Tags Posts tagged with "Bengali literature"

Bengali literature

কী মুশকিল! বোতল তো কত কিছুর হতে পারে। বোতলে তেল, জল, সুগন্ধী, নেলপলিশ, ওষুধ, মায় অ্যাসিড, কেরোসিন, বিষ পর্যন্ত থাকতে পারে। সুতরাং নামটা শুনে অত উৎফুল্ল হওয়ার কারণ নেই। তবে বোতলের মহিমায় ব্যুৎপত্তি খোলার উদাহরণ পেয়েছি

প্রসঙ্গত ছেলেখেলা বলতে নেহাৎ সহজ হেলেফেলার কাজ বুঝি, কিন্তু ছেলেমানুষ যে খুব সহজ অন্তত হেলাফেলা করার মতো প্রাণী নয়, তা বড়রা বিলক্ষণ জানেন। এই প্রথাগত ‘ছেলে’ শব্দটির মধ্যে বলা বাহুল্য বাচ্চা ‘মেয়ে’ সম্প্রদায়ও অন্তর্ভুক্ত। আর মেয়েরা দুষ্টুমিতে বিশেষ করে অন্যের অনিষ্ট করার প্রতিযোগিতায় খানিক পিছিয়ে থাকলেও পাকামিতে পশ্চাদ্‌পদ একথা তাদের চরম নিন্দুকেও বলবে না।

আমরা তৃতীয় বার সিকিম গিয়েছিলাম মোট চারটি পরিবারের এগারোজন সদস্য মিলে। আমরা তিনজন ছাড়াও আমার মা বাবা, আর আমার বরের অফিসের এক সহকর্মী দম্পতি ও তাদের কন্যা এবং কন্যার মাসিমেসোমাসতুতো ভাই। গ্যাংটক থেকে য়ুমথাং দেখার জন্য লাচুংয়ে রাত্রিবাসের সময় দেখি ওর অফিসের সেনগুপ্তদা একটা পুঁচকি বোতল বার করেছেন। তাই নিয়ে সেনগুপ্তদি বেজায় চটে রাগারাগি করছেন। দাদার শরীরে নানা আধিব্যধি, তার মধ্যে এই উপদ্রব কেন? দিদিকে বোঝানোই যাচ্ছে না ৩৬০ মিলিলিটার নয়দশ ভাগ হলে পরে তা শীত, মেজাজ, যকৃত কাউকেই কব্জা করতে পারবে না।

আমার সদ্য ক্লাস ওয়ানে অ্যাডমিশন নেওয়া পাঁচ পূর্ণ করা কন্যা তার বাবাকে শাসনের ভঙ্গিতে বলল, “বাবা, তুমি কিন্তু খাবে না

আমার বেশ মজা লাগল। ওকে প্রশ্ন করলাম, “কেন রে? বাবাকে খেতে মানা করছিস কেন? ওটা কী?” মাকে নিয়ে তার ভাবনা নেই, জানে নরম পানীয়ের ভক্ত। বাবাকেও কড়া পানীয় পান করতে দেখেনি, তবু অনুমান করেছে পরিস্থিতির দাবিতে সাড়া দিলে বাবাই দিতে পারে।

কমন নেমটা জানি না। প্রপার নেমটা দেখেছি – রয়াল চ্যালেঞ্জ

কৃতিত্বটা কাকে দেব, আইসিএসসি বোর্ডের পাঠ্যসূচি না একটি পাঁচ বছরের বালিকার অন্তর্দৃষ্টি? তবে মদের বোতলও যে ব্যাকরণ শিক্ষায় কাজে লাগতে পারে তা ঐ শিশুর কাছে শিখলাম

একটু পিছিয়ে যাই। এই অবতার আমার সন্তান নন। সম্পর্কে তার মামা। অনেকদিন আগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন আমার ছোটমাসির কোল আলো করে। পাক্কা দশ পাউন্ডের পুত্ররত্ন জন্মগ্রহণ করার সময়েই গর্ভধারিণীকে চিরে বেশ কাবু করে দিয়েছিলেন।

আমার দাদামশাই এক সময় যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। ‘লবাব’এর রোল ছিল বাঁধা। বম্বেতে কোনও এক প্রযোযনা সংস্থায় নায়কের চাকরিও পেয়েছিলেন। কিন্তু সুন্দরী ও সম্ভাব্য সুরাসক্তির আশঙ্কায় তাঁর বিধবা অগ্রজা মানে আমার মায়েদের পিসিমা রুপোলি দুনিয়ায় যেতে দেননি। দাদুর আমার জ্বালাময়ী ঝাল, ডালপুরি, চুনো মাছের টক কিংবা বিড়ি ছাড়া আর কোনও কিছুতে বিশেষ আসক্তির কথা শুনিনি। কিন্তু কপাল করে নিজে দেখেশুনে যে চার সুবোধ জামাতা চয়ন করেছিলেন, তাঁরা সকলেই ঢুকুঢুকুতে ওস্তাদতার মধ্যে পারদর্শী ছিলেন আমার বড়ো মেসো আর ছোট মেসো। মাঝের দুজনের আসক্তি কম না হলেও শক্তি একটু কম পড়ত। অর্থাৎ অল্পেই নেশা হয়ে কুপোকাৎ হয়ে যেতেন।

তা এ হেন ছোটমেসোর একমাত্র পুত্র শ্রীমান চিন্টু কুমার আমাদের নাবালকনাবালিকা ভাইবোনেদের কাছে পালা করে আদর খাচ্ছে। কিন্তু রোজকার বরাদ্দ চটকাইমটকাই কিংবা হুটোপাটিতে তার বিশেষ মনোযোগ নেই। পাশের ঘরে বাবা মেসোদের আসর বসেছে বলে দরজা ভেজানো। আর চিন্টু বারবার সেই দরজা ঠেলে ও ঘরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। যারা বোতলের মাহাত্ম না মানতেও দৌরাত্ম জানি, তারা চিন্টু ট্র্যাক হড়কে নিষিদ্ধ এলাকায় গোঁত্তা খাওয়ার উপক্রম করলেই তটস্থ হয়ে পড়ছি। মামাসিদের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের গজগজানি সেদিন বিয়েবাড়ির গুঞ্জনে গুম। যে যার ট্যাঁভ্যাঁদের তুলনায় সাডল্য ভাইবোনেদের জিম্মা করে মেতেছে আড্ডার নেশায়।

চিন্টু আমার ট্যাঁক থেকে নেমে টলোমলো হেঁটে এবার দরজা ঠেলে এক্কেবারে মাঝখানে। “বাবা এটা কী?”

এটা কিছু না। তুই ভেতরে যা

বাবা এটা কী?”

