(J.C. Bose)
সাল ১৯০১। সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বৈজ্ঞানিক সফরে বেরিয়ে জগদীশচন্দ্র বসু তখন রয়েছেন ইংল্যান্ডে। গত কয়েক মাস ধরে তিনি একের পর এক বক্তৃতা দিয়েছেন ইউরোপের নানা দেশ জুড়ে, সম্প্রতি লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশন বা ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভায় তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতার সাহায্যে গড়ে তোলা যন্ত্রপাতির সাহায্যে বক্তৃতা সে-দেশের সংবাদপত্রে প্রভূত সাড়া জাগিয়েছে। কোনও-কোনও বিজ্ঞানীমহল থেকে আপত্তিজনিত কারণে তাঁর কিছু তত্ত্ব বিতর্কের মুখে পড়লেও পশ্চিমি বিজ্ঞান-আকাশে তাঁর খ্যাতি তখন মধ্যগগনে; একাধিক নামজাদা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর কাছে তখন অধ্যাপনায় যুক্ত হয়ে পাকাপাকিভাবে ইউরোপে থেকে যাওয়ার আমন্ত্রণ আসছে। (J.C. Bose)
আসছে আরও নানা ধরনের প্রস্তাবও। যেমন সে-বছরের মে মাসের দশ তারিখে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের ওই বক্তৃতার ঠিক আগে তাঁর কাছে বিলেতের এক বিখ্যাত কোম্পানির কর্ণধার (কোনও গবেষকের মতে ইনি ছিলেন ‘মার্কনি’স ওয়ারলেস টেলিগ্রাফ কোম্পানি লিমিটেড’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেজর স্যামুয়েল ফ্লাড পেজ) এসে জগদীশচন্দ্রকে তাঁর প্রচুর টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন, বদলে দাবি করেন যে জগদীশচন্দ্র যেন সেদিনের বক্তৃতায় তাঁর যন্ত্রপাতির গঠন-প্রণালী বিশদে বর্ণনা না করেন, সেই সঙ্গে তিনি জগদীশচন্দ্রের সাম্প্রতিক একটি আবিষ্কারের সত্ত্ব কেনবার জন্য পেটেন্টের ফর্মও নিয়ে আসেন। কিন্তু জগদীশচন্দ্র তখন তাঁর আবিষ্কারের মেধাসত্ত্ব কোনও কোম্পানির কুক্ষিগত হোক, এমনটা চান না, তাই সেই লোভনীয় অফার অবহেলায় ফিরিয়ে দেন। ১৭ মে, রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর আবিষ্কারকে এইভাবে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করার মানসিকতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে লেখেন: ‘টাকা— টাকা— কি ভয়ানক সর্ব্বগ্রাসী লোভ। আমি যদি এই জাঁতাকলে একবার পড়ি তাহা হইলে উদ্ধার নাই।’ (J.C. Bose)
আরও পড়ুন: আলোকরেখার অন্তরালে প্রয়োগ-শিল্পী: রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে জগদীশচন্দ্র তাঁর আবিষ্কারকে পেটেন্ট করে না রেখে সেগুলোকে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষেই ছিলেন (তাঁর তৈরি বসু বিজ্ঞান মন্দির-এর প্রতিষ্ঠার সময়েও তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে এই প্রতিষ্ঠান থেকে আবিষ্কৃত কোনও কিছুরই কখনও পেটেন্ট নেওয়া হবে না), তিনি তাঁর কর্মজীবনে অন্তত একবার এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়েছিলেন। প্যাট্রিক গেডিজ-এর লেখা জগদীশচন্দ্রের বিখ্যাততম জীবনী ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক অফ স্যার জগদীশচন্দ্র বোস’-এ দেখা যায় যে গেডিজ সাহেব লিখছেন: ‘Simply stated, it is the position of the old rishis of India, of whom he is increasingly recognised by his countrymen as a renewed type, and whose best teaching was ever open to all willing to accept it. It also concurs with that of the modern pilgrim of a later chapter and of the boy growing up in the enthusiasm of the antique poetry and chivalry of the past, whose acquaintance we made at the beginning.’ গেডিজ জগদীশচন্দ্রকে দেখতে চেয়েছিলেন ভারতের সেই সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের একজন হিসেবে, যিনি মনে করেন জ্ঞানকে সবসময় উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত সকলের জন্য, কারও হাতে তার কুক্ষিগত হয়ে থাকা উচিত নয়। (J.C. Bose)

আসলে জগদীশচন্দ্র যে পেটেন্ট নেওয়ার বিরোধী ছিলেন, বা তাঁর আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অধিকারকে নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখবার পক্ষপাতী ছিলেন তা না মোটেই, এমন একটা ভাবমূর্তি তাঁর অনেক কাল আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। আর এটা নির্মাণের ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁর প্রথম জীবনীকার, স্কটিশ স্থাপত্যবিদ ওই প্যাট্রিক গেডিজ-ই। ১৯২০ সালে তাঁর লেখা জীবনী-বইটি প্রকাশিত হয়, যাতে তিনি জগদীশচন্দ্রের পেটেন্ট নিয়ে মনোভাবের কথা লেখেন। জগদীশচন্দ্রের মধ্যে ছিল তীব্র একটা অনীহা, যে-কারণে তাঁর আবিষ্কৃত অন্য কোনও যন্ত্রেরই পেটেন্ট নেওয়ার চেষ্টাও করেননি কখনও। (J.C. Bose)
গোটা জীবনে তিনি একমাত্র যে পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছিলেন, সেই আবেদনের ক্রমাঙ্ক ছিল ৭৭,০২৮। তারিখ সেপ্টেম্বরের তিরিশ, ১৯০১। আবেদনপত্রে তাঁর নাম লেখা ছিল ‘Jagadis Chunder Bose, of Calcutta, India’, আর এর পাশে লেখা ‘Assignor of one-half to Sara Chapman Bull, of Cambridge, Massachusetts’। এই আবেদনপত্রে জগদীশচন্দ্রের বয়ানে এটাও লেখা ছিল যে তিনি ব্রিটিশ ভারতের একজন প্রজা, আর এখনও পর্যন্ত তড়িৎ-সঞ্চালন বিষয়ে তিনি বেশ কিছু নতুন এবং দরকারি আবিষ্কার করেছেন, এবং এই পেটেন্ট-আবেদনে উল্লিখিত আবিষ্কারটি সে-সবেরই একটি নমুনা। এরপর প্রায় পাঁচ পাতা জুড়ে বর্ণনা করা ছিল এই আবিষ্কারটির খুঁটিনাটি। শেষে ছিল জগদীশচন্দ্রের স্বাক্ষর, আর সাক্ষী হিসেবে সই ছিল Reginald Eaton Ellis এবং Thomas Lany Whitehead- এর। এটাও এখানে বলে নেওয়া দরকার যে তাঁর এই পেটেন্টই আমেরিকায় প্রথম কোনও ভারতীয় বা এশীয় ব্যক্তি হিসেবে নেওয়া পেটেন্ট। (J.C. Bose)
“কলেজের একটি ছোট্ট ঘরে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় কিছু যন্ত্রপাতি তৈরি করে তিনি যেভাবে এই তরঙ্গ নিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষাগুলি চালিয়ে বিজ্ঞানী মহলকে চমকে দিয়েছিলেন, তার তুলনা পাওয়া দুষ্কর।”
এই পেটেন্ট আবেদনের ভিত্তিতে আমেরিকান পেটেন্ট অফিস ১৯০৪ সালের মার্চ মাসের উনত্রিশ তারিখে নিবন্ধীকৃত করে তাঁর আবিষ্কারটিকে। নিবন্ধন সংখ্যা ছিল ৭৫৫,৮৪০।
