Tags Posts tagged with "Bengali literature"

Bengali literature

হাসান আজিজুল হকের ‘শকুন’ গল্প পড়ে আমি পড়ে আমি বিভ্রান্ত। ওপার বাংলার বরেন্দ্রভূমিতে বসে লেখক রাঢ়ভূমির গল্প লেখেন কী করে?

চটজলদি সিদ্ধান্ত, আমি রাজশাহী যাব। লেখকের সঙ্গে দেখা করব।

বন্ধু আসমহম্মদকে বলি ব্যাপারটা। সে আমার ব্যবস্থা করে দেয় রাজশাহী যাওয়ার। পরেরদিন আমি রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। আমার লালগোলা, তার পাশেই বিশাল পদ্মার চর। চরে একটা বাংলাদেশী গ্রাম, নাম কোদালকাটি। সেটা পেরুলেই পদ্মা। আর পদ্মার ও পাড়েই গোদাগাড়ি। একটা গঞ্জরাস্তা কিন্তু ঝা তকতকে। বাস এল, আমি উঠে পড়লাম তাতে। পরের স্টপ রেলবাজার। সেখানে একটা মাজার আছে। বাস ঘিরে মাজার কমিটির লোকেরা মাজারের উন্নতি কল্পে চাঁদা চাইছে। দিলাম। ভিনদেশে যাতে কোনও বিপদে না পড়ি।

অথচ রাজশাহী পৌঁছে আমার চক্ষু চড়কগাছ! চারপাশে শুধুই পুলিশ। যাব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভয়ে ভয়ে একটা রিক্সা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছতেই আমার দম বন্ধ অবস্থা। সেখানে এতই পুলিশ যে, অগত্যা রিক্সা ফিরিয়ে চলে আসি নিরাপদ দূরত্বে।

বন্ধু আসমহম্মদ বলেছিল, তেমন কিছু অসুবিধা হলে একজনের ঠিকানা দিচ্ছি, চলে যাবি। আমার কথা বলবি। সেই সব ব্যবস্থা করে দেবে।

আমি রিক্সাবালাকে তার কথা বললাম। রিক্সাবালা নিমেষেই আমাকে সেখানে পৌঁছে দিল। পৌঁছে দিল মানে, একটা কানাগলিসেটা পেরিয়ে রিক্সাবালা আমাকে যেখানে নিয়ে এল সেটা বস্তি মতো একটা কিছু। অন্তত আমার তাই মনে হল। আমি অনেক বস্তি দেখেছি। আমার বাড়ির চারপাশেই ৪৭/৭১এর দেশ ছেড়ে আসা মানুষের বাস। যাঁরা আজকেও খলপার টাটির ঘর, ওপরে করগেট টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে বাস করেন।

সেরকম বস্তির মধ্যে একটা বাড়ি। জরাজীর্ণ। সেই বাড়ির দরজায় নয়, একবারে ঘরের মধ্যে আমাকে ঢুকিয়ে দিল সেই রিক্সাবালা। ঘরের ভেতরটা আবছা। কেমন সব এলোমেলো। অগোছালোতেমন ঘরে যে মানুষটি আমাকে আপ্যায়ন করল, তার নাম আমি ভুলে গেছিতবে আমার সম্পর্কে সব জেনে সে যা বলল, তা অনেকটা এরকমবছেন ভাই। একটুখানি জিরান ল্যান। ছরিবত খান। আপনার চিন্তার কোনও কারণ নাই। আমি আসি। আছমহম্মদভায়ের দোছত আপনি, মানে আমার দোছত। মুনে করেন, এই বাড়ি আপনার নিজের বাড়ি।

লোকটা যত সহজে এবং যেভাবে বলল, আমার মাথায় ঢুকল না। আমাকে কোথায় বসাবে তাও ভাবল না। ততক্ষণে একজন মহিলা বড় একটা ফুলতোলা কাঁচের গেলাসে সরবত নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটি আমাকে বলল, ল্যান ভাই ধরেনছরবত খান।

মহিলা নিশ্চয় লোকটির বউ। আমি অনুমান করি। কিন্তু বুঝতে পারি না, মহিলা একজন অপরিচিত পরপুরুষের সামনে এত স্বাভাবিক হয় কী করে?

এর মধ্যে মহিলাকে ঘিরে ধরেছে একগোণ্ডা বালবাচ্চা। তারা কিলবিল করছে। বলছে, মা ছরবত খাবো – মা ছরবত খাবো! জোর পিয়াস লেগ্যাছে।

এই দৃশ্য দেখে আমার হাতের সরবতের গেলাস হাতেই থেকে যায়। মুখে তুলতে পারি না। বাচ্চাদের দিকে খেয়াল নেই মহিলার। মেহেমানকে নিয়েই ব্যস্ত সে। মেহেমানের দেশে তার বাপের বাড়ি। বর্ডার পেরিয়ে সে বহুদিন বাপের বাড়ি যেতে পারেনি। সে দুঃখ মেহেমানকে শোনাতে চায়। জানতে চায় তার মাবাবা কেমন আছেন? কিন্তু মেহেমান সরবতের গেলাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে যে! বসতে জায়গা দেয়নি। হঠাৎ সেটা খেয়াল হতেই শরমে আপন মনে ছিঃ ছিঃ বলে উঠল মহিলা। তারপর ছুটে গেল ঘরের বাইরে। মেহেমানকে বসতে দেবার জন্য কিছু একটা আনতে বোধহয়।

লোকটা এতক্ষণ ঘরে ছিল না, কথা বলতে বলতে কখন বাইরে বেরিয়ে গেছিল, আবার ফিরে আসতেই আমি তাকে খেয়াল করলাম। লোকটা ঘরের কোনায় থাকা আলমারি থেকে কী বের করতে করতে বলছে, জলদি করেন ভাই। ভারছিটির ক্লাস শুরুর আগেই আপনার হাছানছাহেবেরে ধরতি হবে। নাকি খুব দরের মানুষ। ছময়ের দাম বোঝেন। আমি খোঁজ নি আইলাম। আপনি জলদি জলদি ছরবতটা খাইয়া ল্যান।

এবারে আমি আর সরবত হাতে ধরে রাখতে পারি না, এক চুমুকেই খেয়ে ফেলি। আমার তৃষ্ণা লেগেই ছিল। ধূ ধূ বালির চরের ওপর দিয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক হেঁটে আসা চারটি খানি কথা নয়। তবু হেঁটে এসেছি। হাসান আজিজুল হক নামের এক গল্প লেখকের টানে। বরেন্দ্রভূমির একজন লেখক রাঢ়ভূমির পটভূমিতে ‘শকুন’ নামের গল্প লেখেন কী করে? বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন গল্প লেখা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাছাড়াও ওই গল্পের চরিত্রগুলির মধ্যে আমি নিজেও একজন। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি রাখালিও করেছি। রাখালবালকদের সঙ্গে ঠিক গল্পের মতোই শকুন মেরেছি। শুধু তাই না, গল্পের চরিত্র যে ভাষায় কথা বলছে, আমি নিজেও সেই ভাষায় কথা বলেছি আমার শৈশবকৈশরে। অথচ ভাষার চরিত্র হচ্ছে প্রতি দশ কিমি অন্তর বদলে যাওয়া। তাহলে এটা সম্ভব কী করে?

এইসব প্রশ্ন নিয়ে বিনা পাশপোর্টে বন্ধু আসমহম্মদের সহায়তায় আমি ছুটে এসেছি এই বিদেশবিভুঁইয়ে। যে দেশটাই আবার গণতন্ত্র নেই। সামরিক শাসকের অধীন। যেখানে সেখানে পুলিশ। অগত্যা এই লোকটির দ্বারস্থ।

বাড়ি থেকে বেরোতেই আমার চোখ পড়ে দরজার বাঁদিকের একটি পরিত্যক্ত জায়গার ওপরইটের প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীর কোথাও একফুট দাঁড়িয়ে আছে তো কোথাও মটির সঙ্গে মিশে গেছে। মধ্যেখানে একটা শিবলিঙ্গ। পাশেই একটা বেলগাছ দাঁড়িয়ে জায়গাটাকে ছায়া করে রেখেছে।

কানাগলি পেরিয়ে আমরা আবার বড় রাস্তায় উঠেছি। লোকটি একটা খালি রিক্সা দেখে হাঁক ছেড়ে ডাকল। রিক্সাবালা হাঁক শুনে এসে দাঁড়াল আমাদের পাশে। আমরা উঠে বসলাম তাতে। রিক্সা চলতে শুরু করল। সঙ্গে রিক্সাবালার বকবকানি, কোনে যাইবেন ভাই? ছঙ্গে মেহেমান দেখত্যাসি। ইন্ডিয়া থেইক্যা আইত্যাসে বোধায়। কে লাগে? ভাবীজানের ভাই নাকি?

বকবক না কইর‍্যা রিক্সা টান। ভারছিটি যাওন লাগবো। তার আগে নিজাম হোটেলে লিয়া চল।

ধমকের স্বরে বলল লোকটি।

রিক্সাটা আমাদের নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে এমন এক জায়গায় নিয়ে এল, অবাক না হয়ে পারলাম না। রাস্তার ধারে নয়নজুলির ওপর গোটা গোটা বাঁশের পাটাতন। তার ওপর সার সার খলপার টাটির ঝুপড়ি ঘর। ঘরগুলি আবার এক একটা হোটেল। কোনটার নাম ‘আমিনা’, কোনটার নাম ‘কোহিনুর’, কোনটার নাম ‘নিজাম’।

লোকটি বলল, নামেন ভাইএকটু নাছতা কইর‍্যা লিই।

বাড়িতে শুধু সরবত খাইয়ে রিক্সা চড়িয়ে হোটেলে নাস্তা খাওয়াবে ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে আমি কোনও কুলকিনারা পাচ্ছি না। বেবাক দাঁড়িয়ে আছি।

লোকটি আবার আমায় তাগাদা দিল, অগত্যা আমাকে একটি হোটেলে ঢুকতে হল লোকটির পিছু পিছু। ভিতরে বাঁশের পাটাতনের ওপর গজাল গেঁথে বেঞ্চহাই বেঞ্চ আটকানো। তাতে বসে অনেকেই খাচ্ছে। হোটেলকর্মী, খরিদ্দারের হাঁটাচলায় পাটাতন দোল খাচ্ছে, কিন্তু কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। খরিদ্দার খেতে ব্যস্ত। হোটেলকর্মীরা খাওয়াতে ব্যস্ত। অথচ আমার রীতিমতো ভয় করছে। বাঁশের পাটাতনের নীচেই বিশাল খাল। খালে জল কাদা সমান সমান। তার মধ্যে অসংখ্য কাক আর কুকুরের দাপাদাপি। কোনও কারণে পাটাতন ভেঙে পড়লে আর দেখতে হবে না, কাককুকুরে আমাদেরকেও ছিঁড়ে খাবে।

ইতিমধ্যে আমাদের সামনে নাস্তা পরিবেশিত হয়েছে। আমি খেয়াল করিনি। লোকটি যখন বলল, খেয়্যা ল্যান ভাই। ঠাণ্ডা মারলে আর খাইতে পারবেন না, তখন আমি দেখি আমার সামনে বড় একটা চিনামাটির প্লেটে তন্দুরি রুটি আর একটা বড় বাড়িতে পায়চা। পায়চা দেখে আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। গরুর গোটা ঠ্যাঙ সাজিয়ে দিয়েছে যেন। কিভাবে খাব? এতবড় হাড় মুখে লাগিয়ে মজ্জ্বা টানা যায় নাকি?

না, টানা যায় না। তবে খাওয়া যায়। আমি লোকটিকে দেখি, লোকটি তার বাঁহাতটা পায়চার বাটির ওপর রেখে ডানহাতে পায়চার বড় হাড়টা শক্ত করে ধরে বাড়ি মারছে। ওতেই মোটা হাড়ের ভিতর থেকে মজ্জ্বা খসে খসে পড়ছে বাটিতে। গল্পকারের খোঁজে এসে আমি যেন গল্পের খোঁজ পাচ্ছি। আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। হয়ত সেই আনন্দেই আমি লোকটিকে জিজ্ঞেস করে বসি, ভাইবাড়ি ছেড়ে আপনি আমাকে এতদূরে হোটেলে নাস্তা করাতে নিয়ে এলেন কেন?

লোকটি বলল, দ্যাখেন নি ভাই আমার বাড়ির দরজায় একটা ছিবমন্দির আসে! আছলে ওই বাড়ি ছিল এক হিন্দু ভায়ের। আমার বাপের কাছে সে লোক ওই বাড়ি বিক্রি কর‍্যা ইন্ডিয়ায় চলে যায়। আমার বাপেরে বলে যায়, আর কিছু না পারেনছম্ভব হলে মন্দিরটার মান রাখিয়েন। তাই আমরা বাড়িতে গোমাংছ ঢোকায় না ভাই।

একথা শুনে শুধু আমি একা আনন্দিত হই না, আমি দেখি পাটাতনের নীচের জলকাদায় অগুনতি কুকুর আনন্দে লটাপটি খাচ্ছে। কাকগুলি হোটেলের নীচের বদ্ধ হাওয়ায় মুক্ত মনে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে লোকটির বাড়ির দরজার পাশে পরিত্যক্ত শিবমন্দিরে শিবলিঙ্গের মাথায় বসন্ত বাতাসে একটা দুটো বেলপাতা খসে খসে পড়ছে। জীবপ্রকৃতির সব আনন্দ উল্লাস ভেসে আসছে আমার কানে। আমার সব ভয় কেটে যাচ্ছে।

পঞ্চবিংশতিতম আন্তঃরাজ্য তস্কর সম্মেলন । এবারে রজতজয়ন্তী বর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সম্মেলন । এই সম্মেলনের ভেন্যু অর্থাৎ মিলনস্থল হল ভেটকিমারির জঙ্গল । অনেক বড় বড় চোর ,ডাকাত ,গাঁটকাটা ,পকেটমার ,ঠগ,তোলাবাজ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সম্মেলনে যোগ দিতে আসছেন । আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্মাগলার বড়া কোকিল” এবারের সম্মেলনের বিশেষ অতিথি । অনেক বিদগ্ধ চোর এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছেন। তাঁরা এখানে তাঁদের তস্করবৃত্তি সংক্রান্ত গবেষণাপত্র প্রকাশ করবেন । এ ছাড়া কানকাটা মদন,পাজি মস্তান,ঝুলন দেবীর মত বিশিষ্ট তস্করবর্গ উপস্থিত থেকে সম্মেলনের গৌরব বৃদ্ধি করবেন ।

এবারের সম্মেলন উদ্বোধন করতে আসছেন দেশের কৃতি ডাকাত দস্যু কাল্লু খাঁ । ডাকাতিতে তাঁর অমর কীর্তির জন্য তিনি “দস্যু” উপাধি লাভ করেছেন । এ ছাড়া তিনি দেশের সর্বোচ্চ সম্মান তস্করভূষণ উপাধিতেও ভূষিত হয়েছেন । গতবছর তিনি চারচারবার জেল ভেঙে পালিয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন । তিনি বলেছেন আমাদের দেশে এমন কোন কারাগার এখনও তৈরী হয়নি যা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে ।