এটা কোকোকোলা”

বাবা চিন্টু কোকোকোলা খাবে।”

মেসো গ্লাস থেকে এক চামচ হলদেটে তরল তুলে ছেলের মুখে দিয়েছেন। “এবার যা

বাবা চিন্টু আর একটু কোকোকোলা খাবে

আর এক চামচ নিয়ে আবার ছেলেকে শান্ত করলেন ছোট মেসো। “এবার ভেতরে যাও তোবাচ্চাদের আর খেতে নেই

বাবা চিন্টু আর একটু কোকোকোলা খাবে

ভ্যাপ্‌! ডেঁপো ছেলে কোথাকার! বললাম না বাচ্চাদের বেশি কোকোকোলা খেতে নেই

ঠোঁট ফুলিয়ে চিন্টুবাবু ভেতরের ঘরে ঢুকে দাদাদের বলল, “অ্যাই, মড খাবি তো ও ঘরে যা।”

এবার চিন্টুর এক দিদির পালা। ছোট্টবেলা থেকেই আমার বোন বেশ স্বাবলম্বী দিদির মতো ভাত মেখে গেলাতে হোত না, নিজের কচি দুটি হাতের সদব্যবহার করে টেবিলে চড়ে বসে খাদ্যাখাদ্য ভেদ না করে গপাগপ মুখে চালান দিত তার খাদ্য তালিকায় রাস্তার মোরাম, কীটপতঙ্গ বিশেষত পিঁপড়ে এমন কি বৈদ্যুতিক প্লাগের পিন সবই শামিল ছিল নেহাত কুকুর শিকার করা সম্ভব ছিল না, নাহলে বাঙালি বাড়িতে একজন নাগাকে পাওয়া যেত

তবে তার খাদ্যরুচি যে খুব বিচিত্র ছিল তা নয় একটু অ্যাডভেঞ্চার ও পরীক্ষানীরিক্ষা প্রিয় ছিল আর কী নিজে পোকা শিকার করত, আবার নিজেও ছিল ফলের পোকা সবচেয়ে প্রিয় ফল আপেল সেটা কতটা স্বাদের জন্য কতটা বর্ণের জন্য বলতে পারব না কারণ গোটা আপেল খেতে গিয়ে গলায় খোসা লেগে বিষম খেতো বলে মা আপেলের খোসা ছাড়িয়ে দিলে বেজায় চটে যেত তার লাল আপেলই চাই

গাত্রবর্ণও ছিল প্রিয় ফল আপেলের মতো, তবে খোসা ছাড়ানো আর অমন খাদুরে বাচ্চার চেহারাটাও যে নাদুস নুদুস আদুরে ধরণের ছিল অনুমান করাই যায় কিন্ডারগারর্টেন স্কুলে পড়ার সময় অ্যানুয়াল ফাংশনে সেজেছিল স্নো হোয়াইট তাই নিয়ে চার বছরের খুকির কিছুদিন রূপসী বলে কি গর্ব!

নাটকে সৎ মায়ের দেওয়া বিষ মাখানো আপেল মুখে দিয়ে তার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার কথা তা স্নোহোয়াইট আপেলে বাইট দিল ঠিকই, কিন্তু তাতে যে বিষ মাখানো ছিল তা বোধহয় ভুলে গিয়েছিল কিংবা মনে করতে একটুও ইচ্ছা করছিল না আড়াল থেকে সিস্টার রেমিজ়ার গলা দর্শকাসনে বসেও শোনা যাচ্ছিল, “সুদেষ্ণা ড্রপ দ্য অ্যাপেল” একবার নয় তিনচার বার শেষে যখন নেপথ্য থেকে প্রতিশ্রুতি এল, “আই উইল গিভ উই অ্যানাদার অ্যাপেল, প্লীজ় থ্রো দিস”, তখন খুব অনিচ্ছেয় স্নোহোয়াইট বিষে আচ্ছন্ন হয়ে ভূমিশয্যা নিল

অনুষ্ঠানের শেষে সুদেষ্ণা তার নিজস্ব উপার্জন খাবারের প্যাকেট পেয়ে ডালডায় ভাজা বালি কিচকিচ নিমকি, কিটকিটে দানাদার, বাপুজি কেক কোনওটাই বাদ দিল না। বাড়িতে এসে জল ও গ্রাইপ ওয়াটার ছাড়া আর কিছু অফিশিয়ালি দেওয়া হয়নি।

কিন্তু পরের দিন সকালে ঘুম বলে ঘুম, ওঠানোই যায় না। টেনেটুনে উঠিয়ে দিলে টলে পড়ে যায়। বাইরের খাবার থেকে কিছু গোলমাল হল? বাড়িতে কান্নাকাটি অবস্থা। ডাক্তার এসে অবস্থা দেখে বললেন হাসপাতালে ভর্তি করতে। আমি কোনও ফাঁকে চুরি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কাফ সিরাপের বোতল শেষ।

শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে দৌড়তে হয়নি। তবে তার পর থেকে আমাদের অসুখ করলেই বাড়ির আগে সমস্ত বোতলের স্টক মিলিয়ে নেওয়া হত।

কাল রাত্তিরে আবার হয়েছে। বাপি আর মাম্‌মামের ঝগড়া।

ঝগড়ার সময় বাপি মাম্‌মাম দুজনেই বেশির ভাগ টানা ইংলিশ বলে। প্রথম-প্রথম যখন ওদের ঝগড়া শুনতাম, সবটুকু বুঝতে পারতাম না। বেঙ্গলিতে যতটুকু বলত তা থেকে আন্দাজ পাওয়া যেত একটুখানি। বাপি বেশি-বেশি ড্রিংক করে বলে মাম্‌মামের রাগ। সেই দিয়ে শুরু হত।

তখন আমি সবে বাড়ির মিস্‌-এর কাছে ওয়ার্ডবুক শুরু করেছি। পরের বছর আমাকে সেন্ট নিকোলাসে দেবে, বলে রেখেছিল বাপি। সেন্ট নিকোলাস খুব বড় স্কুল। বেঙ্গলি বললেই পানিশমেন্ট। ওখানকার অ্যাডমিশন টেস্ট নাকি খুব টাফ, তাই মিস আমাকে রোজ ওয়ার্ডবুক ক্র্যাম করাত। না পারলেই হাতের তালুতে স্কেল দিয়ে চড়াৎ! আর আমি ভেউ ভেউ করে কাঁদতাম। সেই নিয়েও রাতে ফের ঝগড়া হত ওদের। মাম্‌মাম মিস্‌কে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলত। আর বাপি বোধহয় মাম্‌মামকে ব্লেম করত, বলত— মাম্‌মাম আমার পড়া দেখে না বলেই তো বাইরের লোক রাখতে হয়েছে!