কিন্তু কী ছিল সেই আবিষ্কারের বিষয়বস্তু, যা তিনি নিজের নামে পেটেন্ট করে নিয়েছিলেন? সেই পেটেন্ট-প্রাপ্ত বিষয় বা বস্তুটি সম্বন্ধে আরও কিছু বলবার আগে আমরা খুব সংক্ষেপে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিয়ে দু-চার কথা বলে নেব। কারণ এই তরঙ্গের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাঁর আবিষ্কারের মূল প্রয়োগ বা সম্পর্ক। (J.C. Bose)
স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ষাটের দশকে দেখিয়েছিলেন যে তড়িৎ আর চুম্বকের মেলবন্ধনে বিশেষ জাতের তরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে। সেই তরঙ্গ, যাকে চিহ্নিত করা হয় তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ হিসেবে, বাতাস বা শূন্য স্থানের মধ্যে দিয়ে যায় আলোর সমান গতিতে। ততদিনে আলোর গতি মেপে ফেলা গিয়েছিল, ওর মান সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। সেই তখন থেকেই সকলের কাছে এটা পরিষ্কার হয় যে আলো নামে যে জিনিসটাকে আমরা চিনি, সেটাও এই তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের মধ্যেই পড়ে। দৃশ্যমান আলো ছাড়াও আর যতরকমের এই ধরনের তরঙ্গ (যেমন এক্স রশ্মি, গামা রশ্মি, অতিবেগুনী রশ্মি, রেডিও তরঙ্গ বা অবলোহিত তরঙ্গ) আছে, সে-সবেরই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। প্রত্যেকেরই কিছু দিক দিয়ে দৃশ্যমান আলোর সঙ্গে বেশ মিল। (J.C. Bose)
জেমস ম্যাক্সওয়েল ১৮৭৯ সালে নেহাতই অল্পবয়সে প্রয়াত হন, তিনি এইরকম কোনও তরঙ্গ যন্ত্রের সাহায্যে সৃষ্টি করা বা এদের ধর্ম নিয়ে পরীক্ষা করবার সুযোগ পাননি। তাঁর মৃত্যুর প্রায় দশ বছর পর জার্মান বিজ্ঞানী হেইনরিখ হার্জ নিজস্ব যন্ত্রপাতি বানিয়ে তা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখান যে হ্যাঁ, সত্যিই গবেষণাগারে এই ধরনের অদৃশ্য তরঙ্গ তৈরি করা সম্ভব। (J.C. Bose)
আরও পড়ুন:পবিত্র একাকীত্বের হৈমন্তিক কবি: শক্তি চট্টোপাধ্যায়
১৮৯৪ সালে হার্জ সাহেব অকালেই প্রয়াত হন, যদিও তাঁর প্রয়াণের ওই সময়কালেই বিশ্বের নানান প্রান্তে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী এই ধরনের নানা জাতের তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করছিলেন, এবং এঁদের নানারকম ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখছিলেন। এঁদের মধ্যেই একজন ছিলেন আমাদের জগদীশচন্দ্র বসু, প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিদ্যার তরুণ অধ্যাপক। কলেজের একটি ছোট্ট ঘরে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় কিছু যন্ত্রপাতি তৈরি করে তিনি যেভাবে এই তরঙ্গ নিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষাগুলি চালিয়ে বিজ্ঞানী মহলকে চমকে দিয়েছিলেন, তার তুলনা পাওয়া দুষ্কর। পরবর্তীকালে তাঁর গবেষণার ধারা বা গতিপথ বদলে গেলেও ১৮৯৪ থেকে মোটামুটি ১৯০১ সাল পর্যন্ত তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিয়ে বেশ কিছু নতুন উদ্ভাবনা তাঁর হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল। (J.C. Bose)
পেটেন্ট আবেদনের বিষয়বস্তু
