Tags Posts tagged with "রম্যরচনা"

রম্যরচনা

কাউন্টারের সামনে ভাল ভিড়। পাড়ার মুদির দোকান। রাত সাড়ে আটটা। খদ্দেররা সবাই পুরুষ।

ভিড়ের পেছনে রাস্তা। সেখান থেকে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল,

আঙ্কেল, দুটো গোল্ড ফ্লেক দাও না।

পুরুষদের ভেতর যারা দ্বিতীয় সারিতে তাদের কারও কারও ঘাড় একশ পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি ঘুরে গেল। তারা দেখতে পেলেন হাফ প্যান্টের বাইরে নব্বুই শতাংশ মখমলি উরুদেশ। ক্ষীণ কটি আর স্কিন টাইট গেঞ্জির মাঝখানে সোয়া ইঞ্চি জায়গা বেলিবাটন সমেত উন্মুক্ত। মাথার ওপর তোলা চশমা। হাতে চওড়া স্ক্রিনের বাহারি মোবাইল এবং কানে, যথারীতি, হেডফোন, যার শেষ প্রান্তটি অদৃশ্য হয়ে গেছে মৃদু দৃশ্যমান গভীর ক্লিভেজের ভেতর।

অঙ্কটা যেটুকু মিলতে বাকি ছিল মিলিয়ে দিল ওই গোল্ডফ্লেক। তার মানে এটি একটি উচ্ছন্নে যাওয়া ডেঁপো মেয়ে। যে কিনা নিশ্চয়ই যাদবপুরে পড়ে। বাঘাযতীনে পিজি নেয় এবং একাধিক পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করে।শুধু তাই নয় এরা ডাইনি গোত্রের।এরা একাধিক ছেলেকে চুষে চুষে খায় এবং খাওয়া শেষ হলে ছিবড়েটুকু ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেটের মতই, দুআঙুলের টুসকিতে রাস্তার পাশের ম্যানহোলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

ইতিমধ্যে দোকান মালিক আপদ বিদায়ের ভঙ্গিতে বাকিদের দাঁড় করিয়ে রেখে প্যাকেট নামিয়ে দুটি সিগারেট বাড়িয়ে ধরেছেন। কিন্তু মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে, রাস্তার ওপর, সেই অবধি দোকানদারের হাত পৌঁছন অসম্ভব। দুসারি পুরুষালী ব্যারিকেড রয়েছে মাঝখানে। প্রথম সারিতে যারা দাঁড়িয়ে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তারা প্রকট ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, আমরা আগে এসে দাঁড়িয়েছি। এবং আমরা ঘরোয়া মানুষজন। চাল ডাল তেলের খদ্দের। সিগারেট নয়, কনডম নয়, জাপানি তেলও নয়। এসেছি কিনতে পাতি সংসার।

আর এই মেয়ে এসেছে পরে। পোশাকের তো ওই ছিরি। তার ওপর চাইছে সিগারেট!

আমরা, ছেলেরা, আজও ফার্মেসি থেকে ন্যাপকিনটুকুও খোলা হাতে নিই না। প্রথমে দু ফেরতা খবরের কাগজ, তারপর মিশকালো পলিথিনে মুড়িয়ে নিয়েই ব্যাগে পুরে ফেলি। আর এই গাখোলা ঢলানিকে কি না আগে ছেড়ে দিতে হবে? নেভার।

সামনের সারির একজন হুঙ্কার দিয়ে ওঠে,

বাসুদা, আমাকে আগে ছেড়ে দাও। তারপর ওইসব ফালতু কাস্টমার সামলিও।

মেয়েটি ইতিমধ্যে কান থেকে ঠুসো জোড়ার একটি নামিয়ে ঘাড় কাত করে বলে উঠেছে,

এক্সকিউজ মি।

শুধু তাই নয়,লাস্ট রোয়ের সদ্য রিটায়ার্ড মদনবাবুর পিঠে আলতো করে হাত রেখে বলে উঠেছে,

