Tags Posts tagged with "বাংলা বিশেষ রচনা"

বাংলা বিশেষ রচনা

লিখেছেন -
0 1333

পাড়ার সান্ধ্য আড্ডায় মিতা মাসিমা সেদিন বড্ড দু:খ করছিলেন, আদিত্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আট হাজার টাকা মাইনের একটা চাকরি করছে। গাধার মতো খেটেও বছরে ইনক্রিমেন্ট সাকুল্যে দুই হাজার। আজকের মাগ্গিগণ্ডার বাজারে এটা কোনও উন্নতি? গঙ্গাপাড়ের অলিগলি এখন ছেয়ে গেছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারে। এই যদি রোজগারের হাল হয়, আগামী প্রজন্ম নিজে খাবে না মাবাবাকে খাওয়াবে!

লোকে কি ভীষণ বাজে কথা বলে! তাই না? কেন ‘চাকরি নেই, চাকরি নেই’ করে চেঁচাচ্ছে সবাই? চাকরি আছে তো! গণ্ডায় গণ্ডায়। কী ভাবছেন? এবার আমি পাগলের প্রলাপ বকছি? কোনোদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় পাশের দেওয়াল খেয়াল করেছেন? করেননি তো? তাইই বিশ্বাস হচ্ছে নানজর করলেই দেখতে পেতেন, কাজের তালিকায় নয়া সংযোজন বডি মাসাজ পার্লারে চাকরি। আর বন্ধুত্বর বিজ্ঞাপনে দেওয়ালগুলো যেন চলতিফিরতি সাইনবোর্ড! এরপরেও বলবেন চাকরি নেই?

জানি, থামিয়ে বলবেন আগে বিউটিশিয়ান কোর্স করো। তারপর ট্রেনি হয়ে পার্লারে ঢোকো। কাজ শেখো। তারপর না হয়……। আর বন্ধুত্ব করে কারও পেট ভরে? আজকাল তো ফেসবুক খুললেই হাসতে হাসতে হাজার বন্ধু জোগাড় হয়ে যায়। এক্কেরে হক কথা কইছেন। বিজ্ঞাপন দেখে সাদা মনে এই কথাই ভাসবে। এর মধ্যেও যে অনেক কিন্তু, পরন্তুর প্যাঁচ আছে, জানেন?

সর যো তেরা চকরায়ে/ ইয়া দিল ডুবা যায়ে

আজা প্যায়ারে পাস হামারে…. গুরু দত্তের ‘প্যায়াসা’ ছবির এই গানের একুশে সংস্করণ বডি মাসাজ পার্লারের চাকরি। অভিনেতা জনি ওয়াকার যখন এই গানে লিপ দিয়েছিলেন তখন সেটা আক্ষরিক অর্থে বিশুদ্ধ মাসাজের গপ্পো ছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না। আর আজ ওই একই আরাম মিলছে যৌনতার প্যাকেজে। প্যাকেজ কিনলেই সুন্দরী সেবাদাসী ‘ফ্রি’

এই ব্যাপারে চৌখস হচ্ছে রাজীব (নাম পরিবর্তিত)। পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। একদিন কাকতালীয়ভাবেই অফিস ফেরত বাসে মুখোমুখি। খুব যে গলায় গলায় ভাব আমাদের দুই বাড়ির মধ্যে তা নয়। তবে দেখা হলে হাইহ্যালোর সৌজন্যটুকু আন্তরিক। বাসে মুখোমুখি হতেই সৌজন্যালাপ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। তখনই জানলাম, পাড়ার মহুল নাকি পার্লারে চাকরি পেয়েছে। শুনে ‘বা:’ বলতেই রাজীব বলল, জানো ওর কী কাজ? মাসে একবার ভ্রূপ্লাক আর ছ’মাসে একবার হেয়ার ট্রিমিংএর বাইরে ভুলেও পার্লারের পথ মাড়াই না। বডি মাসাজ দূর অস্ত। তবে অবাক হই, যখন দেখি পাড়ার প্রায় প্রত্যেক গলিতেই একটা করে পার্লার গজিয়ে উঠছে ইদানিং। আরও অবাক কাণ্ড, রমরমিয়ে চলেও সেগুলো। নিজের মনে নিজেই বলি, লোকে কোথ্থেকে এত পয়সা পায়! তাই রাজীবের প্রশ্নে আমার জ্ঞানভান্ডার উপুড় করতেই সে হেসে খুন। বলল, বাইরে থেকে তুমি যেমন বলছ তেমনটাই। বাট অন্দর কা কিসসা আলাগ হ্যায়। রাজীবের এক বন্ধু নাকি শখে পড়ে একবার মাসাজ করাতে গিয়েছিল। প্রথমে ফোনে যোগাযোগ। মহিলা কণ্ঠ সাগ্রহে জানতে চাইল, কোথা থেকে তিনি আসবেন। বন্ধুটি বলতেই ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এল, চলে আসুন। যেমন মাসাজ চাইবেন তেমনটাই মিলবে। আরও বিশদে জানতে রাজীবের বন্ধু শুধোয়, কী কী মাসাজ করান আপনারা? ফোনের ওপ্রান্তের হাস্যময়ী এবার লাস্যময়ী গলায় উত্তর দিল, ফুল বডি মাসাজ, ফুল স্যাটিসফ্যাকশন, স্যান্ডুইচ, চকোলেট মাসাজ, আইসক্রিম মাসাজ। এত্ত রকমের মাসাজের লিস্ট শুনে লেবড়ে ‘ল’ হয়ে বন্ধু আর কথা না বাড়িয়ে ফিক্সড ডেটে পার্লারে সশরীরে হাজির। প্রথমে মুখোমুখি মালকিনের। তিনি সাদরে এয়ারকন্ডিশন রুমে বসিয়ে জানালেন মাসাজের মর্ম। ফুল বডি মাসাজ মানে তাকে নগ্ন করে এক মহিলা সারা শরীর দলাইমলাই করবে। ফুল স্যাটিসফ্যাকশন মানে সহবাস। স্যান্ডউইচ মানে দুই মহিলাকে একসাথে নিয়ে সঙ্গম। চকোলেট, আইসক্রিম মানে লিঙ্গে ওই উপাদান লাগিয়ে লেহন করানো। রাজীবের বন্ধু আদিম ইশারার হাতছানি উপেক্ষা করতে পারেনি। কারণ, ততক্ষণে একদল ইনা, মিনা, ডিকা তার সামনে পরীর মতো উড়ছে। তবে মাসাজের পর বন্ধুটি কপর্দকশূণ্য হয়ে বেরিয়েছিল পার্লার থেকে। আর স্যাটিসফ্যাকশন? সেখবর সেই জানে।

