Tags Posts tagged with "South Africa"

South Africa

লিখেছেন -
0 184

রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে অনেক সময়ই দেখতে পান কুকুর বা বিড়াল | মানুষ আর পশুর পাশাপাশি সহাবস্থান তো প্রকৃতিরই নিয়ম | কিন্তু তাই বলে গরু  ছাগল  কুকুর বিড়াল বা ভেড়া নয়‚ একেবারে সিংহ ! শুনলেই তো ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় ! কিন্তু এমনই ঘটনার সাক্ষী রইলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের কিছু অভিযাত্রী |

প্রায় সপ্তাহ দুয়েক আগে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় মৃদুমন্দ চালে সিংহ দেখতে সাফারিতে বেরিয়েছিলেন গুটিকয়েক সওয়ারি | কিন্তু তাঁদের আর বিশেষ কসরৎ করে খুঁজতে হল না সিংহ | বরং পশুরাজ নিজেই এসে ধরা দিলেন তাঁদের দৃষ্টিতে | রাজকীয় ভঙ্গীতে ৪ টি সিংহ ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের রাস্তা দিয়ে কয়েকটি গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যায় | গাড়িতে বসে আছেন বহু দর্শনার্থী | থরহরি কম্পমান অবস্থায় সেই সিংহের ভিডিও তোলেন তাঁরা |


লায়নস অফ ক্রুগার পার্ক অ্যান্ড স্যাবি আইল্যান্ড নামে এক ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয় এই ভিডিওটি | পোস্ট হবার পরেই ২০ লক্ষ মানুষ দেখেন এই ভিডিও |৩৪‚০০০ বারেরও বেশি শেয়ার করা হয়েছে ভিডিওটিকে | বহু মানুষই প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন ভিডিওটি আদতেই তাঁদের কাছে ভয়ের শিহরণ জাগানো |

জনপ্রিয় হ্রদ ‘লেক ভিক্টোরিয়া’ হল আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম হ্রদ । তানজানিয়া, কেনিয়া ও উগান্ডার মধ্যবর্তীস্থলে অবস্থিত এই লেক কিন্তু আফ্রিকার নীল নদেরও উৎপত্তিস্থল । লেক ভিক্টোরিয়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ টি দ্বীপ রয়েছে ।

লেক ভিক্টোরিয়ার এই ৩,০০০ দ্বীপের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি বিতর্কিত রেম্বা আইল্যান্ড । আপাতভাবে দ্বীপটি কেনিয়ার অন্তর্গত হলেও এর অধিকার নিয়ে কেনিয়া আর উগান্ডার মধ্যে বহুদিন ধরেই চলছে দ্বন্দ্ব । আর এই দুই দেশের সীমানা থেকে লেক ভিক্টোরিয়ার হ্রদের জল ঠেলে প্রায় ৩ কিলোমিটার মতো গেলে, খোঁজ পাওয়া যাবে রেম্বা দ্বীপের । যৌনকর্মী, আফ্রিকার কুখ্যাত অপরাধী, ড্রাগ পাচারকারীদের জন্য আদর্শ জায়গা এই রেম্বা আইল্যান্ড ।

মাত্র ২০০০ বর্গ মিটারের এই দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা ২০ হাজারের কাছাকাছি । পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে ৬০ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি লেক ভিক্টোরিয়ার হ্রদের জলে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করেন হাজার হাজার মৎস্যজীবী । যাঁদের নির্দিষ্ট বাড়ি-ঘর নেই । যাযাবরের মতো এই দ্বীপ থেকে ওই দ্বীপেই ঘুরে বেড়ান তাঁরা । বাকি ৪০ শতাংশ এই দ্বীপে অন্য ব্যবসা করেন । ছোট্ট এই দ্বীপটি যেন আফ্রিকার ক্ষুদ্র সংস্করণ । আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সব দেশের মানুষই এখানে পাওয়া যাবে । তবে জনসংখ্যার ২০% হল কেনিয়ার আবাসুবাস, লুয়ো এবং সোমালিয়ার অধিবাসী । এছাড়া দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, তানজানিয়া, উগান্ডা ও অন্যান্য দেশের মানুষও ও বসবাস করেন এই দ্বীপে ।

ছোট্ট এই দ্বীপে গায়ে গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট টিনের চালা-বিশিষ্ট ঘর । এই ২০০০ বর্গমিটার এলাকার মধ্যে রয়েছে- মাছের আড়ত, একটি গির্জা, একটি মসজিদ, অসংখ্য জুয়ার কাউন্টার, মদ ও ড্রাগের পাব, সেলুন, ওষুধের দোকান, খাবার হোটেল এবং প্রায় তিন হাজার যৌনকর্মী । এই দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষের পেশাই হল মাছ ধরা । এখানে বিভিন্ন জিনিস বেচাকেনা হয়ে থাকে, কিন্তু তার মধ্যে অন্যতম হল নারীদেহের ব্যবসা । এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন রকমের ড্রাগের কারবার, জুয়ার ব্যবসা । রাত বাড়লেই বসে মদের আসর । এখানকার স্থানীয় মদ ‘ছাঙ্গা’র ব্যবসাও রমরমিয়ে চলে।