আমি বিছানার এক কোণে মটকা মেরে ঘুমের অ্যাকটিং করতাম আর সব শুনতাম। ভাবতাম, কার দিকটা সাপোর্ট করি! মিস্‌ যে আমাকে পেটায় মাম্‌মাম সেটার অ্যান্টি করছে, তাই মাম্‌মামকেই ভালো মনে হত। আবার বাপি যখন বলছে মাম্‌মামই এর জন্যে রেসপনসিবল— তখন সেটাও যে একদম ভুল, তা বলতে পারতাম না। পার্কে যাদের সঙ্গে খেলতাম— রোহিত, পূজা, টিকলু— ওরা সবাই কী সুন্দর নিজেদের মা’র কাছেই পড়ে। কিন্তু আমার মাম্‌মামই কেবল দেখতাম সন্ধে হলেই আমাকে আয়ার কাছে রেখে উজ্জ্বলা-আন্টি সোহিনি-আন্টিদের সঙ্গে শপিংএ কিংবা তিমির আঙ্কলের সঙ্গে মুভি দেখতে বেরিয়ে পড়ছে। বাপির কমপ্লেনের উত্তরে মাম্‌মাম ‘আমারও নিজস্ব লাইফ দরকার’ বলে ঝাঁঝিয়ে উঠত। তখন বাপিও কড়া গলায় কী সব বলত, তার মধ্যে ‘ড্রিংক’ ‘ড্রিংক’ কথাটা ঘুরে ফিরে আসত, ‘লাইফ’ও। বোধ হয় বাপি বলতে চাইত, ড্রিংক করাটাও বাপির নিজস্ব লাইফের ব্যাপার।

আমার বাপি আর মাম্‌মাম, দুজনেই নিজেদের লাইফ নিয়ে খুব কনশাস। ‘নিজেদের লাইফ’।

# #

ও, ইয়েস। যেটা বলতে যাচ্ছিলাম তখন। কথাটা ওই ‘ড্রিংক’ নিয়েই। একদম ছোট্টবেলায়, বুঝতে পারতাম না ড্রিংক নিয়ে কীসের এত অবজেকশন। মিসের কাছে শিখেছি তখন, ড্রিংক মানে পান করা। মাম্‌মাম নিজেই তো আমাকে চোখ পাকিয়ে বলে, ‘জয়, ড্রিংক সাম মোর মিল্ক, নো আরগুমেন্ট!’ বাপি কী এমন জিনিস বেশি পান করে, যাতে মাম্‌মাম রেগে যায়? বলে, ‘আই কান্ট স্ট্যান্ড’?

এখন আমি জানি। সেন্ট নিকোলাসে ভর্তি হওয়ার পর এই পাঁচ বছরে আমি অনেক কিছু জেনে গেছি। যদিও আমার বন্ধুরা বলে, ‘জয় ইউ আর স্টিল আ চাইল্ড!’ ওদের অনেকেই আমার চেয়ে অনেক বেশি জানে, ওরা আমাকে সব শিখিয়ে দেয়। আমার পাশে বসে কৃপাল সিং, মাথায় কাপড়-জড়ানো ঝুঁটি— সে সেই ক-বে আমাকে বলেছিল, তার বাবা রাম খায়। শুনে তো বুঝতেই পারিনি। রাম তো সীতার হাজব্যান্ড ছিল, তাকে কী করে খাবে? হ্যাঁ, কে একটা রাক্ষুসি একবার হাঁ করে রামকে খেতে এসেছিল, কিন্তু পারেনি তো। সেই শুনে কৃপাল সিং-এর কী হাসি!

এখন আমাদের ক্লাসের সবাই জানি, কার বাবা কী খায়। কৃপালের বাবা, রনিতের বাবা, স্যামুয়েলের বাবা…

কিন্তু আমি যখন আমার বাপিকে জিগ্যেস করেছিলাম ‘তুমি রাম খাও বাবা, না স্কচ’— বাপি বলেছিল, ‘দ্যাট্‌স নান অব ইয়োর বিজনেস!’ তাই আজকাল আমি স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে শেখা জিনিস বাড়িতে এসে বলি না আর।

সব জিনিস বলার মতো নয়ও।

আমাদের স্কুলবাসের লাস্ট সিটে বসে ক্লাস এইটের মনীশ ভাই। ওর চেহারাটাও বড়, হালকা গোঁফের মতো আছে— আমাদের ফাইভ-সিক্সের চার-পাঁচজনকে ওর কাছে বসিয়ে ফিসফিস করে যা সব বলে না! একদিন বলল, ‘তোরা যারা এখনও বাবা-মা’র সঙ্গে একসঙ্গে ঘুমোস, দু’একদিন ঘুমের ভান করে অনেক রাত অবধি জেগে থেকে দেখিস তো, তোদের বাবা-মা কী কী করে অন্ধকারের মধ্যে! দেখে এসে আমাকে বলবি…’

পরের দিনই স্যাম পিছনের সিটে বসে খুব এক্সাইটেড গলায় বলল, তার ড্যাডি আর মাম্মি…

রনিত দু’দিন পর জানাল, ঘর অন্ধকার ছিল বলে সে ভাল করে দেখতে পায়নি কিছু, কিন্তু ইট সিমড দ্যাট…

মনীশ ভাই মুখ টিপে হাসল, আর আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে, জয়? তোর বাবা-মা কিছু করে না? দেখতে পাসনি কিছু?’

আমি একটু চুপ করে থেকে, বলেছিলাম, ‘নাহ্‌। আমি তো আলাদা ঘরে শুই।’

# #

মোটেই আমি আলাদা ঘরে শুই না। মিথ্যে বলেছিলাম মনীশ ভাইকে। ইন ফ্যাক্ট, বাপি অনেকবার বলেছে আমাকে আমার নিজের ঘরে আলাদা শোয়ানোর কথা, মামমাম বলেছে আরেকটু বড় হোক, হি ফীলস স্কেয়ার্ড!

মনীশ ভাইয়ের কথামতো ঘুমের ভান করে সেই প্রথম আমি অনেক রাত অবধি জেগেছিলাম, আর দেখেছিলাম-শুনেছিলাম অনেক কিছু। কিন্তু সেগুলো ওদের সামনে বলা যায় না।

ইন ফ্যাক্ট, যে-ইনসিডেন্ট আমি দেখেছি— ইট চেঞ্জড দ্য কোর্স অব মাই লাইফ!

তখন মাঝরাত। আবছা অন্ধকারের মধ্যে ঝটাপটি হচ্ছিল। বাপি দেখলাম, কে জানে হয়তো রাগের বশেই— আই ডিডন’ট নো ক্লিয়ারলি হোয়াই— মাম্‌মামকে আনড্রেস করার চেষ্টা করছে! আর মাম্‌মাম কিছুতেই অ্যালাও করবে না! জোর একটা ঝটকা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়ে মাম্‌মাম উঠে বসেছিল। হাঁফাতে হাঁফাতে চাপা গলায় বলেছিল, ‘ডোন্ট বিহেভ লাইক আ ব্লাডি রেপিস্ট! বলেছি তো আমার আর্জ নেই আজ!’

