Tags Posts tagged with "বাংলা ভাষার মৃত্যু"

বাংলা ভাষার মৃত্যু

অফিসপাড়ায় রাস্তার উপরে এক হল্লাময় সমাবেশে সম্প্রতি এক ছোকরার গলায় ‘বাংলা আমার জীবনানন্দ’ শুনে আমার পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘ইয়ে এলআইসি-ওয়ালা গানা বহুত আচ্ছা হ্যায়।’ আমি অবাক হওয়াতে উনি আমাকে দেখে আরও অবাক হলেন বোঝা গেল। বললেন, ‘ইয়ে গানাকা শুরুতে যে লাইনটা আছে, তাতেই প্রডাক্টকা বারে মে বলা আছে। এটা বোধ হয় সরকারি গানা আছে। মার্কেটিং সেন্স বহুত ভাল আছে।’ আমি চুপ করে থাকি, হিজল গাছের ছায়ার মতো। উনি বলে চলেন, ‘জীবন আনন্দ পলিসিকা বারে মে শুনা হ্যায় আপনে? বড়িয়া রিটার্ন আছে। আর বাঙ্গালী লোক বহুত ইনসিওরেন্স প্রেমী ভি আছে। বাংলা আমার জীবন আনন্দ। ওয়াহ্। নিন, মশলা খান। ইয়ে ভি এক নাম্বার মশলা আছে।’ প্রসঙ্গত, লাইফ ইনসিওরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার একটা পলিসির নাম হল জীবন আনন্দ। বিজ্ঞাপন দেখেছেন নিশ্চয়ই। আমিও দেখেছি, শুনেছি। কিন্তু এ ভাবে শুনতে হবে ভাবিনি।

শহরের বেশ কিছু বাজারে এখন ‘পটল কত করে’ জিজ্ঞেস করলে দোকানী পাত্তা দেন না। পরভল বললে উত্তর পাওয়া যায়। দোকানী কিন্তু বাঙালি। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে গিয়ে দেখবেন, সমস্ত সব্জির গায়ে লেখা হিন্দি নাম। লাউ বললে অফার পাবেন না। বলতে হবে লউকি। ‘কাঁচা লঙ্কা দুশ গ্রাম ওজন করে দেবেন ভাই?’ বললে চটজলদি যা শুনতে হতে পারে তা হল, ‘স্যার হারা মির্চায় আড়াইশ গ্রাম কিনলে পচাশ গ্রাম ফ্রি।’ একটা ভারতবিখ্যাত খুচরো ব্যবসার চেইনের আমার বাড়ি লাগোয়া যে দোকানটা আছে (এখন আবার দোকান বলতে নেই, আউটলেট), সেখানে শাক-সব্জি রাখার তাকগুলোতে এরকম পরপর স্টিকার দেখেছিলাম—ধনে পাত্তা, চন্দরমুখী আলু, আলু রেগুলার (জ্যোতি), তাজা কোকোনাট, বিনস-বরবট্টী কম্বো, টমাটর, লউকি। শেষটা ছিল মারাত্মক। ‘বাগান তাজা গোবি’। ফার্ম ফ্রেশ কলিফ্লাওয়ারের এর থেকে ভাল বঙ্গানুবাদ হতেই পারে না। অন্য দিকে, ত্রিফলা ভাষার এমন দারুণ সমাহারের পরে, ওজন মেশিনের উপরে আশ্চর্যজনকভাবে বিশুদ্ধ শক্ত বাংলায় লেখা ছিল, ‘পরিমাণের সীমা প্রযোজ্য’। এর মানে হল, বাগান ফ্রেশ গোবি একটা কিনলে পাঁচ টাকা ছুট, দুটো কিনলে বারো টাকা ছুট। কিন্তু দুটোর বেশি কেনা যাবে না। তাই পরিমাণের সীমা। এসব দেখে একটা সহজ কৌতূহল হয়। সব্জিগুলোর নাম দিয়েছিলেন যিনি, পরিমাণের সীমা কথাটা কি তিনি লিখেছিলেন? না লিখে থাকলে অধম শুধোয়, কেন?

