Tags Posts tagged with "mob lynching in West Bengal"

mob lynching in West Bengal

ছোটবেলায় আমার নাকি একটা বদ রোগ ছিল। মুখে খাবার নিয়ে বসে থাকতাম চুপচাপ। খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না। মা হাল ছেড়ে দিত যখন, দিদা বলত, ‘খেয়ে নাও, খেয়ে নাও, না হলে কিন্তু ছেলেধরা এসে পড়বে এক্ষুণি’। এটা আমার কানে গেলেই নাকি আমি ‘লক্ষ্ণী’ ছেলে হয়ে যেতাম। ছেলেধরা কথাটার সঙ্গে পরিচয় এমন ভাবেই। মাঝখানে তিনটে দশক কিভাবে যেন কেটে গেল। কবে যে বড় হলাম, ক্রমশ বুড়ো হলাম, চুপিসাড়ে। ছেলেধরা শব্দটাও যেন পাড়ি দিয়েছিল রামচন্দ্রের সঙ্গে, বনবাসে। ইদানীং সেই শব্দ ফিরে এসেছে আবার। তবে এই ফিরে আসাটা হঠাৎ হাওয়ায় উড়ে আসা ছোটবেলার ধনের মতো নয়। ছেলেধরা বললেই এখন মার শালাকে, ছেলেধরা বললেই এখন ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা কয়েকটা রক্তাক্ত খালি গা, কয়েকটা নুয়ে পড়া, ঝুঁকে পড়া বিধ্বস্ত মুখ। মুখে গ্যাঁজলা।

ছেলেধরা-র নতুন নাম রগড়। কিংবা উল্লাস।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ছেলেধরা’ গল্পে ছিল, ‘কলকাতায় যারা চাকুরি করে তারা এসে জানায়, সেদিন বউবাজারে একটা ছেলেধরা ধরা পড়েচে, কাল কড়েয়ায় আর একটা লোককে হাতে-নাতে ধরা গেছে, সে ছেলে ধরে ঝুলিতে পুরছিল। এমনি কত খবর!’ আমার আপনার চারপাশে ইদানীং ছেলেধরা সন্দেহে উত্তম-মধ্যম দেওয়া হচ্ছে যাঁদের, তাঁদের মধ্যে একজনকেও কিন্তু হাতে-নাতে কিছু কুকাজ করতে দেখা যায়নি। স্রেফ সন্দেহ। আর শুধুমাত্র সন্দেহের উপরে ভর করে রক্ত মাখা জয়োল্লাস। এই তো, টিভির থেকে গমগম করে ভেসে আসছে, ‘শিশুচোর সন্দেহে মার। উত্তপ্ত কাঁকুড়গাছি। ফুলবাগান থানায় আটক করা হল শিশুচোরকে।’ সম্প্রতি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চারটে গণপিটুনির নিউজফিড দিয়ে শিরোনামে এসেছিল হাওড়া। পুরো জেলা থেকে একটি শিশুও উধাও হয়নি, গায়েব হয়নি, কিন্তু ছেলেধরা সন্দেহে প্রতিদিন নিয়ম করে মার খেয়ে যাচ্ছেন কেউ না কেউ। টিকিয়াপাড়া, বেলুড়ের ভোটবাগান, সাঁতরাগাছির দক্ষিণ বাকসাড়া, মধ্য হাওড়ার শ্রীবাস দত্ত লেন—হাওড়ার গণপিটুনির যজ্ঞস্থলের তালিকা বেড়ে চলেছে রোজই। ওই জেলাতেই দিনকয়েক আগে চোর সন্দেহে মার খেয়েছেন এক সিভিল ভলেন্টিয়ারও। পুরসভা ঠোঁট উল্টে বলছে, গুজব যাতে না ছড়ায় তার জন্য লিফলেট বিলি করছি তো। পুলিশ বলছে, মাইকে প্রচার করছি তো। আর বাসিন্দারা বলছেন, এসব না করে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে লোককে বেধড়ক পেটাচ্ছে যারা, তাদের আগে পেটাক পুলিশ। আর পুলিশের কেউ কেউ আবার ফিসফিস করে বলছেন, পেটাক বললেই কি পেটানো যায়! কে কার স্নেহধন্য সেই হিসেব আগে।