আমি কাঠ হয়ে ছিলাম, আধবোজা চোখ। রাস্তার ভেপার ল্যাম্পের আলো একটুখানি এসে পড়েছিল জানলার ফাঁক দিয়ে, তাতে বাপির মুখটা কীরকম ফেরোশাস মনে হচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল বাপি, ‘আই জাস্ট ওয়ান্টেড টু চেক্‌ দ্যাট! আজ সন্ধেবেলা… য়ু সিম্পলি গট স্পেন্ট-আপ উইথ দ্যাট বাস্টার্ড তিমির বোস, ইজনট ইট? আর তো আর্জ থাকার কথাও নয়!’

ফটাস করে চড়টা এত জোর মেরেছিল মাম্‌মাম— এত আচমকা, আমি ঘুমের ভান করতে করতেই কেঁপে উঠেছিলাম। তারপর যখন বাপি মাম্‌মামের দুটো হাত পিছন দিকে মুচড়ে দিচ্ছিল আর মাম্‌মাম কঁকাচ্ছিল খুব— আর থাকতে পারিনি। হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠে বসেছিলাম বিছানায়।

তার পরের দিনই মাম্‌মাম দুটো বড় সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে আমার হাত ধরে ট্যাক্সি চেপে দিদার ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিল। আমি তখন থেকেই দিদার বাড়ির স্টপ থেকে স্কুলবাসে উঠি।

বাপি দিদার বাড়িতে এসেছিল এক সপ্তাহ পরে। দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কথা বলেছিল দুজনে। না, মারামারি ঝগড়াঝাটির আওয়াজ পাইনি সেদিন আর। শুধু বাপি চলে যাওয়ার সময় আমাকে একটা মস্ত চকোবার দিয়ে নিচু গলায় বলেছিল, ‘আমার সঙ্গে থাকবে, জয়-সোনা, কেমন? গুড বয়!’ কী মিষ্টি করে বলল, একটুও রাগি ভাব নেই!

আর রাতে মাম্‌মাম দিদাকে বলেছিল, ‘কী করে ও কাস্টডি পায় আমিও দেখে নেব। ওর ইনকাম বেশি, তাই? হুঁহ্‌!’ সেদিন আমাকে একদম জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল মাম্‌মাম।

যে-আমাকে ক্লাসমেটরা ‘চাইল্ড’ বলে লেগপুল করে, সেই আমি সেইদিন বুঝলাম— এই রকম করেই তবে চাইল্ডরা অ্যাডাল্ট হয়ে যায়!

# #

কালো কোট-পরা লোক দুটোও, আমাকে ‘চাইল্ড’ বলেই মেনশন করছিল বারবার।

আমি ফিল্মে দেখেছি, ওদের উকিল বলে। লইয়ার। তবে ফিল্মে যে রকম বিরাট হলঘরের মতো কোর্ট দেখায়, একদিকে সারি-সারি লোক বসে, উঁচু বেদির ওপর জজসাহেব, অনেক দূরে-দূরে মুখোমুখি দুটো উইটনেস বক্স— এই কোর্টরুমটা সেরকম নয়। ছোটমতো একটা ঘর, রোগামতো দাঁত-উঁচু একটা লোক একদিকে অল্প-উঁচু ডায়াসের ওপর গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আছে। উকিল দুজনও একদমই ড্রামাটিক তর্কাতর্কি করল না ফিল্মের মতো, যে-যার কথা শেষ হতেই বসে পড়ল।

কিন্তু কথাগুলো ভালো নয় মোটেও। লম্বা টাকলু উকিলটা মাম্‌মামের, সে বাপিকে বলছিল ড্রাঙ্কার্ড, সিজোফ্রেনিক, সাস্‌পিশন ম্যানিয়াক। আর, প্লাম্পি ভুঁড়িওয়ালা লোকটা বাপির লইয়ার। সে মাম্‌মামকে বলল এক্সট্রাভ্যাগান্ট, সেলফ-সেন্টার্ড, ডিবচ্‌…। সব কথা আমি স্পষ্ট বুঝিনি, তবে খারাপ কথা নিশ্চয়ই, মাম্‌মামের উকিল দু’একবার প্রোটেস্ট করল, জজ একবার বললেন ওভাররুল্‌ড, একবার বললেন সাস্টেইন্‌ড।

আর বাকি যা কথা হচ্ছিল, সব আমাকে নিয়ে, আমি বুঝতে পারছিলাম। ‘চাইল্ড’, ‘কাস্টডি’, ‘অ্যালিমনি’… এইসব কথা উঠছিল বার বার। আমার দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল সবাই।

মাম্‌মাম আমার একটা হাত শক্ত করে নিজের মুঠিতে ধরে দিদার পাশে বসে ছিল। বাপি দেখলাম অনেকটা দূরে চুপ করে বসে আছে। আমাকে দেখে হাত নাড়ল। আমিও ভয়ে-ভয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে একটু হাসলাম, মাম্‌মাম যদিও বলে রেখেছিল আমি যেন বাপির সঙ্গে চোখাচোখি না করি— তবু আমার খুব ইচ্ছে করছিল বাপির কাছে একবার ছুটে যাই। বাপি সেই যে আমার পেটে মুখ রেখে ‘ভ্রু-উ-উ-ম’ করে একটা আওয়াজ করত সেটায় দারুণ হাসি পেত আমার— কতদিন করেনি! আর সেই-যে, কভার ড্রাইভ মারার সময় ফ্রন্টফুট-টা ঠিক কোন্‌ পোজিশনে থাকবে সেইটা সবে একটুখানি শেখাচ্ছিল আমায়, আর শেখাই হয়নি তারপর। স্কুলের ম্যাচে ড্রাইভের বল পেলে কিছুতেই মারতে পারি না, আর ঠিক পরের বলটাতেই আউট হয়ে যাই, কেন কে জানে।

বাপিকে দেখে আমার বুকের মধ্যে হালকা হালকা ফোঁপানি এল কয়েক বার।

কিন্তু মাম্‌মাম যে বলে রেখেছে, একটু লুজ্‌ পেলেই নাকি বাপি আমাকে নিয়ে চলে যাবে! সত্যি নাকি? নিয়ে চলে যাবে মানে, মাম্‌মামের কাছ থেকে— পারমানেন্টলি?