বাংলায় যাঁরা তৃপ্ত চুমুক দেন, তাঁরা পরের কয়েকটা লাইন একটু হজম করার চেষ্টা করে দেখুন। ‘প্রমিস। যখন আপনি আমাদের সঙ্গে একটা সম্পর্কতা শুরু করার একটা প্রমিস বানান, তখন এটা শুধুমাত্র আমরা আমাদের রাখায় ন্যায্য হয়। কেননা একটা তৈরি করা প্রমিস হল প্রমিস রক্ষিত করা। …এখন আপনার নেটওয়ার্কের সঙ্গে আপনার সম্পর্কতা কখনই আবার একই থাকবে না। আর সেটাই প্রমিস।’ ফেলুদা ‘মুড়ো হয় বুড়ো গাছ, হাত গোন ভাত পাঁচ’-এর সমাধান করে দিয়েছিলেন। প্রমিস করে বলতে পারি, কি বোঝাতে চাওয়া হয়েছিল এই কটা লাইনে, তা উদ্ধার করা প্রদোষ মিত্তিরের ক্ষমতা ছিল না। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহোদয়কে এর পাঠোদ্ধার করতে বললে হয়তো তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অথচ দেশের তাবড় তাবড় খবরের কাগজে প্রথম পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছিল, এই তো মাত্র মাস কয়েক আগে। মোবাইল পরিষেবা সংস্থার বিজ্ঞাপন। এটা পড়ে খাবি খাচ্ছিলেন যাঁরা, তাঁরা ভুল-জলে পড়ে খানিক গলা তোলার আগেই আবার এক সমুদ্র জল মিশিয়ে দেয় দেশের এক শীর্ষ সরকারি ব্যাঙ্ক। বুক বাজিয়ে বলে, ‘ভারতীয় ব্যাঙ্কিং প্রবন্ধনে আগামী বড় বিপ্লব।’ নাও, এবারে বোঝ ঠ্যালা। এতেই শেষ নয়। ওই বিজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছিল, ‘ব্যাঙ্কিং শিল্পে সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ ইনফ্রা হয়ে।’ ব্যস, ওইটুকুই। আর কিছু নেই! আর এক চামচ খান। ‘স্বীকৃত পরিচালন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ব্যাঙ্কিং ও ফিনান্সে উদ্ভাবনী ও কার্যকল্প ভিত্তিক গবেষণা প্রদান।’ মনে মনে ভাবি, এমন কথাগুলো সুকুমার সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়দের চোখে পড়েনি ভাগ্যিস।

যে কোনও দিনের খবরের কাগজ উল্টোলে দারুণ কিছু শব্দ পাওয়া যায়। নতুন ধরনের সব্জি বানানো হলে বলা হয় জেনেটিক্যালি মডিফায়েড। কিন্তু মুশকিল হল, এই না জেনে টিকালি মডিফায়েড ট্যাঁশগরুরা জীবন বিজ্ঞান, জিনবিদ্যার দেওয়াল টপকে ভাষামঞ্চেও ঢুকে পড়ছে কি অবলীলায়। আর ঢোকার পরেই তাণ্ডবনেত্য। এই তো দেখতে পাচ্ছি, জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। কিসের বিজ্ঞপ্তি? নন-ব্যাঙ্কিং আর্থিক কম্পানির প্রতি জারিকৃত পঞ্জীকরণ প্রমাণপত্র বাতিলকার্য। বাংলা আমার জীবনানন্দ। এখানে ধূপ জ্বললে প্রার্থনার হবেই স্বীকার, যে সাবানটার সঙ্গে স্বাস্থ্যও জড়াজড়ি করে থাকে, কাগজে তার বিরাট বিজ্ঞাপনের তলায় ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরে লেখা থাকে, ‘সংক্রমণ ঘটানো জীবাণুগুলোর সঞ্চালন রোধের সহায়ক সুপারিশ করা পদ্ধতিগুলোর অন্যতম হল সাবান ও জল দিয়ে ধোয়া।’ বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক। পান করি। গলা দিয়ে নামে কই?