আঙ্কেল একটু হাতটা বাড়িয়ে দাও না প্লিজ।

মদনবাবুর মদনজল শেষ কবে নির্গত হয়েছে ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি। পায়ের নোংরা নখের কোণা থেকে মাথার রঙ করা টাক অবধি ঝনঝনিয়ে উঠেছে এইটুকু নারীস্পর্শেই। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে বলে উঠলেন,

এই বাসু, দাও দাও আমার হাতে দাও। আমি দিয়ে দিচ্ছি।

মেয়েটি খুচরো রেডি করেই এনেছিল। দেওয়া নেওয়ার ফাঁকে নেলপালিশ লাগান ধারাল নখ ছুঁয়ে গেছে মদনবাবুর হাতের তেলো।

থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কেল, বলে সরে যেতেই বুক ধড়ফড়ের হাত রেহাই পেলেন তিনি।

কিন্তু নিস্তার কি এত সহজে মেলে! ওই মেয়ে তন্মধ্যে একটি সিগারেট দু’ আঙুলে ঝুলিয়ে গলায় আবদারের সুর তুলে বলে ফেলেছে,

একটু আগুন হবে বাসুদা?

কাউন্টারের ওপর ফাঁসি হয়ে যাওয়া আসামীর মত একটা দড়িবাঁধা লাইটার সব সময় ঝোলে। কিন্তু সেখানে পৌছতে হলে ভিড়টাকে দুভাগ হতেই হয়। নইলে চামড়ায় আগুন ঘষা খায়।

মদনবাবু এবং আরও দুজন একটু ডাইনে বাঁয়ে হেলে গেলেও বাকিরা হেললেন না। একেই তো লাইন টপকান কেস তায় আবার এখন আগুন চাইছে এই সর্ব অঙ্গে আগুনবাহী মেয়েটা !

বাসু উপায়ান্তর না দেখে দেশলাইটা একটু আলতো করে ভিড়ের ওপর দিয়ে ছুঁড়ে দিতেই শেষ চমকটি উন্মোচিত হল। ম্যাচবক্স লুফে নিয়ে মেয়েটি রাস্তা পার হল এবং উলটো দিকে পেছন উঁচু বাইকে, এতক্ষণ ফোকাসের বেমালুম বাইরে থাকা, ইয়াং দেড়েল মাচো ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেল। তার পরনেও স্যান্ডো এবং লোমশ পা বার করা বারমুডা।

সবিস্ময়ে স্টার্ভড জনতা দেখল, কী আরামে , হাতের তালুর আড়াল তুলে এক আগুন ভাগাভাগি করে ধরিয়ে নিচ্ছে দুজন দুটো সিগারেট।

দেশলাই ফেরতটুকু দিয়েই মেয়েটি কী মসৃণ দ্রুততায় উত্তুংগ বক্ষ ছেলেটির পিঠে লেপটে ধোঁয়া ছেড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দুজনে, রাস্তার পরবর্তী বাঁকটায়।

এই সমগ্র দৃশ্যে লাইনে দাঁড়ান প্রবীণতম মানুষটির দীর্ঘশ্বাস পতনের সঙ্গে নির্গত শেষ সংলাপটুকু ছিল এই রকম,

এদের ঘরভাড়া দিসে কেডা? ক্যান দিসে? কলোনি কমিটির মিটিং ডাকোন লাগে। এইজন্যই কি ইংরজের সঙ্গে লড়াই দিসিলাম? দ্যাশ ছাইড়া আইসিলাম?

#                                  #           #

খুব একটা ভূল বলেননি ঐ বৃদ্ধ। ইংরেজ আসার আগে আমাদের দেশে চলন ছিল হুঁকো এবং গড়গড়ার। প্রধানত পুরুষেরা প্রকাশ্যে, অন্দরের সম্ভ্রান্ত গিন্নিরা দ্বিপ্রাহরিক পিএনপিসির আসরে ধূমপান করতেন।

সে ছিল তাম্বাকু সেবনের স্বর্ণযুগ।

বিশ্বযুদ্ধ আমাদের উপহার দিল ফ্রন্টে ও সিভিলিয়ান জীবনে বিষাক্ত গ্যাসবাহী সিগারেট।

