Tags Posts tagged with "cheating in exams"

cheating in exams

এক দল চোখ কুঁচকে, মুখে ত্রিকোণমিতি সাজিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে গেয়ে চলেছেন, কোথা কোথা খুঁজেছি তোমায়, তুমি জানো না। আর অন্য দল ‘প্রকাশ্যে’ পেনপেনসিলবোর্ড সামলে, মনে মনে বিন্দাস আউড়াচ্ছেন, তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, যেতে দেব না। এক দল মনোহরণ সোনার হরিণ খুঁজেই চলেছেন, অন্য দল ভাবছেন, ভেঙে মোর ঘরের চাবি তোকে কে নিয়ে যায় দেখি। তুই মোর পরাণসখা, বন্ধু হে আমার।

অঙ্গদানে বললে রাজি, ফোনদানে নয়।

বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা পরীক্ষা শুরুর আগে পইপই করে বলেছেন, কথা শোন, মাথা খাও, ফোনখানি নিও না। তবে কথা শুনছে কে! বোর্ডিং পাসটা পকেটে করে ক্রুশবিদ্ধের মতো যেমন দাঁড়াতে হয় বিমানবন্দরের সিকিউরিটি চেকপয়েন্টে, ঠিক তেমনভাবে বহু স্কুলের গেটে বহু পরীক্ষার্থী দাঁড়াচ্ছেন। চোখএক্স রে টপকে গিয়ে হলেও ঢুকছেন। চিরসখা থাকছে বহাল তবিয়তে। ঈশপের ফেবলএ পড়েছিলাম, এ ফ্রেন্ড ইন নিড, এ ফ্রেন্ড ইনডিড। অসময়ে বন্ধুর পাশে তারা কি ভাবে দাঁড়াচ্ছে, বন্ধুরাই জানেন।

উচ্চমাধ্যমিক সংসদ পড়েছে মহা গেরোয়। দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতাও নাকানিচোবানি খাচ্ছেন। রাজ্যের যতগুলো স্কুলে পরীক্ষা চলছে, মুঠোর মধ্যে ‘উন্নয়ন’এর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচার করতে হচ্ছে, রায় দিতে হচ্ছে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই সংসদ বুক বাজিয়ে, লাল চোখে জানিয়ে দিয়েছিল, এ বছর পরীক্ষা হলে কেউ যদি মোবাইল সহ ধরা পড়ে, তা হলে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে। তবে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে খানিক তোতলাচ্ছে যেন। এক এক বিচারক বিধান দিচ্ছেন এক এক রকম। প্রথম দিন কপাল পুড়েছিল পাঁচ ফোনপ্রেমিকের। পত্রপাঠ রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়। দ্বিতীয় দিন ধরা পড়ে দুজন। তবে শাস্তি হিসেবে তাদের শুধুমাত্র সেদিনের পরীক্ষা বাতিল হয়। এই লেখাটা লেখার সময় চতুর্থ দিনের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এই দিনে নেটওয়ার্ক বিপ্লবের শিকার হয়েছেন ছ’জন। তাঁরা মুক্তবিহঙ্গ হয়েছেন। অর্থাৎ, এ বছরে বাকি পরীক্ষাগুলোর একটাও তাঁরা আর দিতে পারবেন না। বিচার বিপর্যয়ে বেজায় চটে গিয়ে সরকারি স্কুলশিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু বলেছেন, ‘সংসদ তিন দিন তিন রকম শাস্তির বিধান দিয়েছে। প্রথম দিন রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে, কিন্তু দ্বিতীয় দিন দুই পরীক্ষার্থীর শুধু দ্বিতীয় ভাষার পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় তারা পরের পরীক্ষা দিতে পারলেও বছর নষ্ট হবে। পরের বছর শুধু দ্বিতীয় ভাষার পরীক্ষা দিলেই চলবে। আর এ দিনের ছয় পরীক্ষার্থীকে পরের বছর সব পরীক্ষাই দিতে হবে। শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েই যাচ্ছে। যা কাম্য নয়।’