একশ কুড়ি বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কি আক্কেলে লিখেছিলেন, ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে’। আবার ইমনকল্যাণ রাগ। তিনি জানতেন না, মহাবিশ্ব অনেক দূরের ব্যাপার, পাশের পাড়াতে গেলেও জনতার রাগ হয় আজকাল। রাগে মার, মারে মৃত্যু। ছেলেধরা, শিশুচোর সম্পর্কিত যতগুলো খবর চোখে পড়ল এ কদিন, সমীকরণের ধ্রুবকের মতো একটা শব্দ তাতে কমন। ‘অপরিচিত’। ‘এ পাড়ায় তো লোকটাকে আগে দেখা যায়নি।’ এ বারে খুব সহজ দুয়ে দুয়ে চার। লোকটা অপরিচিত, সুতরাং লোকটার মতলব ভাল নয়। মতলব ভাল নয়, সুতরাং লোকটা নিশ্চয়ই ছেলেধরা। অতএব, অ্যাই কে আছিস, ধর শালাকে, ক্যালা। বাদ যাচ্ছেন না মহিলারাও। হাওড়ার বেলিসিয়াস রোডে দিন তিন চারেক আগে গণপিটুনির শিকার হলেন যে মহিলা, তাঁর অপরাধ, ক্ষিদে পেয়েছিল। বাড়ি কোন্নগরে। পেটের দায়ে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিউটিশায়ানের কাজ করেন। কাজে বেরিয়ে টিকিয়াপাড়ার স্থানীয় একটা বেকারির থেকে তিনি রুটি কিনতে গিয়েছিলেন। রুটি জোটেনি, অপরিচিত সন্দেহে, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি জুটেছে। ঘটনাটা আশ্চর্যের হলেও সত্যি। আরও আশ্চর্যের কথা হল, খবর পেয়ে (স্যাটেলাইট যুগেও পুলিশ অবশ্য বরাবরই দেরি করে খবর পেয়ে থাকে) পুলিশ যখন ওই মহিলাকে উদ্ধার করতে যায়, তখন রাস্তা থেকে, ছাদের উপর থেকে পুলিশকে লক্ষ করে ইঁট ছুঁড়তে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। এর মানে হল, আইন পকেটে নিয়ে এই তো উচিত শিক্ষা দিচ্ছি বেশ। তোমরা এলে কেন? তফাৎ যাও।

‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে’, অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা পড়ে, মাধ্যমিকে এক্সট্রা পাতা নিয়ে, ফাটিয়ে লিখে বাঙালি ভাব সম্প্রসারণে দশে সাড়ে নয় পায়। সম্প্রসারণের মেয়াদ ওই খাতাটুকুই। মজ্জাগতভাবে আমরা বিশ্বাস করি, নিজেদেরকে নিজেরাই বলি, উটকো ঝামেলায় জড়াবি না একদম। দুটো বাসের রেষারেষিতে কোনও মানুষের হাঁটুর থেকে বাকি পাটা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝোলে যখন, আমরা তখন ষোল মেগাপিক্সেলের ক্যামেরায় অবজেক্ট খুঁজি, মোবাইল ফোনের চক্রব্যুহ গড়ে তুলি এক লহমায়, কিন্তু লোকটাকে কেউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি না। গণপিটুনি শব্দটার মধ্যেই তো গণ কথাটা মিশে থাকে। ভাবতে অবাক লাগে, এই আপামর জন গণের একজনের মনের মধ্যেও কি অন্যরকম কিছু হয় না? মনে হয় না, যেটা হচ্ছে সেটা ভুল, একে থামানো দরকার? মনে হয় না, লোকটাকে সন্দেহ করা হচ্ছে কেন, শুধু পাড়ায় আগে দেখা যায়নি বলেই? মনে প্রশ্ন আসে না, আমিও তো কাল নিজের প্রয়োজনে যেতে পারি অন্য কোনও অঞ্চলে। আমার সঙ্গেও যদি একই রকম কিছু ঘটে যায়? খবরের কাগজে গণধোলাইয়ের শিকারের যে ছবি ছাপা হয় প্রতিদিন, তাতে শিকারের সঙ্গে একই ফ্রেমে শিকারীর ছবিও থাকে। তারা জানে ফটো উঠছে। মিডিয়ার লোক দেখে শিকারীরা পোজ দেয়। এসএলআর-এ ফুটে ওঠে ক্যানাইন-দাঁত।