মেয়েরাও যে ধূমপান করে সেটি আমাদের প্রথম প্রত্যক্ষ করাল হিন্দি সিনেমা।

আমরা সবিস্ময়ে দেখলাম, কালো লম্বা হোল্ডারের মাথায় লাগান জ্বলন্ত সিগারেট । মৃদু মৃদু টান দিচ্ছেন নাদিরা, হেলেন, বিন্দু। কাঁধ খোলা, দস্তানা ঢাকা পেলব হাতটি রাখা অজিত, প্রাণ কিম্বা প্রেম চোপড়ার কাঁধে, জুয়ার টেবিলে। পরনের পোশাকটিও যথেষ্ট সংক্ষিপ্ত।

আমাদের জীবনে সিনেমার ভয়ংকর প্রভাব সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই গেঁথে দিল একটি চিরস্থায়ী ডেটা, সিগারেট খায় খারাপমেয়েরা।

ছেলেরা নয়। কারণ সিগারেট হল দেব আনন্দ, দিলীপ কুমার, ধর্মেন্দ্র, অমিতাভ বচ্চনের স্টাইলসিগনেচার। সিগারেট এদের পৌরুষের জয়ধ্বজা। এদের রোমান্টিসিজমের ফ্লেভার।

নায়ক’ ছবিতে রিসিভার কানে, সানগ্লাস চোখে, ঠোঁটে সিগারেট উত্তম তো সর্বকালের সেরা পুরুষালী আইকন।

কিন্তু ‘দিওয়ার’ অবধি আসার পরেও পরভীন ববি যখন দুটি সিগারেট একসঙ্গে জ্বালিয়ে বচ্চনের বুকে মাথা রেখে একটি এগিয়ে ধরে, তখনও আমরা এই মারাত্মক অ্যাংরি ইয়াং ম্যানটির ভয়ে হলে সিটি না দিলেও মনের ভেতর কোথাও সামান্য খেদ রাখি এই ভেবে যে গুরু কি না শেষে একটা কলগার্লের প্রেমে পড়ল!

সিনেমা থেকে বাস্তবের মাটিতে প্রথম আমাদের সামনে সিগারেট মুখে নারীকে দেখলাম ফার্স্ট ইয়ারে। সে তখন থার্ড ইয়ারে। নাম বেগম দি(নামটি কাল্পনিক)

কলেজের প্রথম দিনই সেই মফঃস্বল তোলপাড় করা জোয়ান অব আর্ককে দেখলাম এয়ার হোস্টেস ব্লাউজ পড়ে ছেলেদের ক্যান্টিনে বসে। হাতের খুরিতে চা। অন্য হাতের আঙুলে জ্বলন্ত সিগারেট। আলোচনায় নকশাল আন্দোলনের ভবিষ্যৎ।

সামনে কিছু সিনিয়র ও জুনিয়র । তারা বুঁদ হয়ে বেগমদির কথা শুনছে।

আফশোষ, বেগমদিকে আমরা বেশিদিন পাইনি। পরের বছর এম এ করতে কলকাতা, তার কিছু পরে আমেরিকার কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হয়ে নীল আকাশে ধোঁয়া ছেড়ে উড়ে গেল বেগমদি। পেছনে রেখে গেল অজস্র প্রাক্তন ভগ্ন নকশাল হৃদয়।

বেগমদিই, প্রথম প্রতক্ষ্য ধোঁয়াবনবিহারিণীযাকে খারাপ মেয়ে বলবার হিম্মত কেউ সামনে দেখায়নি। আড়ালে যা বলেছে, তা উচ্চারণের অযোগ্য।

সোশাল মিডিয়ায় ক’দিন আগেই একটা ছবি ভাইরাল হল। এক সুসজ্জিত কনে একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে। হাতে সিগারেট। নাক মুখ দিয়ে গলগল করে বার হয়ে আসছে ধোঁয়া।

কনের বদলে এখানে কিন্তু বর থাকলে ছবিটি ভাইরাল হয় না। কারণ, কনেটি দুষ্টু।

বোঝাই গেল দুষ্টুনারীর প্রতি আকর্ষণ, মুখে না স্বীকার করলেও, আজও অপ্রতিরোধ্য। আর সিগারেট আজও মেয়েদের দুষ্টুতর ইমেজ দেয়।

