Tags Posts tagged with "rosogolla"

rosogolla

বলিউডের পাশাপাশি #MeeToo এবার টলিউডেও। অভিযোগ ‘রসগোল্লা’-ছবির পরিচালক পাভেলের বিরুদ্ধে। এবং সেই খবরটি আপাতত ছড়িয়ে পরেছে গোটা টলি পাড়া জুড়ে।

সম্প্রতি অভিনেত্রী অনুপমা চক্রবর্তী একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে পাভেলের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ আনেন। সেই পোস্ট অনুযায়ী,বেশ কয়েকবছর আগে অডিশনের সূত্রে আলাপ হয় পাভেলের সঙ্গে, রসগোল্লা ছবির জন্য অভিনেতা অভিনেত্রীর খোঁজ চলছে তখন। সেই সময়ই তাঁকে, অনুরূপাকে পছন্দ হয় পাভেলের। এরপর প্রায়ই চিত্রনাট্য নিয়ে বসতেন তাঁরা, পাভেলের নাকতলার বাড়িতেও যেতেন অভিনেত্রী। তিনি লিখছেন, “আমি তখন হতাশায় ভুগছি, তেল মাখা চুল,কুর্তি আর মেকআপ ছাড়াই পৌঁছে যাই ওঁর  বাড়িতে। সেখানেই যৌন হেনস্থার শিকার হতে হয়। ওর আচরণে স্পষ্টই বোঝা গিয়েছিল আমাকে গরীব ঘরের মেয়ে মনে করেছিল পাভেল।” অভিনেত্রী আরও লেখেন ‘একদিন হঠাৎই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আমায় চুমু খেতে শুরু করে, আমি কোনওক্রমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে আসি সেখান থেকে।”

তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন পাভেল। তাঁর দাবি ২০১৬ সালে এইধরনের কোন ঘটনা ঘটে থাকলে আজকে এতদিন পর সেই কথা কেন বলছেন অভিনেত্রী। এদিকে অভিনেত্রীর কথায় নিজেকে টলিউডে কিছুটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন আগে। নাহলে তাঁর কোন কথারই গুরুত্ব দেওয়া হত না বলে জানান অভিনেত্রী।

প্রসঙ্গত,সম্প্রতি বিরসা দাশগুপ্তর ছবি’ ক্রিসক্রস’-এ অভিনয় করেছেন অনুপমা চক্রবর্তী। এছাড়াও জি ফাইভের ‘কালী’ সহ আড্ডা টাইমস-এর সিরিজ ‘ইন দেয়ার লাইফ’-এ দেখা যাবে এই অভিনেত্রীকে। অন্যদিকে ‘বাবার নাম গান্ধীজি’ ছবি দিয়ে টলিউডে পা রাখলেও ‘রসগোল্লা’ ছবি পরিচালনার পরই জনপ্রিয় হন পাভেল।

কে কবে রসগোল্লা আবিষ্কার করেছিলেন, সেটা জানার জন্য উলটে-পালটে দেখছিলাম শংকরের লেখা ‘রসবতী’। বইটার পুরো নাম ‘রান্নাঘর, কিচেন কিংবা রসবতী’ আর তার সঙ্গে ছোট করে জুড়ে দেওয়া আছে একটা কথা – ‘বঙ্গীয় রসনার রসালো কাহিনী’। মোটামুটি এর থেকেই নিশ্চয় বুঝতে পারছেন বইটা কী বিষয়ে লেখা।

শংকর সেখানে স্পষ্ট লিখছেন, ‘বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি, তার মিষ্টান্নের ইতিহাসও বেশ অস্পষ্ট এবং পরস্পরবিরোধী তথ্যে ভরা। বাগবাজারের নবীন ময়রার অনেক আগে রানাঘাটে ১৮৪৬-৪৭ সালে জনৈক হারাধন ময়রার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে যিনি উপাদেয় রসগোল্লার সৃষ্টি করেছিলেন স্থানীয় জমিদার পালচৌধুরীদের জন্য, রসগোল্লা নামটা নাকি জমিদারবাবুই দেন।’ কয়েক লাইন পরে লিখছেন অন্য আরেকটা মত, ‘স্পঞ্জ রসগোল্লা বহরমপুরের ১৬ মাইল পূর্বে ইসলামপুরের কাছে কালাভাঙাঘাটে ফটিক সরকার নামে এক ময়রা আবিষ্কার করেন। এখন ফটিক সরকারের দোকান নেই, কিন্তু কালাভাঙাঘাটের আদি স্পঞ্জের রসগোল্লা এখনও বিক্রি হয়।’