এখানে দেহব্যবসা বেআইনি নয় । দ্বীপের আয়তন অনুসারে মানুষ অনেক বেশি । চারিদিক থেকে মাছ ভর্তি নৌকো এসে ভিড় করে । সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর সেইসব মাছ রেম্বাতে বিক্রি করার পর জেলেদের যা আয় হয়, সেই পয়সা দিয়েই বেশ্যালয়ে গিয়ে যৌনতা । সারা রাত ধরে ড্রাগ ও মদের নেশায় মজে পরেরদিন আবার নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বেড়িয়ে পরে হাজার হাজার মৎস্যজীবী ।

গণিকাবৃত্তি বৈধ হওয়ার জন্যই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে রেম্বাতে এসে ওঠেন যৌনকর্মীরা । কেউ সন্তান নিয়ে আসেন, কেউ আবার এখানে এসে সন্তানের জন্ম দেন । দিনে একজন যৌনকর্মী ভারতীয় মুদ্রায় ২৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা আয় করেন । দ্বীপে ব্যাঙ্ক নেই, তাই তাঁরা নিজেদের কাছেই টাকা রাখতে বাধ্য হন । সেই টাকা কখনও খরিদ্দার কেড়ে নেন, তো কখনও দ্বীপের দাদারা । তাই কয়েক সপ্তাহ পরপরই সামান্য সম্বলটুকু সঙ্গে নিয়েই উধাও হয়ে যান বেশ কিছু যৌনকর্মী, এবং সঙ্গে বহন করেন যৌন রোগ । তাই তাঁদের বাদ দিয়ে সেই জায়গায় আমদানি হয় নতুন যৌনকর্মীর ।

টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলি প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় দু’বার ভাড়া দেওয়া হয় । ঘরগুলি দিনে একজন ও রাত্রে আর একজন- এইভাবে ভাড়া নেন অর্থাৎ যাঁরা রাতে মাছ ধরেন, দিনের জন্য ঘর ভাড়া নেন। কেউ দিনে মাছ ধরলে রাতের জন্য ঘর ভাড়া নেন। এইসব ঘরের ভাড়া ভারতীয় মুদ্রায় ৬৯০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্তও ওঠে । এই ঘরগুলিকে বলে “উসিসেমে‘ । কিছু ‘উসিসেমে’ আবার যৌনকর্মীরা নিজেরাই ভাড়া নিয়ে রাখেন, তাঁদের ব্যবসা চালানোর জন্য ।

রেম্বা দ্বীপের সারি সারি টিনের ছাউনি ঘেরা চালাঘরে বিভিন্ন বয়সের যৌনকর্মীরা একসঙ্গে সহাবস্থান করেন । জায়গার অভাবে তাই একই ঘরে দশ বারো জন যৌনকর্মী একই সঙ্গে খরিদ্দার সামলান । সেইসময়ে ঘরের বাইরে অপেক্ষায় করে আর এক দল খরিদ্দার। এইভাবেই কেটে যায় দিন । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অস্বাস্থ্যকর জীবনের পথেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাঁরা । যৌনকর্মীদের শিশুদের জীবনও এই দ্বীপে বিপন্ন।

রেম্বাতে নিয়মিত কোনও পুলিশি টহলদারি নেই। গোটা দ্বীপ জুড়ে মাত্র ৯ জন পুলিশ আছেন, যাঁদের পক্ষে ২০,০০০ মানুষকে সামলানো প্রায় অসম্ভব । আইন-কানুন এবং প্রশাসনিক ঘেরাটোপ না থাকায় রেম্বা আইল্যান্ড আজ মদ ও ড্রাগের চোরা ব্যবসায়ীর বিচরণভূমিতে পরিণত হয়েছে । কোনও অপরাধ করে অপরাধী আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে রেম্বাতে গা ঢাকা দিয়ে থাকা বা রেম্বা থেকে পার্শ্ববর্তী যে কোনও দ্বীপে পালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত সহজ।

এই দ্বীপে সুস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কেউই সচেতন নন । দ্বীপের চারপাশের পরিবেশ চরম অস্বাস্থ্যকর, যেদিকেই চোখ পড়বে সেদিকেই আবর্জনার স্তূপ । মলমূত্র, ব্যবহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে শুরু করে কন্ডোম, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ইত্যাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারিদিকে।

কুড়ি হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র চারটি সাধারণ শৌচালয় । আর বাকি সব ক্ষেত্রে শৌচালয় বলতে মাটিতে গর্ত করে, চারদিক ঢাকা দেওয়া স্থান ! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খোলা স্থানেই মল-মূত্র ত্যাগ করে সবাই । অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, আবর্জনায় ঘেরা বাসস্থান, দুর্গন্ধ, মহিলা ও শিশুদের উপর যৌন নিপীড়ন- সব মিলিয়ে এক নারকীয় পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছেন সেখানকার মানুষ।

error: Content is protected !!