লঘু পাপে গুরু দণ্ড নাকি গুরু পাপে লঘু দণ্ড হল সেই বিতর্ক থাক। যুক্তিঅযুক্তির চাউমিন বানাতে সময় বহে যায়। প্রশ্ন হল, পরীক্ষার হলে ফোন আমাদের কি দেয়? আনন্দেবিষাদেপ্রমোদেকমোডে মোবাইল আমাদের সঙ্গী হয়েছে সেই কবেই। এ যুগের তুতেনখামেনরা অন্তিম সময়েও প্রিয় জিনিসের মধ্যে সবার আগে হয়তো রাখবেন মোবাইল। কিন্তু তাই বলে পরীক্ষার হলে? চোখে পড়লে কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। কিন্তু পরমপ্রিয়র সঙ্গে তিন ঘণ্টার বিচ্ছেদ বেদনার কাছে কি ওই ভয়টাও ম্লান? শুধু গোপনে উত্তর পাওয়ার ভরসায় যে পরীক্ষার্থীরা মোবাইল নিচ্ছেন না, তা ঘটনাপ্রবাহেই স্পষ্ট। কালনা কলেজের এক ছাত্রী সম্প্রতি মোক্ষম চাল দিয়েছেন। এডুকেশন বিষয়ের টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। হলে ঢুকে থিতু হয়ে প্রশ্নপত্র পাওয়ার পরে পরীক্ষার্থীরা সাধারণত সেটা পড়ে দেখেন। ওই ছাত্রী ভাবলেন, কে আর এমন ফালতু কাজে সময় নষ্ট করে! ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসা মোবাইলটা সঙ্গে ছিলই। তাই হলে বসেই শুরু করে দিলেন ফেসবুক লাইভ। বলতে থাকেন, ‘আমরা পরীক্ষা দিতে এসেছি। এই হচ্ছে প্রশ্নপত্র। কিচ্ছু জানি না। টেস্ট পরীক্ষা দিতে এসে টাইম পাস করছি!’ দুবার লাইভ করে দশ মিনিটেরও বেশি হলছবি দেখান তিনি। অভিনন্দন বর্তমানের কর্মকাণ্ডের জন্য এত বড় একটা ঘটনার নিয়তি হল খবরের কাগজের এক কোণায়। পরীক্ষার হল থেকে রাজ্যের প্রথম ফেসবুক লাইভ ইতিহাসের পাতায় উঠে পড়ল, অগোচরে। তবে ওই কলেজের তৃণমূল ছাত্র পরিষদ অবশ্য এই ঘটনার নেপথ্যেও বিরোধীদের রাজনৈতিক চক্রান্ত আছে বলে অভিযোগ তুলেছে।

কেমব্রিজ ডিকশনারির ২০১৮ সালের ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ারএর তকমা জুটেছিল যে শব্দের, তা হল নোমোফোবিয়া। এর মানে হল, মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারা নিয়ে একটা ভয়মাখানো চিন্তা। শাওয়ারের তলায় দাঁড়াব যখন, ফোন আসে যদি? রাতে ঘুমনোর সময় আমার পোস্ট করা ছবিতে যদি কেউ উল্টোপাল্টা কমেন্ট করে বসে? তিন ঘণ্টার পরীক্ষা। সে যা হয় হোক, কিন্তু তারই মধ্যে যে নশো বন্ধুর আড়াই জিবি আপডেট। স্ক্রল করতে হয়, না হয় পিছিয়ে পড়তে হয়। গ্যাস সিলিন্ডার লিক করে ছড়িয়ে পড়া গন্ধের মতো মোবাইলে মোবাইলে ঘুরেছে এ বছরের মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র। খামে ভরা প্রশ্ন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় পরীক্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে খামখেয়ালি ঘুরে বেড়ালো কি করে, তার ঠিক ঠাক উত্তর পাওয়া যায়নি এখনও। যাঁরা তা ছড়িয়েছিলেন, পরীক্ষা দেওয়ার ‘আনন্দ’ সবার সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন হয়তো। ‘চলার পথে দিনে রাতে দেখা হবে সবার সাথে, তাদের আমি চাব, তারা আমায় চাবে।’ মূর্খেরা বোঝেনি কেউ।