নবীন চন্দ্র দাশ

‘রসগোল্লার উদ্ভাবক’ বলার বদলে নবীন ময়রাকে ‘স্পঞ্জ রসগোল্লার উদ্ভাবক’ বললে যে প্রকৃত সম্মান করা হবে, সেটা লেখার পাশাপাশি শংকর এই প্রসঙ্গে ইতি টেনেছেন এটা লিখে যে, ‘আসলে সব শিল্পীই একই মিষ্টান্নে নতুন কিছু সংযোজন করেন… অমন যে অমন রসগোল্লা তার উদ্ভাবককে সমস্ত জাত যে একসঙ্গে নতমস্তকে স্মরণ করবে, সম্মানিত করবে তার পথ খোলা নেই… বড় একজন ঐতিহাসিক, বিরাট এক বাহিনী নিয়ে উনিশ শতকের বাংলায় মিষ্টান্ন রহস্যের ওপর আলোকপাত করলে বাঙালি জাতের মুখরক্ষা হবে।’ (পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬)

সত্যি সত্যি কে রসগোল্লা তৈরি করেছিলেন, সেটা নিয়ে যে এখনও কেমন ধাঁধা রয়ে গেছে, সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন এবারে। এখান থেকে আসুন ‘রসগোল্লা’ সিনেমায়। প্লিজ এটা ভেবে নেবেন না যে, ‘রসগোল্লা’র আবিষ্কার নিয়ে এই ধাঁধাগুলো কেটে যাবে ছবিটা দ্যাখার পর। ছবিতে নবীনচন্দ্র দাশ বা তাঁর স্ত্রী ক্ষীরোদমণির মত বাস্তবের মানুষজন রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ছবি শুরুর ডিসক্লেমার মন দিয়ে পড়লে এটা বুঝতে পারবেন যে, ছবিতে দ্যাখান সব ঘটনা একেবারে কাট-পেস্ট সত্যি বলে দাবি করছেন না কেউ।

আমার মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের মশলা দিয়ে মনের মত সাজিয়ে তুলে তৈরি এই ছবি আসলে অনেকটা যেন রূপকথার মতো।

এই রূপকথায় অবশ্য চেনা ফরম্যাটের সেই রাজা-রানিরা নেই। ‘এক যে ছিল রাজা’ বলে শুরু হচ্ছে না গল্প। সত্যজিৎ রায়ের ‘সুজন হরবোলা’ পড়েছেন তো? জীবনের দুঃখ-কষ্ট কাটিয়ে উঠে খুব সাধারণ ঘরের গুনী ছেলেরা যেখানে শেষ অবধি লড়াই জিততে পারে। মনে হচ্ছিল, নবীনচন্দ্র দাশের গল্প বলতে গিয়ে পরিচালক পাভেল বেশ কয়েকবার সেই ‘সুজন হরবোলা’ পড়ে নিয়েছিলেন কিনা।

কারণ এখানে নবীনের যে গল্পটা দ্যাখান হয়েছে, সেটাও তো কার্যত ওই ফরম্যাটেই বাঁধা। বাবা নেই নবীনের (অভিনয়ে উজান গঙ্গোপাধ্যায়)। বিধবা মাকে (বিদীপ্তা চক্রবর্তী) নিয়ে জ্যাঠা হরিমাধবের (কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়িতে তাঁর দয়া-ভরসায় থাকা। বাড়িতে রান্নার কাজ করে নবীন, কিন্তু যতই ভাল রান্না করুক না কেন, সব বখশিস জোটে গিয়ে বাড়ির ঠাকুর কার্তিকের কপালে। কদাচ ওর কপালে নয়। কেন? ভাইপো নবীন যে ‘মেয়েছেলে’দের মত রান্না করে, সেটা মানতে লজ্জায় যে ঘাড় হেঁট হয়ে যায় জেঠুর! উঠতে-বসতে গঞ্জনা শুনে নবীনের দিন কাটে!