ওরে বাবা, না না, সে আমি পারব না! মাম্‌মামকে আমার চাই। আমাকে মাছের কাঁটা বেছে দেবে কে? কেডসের ফিতে সমান করে দেবে কে? স্কুল থেকে ফেরার পর ম্যাগি করে দেবে, ঘুমের সময় লালেবাই শোনাবে? বাপি আমাকে কেড়ে নিতে পারে এমন কথা ওঠার পর থেকেই, মাম্‌মাম অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে। খুব কেয়ার নেয় আমার।

‘আই লাভ মাই মাম্‌মাম।’

উইটনেস বক্সে ডেকে জজসাহেব যখন খুব মিষ্টি করে জানতে চাইলেন আমি কাকে বেশি পছন্দ করি, কাকে রিলাই করি বেশি, কার কাছে থাকলে আমার বেশি ভালো লাগবে— আমি মাম্‌মামের দিকে তাকিয়ে ওই সেন্টেন্সটাই প্রথম বলেছিলাম।

তারপর, মাম্‌মামের ঝলমলিয়ে-ওঠা মুখ থেকে আমার চোখটাকে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে বাপির দিকে তাকিয়ে দেখি, কালো হয়ে গেছে বাপির মুখ, মাথাটা নামিয়ে নিয়ে চুপ করে বসে আছে।

‘অ্যান্ড আই ইকুয়ালি লাভ মাই বাপি, টু!’

চমকে উঠে বাপি তাকিয়েছিল আমার দিকে। চোখ মুছেছিল।

আমি, ক্লাস ফাইভের জয়, সোজা জজসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘প্লিজ আস্ক দেম টু লিভ টুগেদার উইথ মি। অ্যান্ড নট টু ফাইট এনি মোর। প্লিজ।’

# #

দু’দিন হল আমরা এই সী-সাইডে বেড়াতে এসেছি। এর আগে একবার এসেছিলাম, মনে আছে, তখন মর্নিংএ পড়ি, টুয়ে বোধহয়। সমুদ্রে নেমে খুব হুড়োহুড়ি, সন্ধেবেলায় সী-বিচের ধারে কত মজা! সেই ট্যুরে ঝগড়া হয়নি একটুও।

এই ট্যুরেও ঝগড়া করতে বারণ করেছেন জজসাহেব। পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘গিভ এফর্টস। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখুন দুজনেই। বেড়িয়ে আসুন একসঙ্গে, ফরগেট দ্য পাস্ট। ফর দ্য সেক অব দ্য কিড…’

কিন্তু দু’দিন যেতে না যেতেই, কাল রাতে আবার ওরা শুরু করে দিয়েছে। সেই এক ইস্যু। বাপি হোটেলের ঘরে ড্রিংক করতে চায়, মাম্‌মামের তাতে স্ট্রং অবজেকশন। মাম্‌মাম নাকি গন্ধটাই স্ট্যান্ড করতে পারে না।

বাপি প্রথমটায় নরম গলায় রিকোয়েস্ট করছিল ; টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা উইদাউট অ্যালকোহল… ফীলিং ডেসপারেটলি থার্স্টি… জয় তো ঘুমিয়ে পড়েছে, এখন জাস্ট দু-তিনটে পেগ…

আমি যে ঘুমোইনি অ্যাট অল— ওরা কেউ ভাবতে পারেনি বোধহয়। দু’চারটে হট এক্সচেঞ্জের পরেই ভায়োলেন্ট হয়ে উঠল দুজনেই।

‘নো! আই হেট শেয়ারিং বেড উইথ আ ড্রাঙ্কার্ড!’ —ডিসকভারি চ্যানেলে কিং কোবরা যেমন হিসহিস করে, একদম সেই রকম ভঙ্গিতে কথাগুলো বলেছিল মাম্‌মাম।

‘ও, ইজ ইট?’ বাপির নরম গলাটাও সেকেন্ডের মধ্যে যেন নেকড়ের গর্জন, ‘অ্যান্ড আই অলসো হেট টু স্লিপ উইথ আ হোর!’

‘হোয়াট?’

‘আজও তুমি ওই সান-অব-আ-বিচ্‌ তিমির বোসকে ফোন করেছিলে না, গয়না কেনার ছুতোয় সী-বিচ থেকে সরে গিয়ে? সব আমার ভিজিলে আছে!’

‘বেশ করেছি! হেল উইথ ইয়োর সাস্‌পিশন অ্যান্ড হেল উইথ ইয়োর ভিজিল! আমার যখন খুশি যাকে খুশি ফোন করব, নেভার ট্রাই টু পোক ইয়োর আগলি নোজ্‌, ওকে? তোমার খবর আমি রাখি না? এবার ট্যুরে গিয়ে সেক্রেটারির সঙ্গে…’

তারপর আরও, আরও। সারারাত। সেই হুবহু আগের মতো সব! পুরো ডাস্টবিন উপুড় করছিল দুজন মিলে।

আর, আমি শুয়েছিলাম চুপচাপ। আমার বোজা চোখের কোণ দিয়ে গরম জল গড়াচ্ছিল।

# #

আমি আজ ওদের লুকিয়ে একা একা সী-বিচ ধরে চলে এসেছি বহুদূর। খুব চুপিসাড়ে আস্তে আস্তে সরে এসেছি, দুজনেরই নজর এড়িয়ে। এইরকম অচেনা জায়গায় হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ। বিচের যেদিকটা একেবারে ফাঁকা— সেইদিকে হাঁটা লাগালেই, ব্যস! সেপারেটেড! এবার কোন্‌দিকে খুঁজবে খোঁজো!

হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে… কত্ত দূর এসে গেলাম! কতক্ষণ হাঁটছি? এক ঘণ্টা, না আরও বেশি? এতক্ষণে ওরা দুজনেই টেনশন করছে খুব, ফর শিওর! খুঁজছে আমাকে পাগলের মতো? ছোটাছুটি করছে? সী-বিচে খুঁজছে, মার্কেটে খুঁজছে, রাস্তায়? কাঁদছে কি? খুব?

মাম্‌মাম তো ডেফিনিটলি কাঁদছে। আর বাপি? বাপি সহজে কাঁদে না, কিন্তু সেই কোর্টরুমে দেখেছিলাম…

আচ্ছা, এখানে থানা আছে নিশ্চয়ই। ওরা কি থানায় যাবে? বোধহয় চলেই গেছে এতক্ষণে! আমি বেশ ইমাজিন করতে পারছি, থানায় বসে মাম্‌মাম কাঁদতে কাঁদতে ফেইন্ট হয়ে যাচ্ছে… আর বাপি মাম্‌মামকে ধরে বসে আছে শক্ত করে। ক্লোজ অ্যান্ড টাইট! নো মোর ফাইট! …সীন’টা ভাবতেই ভালো লাগে খুব।

ইয়াপ্‌, এখন তো আমি বুঝে গেছি কেসটা! যার কাছ থেকেই আমাকে কেড়ে নেওয়ার মতো সিচুয়েশন তৈরি হয়, সে-ই তখনকার মতো বদলে যায়। হি, অর শি, পাইনস ফর মি। বিহেভস লাইক আ রিফর্মড সোল। বাট, সেপারেটলি!

