Tags Posts tagged with "International Mother Language Day"

International Mother Language Day

আজ পাঁচুদার বাৎসরিক কাজ। প্রতিবছর এই দিনটা বেশ জাঁকজমক করেই পালন করে অভিষেক। অভি পাঁচুদার একমাত্র ছেলে। সকাল থেকে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে, বগলে বডি স্প্রে দিয়ে সব একহাতে সামলাচ্ছে অভি। ওর বউ মোহনার এসব আদিখ্যেতা একদম ভাল লাগে না। একটা মরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে এত হই চই করার কি মানে আছে কে জানে ? হ্যাঁ যখন উনি বেঁচেছিলেন তখন সত্যিই ওনার একটা পরিচিতি ছিল। মানুষ ওনাকে মানত, শ্রদ্ধা করতো। সকাল থেকে বসার ঘরে মানুষের ভিড়। কত শিল্পী, সাহিত্যিক, পন্ডিত ওনাকে অবলম্বন করেই পৃথিবীতে নাম করেছেন…কিন্তু আজ তো উনি একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ছাড়া আর কিছুই নন। আরে বাবা বাস্তবটাকে মানতে হবে তো !

অভি কিন্তু আজকের দিনটাতে খুব সিরিয়াস। সব কাজ সরিয়ে রেখে আজ সে একেবারেই ফ্রি। মিটিং, কনফারেন্স, ক্লায়েন্ট মিট সব ক্যান্সেল, এমনকি আজ অফিসের কোন ফোনও সে রিসিভ করে না। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বাবার কাছের লোকজন সবাইকে নেমন্তন্ন করে সে। বাবা যা যা ভালোবাসতেন যেমন, লাউ ডাঁটা দিয়ে পোস্ত চচ্চড়ি, পটলের দোর্মা, বড় বড় চ্যাটালো পুকুরে পুঁটিমাছ ভাজা, দই, কমলা ভোগ ছাড়াও বাবার প্রিয় সর্ষে-ইলিশও থাকে মেনুতে। খাওয়া দাওয়া ছাড়াও বিকেলের দিকে একটা স্মরণ অনুষ্ঠান হয়, যেখানে বাবার ছবিকে সামনে রেখে তাঁর সম্পর্কে বক্তব্য, গান, কবিতা, শ্রুতি-নাটক ইত্যাদি করা হয়। পাঁচুদার জীবনের উজ্জ্বল দিকগুলো নিয়ে তাঁর বন্ধুরা স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর পাণ্ডিত্য, তাঁর রসবোধ, দেশ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার খ্যাতি সব প্রকাশ্যে আসে। বলতে বলতে কারো কারো চোখে জল চলে আসে। রুমালের খুঁট দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে কেউ কেউ চিৎকার করে ওঠেন, ‘পাঁচুদা অমর রহে’।

সমস্যাটা এখানেই। অমর রহে বলে চিৎকার করলেই তো কেউ আর অমর হয় না। কালের নিয়মে সবাইকেই একদিন মরে যেতে হয়। সময় এগিয়ে চলে। পাঁচুদার বাৎসরিকের দিনটাও চলে যায়। পরের দিন সকাল থেকে আবার অফিস, ক্লায়েন্ট, মেয়ের স্কুল, গ্যাস, ব্যাঙ্ক, জি.এস.টি। সকাল আটটায় চান করে, বুকে টাই বেঁধে একমুঠো দুধেশ্বর সেদ্ধ, মাখন আর কাটাপোনার ঝোল গিলে মোবাইল কানে নিয়ে দৌড় আর দৌড়। এভাবেই ছুটতে ছুটতে আবার পরের বছর, আবার বাৎসরিক, আবার পাঁচুদা। কিন্তু সারা বছরের তিনশ পঁইশট্টিটা দিনের মধ্যে আর কোথাও পাঁচুদা থাকে না। তার ছবির মালাটা শুকিয়ে গিয়ে ঝরে পড়ে যায়। ছবিটাও ঝুল আর হাল্কা মাকড়শার জালের আড়ালে ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে। দেখা যায় না পাঁচুদার রোম্যান্টিক হাসি, কপালের তিল বা না আঁচড়ানো চুলের অবিন্নস্ত বিন্যাস। সময়ের নিয়মে এবং নিরন্তর অযত্নে পাঁচুদা একটু একটু করে হারিয়ে যেতে থাকেন।