ধরা না পড়লে তো চুরিবিদ্যার থেকে বড় বিদ্যা আর হয় না। জীবনের প্রতিটা চাওয়া পাওয়ার মতো টুকতেও আমাদের সঙ্গ দেয় গুগল। হাউ টু চিট ইন একজাম টাইপ করলে বিশ্বের এক নম্বর সার্চ ইঞ্জিন কম করে একশ রাস্তা দেখায়। ইউটিউবের লিঙ্ক আসে। যত্ন করে শেখানো আছে মহাবিদ্যার মহাকৌশল! নখের মধ্যে, রবারের অন্তঃস্থল বাইপাস সার্জারি করে, স্কেলটা আড়াআড়ি ভাবে কেটে, পেনের রিফিলের গায়ে কাগজ মুড়ে গুপ্তকথা খোদাই করার অনেক পদ্ধতি হাতে কলমে শেখানো আছে ইউটিউবে। দুনিয়াজোড়া লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী যে এতে ‘উপকৃত’ হয়েছেন, তা ভিউয়ের সংখ্যা দেখেই মালুম হয়।

আমাদের স্কুল জীবনে মোবাইল ছিল দূর আকাশের তারার মতো। কম্পিউটার ক্লাসে ওয়ার্ড ফাইল খুলে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক এসব লিখলে নিচে লাল কালির দাগ পড়ত অটোমেটিকালি। মাইক্রোসফটের কাছেও অজানা শব্দ যে! স্কুলের বন্ধুদের ঠেকে শৌনক সেদিন এসব শুনে বেজায় মন খারাপ করে বলল, ‘আর্টটা উঠে যাচ্ছে বুঝলি! মোবাইল নিয়ে কাঁচকলা হবে। সাত ইঞ্চির স্ক্রিন। পারবি শালা লুকোতে?’ শৌনকের থেকে জীবনে শিখেছি অনেক কিছু। বুঝেছি, ওপেন সার্জারি নয়, আসলে ভরসা ল্যাপরোস্কোপিতেই। ক্লাস নাইনের পরীক্ষা চলছিল। শৌনকের পেনসিল বক্সের এক কোণায় রাখা ছিল হাফ মুঠো চাল। চাল স্পর্শ করে লিখছিল শৌনক। স্যার অবাক চোখে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসব কি?’ বাধ্য ছাত্র অবলীলায় বলল, ‘গুরুজীর মন্ত্রপূত চাল স্যার। সব সময় সঙ্গে রাখতে হয়। গুরুর নির্দেশ।’ পরীক্ষার পরে জেনেছিলাম, গোটা পনেরো চালে খোদাই করা ছিল কেমিস্ট্রির সব কটা দরকারি ফর্মুলা। বইমেলায় চালের উপরে নাম লেখেন যাঁরা, তাঁদের একজনকে দিয়ে কাজটা করিয়েছিল। মনে পড়ে, ইলেভেনের অঙ্ক পরীক্ষায় চোখের ইন বিল্ট জুম লেন্স দিয়ে আমার পুরো খাতা জেরক্স করার পর, হল থেকে বেরিয়ে এসে এই অধমকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ভাই স্ক্যান তো করে দিয়েছি। কিন্তু প্রতিটা লাইনের আগে টেন জি টেন জি করে কি লিখছিলি রে?’ বুঝেছিলাম, ও লগারিদমের অঙ্কের log-এর কথা বলতে চেয়েছিল। চিরাচরিত পদ্ধতির এমন অবক্ষয় দেখে বহু শৌনকের আজ সত্যিই মন খারাপ। পোড় খাওয়া রেকর্ড কিচকিচ শব্দ করলেও গান বাজায়, সিডিতে একটু বড় স্ক্র্যাচ পড়লেই সব শেষ।

আমার এক ভাই পাসপোর্টের ফর্ম ভরার সময় আইডেন্টিফিকেশন মার্কের আন্ডারে লিখেছিল, স্যামসাং এস এইট প্লাস।

এমন কয়েক লক্ষ ভাইবোনেরাই তো পরীক্ষায় বসছে এ বারে। অবাক হব কেন?

রেসিপি

error: Content is protected !!