প্রত্যেক বছর এই সম্মেলনে বছরের শ্রেষ্ঠ তস্করকে “তস্করসম্রাট” উপাধি প্রদান করা হয়ে থাকে। এবারের তিনটি রাজ্য এর প্রধান দাবিদার । পশ্চিমভঙ্গ ,মেঘাচল ও অন্তপ্রদেশ । এ ছাড়া হিমালয়খন্ড এবং কমলনাড়ুও কম যায় না । ঐ দুই রাজ্যের প্রতিনিধিগনও স্ব স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী । সুতরাং তাদেরও উপেক্ষা করা চলে না । কিন্তু কার ভাগ্যে যে শিকে ছিঁড়বে তা নিয়ে জোর জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে । বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল থেকে সুপারিশের পর সুপারিশ আসছে । মোটা টাকার বেটিংও চলছে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ।

বোঝাই যাচ্ছে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবার । ছিঁচকের মনে তাই বেশ টেনশন রয়েছে । ছিঁচকে পশ্চিমভঙ্গের একজন নামকরা সিঁধেল চোর । গত বছর রাজ্য পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সে এ রাজ্যের চোরচূড়ামনি হয়েছে । তাই এবার সে তস্কর সম্মেলনে পশ্চিমভঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করার সম্মান লাভ করেছে । ছোটবেলা থেকেই তার চৌর্য প্রতিভা লক্ষ্য করা যায় । তার বাবা ছিলেন একজন নামকরা চোরাকারবারি ।তা ছাড়া ভেজালবিশেষজ্ঞ হিসেবেও তিনি সংশ্লিষ্ট মহলে সবিশেষ পরিচিত । এ বিষয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান ভেজাল কারবারিদের খুব উপকারে এসেছে । চৌর্যবৃত্তি ছিঁচকের পারিবারিক পেশা । তার “হাতেসিঁধকাঠি” হয়েছিল বাবার কাছেই । পরে অবশ্য বিভিন্ন নামকরা ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়েছে সে ।

এবারে মূল লড়াইটা হবে ছিঁচকে ও শ্রী অপহারক শর্মার মধ্যে । শ্রী শর্মা অন্তপ্রদেশের প্রতিনিধি ।গত বছর অন্তপ্রদেশ সরকার তাঁকে চোরচূড়ামনি খেতাব দিয়েছে । শোনা যায় যে কোন দেরাজ ,আলমারি অথবা সিন্দুকের তালা খুলে ফেলা তাঁর কাছে বায় হাত কা খেল্‌ । তালোঘাটিনী মন্ত্র অর্থাৎ যে মন্ত্রে নিমেষে তালা খুলে যায় – সেই মন্ত্রে তিনি সবিশেষ পারদর্শী । এ ছাড়া তিনি আরেকটি বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী । তিনি নাকি মুহূর্তে ঘুম পাড়িয়ে ফেলতে পারেন যে কোন মানুষকে । শুধু তাই নয় যতক্ষণ তিনি চাইবেন সে ব্যক্তি কিন্তু ঘুমিয়েই থাকবে । উঠবে না । এর জন্য শ্রী শর্মার কোন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তিনি নিদালী মন্ত্র জানেন ।অবশ্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক কথাই রটে । তার সবটা সত্যি নাও হতে পারে । সুতরাং ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতে চায় না ছিঁচকে । তার মতে ঘুম পাড়ানো কী এমন ব্যাপার ? আর তা ছাড়া এই ভাবে মন্ত্র পড়ে ঘুম পাড়িয়ে চুরি করা হল মোটা দাগের কাজ । গৃহস্থ স্বাভাবিক ভাবে নিদ্রা যাবে । তাকে কোন রকম বিরক্ত না করে চুপিসারে কাজ সারতে হবে । কাকপক্ষীটিও টের পাবে না । প্রকৃত চোর ঘুমন্ত মানুষের নিশ্বাসপ্রশ্বাসের আওয়াজ শুনে ঘুমের গভীরতা মাপবে । এবং সেই মত কাজ করবে । তবেই না বাহাদুরি । মনে রাখতে হবে চৌষট্টি কলার অন্যতম কলা হল চুরিবিদ্যা ।

এদিকে আবার মেঘাচলের মহিলা প্রতিযোগী মিস্‌ মনিকা অনেকের চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারেন ।তুল্যমূল্যর বিচারে তিনিও কম জান না । ছিঁচকে জানে মহিলা জ্ঞানে তাঁকে যদি হেলাফেলা করা হয় তাহলে আখেরে ঠকতে হতে পারে । কারণ অনেক সময় দেখা গিয়েছে – এ লাইনে মহিলারা পুরুষদের চাইতে অধিকতর সফল । তাদের একটা সহজাত ক্ষমতা রয়েছে – তারা অনায়াসে লোকের মনে কোন রকম সন্দেহের উদ্রেক না ঘটিয়ে সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে – এবং অধিকাংশ সময়েই সেটা তাদের কাজের পক্ষে সহায়ক হয় ।

পাঁচুরামের ওপর বিভিন্ন ডেলিগেট্‌সদের আপ্যায়নের ভার পড়েছে । তাঁদের যাতে কোন অসুবিধে না হয় –সে দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে তাকে । ফান্ডের জন্য কোন চিন্তা নেই । সম্মেলনের স্বেচ্ছাসেবকগ বহু আগের থেকেই ফান্ড কালেকশনের জন্য দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন । ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক ডাকাতিও সঙ্ঘটিত হয়েছে । কিন্তু এবারের সম্মেলনের খরচ অনেক বেশি । কারণ রজতজয়ন্তী বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় এবার প্রস্তাব পাশ হয়েছে যে ডেলিগেট্‌সদের একটি করে সোনার সিঁধকাঠি উপহার দেওয়া হবে । তাই শুধু মাত্র ব্যাঙ্ক ডাকাতির ওপর নির্ভর না করে সম্মেলনের সংগঠকগণ ট্রেনে ,ট্রামে ,বাসে ,বাজারে ,মেলায় ,মিটিঙে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের স্বেচ্ছাসেবকদের । এ ছাড়া বাছা বাছা ধনীগৃহেও হানা দিতে বলা হয়েছিল তাঁদের ।

এবারের সম্মেলনের স্লোগান হল –“যদি না পড়ে ধরা “। কারণ পন্ডিতেরা তো বলেই গিয়েছেন –“চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা “। তস্কর সমাজ এই আপ্তবাক্যটিকে বেদবাক্য হিসেবে গণ্য করে। সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত পত্রিকা “তঞ্চক”এ গতবছরের তস্করসম্রাটের একটি জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর মতে ,-“চুরি নিছক একটি জীবিকা মাত্র নহে । ইহা জীবনদর্শনও বটে । ইহাকে শুধু মাত্র অর্থ উপার্জনের নিমিত্ত কোন উপায় হিসাবে গণ্য করা উচিৎ হইবে না।চুরি আমাদের সমাজের পক্ষে হিতকর । ইহাতে সম্পদের পূঞ্জিকরণ রোধ হয় ।“ তিনি আরও বলেছেন , “চুরি আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত । চুরি করেন নাই এমন ব্যক্তি পৃথিবীতে বিরল । সাধারণ মানুষ হইতে শুরু করিয়া পৃথিবীবিখ্যাত মনিষীগণ প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় কিছু না কিছু চুরি করিয়াছেন । তা সে ঠাকুমার তৈরী আচারই হোক কিংবা বাপের মানিব্যাগের খুচরো পয়সাই হোক । সুতরাং ইহা হইতে স্পষ্ট যে চুরি নিন্দনীয় কাজ নহে । তাই তো পণ্ডিতগণ ইহাকে ‘মহাবিদ্যা’ আখ্যা দিয়াছেন । তথাকথিত ভদ্রলোকের সহিত চোরেদের পার্থক্য এই যে ,-চোরেরা স্বীকার করে যে তাহারা চোর , কিন্তু ভদ্রলোকেরা তাহা করেন না ।“

সম্মেলনের প্রথম দিন মহামান্য কাল্লু খাঁ একটি প্রতীকী সিঁধ কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ।এবারের তস্কর সম্মেলনের ম্যাসকট্‌ অর্থাৎ প্রতীক হল “পলায়নরত মার্জার “ । বেড়ালকে চোরেদের প্রতিভূ হিসেবে দেখা হয়েছে । বেড়ালের মধ্যে চৌর্যপ্রবৃত্তি যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান । সে প্রায়শই ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য দুধ মাছ ইত্যাদি অত্যন্ত সুচতুর ভাবে চুরি করে খায় ।তিনদিন ব্যাপী সম্মেলনে প্রচুর আলোচনা হয়েছে । অনেক বাকবিতন্ডা ,তর্কবিতর্ক, ভাবের আদানপ্রদান হয়েছে । দেশবিদেশের অনেক জ্ঞানীগুণী তস্কর তাঁদের নিজের নিজের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন । তস্করবৃত্তিকে আরও কীভাবে উন্নত করা যায় – তার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে । ঠিক হয়েছে এই কমিটি শীঘ্রই প্রশাসনের কাছে তাঁদের দাবিদাওয়া পেশ করবে । তাঁদের প্রধান প্রধান দাবিগুলি হল –

চুরি করে ধরা পড়লে দৈহিক নির্যাতন করা চলবে না ।

আদালতে মকদ্দমা হলে চোরেদের আইনি সহায়তা দিতে হবে ।

চুরিবিদ্যাকে ইশকুলের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।

এবং – তস্করতা বিষয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদ লোকসভায় রাখতে হবে যিনি এই বিভাগের সমস্ত সুবিধা অসুবিধা দেখবেন ।

বিনা মেঘে বজ্রপাত ! হঠাৎ খবর এসেছে – অন্তপ্রদেশের চোরচূড়ামনি শ্রী অপহারক শর্মা সম্মেলনে আসতে পারছেন না । শোনা যাচ্ছে যে একটি চুরির ঘটনায় বাড়ির পাইপ বেয়ে উঠতে গিয়ে তিনি পিছলে পড়ে যান । তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এই ঘটনায় অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে । বিশেষত যারা বেটিং-এর সঙ্গে যুক্ত । কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না যে শ্রী শর্মার মত একজন পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ চোর এই রকম আনাড়ির মত পড়ে যেতে পারেন।এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষ দুটি লবিতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।একপক্ষ এর মধ্যে সাবোতাজের ছায়া দেখছেন । অপর পক্ষ যারা ছিঁচকেকে সমর্থন করছেন – তারা বলছেন আসলে শ্রী শর্মা ভয় পেয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। তাই এই নাটক। সাবতেজটাবোতেজ সব বাজে কথা । তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ছিঁচকের সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল হবে তার পক্ষে । সেইজন্য সম্মান রক্ষার্থে তিনি কায়দা করে সরে গেলেন । দেখ গে তিনি সুস্থই আছেন । আসলে তাঁর কিছুই হয়নি । সব ভাঁওতা ।

তবে কিছু লোক আছে যারা এই সব কুটকচালি ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে যেতে চান না । তারা চুরি-প্রিয় মানুষ । তাঁদের ধ্যান্‌জ্ঞান চুরি । তারা মনে করেন চুরি একটি উন্নত ধরনের ক্রীড়া । এবং যারা তস্কর তারা হচ্ছেন ক্রীড়াবিদ । কিছু উৎকৃষ্ট চুরি দেখার আশায় ছিলেন তারা । ভেবেছিলেন – হারজিত যারই হোক, শ্রী শর্মা এবং ছিঁচকের মধ্যে যে সুস্থ উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতা হবে তা খুবই আকর্ষক হবে ।

কিন্তু শ্রী শর্মার অনুপস্থিতি তাঁদের আশায় জল ঢেলে দিয়েছে ।

অবশেষে সব জল্পনাকল্পনার অবসান হল । যেমনটি ভাবা গিয়েছিল তেমনটিই হয়েছে । এবারে তস্করসম্রাটের উপাধি জিতে নিয়েছে পশ্চিমভঙ্গের ছিঁচকে । যদিও এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেকে জল ঘোলা করার চেষ্টা করেছিলেন। স্বজনপোষণের অভিযোগও তুলেছিলেন কেউ কেউ । অনেকে বলতে চেষ্টা করেছিলেন ছিঁচকে নাকি ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছে । কিন্তু সবার বাদানুবাদকে নস্যাৎ করে দেন মহামান্য কাল্লু খাঁ স্বয়ং । তাঁর মতে ছিঁচকের কৃতকার্যতা নিয়ে কোন সংশয়ের অবকাশ নেই । সে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই নির্বাচিত হয়েছে । কারণ হিসেবে তিনি বলেন – এবারে একটি কঠিন আইটেম ছিল । সেলব্রেটিদের পকেট মারা । সেই আইটেমে প্রত্যেকেই দেশের মন্ত্রী থেকে শুরু করে গায়ক ,নায়ক ,কবি ,সাহিত্যিক ,বিজ্ঞানী ,শিল্পী ইত্যাদি তাবড় তাবড় সেলিব্রেটিদের পকেট মেরেছেন । কিন্তু ছিঁচকে যা করেছে তা অভাবনীয় । সে যার পকেট মারতে সক্ষম হয়েছে তিনি আর কেউ নন – স্বয়ং কাল্লু খাঁ – তস্করভূষণ ।

উদ্ভট বার্তা” কাগজের পক্ষ থেকে এবারের তস্করসম্রাট ছিঁচকের ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম ।ছিঁচকে অনেক ধৈর্য ধরে আমার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে । সে মনেপ্রাণে একজন চোর । রোজ সকালে উঠে চোরের দেবতা দেবসেনাপতি স্কন্দ বা কার্তিকেয়কে প্রণাম না করে সে জলগ্রহণ করে না । তার কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি – চৌষট্টি কলার এক কলা এই বিদ্যা । অতি প্রাচীনকাল থেকে এই বিদ্যা আমাদের দেশে অধীত এবং অনুশীলিত হয়ে আসছে । এমন কি চর্যাপদেও এর উল্লেখ আছে ।

সেখানে আমরা পাই – যো সো চৌর সোই দুষাধী । দুষাধী অর্থাৎ দুঃসাধ্য কর্ম । যে প্রকৃত চোর সে দুঃসাধ্য কর্ম করার ক্ষমতা রাখে । এখানে চোরকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে । দেশের নবীন চোরেদের প্রতি তার বার্তা হল – প্রকৃত চোর হওয়া চাট্টিখানি কথা নয় । প্রচুর পরিশ্রমের প্রয়োজন । তার চলাফেরা হবে বিড়ালের মত নিঃশব্দ । হরিণের মত বেগবান । শ্যেনপক্ষীর মত গ্রাহ্য বস্তুকে আয়ত্তে আনতে সমর্থ হবে অনায়াসে। শুধু তাই নয় নানাবিধ রূপ ধারণে তাকে হতে হবে পারদর্শী। সে হবে জলের মত । যখন যেমন তখন তেমন । মানুষের মধ্যে নেই হয়ে থাকতে হবে তাকে । যেন কেউ চিনতে না পারে । তার চেহারার মধ্যে কোন বিশেষত্ব থাকবে না । সে হবে ভীষণ রকম স্বাভাবিক । এও এক ধরনের সাধনা । ছিঁচকে তার পেশার জন্য যথেষ্ট গৌরব বোধ করে । এবার তার লক্ষ্য হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় সম্মান “তস্করভূষণ” উপাধি লাভ করা ।