প্রতিবছরই আমি পাঁচুদার বাৎসরিকে যাই। এতবড় মাপের একজন মানুষ, তাঁর স্মরণ অনুষ্ঠান। না গিয়ে থাকা যায় না। যখন বেঁচে ছিলেন তখনও যেতাম। মানুষ পাঁচুদাকে খুব ভালোবাসত। কত সম্মান, পুরস্কার, কত ছাত্রছাত্রী। দেশের মানুষ পাঁচুদাকে মাথায় করে রাখত। দেশ বিদেশ থেকে কত মানুষ আসতেন, আলাপ, আলোচনা… কিন্তু সেই সময় আর রইলো না। কেমন যেন সব বদলাতে শুরু করলো। সবার কাছেই পাঁচুদা কাজের মানুষ থেকে শুধুমাত্র শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠতে লাগলেন। মানুষের কাছে পাঁচুদার প্রয়োজন ফুরোতে লাগলো। চারপাশের মানুষের অযত্ন, আর অবহেলা একটু একটু করে পাঁচুদাকে খুব একা করে দিল। এই একা হয়ে যাওয়া পাঁচুদার কাছেও আমি যেতাম। শুনতাম তাঁর অতীত গৌরব, ঐতিহ্যের কাহিনি।

এভাবেই বোধহয় সব কিছু হারিয়ে যায়। সময়ের স্রোতে অযত্ন আর অবহেলাকে সঙ্গী করে ভেসে যায় গ্রাম, ঘর, শহর, নগর বা পাঁচুদারা… হারিয়ে যায় সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাষা। পাঁচুদার মতই একরাশ ঐতিহ্য আর গরিমা নিয়ে আমাদের গর্বের বাংলা ভাষাও কি একদিন হারিয়ে যাবে ? হারিয়ে যাবে তার কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত ? আশংকাটা একেবারেই অমূলক নয়। পাঁচুদার জীবনের সঙ্গে বাংলা ভাষার ইতিহাসের বড্ড মিল। ওনার মতোই বাংলা ভাষাও একসময় সবার কাজের ভাষা, কাছের ভাষা ছিল। বাঙ্গালিরা বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ববোধ করতো। বাংলা পড়া বা লেখাটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিন্তু আজ ছবিটা অনেকটাই বদলে গেছে। আরও খারাপ ভাবে বললে বলা যায় খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল জেনেরেশনের কাছে বাংলায় কথা বললে স্টেটাস থাকে না। এরা রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের ইংরাজি অনুবাদ পড়ে। স্কুলে ইংরাজি বা হিন্দি এদের প্রথম ভাষা। রবীন্দ্র, বিভূতি বা শরৎ রচনাবলীর মোটা মোটা বইগুলো দিয়ে বসার ঘরের বইয়ের আলমারির একটা তাক ভরিয়ে রাখে কিন্তু অন্য সব তাকে সাজানো থাকে বিদেশি সাহিত্যের আলোড়ন ফেলা বই।