এখন অবিশ্যি, একসঙ্গে! এই প্রথম! হি হি। নাও, বোঝো দুজনেই! ভেবে ভেবে কেমন একটা সলিউশন বের করেছি আমি, দ্যাখো জাস্ট!

কিন্তু, আমি এ কোথায় চলে এলাম কে জানে! একদম ফাঁকা চারদিক। একদিকে ধু-ধু বালি, অন্যদিকে ঢেউ আর ঢেউ! আর আকাশ… ভাস্ট অ্যান্ড সাইলেন্ট! ডেসোলেট অ্যান্ড লোনলি! কেউ কোথাও নেই। কেউ আসে না এদিকে? কেন কে জানে!

আচ্ছা, আচ্ছা, দাঁড়াও! সেদিন স্নান করতে নেমেছিলাম যখন, কয়েকটা লোকের সঙ্গে বাপি গল্প করছিল। তারা বলছিল, এখানকার বিচে অনেক দূরে কোথায় না কি চোরাবালি আছে! কুইক স্যান্ড! সে দিকটায় কেউ যায় না। চোরাবালি মানে, যেখানে পা রাখলেই মানুষ না কি ডুবে যায়…

আমি কি সেই চোরাবালির দিকটাতেই চলে এসেছি না কি? সেই জন্যেই এত ফাঁকা এদিকটা?

চোরাবালি! কেমন হয় সেটা?

আমি জানি না ঠিক। শুনেছি, বাইরে থেকে না কি কিচ্ছু বোঝা যায় না! ওপরে সব ন্যাচারাল, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা… এই রকম? এমন যদি হয় যে, আর কয়েক পা এগোলেই চোরাবালি শুরু? হয়তো এখনই সেই ডেঞ্জারলাইনের ওপরেই আমার পা’টা রাখা আছে!

বিরাট বিচের মধ্যে আমি একা। বিশাল সমুদ্রের সামনে, মস্ত আকাশের নিচে… একা। আমার একটু-একটু ভয় করছে। কান্না পাচ্ছে একটু একটু।

নাহ্‌। কাঁদব না। আমি চোয়াল শক্ত করছি।

লেট দেম পাইন ফর এভার। লেট দেম রিপেন্ট। বোথ অব দেম।

আমি বরং আরও এগিয়ে যাই।।

************

একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা চারপাশে। আর ঠিক তখনই অন্যদিকে বাঁক খেল জীবন। আরেকটা নতুন অধ্যায়। ঘুরে যাওয়া আনকোরা, প্রায় অচেনা একটা রাস্তায়।

সেলে আমার সেলমেটদের মধ্যে প্রদ্যোতদা আর কল্লোলদা। একজন যাদবপুর এঞ্জিনিয়ারিং। অন্যজন প্রেসিডেন্সী। সঙ্গে আরও কয়েকজন। এদিকে আমি তো তখনও উঁচু ক্লাসের দাদাদের ভাষায় ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত।’ ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা স্বভাবটাকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি তখনও। মাঝেমাঝেই গালাগাল দিয়ে ফেলি। মাথা গরম করে তেড়ে যাই এর তার দিকে। যদিও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই একটু একটু করে কাটছিল সেটা। প্রতীপদা, ডাক্তারদাদের হাত ধরে। আর অমিতেশ স্যর। আমার জীবন নামে জাহাজটার ক্যাপ্টেন। একটু একটু করে পাল্টে দিচ্ছিলেন আমাকে। যেন গঙ্গার পাড় থেকে তুলে আনা একতাল নরম মাটি। ছেনে ছেনে মূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন একটা। সে সুযোগ আর পেলেন কই। তার আগেই তো পার্টির কাজ নিয়ে গ্রামে চলে গেলেন। আর এদিকে সময়ও তো ছোট হয়ে আসছিল দিন কে দিন। খালপাড়ের বস্তি থেকে উঠে আসা একটা রাগী ছেলে। ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’ থেকে ‘প্রলেতারিয়েত’ হয়ে ওঠার আগেই তো ধরা পরে চালান হয়ে জেলে। ডাক্তারদা, প্রতীপদা, অমিতেশ স্যরদের শেষ না করতে পারা কাজটা ফের নতুন করে শুরু হলো জেলে এসে। প্রদ্যোতদা, কল্লোলদাদের হাত ধরে। আমাকে কি ভালোটাই না বাসতো ওরা। লকআপে আমিই সবার চেয়ে ছোট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সঙ্গে কথা বলতো ওরা। গল্প শোনাতো। দেশবিদেশের গরীবগুর্বো মানুষের লড়াইয়ের গল্প। আমার কথা শুনতো। কথার মাঝেমাঝেই হাসতে হাসতে ফেটে পড়তো আমার বলার কায়দায়। আবার কথার মাঝখানে মুখ ফসকে একটা গালাগাল বেড়িয়ে পড়লেই মাথার পেছনে একটা চাঁটি আর কান ধরে পাঁচবার ওঠবোস, প্রত্যেকবার। আমাকে বোঝাত প্রদ্যোতদা। “এই যে কথায় কথায় রেগে গিয়ে গালাগাল দিয়ে এর ওর দিকে তেড়ে যাস তুই, এটা আসলে তোর দুর্বলতা। আসলে মনের কোনে কোথাও শত্রুপক্ষ সম্পর্কে একটা ভয়ের জায়গা রয়েছে তোর। আর সেটাকে ঢাকা চাপা দিতেই উৎকট গর্জন, গালাগাল এসবের প্রয়োজন হয় তোর। এগুলো কাটিয়ে ওঠ। দেখবি একদিন আমাদের সবার চেয়ে বড় রেভল্যুশনারি হবি তুই। আ ট্রু গেরিলা ওয়ারিয়ার। কারণ আমরা সবাই যেখান থেকে এসেছি পিওর মিডল এ্যান্ড আপার মিডল ক্লাসেস, সেই পেটিবুর্জোয়া ভাইসেস থেকে ভয় পেয়ে, নানা ধরনের লোভ আর সুযোগ সুবিধার হাতছানিতে পিছিয়ে আসার একটা প্রবণতা থাকতেই পারে আমাদের মধ্যে। কিন্তু তুই …” আমার দিকে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়েছিলো প্রদ্যোতদা। “তুই যেখান থেকে উঠে এসেছিস, ওই বস্তির ঘর, নোংরা, আবর্জনা, দুর্গন্ধ, দারিদ্রের সাথে চোয়াল কষা লড়াই, এগুলো তোকে শক্ত করেছে রোজ। ইচ এ্যান্ড এভরি মোমেন্টস ইন ইওর লাইফ। তাই তোর লোভের পিছুটান অনেক কম।” কি সুন্দর বলতো প্রদ্যোতদা। মনের মধ্যে হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে দিতো একেকটা শব্দকে। ঠিক অমিতেশ স্যরের মতো। স্যরের কাছে গল্প শুনতাম। এবার শুরু হলো নিজে পড়ার পালা, কল্লোলদাদের চাপে পড়ে। সেলে লুকিয়ে লুকিয়ে আনা হতো সেসব বই। লি শাও চির ‘হাউ টু বি আ গুড কম্যুনিস্ট’, ‘জয়া শুরার গল্প’, হেমিংওয়ের ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’, আরও অনেক বই। এদিকে নিজের তো স্বপন কুমার আর হাঁদা ভোঁদা ছাড়া আর কিছু পড়ার অভ্যেস নেই কোনদিন। মাঝে মাঝেই পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে “দুত্তেরি, নিকুচি করেছে তোমাদের পড়ার!” বলে বই ছুড়ে ফেলে দিতাম। এগিয়ে আসতো কল্লোলদা। কাঁধে হাত রেখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি হেসে নীচুগলায় বলতো – “পড় পড়, হাল ছাড়িস না। দেখবি পড়তে পড়তেই একদিন ঠিক ভালো লেগে যাবে।” আর অবাক কাণ্ড। হচ্ছিলোও ঠিক তাই। ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিলাম বইয়ের অক্ষরগুলোর মধ্যে। চেটেপুটে খাচ্ছিলাম প্রতিটা পাতাকে। অনুভূতিটা অনেকটা সেই স্নানের সময় জল ঢুকে অনেকদিন বন্ধ হয়ে থাকা কানের পর্দা হঠাৎ খুলে যাওয়ার মতো। শোঁ শোঁ করে খোলা হাওয়া ঢুকছে। প্রথম যেদিন ভুপেন্দ্র কিশোর রক্ষিতরায়ের ‘ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব’ – এর মতো ইয়া মোটা বইটা পড়ে শেষ করলাম। সে আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। বইটা সেলের মেঝেতে নামিয়ে রেখেই চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠেছিলাম –“আমি পেরেছি! আমি পেরেছি!!”