রাজীব আমায় রেখেঢেকে পার্লারের গল্প বলেছিল। শুনতে শুনতে লজ্জায়, কষ্টে লাল হয়ে গেছিলাম। কান্না পাচ্ছিল মহুলের কথা ভেবে। এমএ পাশ মহুল ভীষণ মিষ্টি। মহুয়া ফুলের মতোই নরম। ইন্টারভিউ দিতে গিয়েও কিচ্ছু বোঝেনি? পেটের আগুন নেভাতে মহুলের শরীরের নেশাটাই শেষে পণ্যদ্রব্যের মতো বিকোলো?

হাত বাড়ালেই বন্ধু—-

এতো গেল এক চাকরির গপ্পো। দ্বিতীয় অর্থাত ফ্রেন্ডশিপের কাহানিও তথৈবচ। আমার ছোটোবেলাতেও বন্ধুত্বের হাতছানি থাকত খবরের কাগজে। যুগটা পত্রমিতালির। কলকাতার প্রথম শ্রেনির সংবাদপত্র বিগ্ঞপনে ছয়লাপ, পত্র মানে চিঠি পাঠালেই বন্ধু মিলবে। যাঁরা ইচ্ছুক তাঁরা নির্দিষ্ট ঠিকানায় যোগাযোগ করতে পারেন। তখনও এযুগের মতো হুট বললেই ‘বন্ধু’ পাওয়া যেত না। বন্ধুত্বও মিলত না। তাই তখনকার অল্পবয়সীদের কাছে ওই পাতার হেব্বি ডিম্যান্ড। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুনির হদিশও মিলত যে!

যুগের চাহিদা মেনে সেই অশরীরী বন্ধুত্বে অনায়াসে শরীর ঢুকেছে। পত্রমিতালি ছাঁচ বদলে বোল্ড রিলেশন বা ফ্রেন্ডশিপ ক্লাব। আড়াই হাজার টাকায় মিলবে ক্লাবের মেম্বারশিপ। পকেটে পাঁচ, সাত বা দশ হাজার থাকলে মনের মতো হাতেগরম বন্ধু মিলবে। আসলে ভোগ করতে পারবেন নারীশরীর। সবসময় যে সেটাও মিলবে এমন গ্যারান্টি নেই। তখন যদি পুলিশে যান উলটো কড়কানি খাবেন আপনিই। লকআপে পোরার ভয়ও দেখানো হতে পারে। এদিকে প্রত্যেকটি সংস্থাই কিন্তু সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। সেই লাইসেন্সের জোরেই সব জায়গায় জ্বলজ্বল করে এরা!

বলতে খুব খারাপ লাগছে, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি, দোষ আমাদের ঘুণ ধরা সমাজের। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় যেখানে রোটিকাপড়ামকানের বড়ো অভাব সেখানে মান্ধাতার আমলের শিক্ষায় এখনও জন্তুজানোয়ারের মতো সন্তানের জন্ম হয় শহরতলি, আধা গ্রাম বা গণ্ডগ্রামে। কী করে তাদের পালন হবে? কেউ জানে না। কিন্তু বংশ না বাড়ালে যদি মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়! সেই ভয়েই আধমরা ভারতীয় নারীরা ফিদিন বাচ্চা বিইয়ে চলেছে।

কিন্তু তাতেই যে সাড়ে সব্বোনাশ ঘটছে, তার খবর কে রাখে? রোজগারের অভাবে, খিদে মেটাতে, সংসার প্রতিপালন করতে গিয়ে তাই পোশাকআকাশ, বিলাস সামগ্রী, বাড়িগাড়ির মতোই বিকোচ্ছে অল্পবয়সের নারীপুরুষ(জিগোলো) শরীর। মাত্র মাধ্যমিক দিয়েই তাই ‘চাকরি’ মিলছে অনায়াসে। স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অনায়াসে অনলাইনে বন্ধুত্বের নামে আদিম নীল ইশারা ছড়াচ্ছে এরাই। মূল্যবোধ, সংস্কৃতির গলা টিপে খুন করে। আর আমরা, আগের প্রজন্ম নি:শব্দে দেখছি আগামী প্রজন্ম কীভাবে নিশ্চুপে ‘নীলকণ্ঠ’ হচ্ছে। একেই কি বলে সভ্যতা?

রেসিপি

error: Content is protected !!