পাঁচুদার মতোই বাংলা ভাষাও আজ আর কাজের ভাষা নেই। অফিস, কাছারি, ব্যাঙ্ক বা রেলের কাউন্টারে বাংলা ভাষা আর কাজে লাগে না। একসময় ইংরেজদের রাজধানী থাকার কারণে কলকাতার অফিস কাছারিতে ইংরাজিটাই ছিল কাজের ভাষা। ইংরেজ চলে গেলেও অফিস কাছারি থেকে আমরা ইংরাজিকে হটাতে পারি নি বা, ইংরাজিটা রেখে সমান্তরাল ভাবে বাংলাকেও কাজের ভাষা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি নি। বেশ কিছু দরকারি শব্দের সমার্থক বাংলা শব্দও তৈরি করা যায় নি, তৈরি হয় নি বাংলা ভাষার সর্বজনগ্রাহ্য কোন অভিধান। এই অনেক কিছু না পারার যাঁতাকলে পড়ে বাংলা ভাষা ক্রমশ সাহিত্য, বই বা গ্রাম বাংলার কথ্য ভাষাই থেকে গিয়েছে। রোজগার বা বেঁচে থাকার মৌলিক অবলম্বন হয়ে ওঠে নি।

এর জন্য মুলত আমরাই দায়ী নাহলে কবিগুরু, বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্রের মতো বেশ কিছু মানুষ যে ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে একটা উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যে ভাষাকে মাতৃভাষা করার দাবিতে বহু মানুষ প্রাণ দিল, যে ভাষার জন্য আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে একটা দিন ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়, যে ভাষাকে ইউনেস্কো পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ভাষা বলেছে…সেই ভাষায় কথা বলা মানুষগুলো আমাদের সামনেই বাংলা নিয়ে আর গর্ববোধ করে না। সে তার সন্তানদের বাংলা বই , বাংলা গান, বাংলা সিনেমা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, নিজের সন্তানের বাংলা বলতে না পারাটা শহুরে বাঙালি বাবা মায়ের কাছে এখন গর্বের বিষয়, খোদ কলকাতা শহরে মাত্র আঠাশ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে। আর আমরা চুপচাপ সব কিছু মেনে নিয়ে আমাদের গর্বের ভাষাকে একটু একটু করে মেরে ফেলছি। যদিও এ সবকিছুই পশ্চিমবঙ্গ বা আরও নির্দিস্ট করে বললে বলা যায় কলকাতা শহরের চিত্র। এই বঙ্গের গ্রামাঞ্চল বা বাংলাদেশের ছবিটা কিন্তু একেবারেই আলাদা, সেখানে বাংলা ভাষা সম্পর্কে ভাবনাটাই অন্যরকম। অনেক সংগ্রাম, আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হবার কারণে এ ভাষা তাদের অহংকার, অলঙ্কার। আসলে শুধুমাত্র ভালবাসলেই কোন কিছুকে টিকিয়ে রাখা যায় না, তার জন্য দরকার হয় গর্বের, অহংকারের। বাংলাদেশিদের বাংলা ভাষা নিয়ে সেই গর্ব – অহংকার আছে। এই বাংলার মানুষ এ ব্যাপারে বোধহয় একটু হলেও উদাসীন। যে উদাসীনতা একটু একটু করে মৃত্যুকে ডেকে আনে।

আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারি পাঁচুদার বাৎসরিক এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে অনেক তাজা তরুণের রক্তে ভিজে যায় বাংলাদেশের মাটি। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এই অসাধারণ ইতিহাস বিশ্বের মানচিত্রে বাংলা ভাষাকে এক উজ্জ্বল জায়গায় বসিয়ে দেয়। কিন্তু সেই জায়গাটিও আজ কেমন যেন টলমলো। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বাংলা ভাষা আজ কেমন যেন বহিরাগত। পাঁচুদার মতোই বাংলা ভাষারও অতীত গৌরব আছে, সম্মান পুরস্কার আছে কিন্তু বর্তমান নেই। নেই কোন জোরালো ভবিষ্যৎ। অন্য দুই ভাষার দৈনন্দিন চাপে এই বাংলায় বাংলা ভাষা কেমন যেন ধুঁকছে, তাই বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে আজ আমাদের বোধহয় একটু কঠোর হতেই হবে। ইংরাজি হিন্দি বা অন্য কোন ভাষার সঙ্গে বাংলার কোন বিরোধ নেই। পেশাদারি অপেশাদারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরাজি বা হিন্দি শেখা অবশ্যই দরকার কিন্তু বাংলায় থাকা মানুষদের কঠোরভাবে এটা বোঝাতে হবে যে, বাংলায় থাকতে গেলে বাংলাটাকে জানতে হবেই, বাংলা বলতে হবেই নাহলে ভাষা দিবস এই বাংলার মানুষের কাছে পাঁচুদার বাৎসরিক কাজের মতো শুধুই একটা অনুষ্ঠান হয়ে বেঁচে থাকবে যার পরের দিন সকাল থেকে আবার অফিস, ক্লায়েন্ট, মেয়ের স্কুল, গ্যাস, ব্যাঙ্ক, জি.এস.টি……।।