ফিরে এসে সম্পাদকের দপ্তরে ইন্টারভিউর লেখাটা জমা দিতে গিয়ে একটা জিনিষ আবিষ্কার করলাম পকেটটা কেমন হালকাহালকা লাগছে যেন ! যা ভেবেছি তাই । মানিব্যাগটা আমার পকেট থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে কোন মন্ত্রবলে । বুঝলাম ,তস্করসম্রাটের কাছে আরও সাবধান হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল আমার ।সে তার হাতের ভেল্কি আমার ওপর প্রয়োগ করে বুঝিয়ে দিয়েছে – নির্বাচকগণ তাকে তস্করসম্রাট নির্বাচিত করে মোটেও ভুল করেননি

বাইরে উত্তাল ঝড়। সঙ্গে মুষলধার শিলাবৃষ্টি। কন্‌কনে ঠান্ডা। আবহাওয়ার দপ্তর বলছে সারাদিন ধরে চলবে প্রকৃতির এই তান্ডব।

সকাল সাড়ে দশটা। সান্যাল বাড়ির তিন বাসিন্দা রেণুকা আর সৌমেন তাদের পাঁচ বছরের ছেলে রণদীপকে স্কুলে নামিয়ে নিজের নিজের গন্তব্যের দিকে পাড়ি দিয়েছে। বিকেল সাড়ে তিনটের সময়ে বাসন্তী হেঁটে গিয়ে রণকে স্কুল থেকে তুলে আনবেন।

বাসন্তী, সৌমেনের দূর সম্পর্কের খুড়তুতো কাকীমা। এবং বলাই যায় যে তিনি সৌমেনরেণুকার সংসারে আশ্রিতা। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল কলকাতা থেকে বাসা তুলে সৌমেনের আশ্রয়ে এসে উঠেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে।

রেণুকার বছর দেড়েকের মেয়ে মায়া, বাসন্তীর ঘরে পাতা বেবি কটে বসে খেলা ক’রছে। আর নিজের ঘরের মস্ত জানালাটার ওপর দুই হাত রেখে বৃষ্টি দেখছেন বাসন্তী।

বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল কতকগুলো টুক্‌রোটুক্‌রো, অসংলগ্ন ছবি। তাঁর অতীতের সঙ্গে কোন না কোন সূত্রে বাঁধা সেই সব ছবি কিন্ত ওঁর কাছে এই মুহূর্তে ছবিগুলো নিরর্থক।

ভাসমান ছবির টুকরোগুলো অর্থহীন, অথচ সেই সব ছবি যখন তখন বাসন্তীর চোখের সমুখে চলে আসে। ঘুমের মধ্যে আক্রমণ ক’রে তাঁর অবচেতনকে।

অতীত এবং বর্তমানের মাঝে সেতু বন্ধন ক’রতে গিয়ে তাই দিশেহারা হয়ে যান তিনি।

হঠাৎ ফোনের আওয়াজে বাসন্তীর মগ্নতা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। ছুটে খাবার ঘরে গিয়ে ফোনটা ধরলেন।

আমি রেণুকা বলছি”, ওপার থেকে কোমল অথচ স্টীলের মত ধারালো কন্ঠস্বর ভেসে এলো, “বৃষ্টি দেখছিলে নিশ্চয়ই”? বাসন্তী নির্বাক।

জানালা থেকে প্রকৃতির কতশত রূপ দেখতে দেখতে বাসন্তীর আচম্‌কা টুক্‌ ক’রে নিজের মধ্যে হারিয়ে যাবার অভ্যেসটা রেণুকা জানে। সে আবার বলল, “কাকী, আজ আর বৃষ্টি দেখে সময় নষ্ট কোরো না, প্লীজ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আজই সন্ধ্যেবেলা মৌসুমীরা আমাদের বাড়ি ডিনর খেতে আসবে। ওরা চারজনেই আসছে

বাসন্তী ধাক্কা খেয়ে অস্ফুটে বললেন, “চারজন!”

হ্যাঁ, চারজন। মানে মৌসুমী, অভীক, তাদের ছেলে কিরণ আর কাকাবাবু অভীকের বাবা।

অপ্রত্যাশিত এই সংবাদ প্রতিধ্বনির মত বাজতে লাগল বাসন্তীর কানে।

আর কাকী”, রেণুকার গলা আবার ভেসে এলো, “দ্যাখো, রণকে যখন পিক্‌ আপ ক’রতে যাবে, মায়ার স্ট্রোলারটা যেন ভালভাবে ওয়াটার প্রুফ দিয়ে ঢ়াকা থাকে। ঝড়বৃষ্টির দিন আজ।“

আচ্ছা,” বলে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন বাসন্তী। সারাদিনের সমস্ত করণীয় মনে আলোড়ন তুলল। মায়াকে স্নান ক’রিয়ে, খাইয়ে, ঘুম পাড়ানো। সোয়া তিনটে নাগাদ স্ট্রোলারে মায়াকে নিয়ে রণর স্কুলে যাওয়া ও বাড়ি ফেরা। ফিরেই মায়ার ন্যাপি চেঞ্জ ক’রে, গরম দুধের বোতল ওর হাতে ধরিয়ে শুইয়ে দেওয়া। রণকে স্নান করানো, খাওয়ানো।

তারপর রাতের রান্না আরম্ভ করা। রেণুকাকে প্রসন্ন রাখতে হ’লে আমিষনিরামিষ মিলিয়ে গোটা ছয়েক পদ রাঁধতেই হবে। ভাবতে গিয়ে হিমশিম খেলেন তিনি!

ক্ষিপ্রহাতে রান্নার যোগাড় খানিক গুছিয়ে নিলেন অতঃপর। ফিরে এসে রান্না চাপাবেন।

তারপর ওয়াটপ্রুফে মায়া আর তার স্ট্রোলারকে সযত্নে ঢ়েকে স্কুল উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন বাসন্তী। ঠিক তখুনি আকাশ ভেঙ্গে আর একবার বৃষ্টিটা নেমে এলো। দু’হাত দিয়ে স্ট্রোলার ঠেলছেন, অতএব নিজের মাথাটি বাঁচাতে ছাতা ধরার উপায় নেই। ওদিকে উন্মত্ত বাতাসের দাপট সামলে এগিয়ে যাওয়া দুষ্কর। তাও, বৃষ্টি আর ঝড়ের হিংস্র আক্রমণ উপেক্ষা ক’রেই অগ্রসর হ’লেন তিনি।

সবে গোটা দশেক পা এগিয়েছেন, একটা ছোট্ট হন্ডা সিভিক থম্‌কে দাঁড়িয়ে পড়ল বাসন্তীর পাশে।

সন্ত্রস্ত হয়ে চেয়ে দেখলেন গাড়ি থেকে ছাতা হাতে নেমে আসছেন এক সুপুরুষ, সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। পরিষ্কার বাংলায় তিনি বললেন, “ঈস্‌, একেবারে ভিজে কাক হয়ে গ‌েছেন। নিন্‌, বেবিকে নিয়ে উঠে আসুন গাড়িতে। স্ট্রোলারটা আমি বুটে রেখে দিচ্ছি”।

আপনি”? অস্ফুটে বাসন্তী বললেন।

আপনাদের প্রতিবেশী। আমি অভীকের বাবা অজয় মুখার্জী। নাতিকে তুলতে রণদের স্কুলেই যাচ্ছি।

সন্ধ্যাবেলায় অভীক, কিরণ, মৌসুমীর সঙ্গে অজয় মুখার্জীও এলেন সৌমেনরেণুকার বাড়ি। ওদের টেবিলে বসিয়ে বাসন্তীই পরিবেশন করলেন খাবারদাবার। পরম তৃপ্তি সহকারে খাওয়া সারল সকলে। খাওয়ার মাঝে একবার অজয় মুখ তুলে বলেছিলেন, “আপনিও আমাদের সঙ্গে বসে পড়ুন”।

রেণুকা তৎক্ষণাৎ বলল, “না, না। কাকী পরিবেশন ক’রে দিলে খাবারের স্বাদই আলাদা। আমাদের খাইয়ে তবে বসবে কাকী। রোজই তাই করে”।

সে রাতে বাড়ি ফেরার পথে মৌসুমী হঠাৎ বলল, “ইশ, রেণুকাটা কি লকি”!

হঠাৎ কেন মনে হ’ল এ কথা”? অভীকের প্রশ্ন।

নইলে বাসন্তী আন্টির মত এফিসিয়েন্ট হাউস কিপার ক’জনে পায়, বলো”। ছোট্ট একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল মৌসুমী।

কি যে বলো তুমি! বাসন্তী আন্টি তো সৌমেনের কাকীমা। শুনেছি যথেষ্ট শিক্ষিতাও। কোলকাতা ইউনিভার্সিটির অনার্স গ্র্যাজুয়েট। ওঁর স্বামীও ইংলিশ সাহিত্যের নামী স্কলার ছিলেন।

রাখো তো! আসলে বিধবা হবার পর কাকীকে ওরা নিয়ে এসেছে নিজেদের স্বার্থেই। বিনি পয়সার হাউসকীপার আর কোথায় পাবে?

* * * * *

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুকাল ওয়েস্টর্ন দর্শন অধ্যাপনা করার পর তিন বছর হ’ল অবসর নিয়েছেন অজয় মুখার্জী। আর অবসর নেবার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর স্ত্রী বিয়োগ হ’ল। দক্ষিণ কলাকাতায় মস্ত পৈতৃক বাড়িতে এখন তিনি একাই থাকেন। সঙ্গে থাকে দীর্ঘদিনের ভৃত্য কার্ত্তিক। তার তদারকিতে দু’বেলা রান্না ক’রে দিয়ে যায় সাবিত্রী। বাড়িঘর ঝাড়ামোছা, কাপড় কাচা আর বাসন মাজার জন্য বহাল আছে এক ঠিকে ঝি।

কয়েক মাস আগে অভীকমৌসুমী আর কিরণ কলকাতা বেড়াতে গিয়ে দেখল অজয় ভারি নিঃসঙ্গ। সারা জীবন অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনার জগতে কাটিয়ে এখন রিটায়রমেন্ট স্ত্রী বিয়োগের দুদুটো ধাক্কা সামলাতে গিয়ে তিনি অবসাদে ডুবে যাচ্ছিলেন। ছেলেবৌয়ের পীড়াপীড়িতে অজয় অগত্যা মেলবোর্নে একটা বছর কাটিয়ে যেতে রাজি হয়েছিলেন। মেলবোর্নের নতুন পরিবেশ, নাতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং হাঁটাপথে লাইব্রেরির নাগাল পেয়ে অজয়ের অবসন্নতা অনেকখানি কেটে গেল।

বাসন্তীর সঙ্গে পরিচয়ের ক্ষণেই অজয় তাঁর নিঃসঙ্গতার আভাস পেয়েছিলেন। জীবনের এক বৃহদংশ অধ্যাপনার পরিবেশে কাটিয়ে তাঁর বিবেকে সমাজচেতনা এবং মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সৌমেনের বাড়ি থেকে ফিরে আসা অবধি বাসন্তীর একাকীত্ব কীভাবে কাটানো যায়, তাই নিয়ে ভাবনাচিন্তা ক’রে, একদিন দুপুরে লাইব্রেরি থেকে গোটাকয়েক বাংলা এবং ইংরিজি বই নিয়ে তিনি সান্যালাবাড়ির দোরে এসে কলিং বেল টিপলেন।

ওঁকে দেখে বাসন্তী চম্‌কে উঠলেন।

খুব আশ্চর্য হয়েছেন তো”? হাসিমুখে বললেন অজয়, ভেতরে আসতে পারি কি”?

নিশ্চয়ই”, একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বাসন্তী বললেন, আসুন”।

ভেতরে ঢ়ুকে হাতে ধরা বইগুলো বাসন্তীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, পড়ে দেখবেন। দু’সপ্তাহ পরে এসে এগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আরও বই দিয়ে যাব। কি ধরনের বই আপনার পছন্দ একটু জানালে . . .

সত্যিই”? আচম্‌কা বলে ফেললেন বাসন্তী। নিজের সংসারে যখন থাকতেন তখন বইয়ের পোকা ছিলেন তিনি। কি ক’রে জানলেন ভদ্রলোক!

আপনার কাজে বাধা দিলাম না তো?

না, না, অজয়ের প্রশ্নের উত্তরে বাসন্তী বললেন, ব্যাকইয়ার্ডে আমার ভেজিপ্যাচ আছে। ফুলের বাগানও। তাদেরই পরিচর্যা ক’রছিলাম। দেখবেন আমার বাগান?

বাসন্তীর বাগান দেখে, তাঁর সঙ্গে লাঞ্চে টমাটো স্যুপটোস্ট খেয়ে বাড়ি ফিরলেন অজয়। মনে পড়ল প্রয়াত স্ত্রী সুস্মিতার কথা। তিনিও ছিলেন বাগান পাগল। সেই দিনগুলোয় কর্মব্যস্ততার দরুন সুস্মির সুন্দর সাজানো বাগানের দিকে ফিরে চাইবার সময় হ’ত না তাঁর। অথচ এখন তাঁর অফুরন্ত সময় কিন্তু সঙ্গীহীন জীবন।

এরপর থেকে বই নেওয়াদেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে অজয় চলে আসতেন বাসন্তীদের বাড়ি। বাগানের কাজে, ছোট্ট মায়ার দেখভালে সাহায্য ক’রতেন। বাসন্তীর জন্য লাঞ্চ নিয়ে আসতেন কত সময়ে। রান্না করার নতুন শখ হয়েছে তাঁর।

ঝড়বৃষ্টিবিপর্যয়ের দুপুরগুলো ওঁরা কাটাতেন স্ক্র্যাব্‌ল খেলে। সুডোকুর ধাঁধাঁ সমাধানে। অজয়ের আই ফোনে গান শুনে। অথবা হোয়াট্‌স্‌ অ্যাপে অজয়ের বন্ধুদের নানা ধরনের পোস্টিং দেখে।

আজকাল দুই বাড়ির নাতিদের স্কুল থেকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব অজয়য়ের।

এইভাবেই ওঁদের দুপুরগুলো কেটে যাচ্ছিল। আন্তরিক সখ্যতা গড়ে উঠছিল দু’জনের মধ্যে। কতগুলো মাস কেটে গেল অতঃপর। একদিন অজয় হঠাৎ বললেন, আমার বাড়ি ফেরার সময় এসে গেল। আর তিন সপ্তাহ”।

এই সম্ভাবনাটির কথা বাসন্তীর মনে আসেই নি।

কেন? আপনি অভীকদের বাড়িতে স্থায়ী বাসিন্দা নন”? থম্‌কে বললেন বাসন্তী।

নাহ্‌। আমি এসেছিলাম ট্যুরিস্ট হয়ে এক বছরের জন্য। এবার বাড়ি ফিরব।

ও”, বিষণ্ণকন্ঠে বললেন বাসন্তী। বুকের ভেতরটা তাঁর তোলপাড় ক’রে উঠল।

আপনি যে আবার একা হয়ে যাবেন, সে খেয়াল আছে?