বড় মুখ করে নবীন যখন বলেই ফ্যালে, ‘আমি ময়রা হব’, ক্ষোভে ফেটে পড়েন জ্যাঠা। ‘আমাদের সাতপুরুষে কখনও কেউ একাজ করে নি। আর তুই ময়রা হবি?’ নবীন বুঝতে পারে, এই হল তার মহাযুদ্ধ শুরু।

মায়ের তদবিরে বাগবাজারে কালিদাস ইন্দ্রের (রজতাভ দত্ত) মিষ্টির দোকানে কাজ জুটে যায় ওর। আর কপাল ফেরে প্রেম জুটে যায় ভোলা ময়রার কন্যা ক্ষীরোদমণির (অবন্তিকা বিশ্বাস) কাছে। সেই ক্ষীরোদই ওর কাছে আবদার করে বসে, এমন একটা মিষ্টি বানিয়ে দিতে হবে, যেটা হবে এক্কেবারে নতুন। ‘চটচটে নয়, শুকনো হতে মানা / দেখতে হবে ধবধবে চাঁদপানা / এমন মিষ্টি ভূ-ভারতে নাই / নবীন ময়রা, এমন মিষ্টি চাই।’

জীবনে একের পর এক বিপর্যয়। মিষ্টির দোকানের চাকরি আর জ্যাঠার বাড়ির আশ্রয়, দুটোই ঘুচে গেল একসঙ্গে। মাকে নিয়ে বলতে গেলে তখন পথে এসে দাঁড়াল নবীন। পার্টনার চন্দুবাবুর (শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়) ভরসায় দোকান খুলতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হাল হয়ে দাঁড়াল তার। সেখান থেকে কী ভাবে প্রাণপণ যুদ্ধ করে জীবনের মোড় ফেরাল ও, আর শেষ-মেশ আবিষ্কার করে উঠতে পারল ক্ষীরোদের বলে দেওয়া সেই ‘ধবধবে চাঁদপানা মিষ্টি’, সেটা নিয়েই বাকি পুরো ছবির গল্পটা।

এই গল্পে বড় খটকার জায়গাটা কোথায়, জানেন? যে ঘটনাগুলো সিনেমায় একের পর এক দ্যাখান হতে থাকে, সেগুলো যে কাট-পেস্ট সত্যি নয়, বরং কল্পনা দিয়ে তৈরি, সেটা কোথাও তেমনভাবে বলা রইলো না বলে। ছবির শুরুতে ওই আড়াই সেকেন্ডের ডিসক্লেমার তো আর মনে রাখবে না কেউ? কিংবা ছবির একটা গানে ‘লোকগাথা’ শব্দের প্রয়োগ, বা ছবির শেষ দিকে দিদিমার কাছে ছোটদের গল্প শোনার দৃশ্যও হয়তো চোখ এড়িয়ে যাবে। পাবলিকের মাথায় গজাল মেরে বরং এটাই তো প্রায় গেঁথে বসে যাবে যে, ‘রসগোল্লা’ আবিষ্কারের ক্রেডিট শুধু এই একটা লোকেরই বুঝি।

শংকরের লেখা বইয়ের সেই হারাধন ময়রা বলুন, কিংবা ফটিক সরকার। ব্রজ ময়রা বলুন কিংবা দীনু মোদক। যাঁদের যাঁদের নাম জড়িয়ে রয়েছে এই মিষ্টিটার সঙ্গে, এই সিনেমা তো সেই সব নামগুলোই ধুয়ে-মুছে যেন সাফ করে দিল পুরো!

হ্যাঁ, অবিসংবাদিত ভাবে একটা নামেই শুধু আবিষ্কারকের স্ট্যাম্প পড়ে গেল যে! আর মজার কাণ্ড দেখুন আরও, ছবির শুরুতে আপনি এটাও দেখতে পাবেন যে সেই ভদ্রলোকের মিষ্টির কোম্পানি আবার এই ছবির অ্যাসোসিয়েট স্পনসরও বটে!

তখন আপনার এটাও তো মনে হতে পারে, চমৎকার এই ছবিটা আসলে সুকৌশলে তৈরি কোন ব্র্যান্ড বিল্ডিং প্রচার-চিত্র নয় তো?