নৌকোটা দুলছে। সূর্যাস্তের আর বড় দেরি নেই। একেকটা গেরুয়ারঙা ঢেউ এসে নৌকোটাকে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে, দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপারে বাংলাদেশ। সাতক্ষীরা জেলা। টাকি শহরে, ইচ্ছামতীর তীরে বসে থাকা, শহুরে পর্যটকেদের চোখে বাংলাদেশ। ২১শে ফেব্রুয়ারির কথা এলেই যার কথা মনে পড়ে – সেই বাংলাদেশ।

 

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ হয়ে আজ ২০১৯ অবধি, কেটে গিয়েছে ৬৭টা বছর। ২০০০ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি মিলেছে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গিয়েছে তবুও সেই ভাটিয়ালিভাওয়াইয়ার সুর, আজ কেমনটা যেন মৃদু হয়ে আসে। অদৃশ্য কোনও হাওয়ার, একটি অচেনাঅজানা গহ্বরে, সে যেন নিঃশব্দে বিলীন হয়ে আসতে চায়। কেবল সেই গেরুয়া রঙে ছোপানো একতারাধারী খোদার বান্দাদের মনের মানুষের  সন্ধান, এই বিষয়ে তাদের যে খোঁজ – তা ফুরাতে পারে না রোদ পড়ে আসতে থাকে, তাদের চলা ফুরায় না

 

আচ্ছা বেশ, বাউলগানের কথা না হয় বাদই দিলাম। সেদিন একটা লেখায় পড়ছিলাম, (সমরেশ বসুর একটি উপন্যাসের পাতায়) যে ওপারে নাকি রূপকথাকে বলে পরাণকথা। ঠাকুমাদিদিমারা রাতের খাওয়া শেষ হলে পরে, নাতি নাতনিদেরকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে, পান চিবুতে চিবুতে গল্প শোনাতেন। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের গায়ে ভূত আর পেত্নীদের ছায়াগুলোকে লম্বা হয়ে পড়তে দেখতাম। লম্ফের শিখাটুকুও, দপ করেই যেন কেঁপে উঠতো হঠাৎ। গায়ের ভিতরে একটা শিরশিরে ভয় টের পেতুম। রূপকথা নয়, ওদেশে বলতো পরাণকথা, প্রাণের খবর। সোনার কাঠি, রুপোর কাঠির দেশ।

 

ভাষা আন্দোলন

 

কত লোক হয়েছিল সেদিনকার মিছিলে – এক লক্ষ, দুই লক্ষ – নাকি পঞ্চাশ হাজার ? ১৯৫২ সালের সেই সকাল বা দুপুরটাকে যাদের মনে আছে (আমি তখন ধরাধামে ছিলুম না) – কেউ কি মাথা গুণতি করেছিলেন ? পুলিশ যখন গুলি চালিয়েছিল – সেই মুহূর্তটাকে কারোর কি মনে আছে ? রাতভোর কাজ করে, ২৩শে ফেব্রুয়ারির সকালে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটিকে স্থাপন করা গিয়েছিল, সেই মুহূর্তটিকে মনে আছে ? তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের পুলিশ স্তম্ভটিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিক যেমনভাবে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক পরিকল্পিত আইএনএ স্মারকটিকে ডাইনামাইটবোমাতে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরের বিজয়ী ব্রিটিশ সেনাধিপতিরা। আচ্ছা, গণআন্দোলনে শহীদদের জনমানস থেকে বিস্মৃত করাটা কি অতটাই সহজ কাজ ?