মুহূর্তে বাসন্তীর বিষণ্ণ সুন্দর মুখখানা রক্তবর্ণ। আনত মুখে বললেন, আছে”।

যদি অভয় দেন একটা প্রস্তাব ক’রি?

– কী?

আপনি আমাকে বিয়ে ক’রে আমার সঙ্গে কলকাতা চলে আসুন। দিব্যি কাটিয়ে দেব বাকী জীবনটা দু’জনে মিলে”।

আজীবনের অর্জিত সংস্কার, বিশ্বাস, আশা, আকাঙ্খা  একসঙ্গে জেগে উঠে ঘুরপাক খেতে লাগল বাসন্তীর মনে। তিনি নির্বাক্‌ দাঁড়িয়ে রইলেন।

একটা কথা ভেবে দেখুন”, দৃঢ়স্বরে বললেন অজয়, আমরা দুজনেই প্রবীন মানুষ। পৌঢ়ত্ব পার ক’রে বার্ধক্যের দিকে এগুচ্ছি। এই সময়ের নিঃসঙ্গতা বড় কষ্টের। আমরা অনায়াসে হাত ধরে চলতে পারি পরস্পরের বন্ধুত্ব, সাহায্য এবং বিশ্বাসের জোরে। এর বেশী প্রত্যাশা তো থাকবে না আমাদের।

* * * * *

সেই রাতেই অজয় মুখার্জীর অচিন্তনীয় প্রস্তাবখানার সামনে দাঁড়াতে হ’ল সৌমেন আর অভীককেও। নিভৃতে ওদের দু’জনকে ডেকে তিনি বললেন, একটা বয়সের পর আমরা সকলেই এই পরিবর্তনশীল জীবন এবং সময়ের গতির সঙ্গে ঘুরতে থাকা মূল্যবোধের দোটানার মোকাবিলা করি। সমঝৌতাটাও ক’রি নিজেদের মত ক’রে। আমার প্রশ্ন, এই বয়সে নিজেদের মত ক’রে বেঁচে থাকার অধিকার চাওয়াটা কি অপরাধ? বাসন্তীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কে যদি বেঁধে নিই? আপত্তি আছে তোমাদের?

অভীক আর সৌমেন প্রথমে স্তব্ধ, হতভম্ব। তারপর কয়েকটা দিন সময় চেয়ে নিল ওরা। এবং একান্তে দু’জনে একদিন বাসন্তীর মুখোমুখি হ’ল।

কাকী, সৌমেন বলল, অজয় অংকল তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন”।

জানি”, মৃদুকন্ঠে বললেন বাসন্তী, ক’দিন ওঁর প্রস্তাবখানা নিয়ে আমিও ভাবনাচিন্তা ক’রছি”।

পরস্পরের দিকে চাইল ওরা। বাসন্তী বলে চললেন, এই সবে বাহান্ন পেরিয়েছি আমি। অজয়বাবুও বোধ ক’রি আমারি বয়সী। আজকের যুগে মেডিকল রিসর্চের দৌলতে গিফ্‌ট অফ্‌ লাইফ মানে জীবনপরিসীমা যে গতিতে বিস্তার পাচ্ছে, তাতে আমরা দু’জন সবেমাত্র জীবনের মধ্য বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছি। তাই ভাবছি আগামী কতগুলো বছর নিজের মত ক’রে বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছেটা কি অন্যায্য?

* * * * *

কোলকাতা ফিরে যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় সৌমেনদের বাড়ি গিয়ে কলিং বেল টিপলেন অজয়। দরজা খুলল রেণুকা।

বাসন্তীর সাথে একটু কথা ছিল, অজয় বললেন।

পিসি ব্যাক্‌ইয়ার্ডে। গাছে জল দিচ্ছেন, রেণুকা বলল, আপনিও চলে যান না সেখানে”।

অজয়কে দেখে বাসন্তী আশ্চর্য হ’লেন না। যেন তিনি আশাই ক’রছিলেন অজয় বিদায় নিতে আসবেন।

আপনাকে গুড বাই ব’লতে এলাম, হাসিমুখে অজয় বললেন।

জানি”।

পকেট থেকে একটা স্মার্ট ফোন বার ক’রে বাসন্তীর হাতে দিয়ে অজয় বললেন, এটা আপনার জন্য। আমার নিজের স্বার্থেই। হোয়াট্‌স্‌অ্যাপে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব”।

বাসন্তীর মুখে হাসির ঝিলিক। স্বচ্ছন্দ বোধ ক’রছিলেন তিনি।

জানেন, কলকাতায় আমাদের যৌথ জীবনের পরিকল্পনা অলরেডি আরম্ভ ক’রে দিয়েছি।

তাই?

আমরা দু’জনে হাত লাগিয়ে দারূণ এক বাগান তৈরি ক’রব। রংবেরঙের অনেক পাখী আসবে আমাদের হাত থেকে মধু আর দানা খেতে।

রোজ সকালে উঠে ন্যাশনাল লাইব্রেরি যাব। ডায়মন্ড হার্বরে যাব পিকনিক ক’রতে। মাঝেমধ্যে চিড়িয়াখানাতেও যেতে হবে, বুঝলেন! কেমন হবে বলুন তো?

আর থিয়েটার? গানের ফংশন? সিনেমা”? কৌতূক চিক্‌চিক্‌ ক’রল বাসন্তীর দুই চোখের তারায়।

সব হবে। সব হবে। আমি অপেক্ষা ক’রে থাকব আপনার জন্য।

বাসন্তীর সুমুখে তখন শুধুই ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অজয়ের হাত ধরে নতুন পথে হাঁটার স্বপ্ন।

তাছাড়া সারাজীবন পুলিশের মার খেয়ে আর পালাতে পালাতে হাজারটা চোটের ব্যথা আর রোগজ্বালা বাসা বেঁধেছে শরীরে। তোদের ভারবোঝা হয়ে যাবো আমি। বিপদে পড়বি তোরা। আমি জানি তোরা চলে যাবার পর সব সন্দেহ এসে পড়বে আমার ওপর। আমাকে অনেক রগড়াবে ওরা। চাই কি জানেও মেরে দিতে পারে। তবুও তসল্লি (সান্ত্বনা) একটাই, সারাজীবন গুনাহর রাস্তায় হাঁটলেও শেষ বেলায় একটা নেক (সঠিক) কাজ করলাম। পরওয়ার্দিগার বোধহয় আমার সব গুনাহ (পাপ) মাফ করে দেবেন এর জন্য। যা বেটা, বদর বদর।” হেসে আমার কাঁধে একটা চাপড় মেরেছিল চাচা।

পালাবার জন্য পরদিন বিকেলবেলাটাকেই বেছে নিয়েছিলাম আমরা। গিণতির জন্য সেলে ঢোকাবার আধঘণ্টা আগে বেরিয়ে যেতে হবে। রীতিমতো পাঁজি জোগাড় করে দেখে নেওয়া হয়েছিল সময়টা। তখন গঙ্গায় জোয়ার থাকে না। তাছাড়া ওপারে পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধে নেমে পড়বে প্রায়। অন্ধকার আমাদের সাহায্য করবে। দলে কল্লোলদা, প্রদ্যোতদা, কালাচাঁদদা, আমি ছাড়া আরও চারজন। সবার প্রথমে কুয়োয় নেমেছিলাম আমি। তারপর দুমিনিটের গ্যাপে গ্যাপে বাকি সাতজন। আদিগঙ্গার পাঁক-কালো জল কখনও কোমর, কখনও বুক সমান। ঠেলে ঠেলে পেরিয়ে যেতে সময় লেগেছিলো আরও মিনিট দশেক। কাদায় মাখামাখি হয়ে হাঁচোড়পাঁচোড় করে পাড়ে উঠেই ঢুকে পড়েছিলাম ঘিঞ্জি বস্তি আর পুরোন বাড়িগুলোর সরু সরু গলির মধ্যে। এঁকেবেকে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম গলিগুলো। ঠিক সেই সময় হঠাৎই মনে হলো এই বোধহয় শেষবারের মতো ছেড়ে যাচ্ছি শহরটাকে। মার সঙ্গে আর দেখা হবে না কোনদিন! ভাবামাত্র দাঁড়িয়ে পড়লাম শকলাগা মানুষের মতো। যে করে হোক মার সঙ্গে শেষবারের মতো, অন্তত একবার দেখা করে যেতে হবেই। মুহূর্তে ঘুরে গিয়ে হাঁটা লাগালাম উল্টোদিকে। দশ পনেরো পা এগিয়েছি এই সময় পেছন থেকে একটা হাত, খামচে ধরলো কাঁধটা। প্রদ্যোতদা। আমি নেই দেখে ও অনেকটা এগিয়ে গিয়েও ফিরে এসছে ফের। “ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস গাধা! জলদি পা চালা। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে এলাকাটা ছেড়ে।” গঙ্গার ওপার থেকে ততক্ষণে ‘পিই ই’ আওয়াজে বাজতে শুরু করেছে পাগলী সাইরেন। গলির মোড়ে, বস্তিবাড়িগুলোর পায়রার খোপের মত জানলায়, জলের কলের লাইনে মানুষজনের ভয় আর উদ্বেগ মাখানো মুখ। ফিসফাস কথার টুকরো। “নকশাল! … জেল ভেঙে পালিয়েছে!” দ্বিধা আর পিছুটানটা কেটে গেল এক মুহূর্তে। প্রদ্যোতদার হাত ধরে টেনে দৌড় দৌড় এ রাস্তা ও রাস্তা বহু রাস্তা ঘুরে সেই দৌড় একদিন এসে থামলো পালামৌর জঙ্গলে। পেছনে ফেলে এলাম অনেক কিছু। আমার শহর, খালধারের ধচাপচা বস্তি, পার্কের পাশে তিনতলা ইস্কুলবাড়ি, ফুটবল ম্যাচ, জিততাল গুলি খেলা আর ঘুরির প্যাঁচ, রাস্তার লড়াই, শ্রী, উত্তরা, রুপবাণীর লাইনে মারামারি, নিজের থেকেও প্রিয় সব বন্ধুবান্ধব কমরেডস, মায়ের শাড়িতে ধোঁয়া আর ডালের গন্ধ সেই ছোটবেলা থেকে ভালোলাগা প্রায় সবটুকু।

এখানে এসেও সে যে কি ভয়ঙ্কর কষ্ট। জঙ্গল, জোঁক, মশার কামড়, না খেয়ে পাগলের মত হেঁটে যাওয়া দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। ক্ষিদে তেষ্টা আর হাঁটার ধকল সহ্য না করতে পেরে মাঝেমাঝেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছি দলের প্রায় প্রত্যেকে। ফের উঠে পথ হাঁটছি। ক্ষিদের জ্বালায় বুনো ফল, শাকপাতা, গেছো শামুক, জংলি ইদুর, শেকড়কন্দ, ব্যাঙের ছাতা কিছু বাদ দিচ্ছি না। খাবার দাবার চিনি না। কোনটা বিষাক্ত আর কোনটা নয়। ফলে থেকে থেকে মারাত্মক পেটের রোগে ভুগছি। আমাদের মধ্যে প্রথম মারা গেল জাইরুল। কমরেড জাইরুল ইসলাম। মুর্শিদাবাদে বিশাল অবস্থাপন্ন জোতদার বাড়ির ছেলে। আমারই বয়সী। ক্ষিদের ঠেলায় ব্যাঙের ছাতা ধরনের কি একটা ছিঁড়ে খেয়েছিলো গাছের গোড়া থেকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শুরু ভেদবমি আর জলের মতো পায়খানা। ওষুধপত্তর কিচ্ছু নেই। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা কাটেনি বিশাল ঝাঁকড়া একটা মহুয়া গাছের নীচে গোর দেওয়া হয়েছিল কমরেড জাইরুলকে। জঙ্গলে প্রথম শহীদ।

মাস তিনেক বাদে জঙ্গলে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখলাম আমরা। এর আগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় আদিবাসীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হয়ে যেত আমাদের। দূর থেকে আমাদের দেখতো ওরা। খানিকটা সন্দেহ আর ভয় মেশানো দৃষ্টিতে। আকার ইঙ্গিতে খাবার চাইলে বা কথা বলতে গেলেই একছুটে মিলিয়ে যেত গভীর জঙ্গলে। ডাকাতটাকাত ভাবতো বোধহয় আমাদের। ওদের মধ্যে একজন মংটু। ওর বউ তুতিয়া। জঙ্গলে গেছিলো কাঠ কুড়োতে। কাঠ কুড়িয়ে ফেরার পথে ওকে ধরেছিলো দুই ফরেস্ট গার্ড। চেক করার নামে বিট অফিসে নিয়ে গিয়ে বারবার ধর্ষণ করেছিল দুজন মিলে। তারপর ভীষণ রকম আহত আর অচৈতন্য দেহটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেছিল জঙ্গলের রাস্তায়। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটতো জঙ্গলে। যথেচ্ছ আদিবাসী মেয়ে ভোগ করার খোলা ছুট দিয়ে ওদের পাঠানো হতো এখানে। তার ওপর কন্ট্রাক্টরদের কাছে কাঠচুরির মোটা হিস্যা। এইসব এলাকায় ডিউটি পাওয়াটা যে কোন ফরেস্ট গার্ডের কাছে অনেকটা ‘প্রাইজ পোস্টিং’এর মতো।

রাস্তার ওপর স্ত্রীর অচৈতন্য দেহটার সামনে বসে ডুকরে কাঁদছিল মংটু। চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ানো আদিবাসীরা। ঠিক এরকম একটা সময়ে আমাদের দলটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ওদের। একফোঁটা আদিবাসী ভাষা জানা না থাকলেও কান্নাকাটির কারণটা বুঝে নিতে অসুবিধে হয়নি একটুও। সেই রাতেই বিট অফিস অ্যাটাক করি আমরা। মদ খেয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিল ওই দুই হারামজাদা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই খাটিয়া সমেত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে তুলে আনা হয় দুজনকে। বাকি কাজটা করে দিয়েছিল মংটুদের হাতের টাঙ্গি। আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল বিট অফিস। সেই শুরু। জঙ্গলের কোনায় কোনায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেছিল খবরটা। মংটু আর তুতিয়া। আমাদের দলে প্রথম আদিবাসী রিক্রুট। উপরি পাওনা গার্ডদের দুটো বন্দুক আর গুলিভর্তি বড় একটা বাক্স। স্কোয়াডের প্রথম অস্ত্র।