কিছুদিন আগে পল্লীশ্রীর মোড়ে ঘটে গেল নীতিপুলিশের প্রতিবাদ। এক বয়স্ক মানুষ ধমকালেন সিগারেট ঠোঁটে যুবতীকে। আমার সামনে রাসবিহারীর মোড়ে এক নার্সিং হোমের সামনে দাঁড়িয়ে আরেক ধূমপায়িনীকে ধমকাল এক যুবক।হাত তুলে দেখাল সাইনবোর্ড। মেয়েটি এতটুকু বিচলিত না হয়ে ক্রসিং পার হয়ে ওপারে গিয়ে টানতে লাগল অবশেষ।

খাস কলকাতার প্রগতিশীলএকটি স্বনামধন্য ইউনিভারসিটির অবস্থা বলি।

মেয়েকে এ্যাডমিশন টেস্টে এনেছিলাম। গেট পেরিয়ে কয়েক পা এগোতেই বাধা দিল এক শীর্ণা।  হাতে জ্বলন্ত সাদাকাঠি। নির্গত গন্ধটি কিন্তু গঞ্জিকার। মেয়েকে আমাদের হাত থেকে একরকম ছিনতাই করে গলা জড়িয়ে নিয়ে গেল বিল্ডিংএর ভেতর। আমি এগোতেই বাধা দিয়ে বলল, তোমার আর আসার দরকার নেই আংকেল। আমরাই ম্যানেজ করে নেব।

এইসব দেখে সুদূর বর্ধমান থেকে গাড়ি ভাড়া করে আসা বাবা মা হতাশ সুরে বললেন,

চান্স পেলেও এখানে পড়তে দেব না মেয়েকে।

মেয়ের মুখে শাওনের মেঘ নেমে এল যেন।

এডমিশন টেস্ট শেষ। গলগল করে পরীক্ষার্থীরা  বার হচ্ছে। গেটের বাইরে বর্ধমান থেকে আসা সেই গার্জেনদ্বয়।

তারা জানতেও পারলেন না যে আমি এইমাত্র দেখে এলাম মেয়েটি আরেক পরিচিতার সংগে ভেতরের ক্যান্টিনে দাঁড়িয়ে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিচ্ছে।

আঙুলের দু’ফাঁকে জ্বলজ্বল করছে একটি জ্বলন্ত সিগারেট।

পঞ্চবিংশতিতম আন্তঃরাজ্য তস্কর সম্মেলন । এবারে রজতজয়ন্তী বর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সম্মেলন । এই সম্মেলনের ভেন্যু অর্থাৎ মিলনস্থল হল ভেটকিমারির জঙ্গল । অনেক বড় বড় চোর ,ডাকাত ,গাঁটকাটা ,পকেটমার ,ঠগ,তোলাবাজ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সম্মেলনে যোগ দিতে আসছেন । আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্মাগলার বড়া কোকিল” এবারের সম্মেলনের বিশেষ অতিথি । অনেক বিদগ্ধ চোর এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছেন। তাঁরা এখানে তাঁদের তস্করবৃত্তি সংক্রান্ত গবেষণাপত্র প্রকাশ করবেন । এ ছাড়া কানকাটা মদন,পাজি মস্তান,ঝুলন দেবীর মত বিশিষ্ট তস্করবর্গ উপস্থিত থেকে সম্মেলনের গৌরব বৃদ্ধি করবেন ।

এবারের সম্মেলন উদ্বোধন করতে আসছেন দেশের কৃতি ডাকাত দস্যু কাল্লু খাঁ । ডাকাতিতে তাঁর অমর কীর্তির জন্য তিনি “দস্যু” উপাধি লাভ করেছেন । এ ছাড়া তিনি দেশের সর্বোচ্চ সম্মান তস্করভূষণ উপাধিতেও ভূষিত হয়েছেন । গতবছর তিনি চারচারবার জেল ভেঙে পালিয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন । তিনি বলেছেন আমাদের দেশে এমন কোন কারাগার এখনও তৈরী হয়নি যা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে ।