 

আশ্চর্য এই ভাষা আমাদের। স্রেফ একটি ভাষার জন্য আবেগে, সেই ১৯০৫ সাল থেকে আমাদের সংগ্রাম। দেশ ভাগ হলো, তবু সমস্যা গেল না। বরং বেদনার সেই চোরাস্রোতটুকুই থেকে গেল কোথাও। একভাষাদুইদেশ, মনে মনে গুমরোতে হতো তখন। ৫২ থেকে ৬২’র আন্দোলন, ৭১এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা – মহান মুক্তিযুদ্ধ, এই সবকিছুরই তলায় তলায় চোরাস্রোতের মতোই বয়ে যেতে পেরেছে একটাই আবেগ – ভাষার আবেগ, উচ্চারণের আবেগ। হয়তো বা পরাণকথার মতোই

 

ভাষা, জল, মাটি আর আকাশ

 

এই ঘটনা পরম্পরা থেকেই আমরা বুঝলাম – যে রাজনৈতিক কোনও মতাদর্শ নয়, স্রেফ মুখের ভাষা, মুখের কথাকে কেড়ে নেওয়াটাই একটি জাতির পক্ষে সবচেয়ে অবমাননাকর। সমস্ত দিক থেকেই তাদের পরাধীনতার পরিচায়ক। আজ সিডনি থেকে সন্দেশখালি অবধি, আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় গান গাই। পালন করি নজরুলজয়ন্তী, গণসঙ্গীতে মনে পড়াই সলিল চৌধুরী হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কবিতায় পড়ি সুভাষ মুখোপাধ্যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়েদের লেখা একেকটি আশ্চর্য রূপদর্শকে; অথবা সিনেমায় দেখি মৃণাল সেন। হাত ঘুরুঘুরু নাচের বিভঙ্গেতেই পালন করি বসন্তউৎসব, রবিঠাকুরের জন্মদিন। উত্তেজিত হই শাহবাগের খবরে, রমনার বটমূল থেকে হয়তো বা প্রিন্সেপ ঘাট – পদ্মাতেগঙ্গাতে প্রেম আর আন্দোলন, মিলেমিশে ঢেউ হয়ে বয়ে যেতে থাকে। অবিরত কবিতার মতো – স্বস্তিতেঅনায়াসেই।

 

অংবংচং বন্ধ হোক

 

এপারেতে যদি রূপম ইসলাম থেকে থাকেন, তো ওপারেতে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। বাংলাদেশের একটি টিভির অনুষ্ঠানে একটিবার দেখেছিলুম – এপার থেকে যাওয়া ‘দোহার’এর গানের দলকে ওপারের সঞ্চালক সম্বোধন করছেন, “ওপারের দোহারবন্ধুরা” বলেই। এপার আর ওপারের সেই দ্বন্দ্বমূলক বহুব্রীহি সমাস – বড্ডই কষ্ট দেয়। কাঁটাতারের ভাগ থাকুক, অথবা ধর্মবিশ্বাসের – কেবল পাশে থাকতে, আর ভালো থাকতে যে কিছুজনের সমস্যাটা ঠিক কোথায় – এতদিনেও তা বুঝে উঠতে পারিনি। জলেতে ভাগ, জমিতে ভাগ, এমনকি অন্তরীক্ষেও আকাশসীমার কড়াকড়ি, মনের ফাটল চওড়া হচ্ছে রোজ। গীটার তুলেই একেকটা দিন, রূপমেরা কি কখনও গান ধরবেন না, – লিরিকসেও কি লিখবেন না, যে – “(এই) অংবংচং বন্ধ হোক – মানুষ আবার মানুষ হোক …”

 

সম্প্রীতির ভাষাদিবস

 