‘বুঝলেন দাদা, বাংলাটা আমার মেয়ের একদম আসে না’ বললে এখন আর কেউ মুখ ঘুরিয়ে দেখে না। বরং উল্টোটা। একটা ছড়া পড়েছিলাম। ‘টেগোরের পুরো নাম, সরি স্যর, আই অ্যাম ইংলিশ মিডিয়াম।’ বাহারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে আবার কড়া নির্দেশ আছে, বাড়িতেও যেন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাংলায় কথা না বলা হয়। বেচারা বাংলা মিডিয়াম মা-বাবার হয়েছে বড় জ্বালা। মেট্রোয় একবার এক বছর পাঁচেকের একরত্তি মেয়ে ও তার মায়ের মধ্যে টরেটক্কা শুনেছিলাম। দু’বার জোরে জোরে ‘টুকটুকেটুকটুকে টেকটোকেটেকটোকে’ শুনে ওঁদের দিকে ফিরি। তখন বুঝতে পারি, মা জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘টুক টোকেন?’ তা শুনে মেয়ে টোকেনটা মাকে ফেরত দিতে গিয়ে বলছিল, ‘টেক টোকেন।’ আরও এক মহিলাকে দেখেছিলাম, জাত যাওয়ার ভয়ে কিছুতেই ‘বাবু, ব্যাগটা দেবে?’ বলতে পারলেন না তাঁর ক্লাস ওয়ান কিংবা টু-র ছেলেকে। ঠোঁট উল্টে বলছিলেন, ‘বেব্বি, ব্যাগ হেব্বি?’ খোকা, সোনা আজ প্রস্তরযুগের নাম। বেবি কাঁধ শ্রাগ করে বলেছিল, ‘নোপ মম, কুল।’ ব্যাগ আর ইংরিজির চাপে মা অবশ্য কুল মেট্রোতেও ঘামছিলেন কুলকুল করে।

যে কোনও এফ এম রেডিও স্টেশন চালালে বাংলা, হিন্দি আর ইংরিজির এক অদ্ভুত ককটেলের স্বাদ পাচ্ছি আমরা কয়েক বছর ধরে। জানি না, এই ভাষা আমরা স্বীকার করেছি না এর শিকার হয়েছি। ‘স্যাজিটেরিয়াস রাশি যাদের তারা আজ প্লিজ ইয়েলো কালারের পোশাক পরবেন না কেনকী আজ ওই রংটা আপনার জন্য অশুভ আছে।’ আর ক’দিন পরেই তো একুশে ফেব্রুয়ারি। আপনার ইয়ারবাডে এমন আহ্বান ধ্বনিত হতেই পারে, ‘হাই ফ্রেন্ডস। শুভ সকাল। আজকের দিনটা খুব স্পেশাল জানেন। আজ ভাষা দিবস। ইয়ে ভাষা কে লিয়ে অনেক লোক হ্যাড টু ডাই ইন বাংলাদেশ। মতলব, দে ইউজড টু লাভ দেয়ার ভাষা সো মাচ। তো চলিয়ে, প্রথম গানা ইজ ডেডিকেটেড টু বরকত। আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো ইক্কিশে ফেব্রুয়ারি, ফলোড বাই জানেমন, জানেমন..।’ ওঁদের মতো নিজের ভাষার উপরে প্যার আমার-আপনার থোড়ি না আছে।

এই কেনকী, থোড়ি না আছে, মতলব, কমসেকম, ছুট, বাচত, শানদার এমন হাজারো শব্দ বাংলা ভাষায় কি সুন্দর এসে গিয়েছে ঘামাচির মতো। ঘামাচির পাউডার ছড়াতে ভুলে গিয়েছি। আর ঘামাচিগুলো ক্রমে ট্যাটু হয়েছে। এখন ওঠানোর উপায় নেই। বহু বাংলা মাধ্যম স্কুলের শিক্ষকরা মোরে আরও আরও আরও দাও ক্লাস বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। স্কুল আছে, ছাত্র নেই। আর অমুক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের বাসে ছোট্ট ছেলেকে কিংবা মেয়েকে তুলে দিয়ে বাবা বলছেন, ‘ফ্রেন্ডদের সঙ্গে নো বেঙ্গলি টক, প্রমিস?’

উত্তর আসছে, ‘পাক্কা, পা।’

চোখ মেলে, কান পেতে রইবেন না। ‘ঝিলমিল লেগে যাবে’।

রেসিপি

error: Content is protected !!