষের নজর ফেরাতে চাইছেন |

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহের বিরূদ্ধে গেরুয়া ক্ষোভের একাংশ ফেটে পড়লে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে তিনি বলেন যে ‚ যে দেশকে তিনি ভালবাসেন ‚ যে দেশ তাঁর মাতৃভূমি সেই দেশের ব্যাপারে নিজের মতামত ব্যক্ত করে তিনি কোনও ভুল কাজ বা অপরাধ করেছেন বলে তিনি মনে করেন না | গেরুয়া সন্ত্রাসের বিরূদ্ধে কোনও মতামত প্রকাশের প্রতিক্রিয়া যদি এমনই হয় ‚ তবে সমাজের সহনশীলতা নিয়ে তো চিন্তায় পড়তে হবে প্রত্যেক সাধারণ মানুষকেই !

রেসিপি

error: Content is protected !!