প্রত্যেক বছর এই সম্মেলনে বছরের শ্রেষ্ঠ তস্করকে “তস্করসম্রাট” উপাধি প্রদান করা হয়ে থাকে। এবারের তিনটি রাজ্য এর প্রধান দাবিদার । পশ্চিমভঙ্গ ,মেঘাচল ও অন্তপ্রদেশ । এ ছাড়া হিমালয়খন্ড এবং কমলনাড়ুও কম যায় না । ঐ দুই রাজ্যের প্রতিনিধিগনও স্ব স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী । সুতরাং তাদেরও উপেক্ষা করা চলে না । কিন্তু কার ভাগ্যে যে শিকে ছিঁড়বে তা নিয়ে জোর জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে । বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল থেকে সুপারিশের পর সুপারিশ আসছে । মোটা টাকার বেটিংও চলছে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ।

বোঝাই যাচ্ছে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবার । ছিঁচকের মনে তাই বেশ টেনশন রয়েছে । ছিঁচকে পশ্চিমভঙ্গের একজন নামকরা সিঁধেল চোর । গত বছর রাজ্য পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সে এ রাজ্যের চোরচূড়ামনি হয়েছে । তাই এবার সে তস্কর সম্মেলনে পশ্চিমভঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করার সম্মান লাভ করেছে । ছোটবেলা থেকেই তার চৌর্য প্রতিভা লক্ষ্য করা যায় । তার বাবা ছিলেন একজন নামকরা চোরাকারবারি ।তা ছাড়া ভেজালবিশেষজ্ঞ হিসেবেও তিনি সংশ্লিষ্ট মহলে সবিশেষ পরিচিত । এ বিষয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান ভেজাল কারবারিদের খুব উপকারে এসেছে । চৌর্যবৃত্তি ছিঁচকের পারিবারিক পেশা । তার “হাতেসিঁধকাঠি” হয়েছিল বাবার কাছেই । পরে অবশ্য বিভিন্ন নামকরা ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়েছে সে ।

এবারে মূল লড়াইটা হবে ছিঁচকে ও শ্রী অপহারক শর্মার মধ্যে । শ্রী শর্মা অন্তপ্রদেশের প্রতিনিধি ।গত বছর অন্তপ্রদেশ সরকার তাঁকে চোরচূড়ামনি খেতাব দিয়েছে । শোনা যায় যে কোন দেরাজ ,আলমারি অথবা সিন্দুকের তালা খুলে ফেলা তাঁর কাছে বায় হাত কা খেল্‌ । তালোঘাটিনী মন্ত্র অর্থাৎ যে মন্ত্রে নিমেষে তালা খুলে যায় – সেই মন্ত্রে তিনি সবিশেষ পারদর্শী । এ ছাড়া তিনি আরেকটি বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী । তিনি নাকি মুহূর্তে ঘুম পাড়িয়ে ফেলতে পারেন যে কোন মানুষকে । শুধু তাই নয় যতক্ষণ তিনি চাইবেন সে ব্যক্তি কিন্তু ঘুমিয়েই থাকবে । উঠবে না । এর জন্য শ্রী শর্মার কোন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তিনি নিদালী মন্ত্র জানেন ।অবশ্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক কথাই রটে । তার সবটা সত্যি নাও হতে পারে । সুতরাং ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতে চায় না ছিঁচকে । তার মতে ঘুম পাড়ানো কী এমন ব্যাপার ? আর তা ছাড়া এই ভাবে মন্ত্র পড়ে ঘুম পাড়িয়ে চুরি করা হল মোটা দাগের কাজ । গৃহস্থ স্বাভাবিক ভাবে নিদ্রা যাবে । তাকে কোন রকম বিরক্ত না করে চুপিসারে কাজ সারতে হবে । কাকপক্ষীটিও টের পাবে না । প্রকৃত চোর ঘুমন্ত মানুষের নিশ্বাসপ্রশ্বাসের আওয়াজ শুনে ঘুমের গভীরতা মাপবে । এবং সেই মত কাজ করবে । তবেই না বাহাদুরি । মনে রাখতে হবে চৌষট্টি কলার অন্যতম কলা হল চুরিবিদ্যা ।