ভীম নাগ (অভিনয়ে তমাল রায়চৌধুরী) কি গঙ্গার ঘাটে বসে সত্যি ওভাবে তেল মাখতেন গায়ে? আর গাঙ্গুরামের পূর্বপুরুষ কি সত্যি মামুলি এক গোয়ালা ছিলেন শুধু? গোয়ালারা ইচ্ছে মত দুধের দাম বাড়াতে থাকলে সত্যি কি নবীন ময়রা ভীম নাগের কাছে একজোট হতে যান? এগুলো সত্যি কিনা, কিছুই জানি না আমি। তবে এইটুকুনি ভালই জানি যে, এই সিনেমা দেখলে এগুলোর সবটাই পুরো সত্যি মনে হবে!

খটকাটা কোথায়, সেটা এবার ক্লিয়ার হচ্ছে তো? যে সমস্ত নামগুলো আজ মিষ্টির দোকানের আলাদা আলাদা ব্র্যান্ড হয়ে গ্যাছে পুরো, কল্পনার এক রূপকথাতে সেই নামগুলো এখানে-সেখানে এমনভাবে বসিয়ে দেওয়াটা ঠিক হল কি আদৌ?

খুব কুশলীভাবে ছবিতে এসেছে একের পর এক গান। শুরুতেই দেখতে পাবেন ‘খোদার বান্দা’ গানে উদাত্ত ফকিরি নাচ, সঙ্গে সুপ্রিয় দত্তের ক্যামেরায় চোখ-জুড়ানো বাংলা। ‘কইয়া গ্যাছে পীর পয়গম্বর / খোদা নামবে ফাইট্যা অম্বর / দেখতে আসবে সেই বান্দারে / বিকোয় না যে হাট বাজারে।’ ছবির অন্য ত্রুটি যেন মাফ হয়ে যাচ্ছিল এরকম গানের দৌলতে। লিরিক তো মনে হচ্ছিল মনের মধ্যে মালটি-লেয়ার্‌ড ধাক্কা মারছে এসে!

শুধু এই একবার নয়, যখনই মনে হচ্ছিল একটু যেন ঢিমে হয়ে আসছে ছবির স্ক্রিপ্ট, সঙ্গে সঙ্গে ছবির মুডটা চাগিয়ে দিতে এসে পড়ছে একঘর সব গান। যেমন ধরুন, এটা যখন মনে হল যে, নবীন আর ক্ষীরোদের লাভ-স্টোরিটা বড্ড যেন মেক-বিলিভ, অমনি শুরু হয়ে গেল ‘টাপুর টুপুর বৃষ্টি নূপুর, জলছবিরই গায় / তুই যে আমার একলা আকাশ মেঠো সুরের ছায়’। ধুম করে এসে যেন আমায় শক মারল গানটা। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল জমে যাচ্ছিলাম আমি। অঝোর বৃষ্টিতে অল্প পোশাকে এর আগেও তো কত হিরোইনকে ভিজতে দেখেছি, কিন্তু আগে কখনও এই রকমটা হয়েছে?

বা ওই গানটা ধরুন, ‘ওরে নবীন ওরে কাঁচা / আধমরাদের বাঁচা’। যে সুরে যে ছন্দে ছবির যে মোক্ষম ক্ষণে বেজে উঠল গানটা, সেই সিচুয়েশনটা বাস্তব-অবাস্তব যাই হোক না কেন, গানের ওই অ্যাপ্লিকেশনে গায়ে কাঁটা দিয়ে, চোখে জল আর গলায় আবেগ এসে তখন তো প্রায় একসেকার কাণ্ড হওয়ার জোগাড়!

এরকম সব ট্রিটমেন্টগুলো আপনি নিজে ভেবে বের করেছেন পাভেল? আর রিসেন্ট একটা ইন্টারভিউতে পড়লাম এই ইন্ডাস্ট্রিতে আপনার জার্নি নাকি শুরু হয়েছিল ‘স্পট বয়’ হয়ে! সেখান থেকে আপনি আজ এরকম একটা ছবির ডিরেক্টরের চেয়ারে? আপনাকে সাবাশি না দিয়ে থাকব কী করে বলুন? তা’ সে থিওরিটিক্যালি ছবিটা নিয়ে আমার যত খুঁতখুঁতুনিই থাকুক না কেন!