ইতিমধ্যেই বিহারের শহরাঞ্চল, অন্ধ্র, বাংলা থেকে জেলভাঙ্গা আর লুকিয়ে থাকা আরও কমরেডস ঢুকতে শুরু করেছেন। দেখতে দেখতে বড়সড় সংগঠন গড়ে উঠলো আমাদের, এই বিশাল পালামৌ ছোটনাগপুর – বস্তার – দণ্ডকারণ্য অঞ্চল জুড়ে। রাষ্ট্র আর প্রশাসনের বেশ কিছুদিন সময় লাগলো আমাদের মতিগতি বুঝে উঠতে। যখন বুঝতে পারলো তখন দেরী হয়ে গ্যাছে অনেকটাই। তবে দেরী হয়ে গেলেও হাত গুটিয়ে বসে রইলো না ওরাও। সমস্ত নখদাঁত বের করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের বিরুদ্ধে। পুলিশ – সি আর পি এফ – প্যারামিলিটারি ফোর্স আমাদের দাপটে এইসব অঞ্চলে জমি হারাতে থাকা জোতদার – জমিদার – বানিয়া, উঁচুজাতের বড়লোকেরা সব এককাট্টা হয়ে গ্যালো নকশালদের বিরুদ্ধে। আর এদিকে দুনিয়ার যতো গরীবগুর্বো দলিত আদিবাসী জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়লো আমাদের পক্ষে। সেই লড়াইয়ের আঁচ শুধু জঙ্গলেই আটকে রইলো না। বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো আরা – ভোজপুর – গয়া – আওরঙ্গবাদ – জেহানাবাদ – নালন্দা – বৈশালির মতো সমতল জেলাগুলোতেও। আমাদের স্কোয়াডগুলোকে ‘লাল দস্তা’, ‘লাল সেনা’ নামে ডাকতে শুরু করলো স্থানীয় মানুষজন। উল্টোদিকে তৈরি হল রনবীর সেনা, গৈরিক সেনা, ব্রহ্মর্ষি সেনা, লোরিক সেনা, সানলাইট সেনা উঁচুজাত আর বড়লোকদের প্রাইভেট আর্মি। পেছনে সরাসরি মদত পুলিশ আর প্রশাসনেরশয়ে শয়ে গরীব – দলিত – আদিবাসীদের খুন করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলো ওরা। পাল্টা মারের রাস্তায় নেমে পড়লাম আমরাও। জোতদার – জমিদার – বালিয়াদের হাভেলী অ্যাটাক, অ্যাকশন, গণ আদালত, মৃত্যুদণ্ড চলতে থাকলো সমানতালে। পুরোপুরি যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুযুধান দুপক্ষ। এরকম একটা ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের দিনে শহীদ হলো প্রদোতদা। চান্দোয়ায় এক সুদখোর বানিয়ার বাড়িতে অ্যাকশন সেরে ফিরে আসছি, একটা মকাইক্ষেতের মধ্যে আমাদের ঘিরে ফেললো রণবীর সেনার লোকজন। সংখ্যায় আমাদের প্রায় তিনগুন। দুপক্ষের মধ্যে টানা গুলির লড়াই। উল্টোদিক থেকে ছোঁড়া একটা গুলি সরাসরি এসে লাগে প্রদ্যোতদার বুকে। মকাইক্ষেতের মধ্যে দিয়ে গুলি চালাতে চালাতে নিরাপদ জায়গায় টেনে এনেছিলাম শরীরটাকে। তখনও বেঁচে ছিল প্রদ্যোতদা। মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসছিল চলকে চলকে। পাগলের মত চীৎকার করছিলাম, কাঁদছিলাম হাউহাউ করে – “তোমার কিচ্ছু হবে না দাদা শহর থেকে ডাক্তার তুলে নিয়ে আসবো। একদম চিন্তা কোরো না।” ঘোলাটে চোখের চাউনি চিকচিক করে উঠেছিল এক সেকেন্ডের জন্য। ফিকে একটা হাসি – “আমার লড়াই শেষ কমরেড। তুই কিন্তু লড়াইটা ছাড়িস না। নিশানা যেন ঠিক থাকে …”। থিরথির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট। তারপর আমার কোলে মাথা রেখে স্থির হয়ে যাওয়া বরাবরের জন্য।

কোয়েল নদীর ধারে কমরেডদের লাল সেলাম আর চিতার দাউ দাউ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল প্রদ্যোতদা আর সঙ্গে লম্বা একটা পথচলার ইতিহাস। শুনলে হয়তো অবাক হবেন জেল পালিয়ে আমরা যে আটজন প্রথম এখানে এসেছিলাম তার মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া কেউই আজ আর বেঁচে নেই। কল্লোলদা চলে গিয়েছিলো জাঙ্গল ম্যালেরিয়ায়। দুদিনেরও কম সময়ে ব্রেনে পৌঁছে গিয়েছিলো রোগটা। পুলিশের কুমিংয়ের মধ্যে রয়েছি তখন। ডাক্তার ডাকা যায়নি। কালাচাঁদদা মরেছিলো সাপের কামড়ে। বাকিরা কালাজ্বর, পেটের অসুখ আর পুলিশ এনকাউন্টারে। আমার ডেস্টিনি হয়তো আজও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে পালমৌর জঙ্গলে, আপনাকে এই লম্বা পথ হাঁটার গল্পটা শোনানোর জন্য। “দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো অবিনাশ। চোখ তুলে তাকিয়ে রইলো, ‘ট্রি ই ই’ শব্দে নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে উড়ে গেল কোন রাতচরা পাখি। সেই উড়ে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মানুষটা। তারপর আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে তাকালো অভিরূপের দিকে। লাতিন আমেরিকার বিদ্রোহী কবিগায়ক ভিক্তর হারার ‘উনা উন ভেজ রেভেল্যুশনারিও’ (ওয়ান্স আ রেবেল) গানটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল অভিরূপের। একটা লোক। সেই ছোটবেলা থেকে লড়তে লড়তে ক্লান্ত। একটা জীবন ভীষণ অন্যরকমভাবে বাঁচা আর পেরিয়ে আসা বিপদসংকুল একটা রাস্তা অ্যাতোটা সময় ধরে। সাধারন চেনাশোনা চৌহদ্দির একদম বাইরে। কোন প্রশ্ন না করে একদৃষ্টে অবিনাশের দিকে তাকিয়ে রইলো অভিরূপ। কিছুক্ষণ বাদে নিরবতা ভাঙ্গলো উল্টোদিক থেকেই – “প্রদ্যোতদা, কল্লোলদারা তো চলে গ্যালো। ওদের রক্তে মজবুত হওয়া এখানকার মাটিতে ভরসার পা গেড়ে বসলো আমাদের। জঙ্গলের বুকে গরীব মানুষের রাজ কায়েম হলো। এদিকে বাইরে থেকে আরও প্রচুর কমরেড চলে আসতে লাগলেন জঙ্গলে। একটা ফুল ফ্লেজেড গেরিলা আর্মি। কদিন বাদে এলেন কমরেড রামারাজু। অন্ধ্রের মানুষ। পার্টির সর্বোচ্চ স্তরের নেতা। ছোটখাটো চেহারা। মাথায় টাক। মুখে সবসময় লেগে থাকা মিষ্টি হাসি। ভীষণ ভালোমানুষ একটা চেহারা। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। দুর্দান্ত বেহালা বাজাতেন মানুষটা, আমার গানবাজনার ঝোঁক দেখে অবসর সময়ে বেহালাটা নিয়ে বসিয়ে দিতেন আমাকে। হাতে ধরে শেখাতেন। আমিও উৎসাহ পেয়ে গেলাম খুব। জাঙ্গল মার্চ, অ্যাকশন প্ল্যান, পার্টি ক্লাস ঠাসা কর্মসূচী সারাদিন। তার মাখখানে সামান্য ফাঁক পেলেই বেহালাটা নিয়ে বসে পড়তাম। প্রদ্যোতদাদের ধরিয়ে দেওয়া বই পড়ার নেশাটাও ফের পেয়ে বসলো কমরেড রামারাজুর হাত ধরে। এবার ইংরিজী বই। দেশ বিদেশের। মনে আছে, প্রথম যেদিন এডগার স্নোর লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ বইটা আমার হাতে তুলে দিলেন উনি, আমি তো আঁতকে উঠেছিলাম “ইংরিজী”। হেসেছিলেন রামারাজু। ঠিক কল্লোলদার মতো করে। প্রায় হুবহু একই কথা। “পড়ো, প্রথমবারে বুঝতে না পারলে অথবা ভালো না লাগলেও। দেখবে বইয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে একদিন ঠিক ভালো লেগে যাবে। অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছিল কমরেড দাদার কথা। তারপর তো কত বইই না পড়লাম অ্যাতোগুলো বছরে। রেজি দেব্রের ‘রেভল্যুশন উইদিন রেভল্যুশন’, লুই মারিঘেল্লার ‘গেরিলা ওয়ারফেয়ার, চার্লি চ্যাপলিনের ‘হিয়ার আই এ্যাম’, মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ । এদিকে দেশের পরিস্থিতিও পাল্টাচ্ছিলো দ্রুত।

চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-15/

কী মুশকিল! বোতল তো কত কিছুর হতে পারে। বোতলে তেল, জল, সুগন্ধী, নেলপলিশ, ওষুধ, মায় অ্যাসিড, কেরোসিন, বিষ পর্যন্ত থাকতে পারে। সুতরাং নামটা শুনে অত উৎফুল্ল হওয়ার কারণ নেই। তবে বোতলের মহিমায় ব্যুৎপত্তি খোলার উদাহরণ পেয়েছি

প্রসঙ্গত ছেলেখেলা বলতে নেহাৎ সহজ হেলেফেলার কাজ বুঝি, কিন্তু ছেলেমানুষ যে খুব সহজ অন্তত হেলাফেলা করার মতো প্রাণী নয়, তা বড়রা বিলক্ষণ জানেন। এই প্রথাগত ‘ছেলে’ শব্দটির মধ্যে বলা বাহুল্য বাচ্চা ‘মেয়ে’ সম্প্রদায়ও অন্তর্ভুক্ত। আর মেয়েরা দুষ্টুমিতে বিশেষ করে অন্যের অনিষ্ট করার প্রতিযোগিতায় খানিক পিছিয়ে থাকলেও পাকামিতে পশ্চাদ্‌পদ একথা তাদের চরম নিন্দুকেও বলবে না।

আমরা তৃতীয় বার সিকিম গিয়েছিলাম মোট চারটি পরিবারের এগারোজন সদস্য মিলে। আমরা তিনজন ছাড়াও আমার মা বাবা, আর আমার বরের অফিসের এক সহকর্মী দম্পতি ও তাদের কন্যা এবং কন্যার মাসিমেসোমাসতুতো ভাই। গ্যাংটক থেকে য়ুমথাং দেখার জন্য লাচুংয়ে রাত্রিবাসের সময় দেখি ওর অফিসের সেনগুপ্তদা একটা পুঁচকি বোতল বার করেছেন। তাই নিয়ে সেনগুপ্তদি বেজায় চটে রাগারাগি করছেন। দাদার শরীরে নানা আধিব্যধি, তার মধ্যে এই উপদ্রব কেন? দিদিকে বোঝানোই যাচ্ছে না ৩৬০ মিলিলিটার নয়দশ ভাগ হলে পরে তা শীত, মেজাজ, যকৃত কাউকেই কব্জা করতে পারবে না।

আমার সদ্য ক্লাস ওয়ানে অ্যাডমিশন নেওয়া পাঁচ পূর্ণ করা কন্যা তার বাবাকে শাসনের ভঙ্গিতে বলল, “বাবা, তুমি কিন্তু খাবে না

আমার বেশ মজা লাগল। ওকে প্রশ্ন করলাম, “কেন রে? বাবাকে খেতে মানা করছিস কেন? ওটা কী?” মাকে নিয়ে তার ভাবনা নেই, জানে নরম পানীয়ের ভক্ত। বাবাকেও কড়া পানীয় পান করতে দেখেনি, তবু অনুমান করেছে পরিস্থিতির দাবিতে সাড়া দিলে বাবাই দিতে পারে।

কমন নেমটা জানি না। প্রপার নেমটা দেখেছি – রয়াল চ্যালেঞ্জ

কৃতিত্বটা কাকে দেব, আইসিএসসি বোর্ডের পাঠ্যসূচি না একটি পাঁচ বছরের বালিকার অন্তর্দৃষ্টি? তবে মদের বোতলও যে ব্যাকরণ শিক্ষায় কাজে লাগতে পারে তা ঐ শিশুর কাছে শিখলাম

একটু পিছিয়ে যাই। এই অবতার আমার সন্তান নন। সম্পর্কে তার মামা। অনেকদিন আগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন আমার ছোটমাসির কোল আলো করে। পাক্কা দশ পাউন্ডের পুত্ররত্ন জন্মগ্রহণ করার সময়েই গর্ভধারিণীকে চিরে বেশ কাবু করে দিয়েছিলেন।

আমার দাদামশাই এক সময় যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। ‘লবাব’এর রোল ছিল বাঁধা। বম্বেতে কোনও এক প্রযোযনা সংস্থায় নায়কের চাকরিও পেয়েছিলেন। কিন্তু সুন্দরী ও সম্ভাব্য সুরাসক্তির আশঙ্কায় তাঁর বিধবা অগ্রজা মানে আমার মায়েদের পিসিমা রুপোলি দুনিয়ায় যেতে দেননি। দাদুর আমার জ্বালাময়ী ঝাল, ডালপুরি, চুনো মাছের টক কিংবা বিড়ি ছাড়া আর কোনও কিছুতে বিশেষ আসক্তির কথা শুনিনি। কিন্তু কপাল করে নিজে দেখেশুনে যে চার সুবোধ জামাতা চয়ন করেছিলেন, তাঁরা সকলেই ঢুকুঢুকুতে ওস্তাদতার মধ্যে পারদর্শী ছিলেন আমার বড়ো মেসো আর ছোট মেসো। মাঝের দুজনের আসক্তি কম না হলেও শক্তি একটু কম পড়ত। অর্থাৎ অল্পেই নেশা হয়ে কুপোকাৎ হয়ে যেতেন।

তা এ হেন ছোটমেসোর একমাত্র পুত্র শ্রীমান চিন্টু কুমার আমাদের নাবালকনাবালিকা ভাইবোনেদের কাছে পালা করে আদর খাচ্ছে। কিন্তু রোজকার বরাদ্দ চটকাইমটকাই কিংবা হুটোপাটিতে তার বিশেষ মনোযোগ নেই। পাশের ঘরে বাবা মেসোদের আসর বসেছে বলে দরজা ভেজানো। আর চিন্টু বারবার সেই দরজা ঠেলে ও ঘরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। যারা বোতলের মাহাত্ম না মানতেও দৌরাত্ম জানি, তারা চিন্টু ট্র্যাক হড়কে নিষিদ্ধ এলাকায় গোঁত্তা খাওয়ার উপক্রম করলেই তটস্থ হয়ে পড়ছি। মামাসিদের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের গজগজানি সেদিন বিয়েবাড়ির গুঞ্জনে গুম। যে যার ট্যাঁভ্যাঁদের তুলনায় সাডল্য ভাইবোনেদের জিম্মা করে মেতেছে আড্ডার নেশায়।

চিন্টু আমার ট্যাঁক থেকে নেমে টলোমলো হেঁটে এবার দরজা ঠেলে এক্কেবারে মাঝখানে। “বাবা এটা কী?”

এটা কিছু না। তুই ভেতরে যা

বাবা এটা কী?”