এই আশ্চর্য ভাষাতেই লেখা হয়েছিলো সেই আশ্চর্য গান – “কি জাদু বাংলা গানে, গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে – গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা”। ভাগ থাকুক আইনের খাতায়, ধর্মগ্রন্থের পাতায় – বঙ্গভঙ্গ বা ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন যেন আমাদের ভিতরকার মনুষ্যত্বটুকুকেই মনে পড়িয়ে দেয়। আমাদের একতা – আমাদের ভাষাতে, আমাদের নিকোনো উঠোনে, আমাদের তুলসীমন্ডপে, পীরের সিন্নিতে, মুসলমান বেকারিতে সেঁকে পরে তৈরি হয়ে আসা বড়দিনের ফুলোফুলো নরম কেকের কামড়ে – এখানে বিশ্বাস হারানো পাপ। এমন অনেককটি ভাষা এখনও টিকে আছে, নাইজেরিয়াতে – পাপুয়া নিউগিনিতে, বা আরও দূরেকার কোনও দেশে, যে ভাষাতে হয়তো বা আজ, আর একজন বা দুইজন মাত্র কথা বলেন। তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই একেকটি করে এমন ভাষার অবলুপ্তি ঘটবে। বাংলার দশা তেমনটা নয় – তবু, ঠিক যে আশ্চর্য আবেগের সঙ্গে সেই একজন বা দুইজন বা একেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গোষ্ঠী তাদের সামান্য ভাষা আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটুকুকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করে চলেছে, সেই সংগ্রামকেও আমাদের কুর্নিশ করা উচিত। অবশ্য সংগ্রামই বা বলবো কেন ? এ কেবল একটা মনের মধ্যেকার ভালোবাসা, পাটভাঙ্গা কাপড়ে অঞ্জলি দেওয়ার সুখ। আমার মুখের সুস্পষ্ট উচ্চারণ – আমার সবথেকে বড় প্রেমের ধন।

 

একেকটা রঙের আঁচড়, একেকটা তুলির টান – একেকটা আলপনার নকশা, আমাদের জমিটাকে মনে পড়ায়। আমাদের ঐক্যটাকে মনে পড়ায়। কবিতা বা গানের উল্লেখ করে রাজনৈতিক বক্তাদের মতো গা গরম করবার কোনও বাসনা নেই। কেবল বলতে চাইব, ভাষার কাজ তো কেবল ভাব প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয় – তার কাজ ভাব বিনিময়ে। তার কাজ মালা গাঁথা – যোগাযোগের সেতুবন্ধন। ভাগ করাটা কোনও কঠিন কাজ নয়, বরং ভাব করাটাই শক্ত। ২১শের পুণ্যক্ষণে আমরা বরং মেলবার আর মিলিয়ে দেবার কথাটুকুকেই হাঁক পেড়ে ঘোষণা করি চলুন

 

সোনার কাঠি রূপোর কাঠির দেশ, পরাণকথার দেশ, এখানে বিচ্ছেদ হয় না – মানুষ মিলিত হয়, এখানে আমরা সবাই জাতিস্মর, আমাদের ঐক্যের ব্যারিকেড অক্ষয় থাকুক

আমার জন্ম নানাবাড়িতেসেটা ভাগীরথী নদীর পশ্চিম পাড়ে সাগরদিঘী ব্লকে। রাঢ় বঙ্গগ্রামের নাম হরহরি। সেখানে শুধু আমার জন্ম নয়, শৈশবও কেটেছেতাই বুঝি ৭১এর মুক্তি যুদ্ধের বোমা বর্ষণের আওয়াজ আমার কানে আজও বাজে। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য আমি আজও দেখতে পাই। যদিও তা নিয়ে আমার কোনও আতঙ্ক ছিল না তখন, বয়স তো সবে চার। ‘আতঙ্ক’ শব্দটার সঙ্গেই পরিচয় হয়নি। বরং ওসব নিয়ে প্রচণ্ড কৌতুহল ছিল। আর তা নিয়ে নিজের মতো করে বেড়ে উঠেছিলাম।

