Tags Posts tagged with "বাংলা রম্যরচনা"

বাংলা রম্যরচনা

কী মুশকিল! বোতল তো কত কিছুর হতে পারে। বোতলে তেল, জল, সুগন্ধী, নেলপলিশ, ওষুধ, মায় অ্যাসিড, কেরোসিন, বিষ পর্যন্ত থাকতে পারে। সুতরাং নামটা শুনে অত উৎফুল্ল হওয়ার কারণ নেই। তবে বোতলের মহিমায় ব্যুৎপত্তি খোলার উদাহরণ পেয়েছি

প্রসঙ্গত ছেলেখেলা বলতে নেহাৎ সহজ হেলেফেলার কাজ বুঝি, কিন্তু ছেলেমানুষ যে খুব সহজ অন্তত হেলাফেলা করার মতো প্রাণী নয়, তা বড়রা বিলক্ষণ জানেন। এই প্রথাগত ‘ছেলে’ শব্দটির মধ্যে বলা বাহুল্য বাচ্চা ‘মেয়ে’ সম্প্রদায়ও অন্তর্ভুক্ত। আর মেয়েরা দুষ্টুমিতে বিশেষ করে অন্যের অনিষ্ট করার প্রতিযোগিতায় খানিক পিছিয়ে থাকলেও পাকামিতে পশ্চাদ্‌পদ একথা তাদের চরম নিন্দুকেও বলবে না।

আমরা তৃতীয় বার সিকিম গিয়েছিলাম মোট চারটি পরিবারের এগারোজন সদস্য মিলে। আমরা তিনজন ছাড়াও আমার মা বাবা, আর আমার বরের অফিসের এক সহকর্মী দম্পতি ও তাদের কন্যা এবং কন্যার মাসিমেসোমাসতুতো ভাই। গ্যাংটক থেকে য়ুমথাং দেখার জন্য লাচুংয়ে রাত্রিবাসের সময় দেখি ওর অফিসের সেনগুপ্তদা একটা পুঁচকি বোতল বার করেছেন। তাই নিয়ে সেনগুপ্তদি বেজায় চটে রাগারাগি করছেন। দাদার শরীরে নানা আধিব্যধি, তার মধ্যে এই উপদ্রব কেন? দিদিকে বোঝানোই যাচ্ছে না ৩৬০ মিলিলিটার নয়দশ ভাগ হলে পরে তা শীত, মেজাজ, যকৃত কাউকেই কব্জা করতে পারবে না।

আমার সদ্য ক্লাস ওয়ানে অ্যাডমিশন নেওয়া পাঁচ পূর্ণ করা কন্যা তার বাবাকে শাসনের ভঙ্গিতে বলল, “বাবা, তুমি কিন্তু খাবে না

আমার বেশ মজা লাগল। ওকে প্রশ্ন করলাম, “কেন রে? বাবাকে খেতে মানা করছিস কেন? ওটা কী?” মাকে নিয়ে তার ভাবনা নেই, জানে নরম পানীয়ের ভক্ত। বাবাকেও কড়া পানীয় পান করতে দেখেনি, তবু অনুমান করেছে পরিস্থিতির দাবিতে সাড়া দিলে বাবাই দিতে পারে।

কমন নেমটা জানি না। প্রপার নেমটা দেখেছি – রয়াল চ্যালেঞ্জ

কৃতিত্বটা কাকে দেব, আইসিএসসি বোর্ডের পাঠ্যসূচি না একটি পাঁচ বছরের বালিকার অন্তর্দৃষ্টি? তবে মদের বোতলও যে ব্যাকরণ শিক্ষায় কাজে লাগতে পারে তা ঐ শিশুর কাছে শিখলাম

একটু পিছিয়ে যাই। এই অবতার আমার সন্তান নন। সম্পর্কে তার মামা। অনেকদিন আগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন আমার ছোটমাসির কোল আলো করে। পাক্কা দশ পাউন্ডের পুত্ররত্ন জন্মগ্রহণ করার সময়েই গর্ভধারিণীকে চিরে বেশ কাবু করে দিয়েছিলেন।