এটা কোকোকোলা”

বাবা চিন্টু কোকোকোলা খাবে।”

মেসো গ্লাস থেকে এক চামচ হলদেটে তরল তুলে ছেলের মুখে দিয়েছেন। “এবার যা

বাবা চিন্টু আর একটু কোকোকোলা খাবে

আর এক চামচ নিয়ে আবার ছেলেকে শান্ত করলেন ছোট মেসো। “এবার ভেতরে যাও তোবাচ্চাদের আর খেতে নেই

বাবা চিন্টু আর একটু কোকোকোলা খাবে

ভ্যাপ্‌! ডেঁপো ছেলে কোথাকার! বললাম না বাচ্চাদের বেশি কোকোকোলা খেতে নেই

ঠোঁট ফুলিয়ে চিন্টুবাবু ভেতরের ঘরে ঢুকে দাদাদের বলল, “অ্যাই, মড খাবি তো ও ঘরে যা।”

এবার চিন্টুর এক দিদির পালা। ছোট্টবেলা থেকেই আমার বোন বেশ স্বাবলম্বী দিদির মতো ভাত মেখে গেলাতে হোত না, নিজের কচি দুটি হাতের সদব্যবহার করে টেবিলে চড়ে বসে খাদ্যাখাদ্য ভেদ না করে গপাগপ মুখে চালান দিত তার খাদ্য তালিকায় রাস্তার মোরাম, কীটপতঙ্গ বিশেষত পিঁপড়ে এমন কি বৈদ্যুতিক প্লাগের পিন সবই শামিল ছিল নেহাত কুকুর শিকার করা সম্ভব ছিল না, নাহলে বাঙালি বাড়িতে একজন নাগাকে পাওয়া যেত

তবে তার খাদ্যরুচি যে খুব বিচিত্র ছিল তা নয় একটু অ্যাডভেঞ্চার ও পরীক্ষানীরিক্ষা প্রিয় ছিল আর কী নিজে পোকা শিকার করত, আবার নিজেও ছিল ফলের পোকা সবচেয়ে প্রিয় ফল আপেল সেটা কতটা স্বাদের জন্য কতটা বর্ণের জন্য বলতে পারব না কারণ গোটা আপেল খেতে গিয়ে গলায় খোসা লেগে বিষম খেতো বলে মা আপেলের খোসা ছাড়িয়ে দিলে বেজায় চটে যেত তার লাল আপেলই চাই

গাত্রবর্ণও ছিল প্রিয় ফল আপেলের মতো, তবে খোসা ছাড়ানো আর অমন খাদুরে বাচ্চার চেহারাটাও যে নাদুস নুদুস আদুরে ধরণের ছিল অনুমান করাই যায় কিন্ডারগারর্টেন স্কুলে পড়ার সময় অ্যানুয়াল ফাংশনে সেজেছিল স্নো হোয়াইট তাই নিয়ে চার বছরের খুকির কিছুদিন রূপসী বলে কি গর্ব!

নাটকে সৎ মায়ের দেওয়া বিষ মাখানো আপেল মুখে দিয়ে তার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার কথা তা স্নোহোয়াইট আপেলে বাইট দিল ঠিকই, কিন্তু তাতে যে বিষ মাখানো ছিল তা বোধহয় ভুলে গিয়েছিল কিংবা মনে করতে একটুও ইচ্ছা করছিল না আড়াল থেকে সিস্টার রেমিজ়ার গলা দর্শকাসনে বসেও শোনা যাচ্ছিল, “সুদেষ্ণা ড্রপ দ্য অ্যাপেল” একবার নয় তিনচার বার শেষে যখন নেপথ্য থেকে প্রতিশ্রুতি এল, “আই উইল গিভ উই অ্যানাদার অ্যাপেল, প্লীজ় থ্রো দিস”, তখন খুব অনিচ্ছেয় স্নোহোয়াইট বিষে আচ্ছন্ন হয়ে ভূমিশয্যা নিল

অনুষ্ঠানের শেষে সুদেষ্ণা তার নিজস্ব উপার্জন খাবারের প্যাকেট পেয়ে ডালডায় ভাজা বালি কিচকিচ নিমকি, কিটকিটে দানাদার, বাপুজি কেক কোনওটাই বাদ দিল না। বাড়িতে এসে জল ও গ্রাইপ ওয়াটার ছাড়া আর কিছু অফিশিয়ালি দেওয়া হয়নি।

কিন্তু পরের দিন সকালে ঘুম বলে ঘুম, ওঠানোই যায় না। টেনেটুনে উঠিয়ে দিলে টলে পড়ে যায়। বাইরের খাবার থেকে কিছু গোলমাল হল? বাড়িতে কান্নাকাটি অবস্থা। ডাক্তার এসে অবস্থা দেখে বললেন হাসপাতালে ভর্তি করতে। আমি কোনও ফাঁকে চুরি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কাফ সিরাপের বোতল শেষ।

শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে দৌড়তে হয়নি। তবে তার পর থেকে আমাদের অসুখ করলেই বাড়ির আগে সমস্ত বোতলের স্টক মিলিয়ে নেওয়া হত।

কাল রাত্তিরে আবার হয়েছে। বাপি আর মাম্‌মামের ঝগড়া।

ঝগড়ার সময় বাপি মাম্‌মাম দুজনেই বেশির ভাগ টানা ইংলিশ বলে। প্রথম-প্রথম যখন ওদের ঝগড়া শুনতাম, সবটুকু বুঝতে পারতাম না। বেঙ্গলিতে যতটুকু বলত তা থেকে আন্দাজ পাওয়া যেত একটুখানি। বাপি বেশি-বেশি ড্রিংক করে বলে মাম্‌মামের রাগ। সেই দিয়ে শুরু হত।

তখন আমি সবে বাড়ির মিস্‌-এর কাছে ওয়ার্ডবুক শুরু করেছি। পরের বছর আমাকে সেন্ট নিকোলাসে দেবে, বলে রেখেছিল বাপি। সেন্ট নিকোলাস খুব বড় স্কুল। বেঙ্গলি বললেই পানিশমেন্ট। ওখানকার অ্যাডমিশন টেস্ট নাকি খুব টাফ, তাই মিস আমাকে রোজ ওয়ার্ডবুক ক্র্যাম করাত। না পারলেই হাতের তালুতে স্কেল দিয়ে চড়াৎ! আর আমি ভেউ ভেউ করে কাঁদতাম। সেই নিয়েও রাতে ফের ঝগড়া হত ওদের। মাম্‌মাম মিস্‌কে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলত। আর বাপি বোধহয় মাম্‌মামকে ব্লেম করত, বলত— মাম্‌মাম আমার পড়া দেখে না বলেই তো বাইরের লোক রাখতে হয়েছে!

আমি বিছানার এক কোণে মটকা মেরে ঘুমের অ্যাকটিং করতাম আর সব শুনতাম। ভাবতাম, কার দিকটা সাপোর্ট করি! মিস্‌ যে আমাকে পেটায় মাম্‌মাম সেটার অ্যান্টি করছে, তাই মাম্‌মামকেই ভালো মনে হত। আবার বাপি যখন বলছে মাম্‌মামই এর জন্যে রেসপনসিবল— তখন সেটাও যে একদম ভুল, তা বলতে পারতাম না। পার্কে যাদের সঙ্গে খেলতাম— রোহিত, পূজা, টিকলু— ওরা সবাই কী সুন্দর নিজেদের মা’র কাছেই পড়ে। কিন্তু আমার মাম্‌মামই কেবল দেখতাম সন্ধে হলেই আমাকে আয়ার কাছে রেখে উজ্জ্বলা-আন্টি সোহিনি-আন্টিদের সঙ্গে শপিংএ কিংবা তিমির আঙ্কলের সঙ্গে মুভি দেখতে বেরিয়ে পড়ছে। বাপির কমপ্লেনের উত্তরে মাম্‌মাম ‘আমারও নিজস্ব লাইফ দরকার’ বলে ঝাঁঝিয়ে উঠত। তখন বাপিও কড়া গলায় কী সব বলত, তার মধ্যে ‘ড্রিংক’ ‘ড্রিংক’ কথাটা ঘুরে ফিরে আসত, ‘লাইফ’ও। বোধ হয় বাপি বলতে চাইত, ড্রিংক করাটাও বাপির নিজস্ব লাইফের ব্যাপার।

আমার বাপি আর মাম্‌মাম, দুজনেই নিজেদের লাইফ নিয়ে খুব কনশাস। ‘নিজেদের লাইফ’।

# #

ও, ইয়েস। যেটা বলতে যাচ্ছিলাম তখন। কথাটা ওই ‘ড্রিংক’ নিয়েই। একদম ছোট্টবেলায়, বুঝতে পারতাম না ড্রিংক নিয়ে কীসের এত অবজেকশন। মিসের কাছে শিখেছি তখন, ড্রিংক মানে পান করা। মাম্‌মাম নিজেই তো আমাকে চোখ পাকিয়ে বলে, ‘জয়, ড্রিংক সাম মোর মিল্ক, নো আরগুমেন্ট!’ বাপি কী এমন জিনিস বেশি পান করে, যাতে মাম্‌মাম রেগে যায়? বলে, ‘আই কান্ট স্ট্যান্ড’?

এখন আমি জানি। সেন্ট নিকোলাসে ভর্তি হওয়ার পর এই পাঁচ বছরে আমি অনেক কিছু জেনে গেছি। যদিও আমার বন্ধুরা বলে, ‘জয় ইউ আর স্টিল আ চাইল্ড!’ ওদের অনেকেই আমার চেয়ে অনেক বেশি জানে, ওরা আমাকে সব শিখিয়ে দেয়। আমার পাশে বসে কৃপাল সিং, মাথায় কাপড়-জড়ানো ঝুঁটি— সে সেই ক-বে আমাকে বলেছিল, তার বাবা রাম খায়। শুনে তো বুঝতেই পারিনি। রাম তো সীতার হাজব্যান্ড ছিল, তাকে কী করে খাবে? হ্যাঁ, কে একটা রাক্ষুসি একবার হাঁ করে রামকে খেতে এসেছিল, কিন্তু পারেনি তো। সেই শুনে কৃপাল সিং-এর কী হাসি!

এখন আমাদের ক্লাসের সবাই জানি, কার বাবা কী খায়। কৃপালের বাবা, রনিতের বাবা, স্যামুয়েলের বাবা…

কিন্তু আমি যখন আমার বাপিকে জিগ্যেস করেছিলাম ‘তুমি রাম খাও বাবা, না স্কচ’— বাপি বলেছিল, ‘দ্যাট্‌স নান অব ইয়োর বিজনেস!’ তাই আজকাল আমি স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে শেখা জিনিস বাড়িতে এসে বলি না আর।

সব জিনিস বলার মতো নয়ও।

আমাদের স্কুলবাসের লাস্ট সিটে বসে ক্লাস এইটের মনীশ ভাই। ওর চেহারাটাও বড়, হালকা গোঁফের মতো আছে— আমাদের ফাইভ-সিক্সের চার-পাঁচজনকে ওর কাছে বসিয়ে ফিসফিস করে যা সব বলে না! একদিন বলল, ‘তোরা যারা এখনও বাবা-মা’র সঙ্গে একসঙ্গে ঘুমোস, দু’একদিন ঘুমের ভান করে অনেক রাত অবধি জেগে থেকে দেখিস তো, তোদের বাবা-মা কী কী করে অন্ধকারের মধ্যে! দেখে এসে আমাকে বলবি…’

পরের দিনই স্যাম পিছনের সিটে বসে খুব এক্সাইটেড গলায় বলল, তার ড্যাডি আর মাম্মি…

রনিত দু’দিন পর জানাল, ঘর অন্ধকার ছিল বলে সে ভাল করে দেখতে পায়নি কিছু, কিন্তু ইট সিমড দ্যাট…

মনীশ ভাই মুখ টিপে হাসল, আর আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে, জয়? তোর বাবা-মা কিছু করে না? দেখতে পাসনি কিছু?’

আমি একটু চুপ করে থেকে, বলেছিলাম, ‘নাহ্‌। আমি তো আলাদা ঘরে শুই।’

# #

মোটেই আমি আলাদা ঘরে শুই না। মিথ্যে বলেছিলাম মনীশ ভাইকে। ইন ফ্যাক্ট, বাপি অনেকবার বলেছে আমাকে আমার নিজের ঘরে আলাদা শোয়ানোর কথা, মামমাম বলেছে আরেকটু বড় হোক, হি ফীলস স্কেয়ার্ড!

মনীশ ভাইয়ের কথামতো ঘুমের ভান করে সেই প্রথম আমি অনেক রাত অবধি জেগেছিলাম, আর দেখেছিলাম-শুনেছিলাম অনেক কিছু। কিন্তু সেগুলো ওদের সামনে বলা যায় না।

ইন ফ্যাক্ট, যে-ইনসিডেন্ট আমি দেখেছি— ইট চেঞ্জড দ্য কোর্স অব মাই লাইফ!

তখন মাঝরাত। আবছা অন্ধকারের মধ্যে ঝটাপটি হচ্ছিল। বাপি দেখলাম, কে জানে হয়তো রাগের বশেই— আই ডিডন’ট নো ক্লিয়ারলি হোয়াই— মাম্‌মামকে আনড্রেস করার চেষ্টা করছে! আর মাম্‌মাম কিছুতেই অ্যালাও করবে না! জোর একটা ঝটকা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়ে মাম্‌মাম উঠে বসেছিল। হাঁফাতে হাঁফাতে চাপা গলায় বলেছিল, ‘ডোন্ট বিহেভ লাইক আ ব্লাডি রেপিস্ট! বলেছি তো আমার আর্জ নেই আজ!’

আমি কাঠ হয়ে ছিলাম, আধবোজা চোখ। রাস্তার ভেপার ল্যাম্পের আলো একটুখানি এসে পড়েছিল জানলার ফাঁক দিয়ে, তাতে বাপির মুখটা কীরকম ফেরোশাস মনে হচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল বাপি, ‘আই জাস্ট ওয়ান্টেড টু চেক্‌ দ্যাট! আজ সন্ধেবেলা… য়ু সিম্পলি গট স্পেন্ট-আপ উইথ দ্যাট বাস্টার্ড তিমির বোস, ইজনট ইট? আর তো আর্জ থাকার কথাও নয়!’

ফটাস করে চড়টা এত জোর মেরেছিল মাম্‌মাম— এত আচমকা, আমি ঘুমের ভান করতে করতেই কেঁপে উঠেছিলাম। তারপর যখন বাপি মাম্‌মামের দুটো হাত পিছন দিকে মুচড়ে দিচ্ছিল আর মাম্‌মাম কঁকাচ্ছিল খুব— আর থাকতে পারিনি। হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠে বসেছিলাম বিছানায়।

তার পরের দিনই মাম্‌মাম দুটো বড় সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে আমার হাত ধরে ট্যাক্সি চেপে দিদার ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিল। আমি তখন থেকেই দিদার বাড়ির স্টপ থেকে স্কুলবাসে উঠি।

বাপি দিদার বাড়িতে এসেছিল এক সপ্তাহ পরে। দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কথা বলেছিল দুজনে। না, মারামারি ঝগড়াঝাটির আওয়াজ পাইনি সেদিন আর। শুধু বাপি চলে যাওয়ার সময় আমাকে একটা মস্ত চকোবার দিয়ে নিচু গলায় বলেছিল, ‘আমার সঙ্গে থাকবে, জয়-সোনা, কেমন? গুড বয়!’ কী মিষ্টি করে বলল, একটুও রাগি ভাব নেই!

আর রাতে মাম্‌মাম দিদাকে বলেছিল, ‘কী করে ও কাস্টডি পায় আমিও দেখে নেব। ওর ইনকাম বেশি, তাই? হুঁহ্‌!’ সেদিন আমাকে একদম জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল মাম্‌মাম।

যে-আমাকে ক্লাসমেটরা ‘চাইল্ড’ বলে লেগপুল করে, সেই আমি সেইদিন বুঝলাম— এই রকম করেই তবে চাইল্ডরা অ্যাডাল্ট হয়ে যায়!