মনে পড়ে নিজের পৈতৃকবাড়িতে যেদিন প্রথম এলাম, সেদিনের কথা। একেবারে নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ। আরও আশ্চর্যর যেটা সেটা হল নানাবাড়িতে আমি যে ভাষার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম, এই বাড়িতে সেটার প্রচলন নেই। আমার দাদুদাদি, আব্বাচাচাফুফুরা নিজেদের মধ্যে এমন এক ভাষায় আমাকে যা জিজ্ঞেস করছেন, একআধটু বুঝতে পারলেও আমার পক্ষে উত্তর দেওয়া খুব রীতিমতো কঠিন। তবু চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে দেখে আমার দাদী তো আমাকে বলেই ফেলে ছিলেন, বাঙাল কহেকা! আমার খুব রাগ হয়েছিলকিন্তু রাগ দেখানোর সাহস সাহস পাইনিঅগত্যা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে কখনও ওই ভাষা উচ্চারণ করব না। আমি আমার মায়ের ভাষাতেই কথা বলব। বলা যেতে পারে, সেটাই ছিল আমার প্রথম বিদ্রোহ।

আমার মাতৃকুল খাঁটি বাঙালি। পিরফকিরদরবেশের বংশ। প্রখ্যাত লোকগবেষক শক্তিনাথ ঝা মহাশয়ের লেখা থেকে জানতে পারি আমার মাতৃকুল ছিল সন্ন্যাসীফকির বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী বংশ। আর আমাদের পূর্বপুরুষেরা আসলে ছিল বিহার না উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। লালগোলার রাজাদের পড়শিবন্ধু। তো সেই রাজাদের আমন্ত্রণেই তাঁদের লালগোলায় আগমন ঘটেছিল।

যাই হোক, আমার আব্বা কিন্তু আমার সেই বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিলেন। ক্লাসের বই বাদেও তিনটে থান ইটের মতো বই হাতে দিয়ে বলেছিলেন, স্কুলের বই ছাড়াও এগুলি তোমায় পড়তে হবে। না পড়লে জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে না।

আব্বার আদেশ অমান্য করিনি। কিছু না বুঝেই পড়েছিলাম বইগুলি। বাংলা অনুবাদে। বইগুলি ছিল ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ আর ‘ইলিয়াড’-‘ওডিসি’ পরে আরও অনেক বই– ‘রামমোহন রচনাবলী’, ‘মধুসূদন রচনাবলী’, ‘বিবেকানন্দ রচনাবলী’, ‘বঙ্কিম রচনাবলী’, ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’, ‘সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী’, ‘বৈষ্ণব পদাবলী’আরও কত কত বই! বাংলা ভাষার সব অমূল্য সম্পদ। এসব পড়ে জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়েছে কিনা জানি না, তবে আপন মাতৃভাষার প্রেমে এমনই মজে আছি যে, ঘুমে জাগরণে এই ভাষা ছাড়া আমি স্বপ্নও দেখতে পারি না।

যেমন আমার ছাত্র সহিদুল। তার পঞ্চম শ্রেণি। বাংলা পড়াচ্ছি। আল মাহমুদের কবিতা ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ যার প্রথম দু’লাইন –

নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। …”

এই কবিতাটির প্রথম আট লাইন বার কয়েক উচ্চারণ করে পড়িয়ে ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীকে বললাম, অন্তত আরো তিনবার পড় তোমরা নিজে নিজে

ওরা পড়তে শুরু করল। সেই ফাঁকে আমি কবি আল মাহমুদকে নিয়ে ভাবতে বসলাম। বাংলা ভাষায় এমন কবি ক’জন এসেছেন? তাঁর ‘সোনালি কাবিন’, আর ওই যে ভাষাদিবস নিয়ে লেখা সেই কবিতাটি

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ

দুপুর বেলার অক্ত

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?

বরকতের রক্ত।”

কোন ছেলেবেলায় পড়েছিলাম!