তমলুকের এক প্রধান শিক্ষকের হয়তো মতিভ্রম হয়েছিল। খারুই ইউনিয়ন হাইস্কুলের হেডমাস্টারমশাই অনুপম জানা খারুই বাজারে দেখেছিলেন, ছেলেধরা সন্দেহে মারধর করা হচ্ছে ওনারই স্কুলে প্রশিক্ষণ নিতে আসা রাজস্থানের এক যুবককে। পুলিশ নয়, ঘটনাস্থল থেকে ওই ভিনরাজ্যের যুবককে উদ্ধার করে স্কুলে নিয়ে আসেন স্বয়ং প্রধান শিক্ষকই। এর শিক্ষা পেতে অবশ্য অনুপমবাবুর বেশি দেরি হয়নি। ছেলেধরা যুবককে ‘সবক’ শেখানোর আগেই কেন নিয়ে যাওয়া হল, তার শিক্ষা দিতে স্কুলে ঢুকে অনুপমবাবুর উপরেই চড়াও হয় উণ্মত্ত জনতা। তাকে রীতিমতো হেনস্থা করা হয়। আমরা প্রার্থনা করি, প্রধান শিক্ষকের যেন চৈতন্যোদয় হয়।

ডুয়াল ক্যামেরায় সদ্য বানানো মটন রোগানজোসে ফোকাস করা তেলের বিন্দু, এনজয়িং ধামাল উইথ তমাল—ফেসবুকের দৌড় এটুকু হলেই হয়তো ভাল ছিল। এই তো সেদিন একটা পোস্ট দেখলাম, তাতে লেখা, পাড়ার কিংবা বেপাড়ার কোনও অচেনা বাচ্চাকে যেন চকোলেট, টফি না খাওয়াই। ওসব খাওয়ালেই নাকি ওই অচেনা বাচ্চা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করবে, জোর করে বমি করবে আর আপনি ছেলেধরা সন্দেহে মার খাবেন। সোশ্যাল মিডিয়া উপদেশ দিচ্ছে, কোনও লোক যদি পাড়ার রাস্তা চিনতে না পারে, তাহলে কিছুতেই যেন সাহায্য না করা হয়। হতেই পারে, ওরা ছেলেধরা গ্যাংয়ের সদস্য। একটা অদ্ভুত কানা বৃত্তের মধ্যে ঘুরে চলেছি আমরা। ঘুরেই চলেছি। সোশ্যাল মিডিয়া গুজব ছড়াচ্ছে। আম আদমি ওই গুজবটাকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করছে। ‘আমাদের সরকার আমাদের পাশে’ বলে টলিউডের দুষ্টু-মিষ্টিরা টিয়াপাখির মতো করে যা বলছেন তার সারমর্ম কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল নাকি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এ কাজ করে চলেছে..। পুলিশ বলছে গুজবে কান দেবেন না, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। আবার পুলিশ পরিস্থিতি সামলাতে এলে জনতাই পুলিশকে ইঁট-পাটকেল ছুঁড়ছে। এর কোন পথে সমাধান জানা নেই।

সমীক্ষা বলে, আমরা নাকি গড়ে দিনে দুশবার মোবাইল দেখি। আর কমিয়ে না বললে ওই দুশর মধ্যে একশ নব্বই বারই চেক করি ফেসবুক। ফেবু স্বর্গ, ফেবু ধর্ম, ফেবুহি পরমং তপ। দুনিয়া ভুল বলতে পারে, কিন্তু আমার বারো হাজারি মোবাইলের বাহারি অ্যাপের সাত ইঞ্চি স্ক্রিন নয়। হীরক রাজা আজকের দিন দেখলে বুঝতেন, মগজ ধোলাইটাই এর একমাত্র পথ।

যদি কোনও দিন কোনও সত্যিকারের ছেলেধরা দেখেন, আমায় একটু জানাবেন প্লিজ। বিশ্বাস করুন, ইয়েতিও দেখতে চাই না। কিন্তু ছেলেধরা দেখার বড় শখ। ছেলে ধরে কি করে ঝুলিতে পোরে দেখি।

আর একটা কথা। নিজেকে একটু ‘পরিচিত’ করার চেষ্টা করুন। ‘অপরিচিত’দের বেগতিক দেখছেন তো!

রেসিপি

error: Content is protected !!