# #

কালো কোট-পরা লোক দুটোও, আমাকে ‘চাইল্ড’ বলেই মেনশন করছিল বারবার।

আমি ফিল্মে দেখেছি, ওদের উকিল বলে। লইয়ার। তবে ফিল্মে যে রকম বিরাট হলঘরের মতো কোর্ট দেখায়, একদিকে সারি-সারি লোক বসে, উঁচু বেদির ওপর জজসাহেব, অনেক দূরে-দূরে মুখোমুখি দুটো উইটনেস বক্স— এই কোর্টরুমটা সেরকম নয়। ছোটমতো একটা ঘর, রোগামতো দাঁত-উঁচু একটা লোক একদিকে অল্প-উঁচু ডায়াসের ওপর গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আছে। উকিল দুজনও একদমই ড্রামাটিক তর্কাতর্কি করল না ফিল্মের মতো, যে-যার কথা শেষ হতেই বসে পড়ল।

কিন্তু কথাগুলো ভালো নয় মোটেও। লম্বা টাকলু উকিলটা মাম্‌মামের, সে বাপিকে বলছিল ড্রাঙ্কার্ড, সিজোফ্রেনিক, সাস্‌পিশন ম্যানিয়াক। আর, প্লাম্পি ভুঁড়িওয়ালা লোকটা বাপির লইয়ার। সে মাম্‌মামকে বলল এক্সট্রাভ্যাগান্ট, সেলফ-সেন্টার্ড, ডিবচ্‌…। সব কথা আমি স্পষ্ট বুঝিনি, তবে খারাপ কথা নিশ্চয়ই, মাম্‌মামের উকিল দু’একবার প্রোটেস্ট করল, জজ একবার বললেন ওভাররুল্‌ড, একবার বললেন সাস্টেইন্‌ড।

আর বাকি যা কথা হচ্ছিল, সব আমাকে নিয়ে, আমি বুঝতে পারছিলাম। ‘চাইল্ড’, ‘কাস্টডি’, ‘অ্যালিমনি’… এইসব কথা উঠছিল বার বার। আমার দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল সবাই।

মাম্‌মাম আমার একটা হাত শক্ত করে নিজের মুঠিতে ধরে দিদার পাশে বসে ছিল। বাপি দেখলাম অনেকটা দূরে চুপ করে বসে আছে। আমাকে দেখে হাত নাড়ল। আমিও ভয়ে-ভয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে একটু হাসলাম, মাম্‌মাম যদিও বলে রেখেছিল আমি যেন বাপির সঙ্গে চোখাচোখি না করি— তবু আমার খুব ইচ্ছে করছিল বাপির কাছে একবার ছুটে যাই। বাপি সেই যে আমার পেটে মুখ রেখে ‘ভ্রু-উ-উ-ম’ করে একটা আওয়াজ করত সেটায় দারুণ হাসি পেত আমার— কতদিন করেনি! আর সেই-যে, কভার ড্রাইভ মারার সময় ফ্রন্টফুট-টা ঠিক কোন্‌ পোজিশনে থাকবে সেইটা সবে একটুখানি শেখাচ্ছিল আমায়, আর শেখাই হয়নি তারপর। স্কুলের ম্যাচে ড্রাইভের বল পেলে কিছুতেই মারতে পারি না, আর ঠিক পরের বলটাতেই আউট হয়ে যাই, কেন কে জানে।

বাপিকে দেখে আমার বুকের মধ্যে হালকা হালকা ফোঁপানি এল কয়েক বার।

কিন্তু মাম্‌মাম যে বলে রেখেছে, একটু লুজ্‌ পেলেই নাকি বাপি আমাকে নিয়ে চলে যাবে! সত্যি নাকি? নিয়ে চলে যাবে মানে, মাম্‌মামের কাছ থেকে— পারমানেন্টলি?

ওরে বাবা, না না, সে আমি পারব না! মাম্‌মামকে আমার চাই। আমাকে মাছের কাঁটা বেছে দেবে কে? কেডসের ফিতে সমান করে দেবে কে? স্কুল থেকে ফেরার পর ম্যাগি করে দেবে, ঘুমের সময় লালেবাই শোনাবে? বাপি আমাকে কেড়ে নিতে পারে এমন কথা ওঠার পর থেকেই, মাম্‌মাম অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে। খুব কেয়ার নেয় আমার।

‘আই লাভ মাই মাম্‌মাম।’

উইটনেস বক্সে ডেকে জজসাহেব যখন খুব মিষ্টি করে জানতে চাইলেন আমি কাকে বেশি পছন্দ করি, কাকে রিলাই করি বেশি, কার কাছে থাকলে আমার বেশি ভালো লাগবে— আমি মাম্‌মামের দিকে তাকিয়ে ওই সেন্টেন্সটাই প্রথম বলেছিলাম।

তারপর, মাম্‌মামের ঝলমলিয়ে-ওঠা মুখ থেকে আমার চোখটাকে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে বাপির দিকে তাকিয়ে দেখি, কালো হয়ে গেছে বাপির মুখ, মাথাটা নামিয়ে নিয়ে চুপ করে বসে আছে।

‘অ্যান্ড আই ইকুয়ালি লাভ মাই বাপি, টু!’

চমকে উঠে বাপি তাকিয়েছিল আমার দিকে। চোখ মুছেছিল।

আমি, ক্লাস ফাইভের জয়, সোজা জজসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘প্লিজ আস্ক দেম টু লিভ টুগেদার উইথ মি। অ্যান্ড নট টু ফাইট এনি মোর। প্লিজ।’

# #

দু’দিন হল আমরা এই সী-সাইডে বেড়াতে এসেছি। এর আগে একবার এসেছিলাম, মনে আছে, তখন মর্নিংএ পড়ি, টুয়ে বোধহয়। সমুদ্রে নেমে খুব হুড়োহুড়ি, সন্ধেবেলায় সী-বিচের ধারে কত মজা! সেই ট্যুরে ঝগড়া হয়নি একটুও।

এই ট্যুরেও ঝগড়া করতে বারণ করেছেন জজসাহেব। পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘গিভ এফর্টস। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখুন দুজনেই। বেড়িয়ে আসুন একসঙ্গে, ফরগেট দ্য পাস্ট। ফর দ্য সেক অব দ্য কিড…’

কিন্তু দু’দিন যেতে না যেতেই, কাল রাতে আবার ওরা শুরু করে দিয়েছে। সেই এক ইস্যু। বাপি হোটেলের ঘরে ড্রিংক করতে চায়, মাম্‌মামের তাতে স্ট্রং অবজেকশন। মাম্‌মাম নাকি গন্ধটাই স্ট্যান্ড করতে পারে না।

বাপি প্রথমটায় নরম গলায় রিকোয়েস্ট করছিল ; টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা উইদাউট অ্যালকোহল… ফীলিং ডেসপারেটলি থার্স্টি… জয় তো ঘুমিয়ে পড়েছে, এখন জাস্ট দু-তিনটে পেগ…

আমি যে ঘুমোইনি অ্যাট অল— ওরা কেউ ভাবতে পারেনি বোধহয়। দু’চারটে হট এক্সচেঞ্জের পরেই ভায়োলেন্ট হয়ে উঠল দুজনেই।

‘নো! আই হেট শেয়ারিং বেড উইথ আ ড্রাঙ্কার্ড!’ —ডিসকভারি চ্যানেলে কিং কোবরা যেমন হিসহিস করে, একদম সেই রকম ভঙ্গিতে কথাগুলো বলেছিল মাম্‌মাম।

‘ও, ইজ ইট?’ বাপির নরম গলাটাও সেকেন্ডের মধ্যে যেন নেকড়ের গর্জন, ‘অ্যান্ড আই অলসো হেট টু স্লিপ উইথ আ হোর!’

‘হোয়াট?’

‘আজও তুমি ওই সান-অব-আ-বিচ্‌ তিমির বোসকে ফোন করেছিলে না, গয়না কেনার ছুতোয় সী-বিচ থেকে সরে গিয়ে? সব আমার ভিজিলে আছে!’

‘বেশ করেছি! হেল উইথ ইয়োর সাস্‌পিশন অ্যান্ড হেল উইথ ইয়োর ভিজিল! আমার যখন খুশি যাকে খুশি ফোন করব, নেভার ট্রাই টু পোক ইয়োর আগলি নোজ্‌, ওকে? তোমার খবর আমি রাখি না? এবার ট্যুরে গিয়ে সেক্রেটারির সঙ্গে…’

তারপর আরও, আরও। সারারাত। সেই হুবহু আগের মতো সব! পুরো ডাস্টবিন উপুড় করছিল দুজন মিলে।

আর, আমি শুয়েছিলাম চুপচাপ। আমার বোজা চোখের কোণ দিয়ে গরম জল গড়াচ্ছিল।

# #

আমি আজ ওদের লুকিয়ে একা একা সী-বিচ ধরে চলে এসেছি বহুদূর। খুব চুপিসাড়ে আস্তে আস্তে সরে এসেছি, দুজনেরই নজর এড়িয়ে। এইরকম অচেনা জায়গায় হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ। বিচের যেদিকটা একেবারে ফাঁকা— সেইদিকে হাঁটা লাগালেই, ব্যস! সেপারেটেড! এবার কোন্‌দিকে খুঁজবে খোঁজো!

হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে… কত্ত দূর এসে গেলাম! কতক্ষণ হাঁটছি? এক ঘণ্টা, না আরও বেশি? এতক্ষণে ওরা দুজনেই টেনশন করছে খুব, ফর শিওর! খুঁজছে আমাকে পাগলের মতো? ছোটাছুটি করছে? সী-বিচে খুঁজছে, মার্কেটে খুঁজছে, রাস্তায়? কাঁদছে কি? খুব?

মাম্‌মাম তো ডেফিনিটলি কাঁদছে। আর বাপি? বাপি সহজে কাঁদে না, কিন্তু সেই কোর্টরুমে দেখেছিলাম…

আচ্ছা, এখানে থানা আছে নিশ্চয়ই। ওরা কি থানায় যাবে? বোধহয় চলেই গেছে এতক্ষণে! আমি বেশ ইমাজিন করতে পারছি, থানায় বসে মাম্‌মাম কাঁদতে কাঁদতে ফেইন্ট হয়ে যাচ্ছে… আর বাপি মাম্‌মামকে ধরে বসে আছে শক্ত করে। ক্লোজ অ্যান্ড টাইট! নো মোর ফাইট! …সীন’টা ভাবতেই ভালো লাগে খুব।

ইয়াপ্‌, এখন তো আমি বুঝে গেছি কেসটা! যার কাছ থেকেই আমাকে কেড়ে নেওয়ার মতো সিচুয়েশন তৈরি হয়, সে-ই তখনকার মতো বদলে যায়। হি, অর শি, পাইনস ফর মি। বিহেভস লাইক আ রিফর্মড সোল। বাট, সেপারেটলি!

এখন অবিশ্যি, একসঙ্গে! এই প্রথম! হি হি। নাও, বোঝো দুজনেই! ভেবে ভেবে কেমন একটা সলিউশন বের করেছি আমি, দ্যাখো জাস্ট!

কিন্তু, আমি এ কোথায় চলে এলাম কে জানে! একদম ফাঁকা চারদিক। একদিকে ধু-ধু বালি, অন্যদিকে ঢেউ আর ঢেউ! আর আকাশ… ভাস্ট অ্যান্ড সাইলেন্ট! ডেসোলেট অ্যান্ড লোনলি! কেউ কোথাও নেই। কেউ আসে না এদিকে? কেন কে জানে!

আচ্ছা, আচ্ছা, দাঁড়াও! সেদিন স্নান করতে নেমেছিলাম যখন, কয়েকটা লোকের সঙ্গে বাপি গল্প করছিল। তারা বলছিল, এখানকার বিচে অনেক দূরে কোথায় না কি চোরাবালি আছে! কুইক স্যান্ড! সে দিকটায় কেউ যায় না। চোরাবালি মানে, যেখানে পা রাখলেই মানুষ না কি ডুবে যায়…

আমি কি সেই চোরাবালির দিকটাতেই চলে এসেছি না কি? সেই জন্যেই এত ফাঁকা এদিকটা?

চোরাবালি! কেমন হয় সেটা?

আমি জানি না ঠিক। শুনেছি, বাইরে থেকে না কি কিচ্ছু বোঝা যায় না! ওপরে সব ন্যাচারাল, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা… এই রকম? এমন যদি হয় যে, আর কয়েক পা এগোলেই চোরাবালি শুরু? হয়তো এখনই সেই ডেঞ্জারলাইনের ওপরেই আমার পা’টা রাখা আছে!

বিরাট বিচের মধ্যে আমি একা। বিশাল সমুদ্রের সামনে, মস্ত আকাশের নিচে… একা। আমার একটু-একটু ভয় করছে। কান্না পাচ্ছে একটু একটু।

নাহ্‌। কাঁদব না। আমি চোয়াল শক্ত করছি।

লেট দেম পাইন ফর এভার। লেট দেম রিপেন্ট। বোথ অব দেম।

আমি বরং আরও এগিয়ে যাই।।

************

একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা চারপাশে। আর ঠিক তখনই অন্যদিকে বাঁক খেল জীবন। আরেকটা নতুন অধ্যায়। ঘুরে যাওয়া আনকোরা, প্রায় অচেনা একটা রাস্তায়।