এদিকে জেলের পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠছিল দিন কে দিন। রাষ্ট্র যেন ঠিকই করে ফেলেছিল জেলের মধ্যে কাউকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। মাঝে মাঝেই পাগলি ঘণ্টি বেজে উঠছিল জেল কাঁপিয়ে। বেপরোয়া লাঠিচার্জ, চরাগোপ্তা গুলি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা চলছিল সমানে। এরকমই একটা পাগলির দিন শহীদ হলো বেহালার সাগরদা, বাবলুদা। মারতে মারতে দোতলা থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় সাগরদাকে। থেঁতলে কিমা পাকানো মাংসের মতো হয়ে গেছিল শরীরটা।

সেই রাতে জেলে কেউ খায়নি। ফুঁপিয়ে কাঁদছিল কমরেডরা। গলা ফাটিয়ে স্লোগান তুলেছিল অনেকে। আমার কাঁধে চোট। পাঁচহাতি ডাণ্ডার মার। মুখের একপাশটা ফুলে ঢোল। ধুম জ্বর আর শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। বারবার মনে হচ্ছিল এভাবে চলতে থাকলে একদিন জেলের মধ্যেই মরে যাবো আমি। সাগরদা – বাবলুদাদের মতো। অমিতেশ স্যরের কথা মনে পড়ছিল খুব। ক্লাসে গল্পটা শুনিয়েছিলেন স্যর। একটা পাখির গল্প। দক্ষিন আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানকার আদিবাসীরা কেতজেল নামে ডাকে পাখীটাকে। বন্দী অবস্থায় বেশিদিন বাঁচেনা পাখীটা। নিজেকে অনেকটা ওই পাখীটার মতো মনে হচ্ছিল। বুকের মধ্যে ওর ডানার ঝাপটানি শুনতে পাচ্ছিলাম যেন। খাঁচা কেটে আকাশে উড়তে চাইছে কেজেল। আর সেই ওড়ার সুযোগটা তৈরি হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই।

জেলের একপাশে গঙ্গার ধারে লাল পাঁচিলটার একটু দুরে একটা শুকনো কুয়ো। জেল পুলিশ আর গার্ডরাও ঠিকঠাক জানতো না কেন ওটা রয়েছে সেখানে। কিন্তু শওকত চাচা জানতো। শওকত আলি মণ্ডল। ধবধবে পাকা চুল আর দাড়ি। একসময় ক্যানিং লাইনের হাড়কাঁপানো ডাকাত। অনেকগুলো ডাকাতি আর খুনের আসামী। পয়সাওয়ালা গেরস্তের কাপড়ে চোপরে হয়ে যেতো ওর নাম শুনলে। লম্বা মেয়াদী লাইফার এই জেলে। পুরোনো মেট। জেলখানার প্রতিটা ইঞ্চির খবর রাখতো নখের ডগায়। কেন জানিনা আমাকে খুব ভালোবাসতো বুড়ো। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার খিদেটা একটু বেশি। ‘চৌকা’ মানে রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে একবাটি ডাল অথবা একটা মাছের টুকরো, মাঝেমাঝেই এনে খাওয়াতো আমাকে। সেই চাচাই আমাকে শুনিয়েছিলো গল্পটা। ওই কুয়োটার ওপর পাটাতন খাটিয়ে ফাঁসি দেওয়া হতো বিপ্লবীদের। সেই ব্রিটিশ আমলে। কুয়োটার তলায় একটা সুড়ঙ্গ আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহারে মাটি আর পলি পড়ে পড়ে বুজে গেলেও সুড়ঙ্গটা রয়েছে। উত্তেজনায় দম আটকে আসছিল আমার – “ফের খোড়া যাবে?” ফিসফিসে গলায় প্রশ্ন করেছিলাম চাচাকে।