বাংলা ছবির সীমিত বাজেটের মধ্যেই যে কী অপরিসীম মমতা নিয়ে ছবিটা বানিয়েছেন, সেটা বুঝতে পারছিলাম একদম প্রথম ফ্রেম থেকে। ছবি তো নেহাত কম দেখিনি জীবনে। কিন্তু ছবির শুরুতে ধূমপান নিষেধের বাঁধাগতের বাণীটাকেও যে ছবির থিমের সঙ্গে মিলিয়ে অমন কৌতুক রচা যায়, সেটা তো আপনার আগে আর কাউকে কখনও এভাবে করে দ্যাখাতে দেখিনি ভাই!

ফের ছবির গল্পে ফিরি। ছবিতে দেখছি, নবীন চন্দ্র দাশ শুধু প্রোডাক্ট আবিষ্কার করে থেমে থাকছেন না, স্ত্রীর পরামর্শে ভাবতে শুরু করছেন তার মার্কেটিং নিয়ে। আর ওদিকে তাঁর স্ত্রী ক্ষীরোদমণি গোঁসা করে বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছেন বর ‘রসগোল্লা’র পেটেন্ট নিতে রাজি হচ্ছেন না বলে। হ্যাঁ, ওই যুগের নিরিখে এগুলো হয়তো তুমুল বাড়াবাড়ি বলেই ঠেকে। কিন্তু মজাটা কী জানেন? এগুলো স্ক্রিনে যখন ঘটছে, ততক্ষণে এমন ভাবে ইমোশনাল কানেক্ট ঘটিয়ে ফেলেছে ছবির স্ক্রিপ্টটা, যে তখন দর্শক হিসেবে আপনি ওসব ঠিক-বেঠিক আর ধরার জায়গায় নেই!

এরপরে ছবিতে আছে একের পর এক তারকা-মুখ আর সু-অভিনেতার ভিড়! টুকরো টুকরো দৃশ্য মাতিয়ে গেছেন চিরঞ্জিত, শুভশ্রী, লাবনী সরকার, অপরাজিতা আঢ্য বা কৌশিক সেন এসে। ‘হামি’র সেই গাবলু-গুবলু ব্রত অবধি আছে!

তবে একথা ঠিক যে, ছবির রিসার্চে আরও যত্ন আপনি দিতে পারতেন পাভেল! কয়েকটা ব্যাপার খুব লাগছিল এসে চোখে। আজ থেকে অত বছর আগে নবীনের পক্ষে কি পসিবল ছিল বক্তৃতা দিতে গিয়ে ‘কান খুলে শুনে রাখো’র মত লব্জ ইউজ করা? এটা তো একেবারেই হিন্দি ছবির প্রভাবে তৈরি অনতিঅতীতের কথা!

আর একটা ব্যাপার বুঝলাম না, একটা বিশাল কড়া ভর্তি মিষ্টি রান্নার মধ্যে তিন-চারটে আফিমের ডেলা যদি পড়েই যায়, তাহলে কি সেটা এত বিষাক্ত হয়ে পড়ে যে ওই মিষ্টি খেলে মানুষের তৎক্ষণাৎ রক্তবমি হবে?

নবীনের সঙ্গে ক্ষীরোদের বিয়েটা ছবিতে যেভাবে দ্যাখান হল, সেটা তো খুব ফরমায়েশি ইচ্ছেপূরণের মত। ভোলা ময়রার নাতনি, সাতমহলা বাড়িতে তাঁর বাস। হুট করে ওরকম চালচুলো-নেই একটা লোকের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করে ফেলল বাড়ির লোকে?

ছবিতে নবীন চন্দ্র দাসের দোকানের প্রধান কারিগর তাঁর অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী মহেশ (খরাজ মুখোপাধ্যায়)। মহেশ আগে কাজ করতেন কালিদাস ইন্দ্রের দোকানে। কী কারণে সেরকম বর্ধিষ্ণু দোকান থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে এসে সারা জীবনের জন্যে জুড়ে গেলেন হতশ্রী নবীন ময়রার সঙ্গে, সেটাও ছবিতে স্পষ্ট হয় নি ঠিক।  

টুকরো টুকরো ভাল-লাগার সঙ্গে এভাবে মিলে যাচ্ছিল টুকরো টুকরো খারাপ-লাগা আর না-পাওয়াগুলোও। একটা ব্যাপার দেখে তো খারাপ লাগল খুব যে ছবির বেশ কিছুটা অংশ ধরে হাসির খোরাক করে তোলা হল একজন এফেমিনেট মানুষকে। একটু পরে তাঁকেই আবার দ্যাখান হল ঠগ জোচ্চোর হিসেবে! মেয়েলি স্বভাবের পুরুষের ভাবভঙ্গী ইউজ করে লোক হাসানোর মত চটুল ইনসেনসিটিভ ট্রিটমেন্টগুলো এমন একটা ছবির সঙ্গে যাচ্ছে কিনা, সেটাও একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ।    