আমার দাদামশাই এক সময় যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। ‘লবাব’এর রোল ছিল বাঁধা। বম্বেতে কোনও এক প্রযোযনা সংস্থায় নায়কের চাকরিও পেয়েছিলেন। কিন্তু সুন্দরী ও সম্ভাব্য সুরাসক্তির আশঙ্কায় তাঁর বিধবা অগ্রজা মানে আমার মায়েদের পিসিমা রুপোলি দুনিয়ায় যেতে দেননি। দাদুর আমার জ্বালাময়ী ঝাল, ডালপুরি, চুনো মাছের টক কিংবা বিড়ি ছাড়া আর কোনও কিছুতে বিশেষ আসক্তির কথা শুনিনি। কিন্তু কপাল করে নিজে দেখেশুনে যে চার সুবোধ জামাতা চয়ন করেছিলেন, তাঁরা সকলেই ঢুকুঢুকুতে ওস্তাদতার মধ্যে পারদর্শী ছিলেন আমার বড়ো মেসো আর ছোট মেসো। মাঝের দুজনের আসক্তি কম না হলেও শক্তি একটু কম পড়ত। অর্থাৎ অল্পেই নেশা হয়ে কুপোকাৎ হয়ে যেতেন।

তা এ হেন ছোটমেসোর একমাত্র পুত্র শ্রীমান চিন্টু কুমার আমাদের নাবালকনাবালিকা ভাইবোনেদের কাছে পালা করে আদর খাচ্ছে। কিন্তু রোজকার বরাদ্দ চটকাইমটকাই কিংবা হুটোপাটিতে তার বিশেষ মনোযোগ নেই। পাশের ঘরে বাবা মেসোদের আসর বসেছে বলে দরজা ভেজানো। আর চিন্টু বারবার সেই দরজা ঠেলে ও ঘরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। যারা বোতলের মাহাত্ম না মানতেও দৌরাত্ম জানি, তারা চিন্টু ট্র্যাক হড়কে নিষিদ্ধ এলাকায় গোঁত্তা খাওয়ার উপক্রম করলেই তটস্থ হয়ে পড়ছি। মামাসিদের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের গজগজানি সেদিন বিয়েবাড়ির গুঞ্জনে গুম। যে যার ট্যাঁভ্যাঁদের তুলনায় সাডল্য ভাইবোনেদের জিম্মা করে মেতেছে আড্ডার নেশায়।

চিন্টু আমার ট্যাঁক থেকে নেমে টলোমলো হেঁটে এবার দরজা ঠেলে এক্কেবারে মাঝখানে। “বাবা এটা কী?”

এটা কিছু না। তুই ভেতরে যা

বাবা এটা কী?”

এটা কোকোকোলা”

বাবা চিন্টু কোকোকোলা খাবে।”

মেসো গ্লাস থেকে এক চামচ হলদেটে তরল তুলে ছেলের মুখে দিয়েছেন। “এবার যা

বাবা চিন্টু আর একটু কোকোকোলা খাবে

আর এক চামচ নিয়ে আবার ছেলেকে শান্ত করলেন ছোট মেসো। “এবার ভেতরে যাও তোবাচ্চাদের আর খেতে নেই

বাবা চিন্টু আর একটু কোকোকোলা খাবে

ভ্যাপ্‌! ডেঁপো ছেলে কোথাকার! বললাম না বাচ্চাদের বেশি কোকোকোলা খেতে নেই

ঠোঁট ফুলিয়ে চিন্টুবাবু ভেতরের ঘরে ঢুকে দাদাদের বলল, “অ্যাই, মড খাবি তো ও ঘরে যা।”