সেটা তো তোদের ব্যাপার। তোরা বুঝবি।” মুচকি হেসে উঠে গিয়েছিলো জেলঘুঘু, লাইফার।

সন্ধের পড় গিনতি ফাইল শেষ করে কয়েদি নম্বর মিলিয়ে নিয়ে চলে গেল আর্দালি মেট আর জমাদার সেপাই। সেলের টিমটিমে আলোর নীচে বসে শওকত চাচার কথাটা বললাম প্রদ্যোতদাদের। চুপ করে শুনছিল সবাই। “ইউরেকা!” আমার বলা শেষ হওয়া মাত্র কল্লোলদার মুখ থেকে ছিটকে বেরোলো শব্দটা। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছিলাম আমরা। একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হচ্ছিল বারবার টহল দিয়ে যাওয়া গার্ড সেপাই আর সাধারণ কয়েদীদের সম্পর্কে। ওদের মধ্যে দুতিনজন দাগী আসামী যারা আসলে ইনফর্মার। সামান্য আঁচ পেলেও পরদিন সকালেই জেলারের টেবিলে পৌঁছে যাবে খবরটা। নজর রাখতে হচ্ছিল সেদিকেও।

জেলে পার্টি নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চললো দুদিন ধরে। “নো বেল, ব্রেক জেল” – পার্টির ঘোষিত নীতির সাফল্য নির্ভর করছে পরিকল্পনার সফল রুপায়নের ওপর। প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন সকালে গিয়ে ধরলাম শওকত চাচাকে। “বাগানে কাজ করতে চাই।” শুনে ফের একবার মুচকি হাসলো বুড়ো। “তবে রে হারামি। শিকলি কাটার মতলব।” তবে মনে মনে কি ভেবেছিলো কে জানে, পরের দিন সকালে ডেপুটি জেলার ভবানন্দ গুছাইতের টেবিলে ডাক পড়লো আমার। টেবিলের পাশে রাখা একটা চেয়ারে পা তুলে বসেছিলো গুছাইত। আমাকে দেখে চোখ নাচালো। ঠোঁটের কোনে শেয়ালে হাসি – “কিরে সেয়ানা? বিপ্লব ছেড়ে শেষ অবধি ফুলের বাগান! তা ভালো, মতিগতি ফিরুক তোদের। তাহলে লেগে যা কাল থেকেই তা দেখিস আবার, সটকানোর প্ল্যানফ্যান ভাঁজিস না যেন। তোদের শালা বিশ্বাস ফিশ্বাস নেই।” কথাগুলো বলার সময় একদৃষ্টে আমাকে মাপছিল গুছাইত। পাক্কা শয়তান লোকটা। জেলে প্রত্যেকটা ‘পাগলী’ আর নকশাল বন্দীদের পিটিয়ে মারার পেছনে সরাসরি হাত ছিল ওর। টেবিলের ওপর রাখা একটা পাথর। ক্যাম্বিস বলের সাইজ। পেপার ওয়েটের বদলে। ইচ্ছে করছিল এক ঝটকায় গলাটা পেঁচিয়ে ধরে ঠুকে দি রগের পাশে। কিন্তু না, এটা তার সময় নয়। অনেক বড় একটা পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে তাতে। অনেক কষ্টে একটা তাঁবেদারি হাসি ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে রেখে সামলালাম নিজেকে। তারপর ঘাড় নেড়ে বেড়িয়ে এলাম ঘর থেকে।

পরদিন সকাল থেকেই ‘মালি’র কাজে বহাল হয়ে গেলাম আমি আর কালাচাঁদদা। কালাচাঁদ মিস্ত্রী। তারাতলার কারখানায় হাম্বর পেটাতো। লোহাপেটা চেহারা। অসুরের মতো জোর গায়ে। বেহালা এ্যাকশন স্কোয়াডের কর গ্রুপ মেম্বার। বাগানে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে পালা করে কুয়োয় নেমে যেতুম দুজনে পালা করে শওকত চাচার জোগাড় করে দেওয়া মোটা কাছি দড়ি বেয়ে, সঙ্গে বাগানে কাজ করার দুটো মজবুত শাবল আর কোদাল। লাগাতার চলছিল খোঁড়ার কাজ। বাইরে পাহারায় থাকা শওকত চাচা আর দুজনের একজন কেউ। কাছেপিঠে কাউকে আসতে দেখলে বা সামান্য বিপদের গন্ধ পেলেই কোমরে বাঁধা দড়িটার ওপর থেকে একটা হাল্কা টান। সঙ্গে সঙ্গে তরতরিয়ে উঠে আসা দড়ি বেয়ে। অন্ধকার কুয়োর মধ্যে ভ্যাপসা গরম আর দুর্গন্ধ। ছোট টর্চ জ্বালিয়ে খুঁড়তে খুঁড়তে দমবন্ধ হয়ে আসতো। তবু একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি খোঁড়ার কাজ। মাঝে মাঝে রাউন্ডে আসতো গুছাইত। “বাঃ, বেড়ে বাগান করেছিস তো শালারা। ফুলটুল তো ভালোই ফুটেছে দেখছি। কর কর, মন দিয়ে কাজ কর।” কথার জবাবে দাঁত বের করে হাসতাম শুধু। সেপাইদের নিয়ে দুলকিচালে চলে যেতো গুছাইত। এরকম চলতে চলতে মাসখানেক বাদে একদিন। শাবল দিয়ে প্রথম খোঁচাটা মেরেছি মাটিতে, সরু একটা আলোর পিন এসে বিঁধে গ্যালো চোখে। উত্তেজনায় পরপর আরও বেশ কয়েকটা শাবলের খোঁচা। হড়বড় করে দুহাতে মাটি টেনে সরাতেই হাত দশেক দুরে আদিগঙ্গার জল। প্রচণ্ড আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গিয়েই মুখে হাত চাপা দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ লাগলো নিজেকে সামলাতে। আলগোছে মাটি জড়ো করে সাবধানে বুজিয়ে দিলাম গর্তটা। তারপর উঠে এলাম দড়ি বেয়ে। একটু দুরে গাছে জল দিচ্ছিল কালাচাঁদদা। পাশে খুড়পি হাতে উপুড় হয়ে বসা শওকত চাচা। পোড়খাওয়া জেলঘুঘু আমার মুখ দেখেই মূহুর্তে বুঝে নিলো যা বোঝার। “তা হলে বাচ্চা?” আমাকে ওই নামেই ডাকতো চাচা। “কাজ তো হয়ে গ্যালো। এবার আল্লার নাম নিয়ে ঢিল দাও সবাই মিলে।” সেই মূহুর্তে অদ্ভুত একটা কথা ফসকে বেরোল মুখ থেকে। কেন সেটা আজও জানা নেই। “তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো না চাচা। কদ্দিন এভাবে জেলের মধ্যে পচবে? ও আমি কল্ললদাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়ে নেবোখন।” আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত চোখে হেসেছিল সোঁদরবনের বাঘাটে ডাকাত। “সত্যিই মাথার ব্যারাম আছে তোর। আরে পাগলা, অনেক বড় কাজ করতে যাচ্ছিস তোরা। সেখানে আমার মত এঁদোছেঁদো চোরডাকাত

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-14/

রেসিপি

error: Content is protected !!