এদিকে আবার মেঘাচলের মহিলা প্রতিযোগী মিস্‌ মনিকা অনেকের চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারেন ।তুল্যমূল্যর বিচারে তিনিও কম জান না । ছিঁচকে জানে মহিলা জ্ঞানে তাঁকে যদি হেলাফেলা করা হয় তাহলে আখেরে ঠকতে হতে পারে । কারণ অনেক সময় দেখা গিয়েছে – এ লাইনে মহিলারা পুরুষদের চাইতে অধিকতর সফল । তাদের একটা সহজাত ক্ষমতা রয়েছে – তারা অনায়াসে লোকের মনে কোন রকম সন্দেহের উদ্রেক না ঘটিয়ে সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে – এবং অধিকাংশ সময়েই সেটা তাদের কাজের পক্ষে সহায়ক হয় ।

পাঁচুরামের ওপর বিভিন্ন ডেলিগেট্‌সদের আপ্যায়নের ভার পড়েছে । তাঁদের যাতে কোন অসুবিধে না হয় –সে দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে তাকে । ফান্ডের জন্য কোন চিন্তা নেই । সম্মেলনের স্বেচ্ছাসেবকগ বহু আগের থেকেই ফান্ড কালেকশনের জন্য দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন । ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক ডাকাতিও সঙ্ঘটিত হয়েছে । কিন্তু এবারের সম্মেলনের খরচ অনেক বেশি । কারণ রজতজয়ন্তী বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় এবার প্রস্তাব পাশ হয়েছে যে ডেলিগেট্‌সদের একটি করে সোনার সিঁধকাঠি উপহার দেওয়া হবে । তাই শুধু মাত্র ব্যাঙ্ক ডাকাতির ওপর নির্ভর না করে সম্মেলনের সংগঠকগণ ট্রেনে ,ট্রামে ,বাসে ,বাজারে ,মেলায় ,মিটিঙে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের স্বেচ্ছাসেবকদের । এ ছাড়া বাছা বাছা ধনীগৃহেও হানা দিতে বলা হয়েছিল তাঁদের ।

এবারের সম্মেলনের স্লোগান হল –“যদি না পড়ে ধরা “। কারণ পন্ডিতেরা তো বলেই গিয়েছেন –“চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা “। তস্কর সমাজ এই আপ্তবাক্যটিকে বেদবাক্য হিসেবে গণ্য করে। সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত পত্রিকা “তঞ্চক”এ গতবছরের তস্করসম্রাটের একটি জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর মতে ,-“চুরি নিছক একটি জীবিকা মাত্র নহে । ইহা জীবনদর্শনও বটে । ইহাকে শুধু মাত্র অর্থ উপার্জনের নিমিত্ত কোন উপায় হিসাবে গণ্য করা উচিৎ হইবে না।চুরি আমাদের সমাজের পক্ষে হিতকর । ইহাতে সম্পদের পূঞ্জিকরণ রোধ হয় ।“ তিনি আরও বলেছেন , “চুরি আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত । চুরি করেন নাই এমন ব্যক্তি পৃথিবীতে বিরল । সাধারণ মানুষ হইতে শুরু করিয়া পৃথিবীবিখ্যাত মনিষীগণ প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় কিছু না কিছু চুরি করিয়াছেন । তা সে ঠাকুমার তৈরী আচারই হোক কিংবা বাপের মানিব্যাগের খুচরো পয়সাই হোক । সুতরাং ইহা হইতে স্পষ্ট যে চুরি নিন্দনীয় কাজ নহে । তাই তো পণ্ডিতগণ ইহাকে ‘মহাবিদ্যা’ আখ্যা দিয়াছেন । তথাকথিত ভদ্রলোকের সহিত চোরেদের পার্থক্য এই যে ,-চোরেরা স্বীকার করে যে তাহারা চোর , কিন্তু ভদ্রলোকেরা তাহা করেন না ।“