এবার চিন্টুর এক দিদির পালা। ছোট্টবেলা থেকেই আমার বোন বেশ স্বাবলম্বী দিদির মতো ভাত মেখে গেলাতে হোত না, নিজের কচি দুটি হাতের সদব্যবহার করে টেবিলে চড়ে বসে খাদ্যাখাদ্য ভেদ না করে গপাগপ মুখে চালান দিত তার খাদ্য তালিকায় রাস্তার মোরাম, কীটপতঙ্গ বিশেষত পিঁপড়ে এমন কি বৈদ্যুতিক প্লাগের পিন সবই শামিল ছিল নেহাত কুকুর শিকার করা সম্ভব ছিল না, নাহলে বাঙালি বাড়িতে একজন নাগাকে পাওয়া যেত

তবে তার খাদ্যরুচি যে খুব বিচিত্র ছিল তা নয় একটু অ্যাডভেঞ্চার ও পরীক্ষানীরিক্ষা প্রিয় ছিল আর কী নিজে পোকা শিকার করত, আবার নিজেও ছিল ফলের পোকা সবচেয়ে প্রিয় ফল আপেল সেটা কতটা স্বাদের জন্য কতটা বর্ণের জন্য বলতে পারব না কারণ গোটা আপেল খেতে গিয়ে গলায় খোসা লেগে বিষম খেতো বলে মা আপেলের খোসা ছাড়িয়ে দিলে বেজায় চটে যেত তার লাল আপেলই চাই

গাত্রবর্ণও ছিল প্রিয় ফল আপেলের মতো, তবে খোসা ছাড়ানো আর অমন খাদুরে বাচ্চার চেহারাটাও যে নাদুস নুদুস আদুরে ধরণের ছিল অনুমান করাই যায় কিন্ডারগারর্টেন স্কুলে পড়ার সময় অ্যানুয়াল ফাংশনে সেজেছিল স্নো হোয়াইট তাই নিয়ে চার বছরের খুকির কিছুদিন রূপসী বলে কি গর্ব!

নাটকে সৎ মায়ের দেওয়া বিষ মাখানো আপেল মুখে দিয়ে তার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার কথা তা স্নোহোয়াইট আপেলে বাইট দিল ঠিকই, কিন্তু তাতে যে বিষ মাখানো ছিল তা বোধহয় ভুলে গিয়েছিল কিংবা মনে করতে একটুও ইচ্ছা করছিল না আড়াল থেকে সিস্টার রেমিজ়ার গলা দর্শকাসনে বসেও শোনা যাচ্ছিল, “সুদেষ্ণা ড্রপ দ্য অ্যাপেল” একবার নয় তিনচার বার শেষে যখন নেপথ্য থেকে প্রতিশ্রুতি এল, “আই উইল গিভ উই অ্যানাদার অ্যাপেল, প্লীজ় থ্রো দিস”, তখন খুব অনিচ্ছেয় স্নোহোয়াইট বিষে আচ্ছন্ন হয়ে ভূমিশয্যা নিল

অনুষ্ঠানের শেষে সুদেষ্ণা তার নিজস্ব উপার্জন খাবারের প্যাকেট পেয়ে ডালডায় ভাজা বালি কিচকিচ নিমকি, কিটকিটে দানাদার, বাপুজি কেক কোনওটাই বাদ দিল না। বাড়িতে এসে জল ও গ্রাইপ ওয়াটার ছাড়া আর কিছু অফিশিয়ালি দেওয়া হয়নি।

কিন্তু পরের দিন সকালে ঘুম বলে ঘুম, ওঠানোই যায় না। টেনেটুনে উঠিয়ে দিলে টলে পড়ে যায়। বাইরের খাবার থেকে কিছু গোলমাল হল? বাড়িতে কান্নাকাটি অবস্থা। ডাক্তার এসে অবস্থা দেখে বললেন হাসপাতালে ভর্তি করতে। আমি কোনও ফাঁকে চুরি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কাফ সিরাপের বোতল শেষ।

শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে দৌড়তে হয়নি। তবে তার পর থেকে আমাদের অসুখ করলেই বাড়ির আগে সমস্ত বোতলের স্টক মিলিয়ে নেওয়া হত।

রেসিপি

error: Content is protected !!