বাংলা হরফে ছবির বিগিনিং ক্রেডিট দ্যাখানোর স্টাইলটা তো বেশ! কিন্তু ছবির নায়িকা অবন্তিকা বিশ্বাসের নামের পাশে ওভাবে ‘নবাগত’ লিখে দিলেন কেন? বছর তিনেক আগেই তো অবন্তিকাকে নায়িকা হিসেবে দেখতে পেয়েছিলাম ‘ওটাই Last MMS’ (২০১৫) ছবিতে। সে ছবিতে অবন্তিকার সহ-অভিনেতা ছিলেন রাহুল বা শিলাজিতের মত নামী-দামি নায়ক-গায়কেরা। মিনার-বিজলী-ছবিঘর চেনে মুক্তি পেয়েছিল ছবি, ইন্টারনেটে সার্চ মেরে ইউটিউব থেকে সে ছবি দেখে নিতে পারেন আজও।

এই সময়টা মনে হচ্ছিল, ছবির নায়িকা আগে আর কোন ছবি করেছেন কিনা, সেই রিসার্চটুকুও করেন নি যাঁরা, দেড়শো বছর আগে বাংলায় কী হয়েছে না হয়েছে, সে সব কিছু রিসার্চ করে খুঁজে বের করা কি তাঁদের পক্ষে পসিবল নাকি ভায়া!

শুরুর ক্রেডিটে শিল্প-নির্দেশক নীতীশ রায়ের নামের বানানটা পর্যন্ত ভুল চলে গেল! লেখা হয়ে গেল ‘নিতীশ’! জানি না অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে ভদ্রলোক নামের ওই বানানটাই ব্যবহার করে থাকেন কিনা।

আর একটা মেজর খামতি বলছি শুনুন। ছবি দেখে ওঠার পর খুব ইচ্ছে করছিল সত্যিকারের নবীন চন্দ্র দাশ, ক্ষীরোদমণি দেবী বা ভীম নাগেদের কেমন দেখতে ছিল, সেটা দেখতে। কিন্তু তাঁদের ছবি-টবি তো দেখতে পেলাম না কোথাও! এন্ড ক্রেডিটে ছিল কি? থাকলেও আমি দেখতে পাই নি সেটা। কারণ এন্ড ক্রেডিট শুরু হওয়া মাত্র হল-এর আলো জ্বালিয়ে দিয়ে শিবপ্রসাদ-নন্দিতা রায়-পাভেল-উজান-অবন্তিকারা সব হৈ হৈ করে স্টেজে উঠে এলেন যে! শুরু হল দর্শকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা দেওয়া-নেওয়ার পালা!

তবে, ছবির টুকরো টুকরো ভুলগুলোকে ধরেই বলছি, হালে তৈরি বাংলা ছবির মানের নিরিখে ‘রসগোল্লা’ কিন্তু রীতিমত চমকে দেওয়ার মত! পাভেলের আগের ছবি ‘বাবার নাম গান্ধীজি’ (২০১৫) দেখেও এতটা ভাল লাগে নি আমার, যতটা লাগল এটা।

সবে পাভেলের দ্বিতীয় ছবি এটা। বেশি কিছু বলতে চাই না এখনই। তবে এটুকু না লিখে পারছি না যে, ওভার-হাইপ্‌ড ভুলভাল বাংলা সিনেমা দেখতে দেখতে ক্লান্ত চোখে হঠাৎ করে পাভেলের এই ছবিটা দ্যাখা যেন একঝলক টাটকা হাওয়ার মত।

পেশার খাতিরে সাত-তাড়াতাড়ি গিয়ে একলা দেখেছি ছবি। ফেরার সময় বাড়ির বাকি সবার জন্যেও টিকিট কেটে নিলাম। প্রিয়জনদের এ ছবি না দেখিয়ে থাকব কী করে, বলুন?

আর ঠিক করেছি নিজেও ছবিটা পরে আবার দেখতে যাব আমি। একবার নয়, পরপর আরও বেশ কয়েকবার। 

রেসিপি

error: Content is protected !!