সম্মেলনের প্রথম দিন মহামান্য কাল্লু খাঁ একটি প্রতীকী সিঁধ কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ।এবারের তস্কর সম্মেলনের ম্যাসকট্‌ অর্থাৎ প্রতীক হল “পলায়নরত মার্জার “ । বেড়ালকে চোরেদের প্রতিভূ হিসেবে দেখা হয়েছে । বেড়ালের মধ্যে চৌর্যপ্রবৃত্তি যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান । সে প্রায়শই ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য দুধ মাছ ইত্যাদি অত্যন্ত সুচতুর ভাবে চুরি করে খায় ।তিনদিন ব্যাপী সম্মেলনে প্রচুর আলোচনা হয়েছে । অনেক বাকবিতন্ডা ,তর্কবিতর্ক, ভাবের আদানপ্রদান হয়েছে । দেশবিদেশের অনেক জ্ঞানীগুণী তস্কর তাঁদের নিজের নিজের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন । তস্করবৃত্তিকে আরও কীভাবে উন্নত করা যায় – তার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে । ঠিক হয়েছে এই কমিটি শীঘ্রই প্রশাসনের কাছে তাঁদের দাবিদাওয়া পেশ করবে । তাঁদের প্রধান প্রধান দাবিগুলি হল –

চুরি করে ধরা পড়লে দৈহিক নির্যাতন করা চলবে না ।

আদালতে মকদ্দমা হলে চোরেদের আইনি সহায়তা দিতে হবে ।

চুরিবিদ্যাকে ইশকুলের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।

এবং – তস্করতা বিষয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদ লোকসভায় রাখতে হবে যিনি এই বিভাগের সমস্ত সুবিধা অসুবিধা দেখবেন ।

বিনা মেঘে বজ্রপাত ! হঠাৎ খবর এসেছে – অন্তপ্রদেশের চোরচূড়ামনি শ্রী অপহারক শর্মা সম্মেলনে আসতে পারছেন না । শোনা যাচ্ছে যে একটি চুরির ঘটনায় বাড়ির পাইপ বেয়ে উঠতে গিয়ে তিনি পিছলে পড়ে যান । তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এই ঘটনায় অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে । বিশেষত যারা বেটিং-এর সঙ্গে যুক্ত । কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না যে শ্রী শর্মার মত একজন পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ চোর এই রকম আনাড়ির মত পড়ে যেতে পারেন।এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষ দুটি লবিতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।একপক্ষ এর মধ্যে সাবোতাজের ছায়া দেখছেন । অপর পক্ষ যারা ছিঁচকেকে সমর্থন করছেন – তারা বলছেন আসলে শ্রী শর্মা ভয় পেয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। তাই এই নাটক। সাবতেজটাবোতেজ সব বাজে কথা । তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ছিঁচকের সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল হবে তার পক্ষে । সেইজন্য সম্মান রক্ষার্থে তিনি কায়দা করে সরে গেলেন । দেখ গে তিনি সুস্থই আছেন । আসলে তাঁর কিছুই হয়নি । সব ভাঁওতা ।

তবে কিছু লোক আছে যারা এই সব কুটকচালি ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে যেতে চান না । তারা চুরি-প্রিয় মানুষ । তাঁদের ধ্যান্‌জ্ঞান চুরি । তারা মনে করেন চুরি একটি উন্নত ধরনের ক্রীড়া । এবং যারা তস্কর তারা হচ্ছেন ক্রীড়াবিদ । কিছু উৎকৃষ্ট চুরি দেখার আশায় ছিলেন তারা । ভেবেছিলেন – হারজিত যারই হোক, শ্রী শর্মা এবং ছিঁচকের মধ্যে যে সুস্থ উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতা হবে তা খুবই আকর্ষক হবে ।