যদিও বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। এও শুনি তিনি নাকি সাম্প্রদায়িক! বাংলাদেশ নামক দেশটিকে সারাজীবন ইসলামি রাষ্ট্র বানানোর পক্ষে কাজ করে এসেছেন! সামরিক শাসক তো বটেই, জামাতিদের হাত শক্ত করতেও নাকি তাঁর ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক।

সত্যমিথ্যা জানি না, তবে কবি হিসেবে তিনি আমার কাছে অনেক বড়। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি।

যাই হোক, আমার এইসব ভাবনার মাঝে সহিদুল বলে উঠল, স্যারতিনবার পড়া হয়ে গেলআপনাকে শোনাব?

বললাম, শোনা।

সহিদুল পড়তে শুরু করল –

নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের ‘ঠিকিন’ চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। …”

আমি ভুল শুনছি না তো!

সহিদুলের পড়া থামিয়ে ওকে প্রথম থেকে আবার পড়তে বললাম।

সহিদুল আবার পড়তে শুরু করল –

নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের ‘ঠিকিন’ চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। …”

আবার খটকা লাগল। আবার পড়তে বললাম। আবার পড়ল সে। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম ‘মতো’ শব্দটির জায়গায় সে বারবার ‘ঠিকিন’ শব্দটির প্রয়োগ করছে।

করাটাই খুব স্বাভাবিক। আমার স্কুলটি যে অঞ্চলে সেখানকার মানুষেরা ওই ‘ঠিকিন’ শব্দটি ‘মতো’ জায়গায় পরম আদরে ব্যবহারে অভ্যস্ত। একেই বলে মায়ের ভাষা, মাতৃভাষা।

আমার সাহিত্যচর্চায় আমি কখনোই ভাষা নিয়ে তেমন কিছু ভাবিনি। ভাবতে হয়নি। আমার আশপাশে যাঁরা আছে, যাঁদের আমি সবসময় দেখিকথা বলি, এমনকি গাছপালাপশুপক্ষীইটপাথরকংক্রীট, তাঁরাই আমার সাহিত্যে চরিত্র হয়ে আসেতাঁরা তাঁদের ভাষায় কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করে একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করেএটাই তো স্বাভাবিক।

যেমন আমাদের পড়শি ঠোটকাট্টি ফুফু। আসল নাম কী ছিল, সেটা সে নিজেও ভুলে গিয়েছিল। তাঁর ঠোট কাটা ছিল বলে লোকে তাঁকে ঠোটকাট্টি বলে ডাকত। মেয়ে সজ্জ্বাকে নিয়ে সে পনেরোদিনবিশদিন কোথায় হাওয়া হয়ে যেত। যখন ফিরে আসত, আমরা জিজ্ঞেস করতাম, কোথায় গিয়েছিলে ফুফু? ফুফু বলতেন, শিরোদ্যাশ গেলছিনু বাপ।

এই ‘শিরোদ্যাশ’ কোথায় আমি জানতাম না। পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে, ভারতবর্ষের ম্যাপে তন্ন তন্ন করে খুঁজে পাইনি। অনেক পরে জেনেছিলাম শিরোদ্যাশ হল ‘শির’ মানে মাথার দিকে যে দেশ অর্থাৎ মালদাদিনাজপুর। ঠোটকাট্টি ফুফু মেয়ে সজ্জ্বাকে সঙ্গে করে ভিক্ষা করতে যেত সেইসব দেশে। সংগ্রহ করে নিয়ে আসত জীবন ধারণের রসদ।

আমিও সহিদুলের ঠিকিন নিজের ভাষা ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আর ঠোটকাট্টি ফুফুর ঠিকিন ভাষার রসদ সংগ্রহ করি তাঁদের অনাবিল সাধারণ জীবন ধারণ থেকেই। এর জন্য আমার দাদীর ঠিকিন কেউ আমায় বলতেই পারেন, বাঙাল কাহেকা! আপত্তি করব না।

রেসিপি

error: Content is protected !!