সেলে আমার সেলমেটদের মধ্যে প্রদ্যোতদা আর কল্লোলদা। একজন যাদবপুর এঞ্জিনিয়ারিং। অন্যজন প্রেসিডেন্সী। সঙ্গে আরও কয়েকজন। এদিকে আমি তো তখনও উঁচু ক্লাসের দাদাদের ভাষায় ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত।’ ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা স্বভাবটাকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি তখনও। মাঝেমাঝেই গালাগাল দিয়ে ফেলি। মাথা গরম করে তেড়ে যাই এর তার দিকে। যদিও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই একটু একটু করে কাটছিল সেটা। প্রতীপদা, ডাক্তারদাদের হাত ধরে। আর অমিতেশ স্যর। আমার জীবন নামে জাহাজটার ক্যাপ্টেন। একটু একটু করে পাল্টে দিচ্ছিলেন আমাকে। যেন গঙ্গার পাড় থেকে তুলে আনা একতাল নরম মাটি। ছেনে ছেনে মূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন একটা। সে সুযোগ আর পেলেন কই। তার আগেই তো পার্টির কাজ নিয়ে গ্রামে চলে গেলেন। আর এদিকে সময়ও তো ছোট হয়ে আসছিল দিন কে দিন। খালপাড়ের বস্তি থেকে উঠে আসা একটা রাগী ছেলে। ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’ থেকে ‘প্রলেতারিয়েত’ হয়ে ওঠার আগেই তো ধরা পরে চালান হয়ে জেলে। ডাক্তারদা, প্রতীপদা, অমিতেশ স্যরদের শেষ না করতে পারা কাজটা ফের নতুন করে শুরু হলো জেলে এসে। প্রদ্যোতদা, কল্লোলদাদের হাত ধরে। আমাকে কি ভালোটাই না বাসতো ওরা। লকআপে আমিই সবার চেয়ে ছোট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সঙ্গে কথা বলতো ওরা। গল্প শোনাতো। দেশবিদেশের গরীবগুর্বো মানুষের লড়াইয়ের গল্প। আমার কথা শুনতো। কথার মাঝেমাঝেই হাসতে হাসতে ফেটে পড়তো আমার বলার কায়দায়। আবার কথার মাঝখানে মুখ ফসকে একটা গালাগাল বেড়িয়ে পড়লেই মাথার পেছনে একটা চাঁটি আর কান ধরে পাঁচবার ওঠবোস, প্রত্যেকবার। আমাকে বোঝাত প্রদ্যোতদা। “এই যে কথায় কথায় রেগে গিয়ে গালাগাল দিয়ে এর ওর দিকে তেড়ে যাস তুই, এটা আসলে তোর দুর্বলতা। আসলে মনের কোনে কোথাও শত্রুপক্ষ সম্পর্কে একটা ভয়ের জায়গা রয়েছে তোর। আর সেটাকে ঢাকা চাপা দিতেই উৎকট গর্জন, গালাগাল এসবের প্রয়োজন হয় তোর। এগুলো কাটিয়ে ওঠ। দেখবি একদিন আমাদের সবার চেয়ে বড় রেভল্যুশনারি হবি তুই। আ ট্রু গেরিলা ওয়ারিয়ার। কারণ আমরা সবাই যেখান থেকে এসেছি পিওর মিডল এ্যান্ড আপার মিডল ক্লাসেস, সেই পেটিবুর্জোয়া ভাইসেস থেকে ভয় পেয়ে, নানা ধরনের লোভ আর সুযোগ সুবিধার হাতছানিতে পিছিয়ে আসার একটা প্রবণতা থাকতেই পারে আমাদের মধ্যে। কিন্তু তুই …” আমার দিকে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়েছিলো প্রদ্যোতদা। “তুই যেখান থেকে উঠে এসেছিস, ওই বস্তির ঘর, নোংরা, আবর্জনা, দুর্গন্ধ, দারিদ্রের সাথে চোয়াল কষা লড়াই, এগুলো তোকে শক্ত করেছে রোজ। ইচ এ্যান্ড এভরি মোমেন্টস ইন ইওর লাইফ। তাই তোর লোভের পিছুটান অনেক কম।” কি সুন্দর বলতো প্রদ্যোতদা। মনের মধ্যে হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে দিতো একেকটা শব্দকে। ঠিক অমিতেশ স্যরের মতো। স্যরের কাছে গল্প শুনতাম। এবার শুরু হলো নিজে পড়ার পালা, কল্লোলদাদের চাপে পড়ে। সেলে লুকিয়ে লুকিয়ে আনা হতো সেসব বই। লি শাও চির ‘হাউ টু বি আ গুড কম্যুনিস্ট’, ‘জয়া শুরার গল্প’, হেমিংওয়ের ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’, আরও অনেক বই। এদিকে নিজের তো স্বপন কুমার আর হাঁদা ভোঁদা ছাড়া আর কিছু পড়ার অভ্যেস নেই কোনদিন। মাঝে মাঝেই পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে “দুত্তেরি, নিকুচি করেছে তোমাদের পড়ার!” বলে বই ছুড়ে ফেলে দিতাম। এগিয়ে আসতো কল্লোলদা। কাঁধে হাত রেখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি হেসে নীচুগলায় বলতো – “পড় পড়, হাল ছাড়িস না। দেখবি পড়তে পড়তেই একদিন ঠিক ভালো লেগে যাবে।” আর অবাক কাণ্ড। হচ্ছিলোও ঠিক তাই। ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিলাম বইয়ের অক্ষরগুলোর মধ্যে। চেটেপুটে খাচ্ছিলাম প্রতিটা পাতাকে। অনুভূতিটা অনেকটা সেই স্নানের সময় জল ঢুকে অনেকদিন বন্ধ হয়ে থাকা কানের পর্দা হঠাৎ খুলে যাওয়ার মতো। শোঁ শোঁ করে খোলা হাওয়া ঢুকছে। প্রথম যেদিন ভুপেন্দ্র কিশোর রক্ষিতরায়ের ‘ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব’ – এর মতো ইয়া মোটা বইটা পড়ে শেষ করলাম। সে আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। বইটা সেলের মেঝেতে নামিয়ে রেখেই চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠেছিলাম –“আমি পেরেছি! আমি পেরেছি!!”

এদিকে জেলের পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠছিল দিন কে দিন। রাষ্ট্র যেন ঠিকই করে ফেলেছিল জেলের মধ্যে কাউকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। মাঝে মাঝেই পাগলি ঘণ্টি বেজে উঠছিল জেল কাঁপিয়ে। বেপরোয়া লাঠিচার্জ, চরাগোপ্তা গুলি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা চলছিল সমানে। এরকমই একটা পাগলির দিন শহীদ হলো বেহালার সাগরদা, বাবলুদা। মারতে মারতে দোতলা থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় সাগরদাকে। থেঁতলে কিমা পাকানো মাংসের মতো হয়ে গেছিল শরীরটা।

সেই রাতে জেলে কেউ খায়নি। ফুঁপিয়ে কাঁদছিল কমরেডরা। গলা ফাটিয়ে স্লোগান তুলেছিল অনেকে। আমার কাঁধে চোট। পাঁচহাতি ডাণ্ডার মার। মুখের একপাশটা ফুলে ঢোল। ধুম জ্বর আর শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। বারবার মনে হচ্ছিল এভাবে চলতে থাকলে একদিন জেলের মধ্যেই মরে যাবো আমি। সাগরদা – বাবলুদাদের মতো। অমিতেশ স্যরের কথা মনে পড়ছিল খুব। ক্লাসে গল্পটা শুনিয়েছিলেন স্যর। একটা পাখির গল্প। দক্ষিন আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানকার আদিবাসীরা কেতজেল নামে ডাকে পাখীটাকে। বন্দী অবস্থায় বেশিদিন বাঁচেনা পাখীটা। নিজেকে অনেকটা ওই পাখীটার মতো মনে হচ্ছিল। বুকের মধ্যে ওর ডানার ঝাপটানি শুনতে পাচ্ছিলাম যেন। খাঁচা কেটে আকাশে উড়তে চাইছে কেজেল। আর সেই ওড়ার সুযোগটা তৈরি হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই।

জেলের একপাশে গঙ্গার ধারে লাল পাঁচিলটার একটু দুরে একটা শুকনো কুয়ো। জেল পুলিশ আর গার্ডরাও ঠিকঠাক জানতো না কেন ওটা রয়েছে সেখানে। কিন্তু শওকত চাচা জানতো। শওকত আলি মণ্ডল। ধবধবে পাকা চুল আর দাড়ি। একসময় ক্যানিং লাইনের হাড়কাঁপানো ডাকাত। অনেকগুলো ডাকাতি আর খুনের আসামী। পয়সাওয়ালা গেরস্তের কাপড়ে চোপরে হয়ে যেতো ওর নাম শুনলে। লম্বা মেয়াদী লাইফার এই জেলে। পুরোনো মেট। জেলখানার প্রতিটা ইঞ্চির খবর রাখতো নখের ডগায়। কেন জানিনা আমাকে খুব ভালোবাসতো বুড়ো। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার খিদেটা একটু বেশি। ‘চৌকা’ মানে রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে একবাটি ডাল অথবা একটা মাছের টুকরো, মাঝেমাঝেই এনে খাওয়াতো আমাকে। সেই চাচাই আমাকে শুনিয়েছিলো গল্পটা। ওই কুয়োটার ওপর পাটাতন খাটিয়ে ফাঁসি দেওয়া হতো বিপ্লবীদের। সেই ব্রিটিশ আমলে। কুয়োটার তলায় একটা সুড়ঙ্গ আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহারে মাটি আর পলি পড়ে পড়ে বুজে গেলেও সুড়ঙ্গটা রয়েছে। উত্তেজনায় দম আটকে আসছিল আমার – “ফের খোড়া যাবে?” ফিসফিসে গলায় প্রশ্ন করেছিলাম চাচাকে।

সেটা তো তোদের ব্যাপার। তোরা বুঝবি।” মুচকি হেসে উঠে গিয়েছিলো জেলঘুঘু, লাইফার।

সন্ধের পড় গিনতি ফাইল শেষ করে কয়েদি নম্বর মিলিয়ে নিয়ে চলে গেল আর্দালি মেট আর জমাদার সেপাই। সেলের টিমটিমে আলোর নীচে বসে শওকত চাচার কথাটা বললাম প্রদ্যোতদাদের। চুপ করে শুনছিল সবাই। “ইউরেকা!” আমার বলা শেষ হওয়া মাত্র কল্লোলদার মুখ থেকে ছিটকে বেরোলো শব্দটা। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছিলাম আমরা। একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হচ্ছিল বারবার টহল দিয়ে যাওয়া গার্ড সেপাই আর সাধারণ কয়েদীদের সম্পর্কে। ওদের মধ্যে দুতিনজন দাগী আসামী যারা আসলে ইনফর্মার। সামান্য আঁচ পেলেও পরদিন সকালেই জেলারের টেবিলে পৌঁছে যাবে খবরটা। নজর রাখতে হচ্ছিল সেদিকেও।

জেলে পার্টি নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চললো দুদিন ধরে। “নো বেল, ব্রেক জেল” – পার্টির ঘোষিত নীতির সাফল্য নির্ভর করছে পরিকল্পনার সফল রুপায়নের ওপর। প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন সকালে গিয়ে ধরলাম শওকত চাচাকে। “বাগানে কাজ করতে চাই।” শুনে ফের একবার মুচকি হাসলো বুড়ো। “তবে রে হারামি। শিকলি কাটার মতলব।” তবে মনে মনে কি ভেবেছিলো কে জানে, পরের দিন সকালে ডেপুটি জেলার ভবানন্দ গুছাইতের টেবিলে ডাক পড়লো আমার। টেবিলের পাশে রাখা একটা চেয়ারে পা তুলে বসেছিলো গুছাইত। আমাকে দেখে চোখ নাচালো। ঠোঁটের কোনে শেয়ালে হাসি – “কিরে সেয়ানা? বিপ্লব ছেড়ে শেষ অবধি ফুলের বাগান! তা ভালো, মতিগতি ফিরুক তোদের। তাহলে লেগে যা কাল থেকেই তা দেখিস আবার, সটকানোর প্ল্যানফ্যান ভাঁজিস না যেন। তোদের শালা বিশ্বাস ফিশ্বাস নেই।” কথাগুলো বলার সময় একদৃষ্টে আমাকে মাপছিল গুছাইত। পাক্কা শয়তান লোকটা। জেলে প্রত্যেকটা ‘পাগলী’ আর নকশাল বন্দীদের পিটিয়ে মারার পেছনে সরাসরি হাত ছিল ওর। টেবিলের ওপর রাখা একটা পাথর। ক্যাম্বিস বলের সাইজ। পেপার ওয়েটের বদলে। ইচ্ছে করছিল এক ঝটকায় গলাটা পেঁচিয়ে ধরে ঠুকে দি রগের পাশে। কিন্তু না, এটা তার সময় নয়। অনেক বড় একটা পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে তাতে। অনেক কষ্টে একটা তাঁবেদারি হাসি ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে রেখে সামলালাম নিজেকে। তারপর ঘাড় নেড়ে বেড়িয়ে এলাম ঘর থেকে।

পরদিন সকাল থেকেই ‘মালি’র কাজে বহাল হয়ে গেলাম আমি আর কালাচাঁদদা। কালাচাঁদ মিস্ত্রী। তারাতলার কারখানায় হাম্বর পেটাতো। লোহাপেটা চেহারা। অসুরের মতো জোর গায়ে। বেহালা এ্যাকশন স্কোয়াডের কর গ্রুপ মেম্বার। বাগানে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে পালা করে কুয়োয় নেমে যেতুম দুজনে পালা করে শওকত চাচার জোগাড় করে দেওয়া মোটা কাছি দড়ি বেয়ে, সঙ্গে বাগানে কাজ করার দুটো মজবুত শাবল আর কোদাল। লাগাতার চলছিল খোঁড়ার কাজ। বাইরে পাহারায় থাকা শওকত চাচা আর দুজনের একজন কেউ। কাছেপিঠে কাউকে আসতে দেখলে বা সামান্য বিপদের গন্ধ পেলেই কোমরে বাঁধা দড়িটার ওপর থেকে একটা হাল্কা টান। সঙ্গে সঙ্গে তরতরিয়ে উঠে আসা দড়ি বেয়ে। অন্ধকার কুয়োর মধ্যে ভ্যাপসা গরম আর দুর্গন্ধ। ছোট টর্চ জ্বালিয়ে খুঁড়তে খুঁড়তে দমবন্ধ হয়ে আসতো। তবু একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি খোঁড়ার কাজ। মাঝে মাঝে রাউন্ডে আসতো গুছাইত। “বাঃ, বেড়ে বাগান করেছিস তো শালারা। ফুলটুল তো ভালোই ফুটেছে দেখছি। কর কর, মন দিয়ে কাজ কর।” কথার জবাবে দাঁত বের করে হাসতাম শুধু। সেপাইদের নিয়ে দুলকিচালে চলে যেতো গুছাইত। এরকম চলতে চলতে মাসখানেক বাদে একদিন। শাবল দিয়ে প্রথম খোঁচাটা মেরেছি মাটিতে, সরু একটা আলোর পিন এসে বিঁধে গ্যালো চোখে। উত্তেজনায় পরপর আরও বেশ কয়েকটা শাবলের খোঁচা। হড়বড় করে দুহাতে মাটি টেনে সরাতেই হাত দশেক দুরে আদিগঙ্গার জল। প্রচণ্ড আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গিয়েই মুখে হাত চাপা দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ লাগলো নিজেকে সামলাতে। আলগোছে মাটি জড়ো করে সাবধানে বুজিয়ে দিলাম গর্তটা। তারপর উঠে এলাম দড়ি বেয়ে। একটু দুরে গাছে জল দিচ্ছিল কালাচাঁদদা। পাশে খুড়পি হাতে উপুড় হয়ে বসা শওকত চাচা। পোড়খাওয়া জেলঘুঘু আমার মুখ দেখেই মূহুর্তে বুঝে নিলো যা বোঝার। “তা হলে বাচ্চা?” আমাকে ওই নামেই ডাকতো চাচা। “কাজ তো হয়ে গ্যালো। এবার আল্লার নাম নিয়ে ঢিল দাও সবাই মিলে।” সেই মূহুর্তে অদ্ভুত একটা কথা ফসকে বেরোল মুখ থেকে। কেন সেটা আজও জানা নেই। “তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো না চাচা। কদ্দিন এভাবে জেলের মধ্যে পচবে? ও আমি কল্ললদাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়ে নেবোখন।” আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত চোখে হেসেছিল সোঁদরবনের বাঘাটে ডাকাত। “সত্যিই মাথার ব্যারাম আছে তোর। আরে পাগলা, অনেক বড় কাজ করতে যাচ্ছিস তোরা। সেখানে আমার মত এঁদোছেঁদো চোরডাকাত

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-14/

রেসিপি

error: Content is protected !!