কিন্তু শ্রী শর্মার অনুপস্থিতি তাঁদের আশায় জল ঢেলে দিয়েছে ।

অবশেষে সব জল্পনাকল্পনার অবসান হল । যেমনটি ভাবা গিয়েছিল তেমনটিই হয়েছে । এবারে তস্করসম্রাটের উপাধি জিতে নিয়েছে পশ্চিমভঙ্গের ছিঁচকে । যদিও এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেকে জল ঘোলা করার চেষ্টা করেছিলেন। স্বজনপোষণের অভিযোগও তুলেছিলেন কেউ কেউ । অনেকে বলতে চেষ্টা করেছিলেন ছিঁচকে নাকি ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছে । কিন্তু সবার বাদানুবাদকে নস্যাৎ করে দেন মহামান্য কাল্লু খাঁ স্বয়ং । তাঁর মতে ছিঁচকের কৃতকার্যতা নিয়ে কোন সংশয়ের অবকাশ নেই । সে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই নির্বাচিত হয়েছে । কারণ হিসেবে তিনি বলেন – এবারে একটি কঠিন আইটেম ছিল । সেলব্রেটিদের পকেট মারা । সেই আইটেমে প্রত্যেকেই দেশের মন্ত্রী থেকে শুরু করে গায়ক ,নায়ক ,কবি ,সাহিত্যিক ,বিজ্ঞানী ,শিল্পী ইত্যাদি তাবড় তাবড় সেলিব্রেটিদের পকেট মেরেছেন । কিন্তু ছিঁচকে যা করেছে তা অভাবনীয় । সে যার পকেট মারতে সক্ষম হয়েছে তিনি আর কেউ নন – স্বয়ং কাল্লু খাঁ – তস্করভূষণ ।

উদ্ভট বার্তা” কাগজের পক্ষ থেকে এবারের তস্করসম্রাট ছিঁচকের ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম ।ছিঁচকে অনেক ধৈর্য ধরে আমার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে । সে মনেপ্রাণে একজন চোর । রোজ সকালে উঠে চোরের দেবতা দেবসেনাপতি স্কন্দ বা কার্তিকেয়কে প্রণাম না করে সে জলগ্রহণ করে না । তার কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি – চৌষট্টি কলার এক কলা এই বিদ্যা । অতি প্রাচীনকাল থেকে এই বিদ্যা আমাদের দেশে অধীত এবং অনুশীলিত হয়ে আসছে । এমন কি চর্যাপদেও এর উল্লেখ আছে ।

সেখানে আমরা পাই – যো সো চৌর সোই দুষাধী । দুষাধী অর্থাৎ দুঃসাধ্য কর্ম । যে প্রকৃত চোর সে দুঃসাধ্য কর্ম করার ক্ষমতা রাখে । এখানে চোরকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে । দেশের নবীন চোরেদের প্রতি তার বার্তা হল – প্রকৃত চোর হওয়া চাট্টিখানি কথা নয় । প্রচুর পরিশ্রমের প্রয়োজন । তার চলাফেরা হবে বিড়ালের মত নিঃশব্দ । হরিণের মত বেগবান । শ্যেনপক্ষীর মত গ্রাহ্য বস্তুকে আয়ত্তে আনতে সমর্থ হবে অনায়াসে। শুধু তাই নয় নানাবিধ রূপ ধারণে তাকে হতে হবে পারদর্শী। সে হবে জলের মত । যখন যেমন তখন তেমন । মানুষের মধ্যে নেই হয়ে থাকতে হবে তাকে । যেন কেউ চিনতে না পারে । তার চেহারার মধ্যে কোন বিশেষত্ব থাকবে না । সে হবে ভীষণ রকম স্বাভাবিক । এও এক ধরনের সাধনা । ছিঁচকে তার পেশার জন্য যথেষ্ট গৌরব বোধ করে । এবার তার লক্ষ্য হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় সম্মান “তস্করভূষণ” উপাধি লাভ করা ।

ফিরে এসে সম্পাদকের দপ্তরে ইন্টারভিউর লেখাটা জমা দিতে গিয়ে একটা জিনিষ আবিষ্কার করলাম পকেটটা কেমন হালকাহালকা লাগছে যেন ! যা ভেবেছি তাই । মানিব্যাগটা আমার পকেট থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে কোন মন্ত্রবলে । বুঝলাম ,তস্করসম্রাটের কাছে আরও সাবধান হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল আমার ।সে তার হাতের ভেল্কি আমার ওপর প্রয়োগ করে বুঝিয়ে দিয়েছে – নির্বাচকগণ তাকে তস্করসম্রাট নির্বাচিত করে মোটেও ভুল করেননি

error: Content is protected !!