তাঁর এই পেটেন্ট আবেদনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী দুই বিদেশি মহিলা, মিস মার্গারেট নোবল, আর সারা চ্যাপম্যান বুল। প্রথমজন আমাদের কাছে আরও বেশি পরিচিত ভগিনী নিবেদিতা নামে, অবলা বসু বাদে আর যে মহিলার সঙ্গে জীবনে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে সংযুক্ত ছিলেন জগদীশচন্দ্র। আর সারা বুল স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশি শিষ্যাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী, বেলুড় মঠের নির্মাণে তিনিই সবচেয়ে বেশি অর্থসাহায্য করেছিলেন। আরও পরে আমরা দেখি যে তিনি জগদীশচন্দ্রের স্বপ্নের বসু বিজ্ঞান মন্দির-এর জন্যেও বেশ মোটা অঙ্কের অর্থসাহায্য বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন। যদিও তাঁর অকালমৃত্যু তাঁকে এই প্রতিষ্ঠানের সূচনা দেখে যেতে দেয়নি।
১৯০১ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর ওই পেটেন্ট প্রাপ্তির জন্য যে আবেদন করেন জগদীশচন্দ্র, সেটার বিষয়বস্তু কী ছিল? (J.C. Bose)

জিনিসটার নাম ‘গ্যালেনা’। সিসার সালফাইড খনিজ যৌগ, যাকে বিশেষভাবে স্ফটিকও বলা যেতে পারে। যার সংকেত PbS। নানা ধরনের ধাতব-অধাতব পদার্থ নিয়ে সেগুলোর সাহায্যে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গকে ধারণ করবার বা গ্রহণ করবার (যে জন্য এর নাম গ্রাহকযন্ত্র) চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি খেয়াল করেন, এই গ্যালেনা-র কিছু টুকরো নিয়ে যদি সেগুলোর ওপর অন্য ধাতব টুকরো কয়েকটা আলগাভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে ওই গোটা বস্তুর সাহায্যে তরঙ্গকে ধারণ করতে পারা যায় অনেক সহজে। শুধু তাই না, এই গ্রাহকযন্ত্র সব ধরনের তরঙ্গকেই চিনে নিতে পারে। (J.C. Bose)
“জগদীশচন্দ্র তাঁর উদ্ভাবিত গ্রাহকযন্ত্রের সাহায্যে আরও দেখেন যে এই যন্ত্রের সাহায্যে শুধুই যে অদৃশ্য বেতার তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ ধারণ করা যাচ্ছে তাই নয়, এর মধ্যে দিয়ে স্পন্দনশীল বিদ্যুৎ তরঙ্গকে একমুখী করবার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে।”
মজার ব্যাপার, তিনি এই যন্ত্রের নাম দেন ‘তেজোমিটার’ (ইংরেজিতে যেটাকে লেখা হয় ‘ইউনিভারসাল রেডিওমিটার’), যার প্রথমাংশ এসেছে সংস্কৃত ‘তেজস’ থেকে। এই নামকরণের মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর ভারতীয়ত্বকে প্রকাশিত করে রেখেছিলেন। এরই প্রকাশ্য প্রদর্শন এবং কর্মপ্রণালী তিনি দেখিয়েছিলেন রয়্যাল ইনস্টিটিউশন-এর বক্তৃতায়, তিনি এর আরও একটি নাম দিয়েছিলেন— কৃত্রিম চোখ বা ‘আর্টিফিসিয়াল রেটিনা’। যেহেতু এই যন্ত্রের সাহায্যে শুধু দৃশ্যমান আলোই নয়, আরও নানারকম অদৃশ্য আলো যেমন বেতার তরঙ্গ বা অতিবেগুনী রশ্মি বা অবলোহিত রশ্মিকেও চিনে নেওয়া যায়। (J.C. Bose)

অদৃশ্য বেতার তরঙ্গ বা ‘মাইক্রোওয়েভ’ কোনও উৎস থেকে জন্ম নিয়ে যখন কিছু দূরে পৌঁছয়, তখন সেই জায়গায় ওর অস্তিত্ব কতটা (বা আদৌ আছে কি না), সেটা মাপবার ব্যবস্থাই হল এই ধারকযন্ত্র। বিভিন্ন ধরনের অদৃশ্য তরঙ্গ সৃষ্টি করা এবং সেগুলোর নানা ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য খতিয়ে দেখবার কাজ জগদীশচন্দ্র ছাড়াও ওই আমলে যাঁরা করছিলেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই নিজস্ব উদ্ভাবনী উপায়ে নানা ধরনের ধারক বা গ্রাহকযন্ত্র তৈরি করে নিচ্ছিলেন। এরকমই একজন, স্যার অলিভার লজ (যিনি এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র এবং জগদীশচন্দ্র তাঁর লেখা বই পড়েই এই ধরনের তরঙ্গ নিয়ে কাজ করবার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলে শোনা যায়) বানিয়েছিলেন যে যন্ত্র, তার নাম ‘কোহেরার’। এই ব্যবস্থার বিস্তারিত গঠন না বলে এটুকু বলা দরকার যে এই কোহেরার-এর কিছু উন্নতি সাধন করেছিলেন জগদীশচন্দ্র, এবং তাঁর ব্যবহৃত সেই কোহেরার-এর ডিজাইনকেই কাজে লাগিয়ে গুগলিয়েমো মার্কনি বেতার বার্তা প্রেরণের কাজে সাফল্য পেয়েছিলেন। (J.C. Bose)
জগদীশচন্দ্র তাঁর উদ্ভাবিত গ্রাহকযন্ত্রের সাহায্যে আরও দেখেন যে এই যন্ত্রের সাহায্যে শুধুই যে অদৃশ্য বেতার তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ ধারণ করা যাচ্ছে তাই নয়, এর মধ্যে দিয়ে স্পন্দনশীল বিদ্যুৎ তরঙ্গকে একমুখী করবার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে। শুধু তাই না, এর দু’দিকে বিদ্যুৎ প্রবাহ সমান নয়। আর এখানেই লুকিয়ে আছে তাঁর এই যন্ত্রের আসল বিশেষত্ব। (J.C. Bose)
“ব্রাউন সাহেবের চেয়ে জগদীশচন্দ্র অনেক বেশি গুছিয়ে, বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছিলেন এদের কর্মপ্রণালীকে। বাস্তব প্রয়োগের দিক থেকে জগদীশচন্দ্রই এগিয়ে রয়েছেন।”
অনেক পরে জানা গিয়েছিল, তাঁর তৈরি ওই যন্ত্রের পেটেন্ট পাওয়ার বছর দুই পরে, ১৯০৬ সালে পেটেন্ট নেওয়া হেনরি হ্যারিসন ডানউডি সাহেবের কার্বোরান্ডাম গ্রাহক যন্ত্রকে পৃথিবীর প্রথম সেমিকন্ডাক্টর রেক্টিফায়ার-এর স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পদার্থবিদ্যায়, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স-এ ‘রেক্টিফায়ার’ বলতে বোঝায় এমন এক যান্ত্রিক ব্যবস্থাকে, যার সাহায্যে পরিবর্তী প্রবাহকে সমপ্রবাহ-তে রূপান্তরিত করা যায়। আমাদের বাড়ির ইলেকট্রিক লাইনে যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, সেটা পরিবর্তী প্রবাহ, অর্থাৎ এখানে তড়িৎ প্রতি মুহূর্তে একাধিকবার দিক পরিবর্তন করে। আর সাধারণ ব্যাটারি থেকে যে তড়িৎ প্রবাহ পাওয়া যায়, তা একমুখী। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আমাদের জগদীশচন্দ্রেরই এই ধরনের রেক্টিফায়ার-এর আবিষ্কর্তা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল। (J.C. Bose)
ইতিহাসের পাতায় রেক্টিফায়ার-এর আবিষ্কর্তা হিসেবে লেখা আছে জার্মান পদার্থবিদ কার্ল ফারদিনান্দ ব্রাউন-এর নাম। ইনি ১৮৭৬ সালের ১৪ নভেম্বর এই গ্যালেনা নিয়েই এক প্রকাশ্য সভায় পরীক্ষা করে দেখান যে এর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ কেবল একদিকেই প্রবাহিত হয়, উলটোদিকে হতে পারে না। কিন্তু ওই ঘটনার পর প্রায় পঁচিশ বছর পর্যন্ত এই ব্যাপারটাকে ঠিক কী কাজে লাগানো যেতে পারে, সেটা কেউ ভেবে উঠতে পারেননি। ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে তিনি আবার এই কাজটা করেন, এবং এবারে অনেকে তাঁর এই কাজের গুরুত্ব বুঝতে পারে। আজ আমরা জানি যে ডায়োড নামে বিশেষ এক ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্র এই কাজটাই করে, অর্থাৎ এদের সাহায্যে ‘রেক্টিফিকেশন’ বা তড়িতকে একমুখী করার কাজ করা যায়। (J.C. Bose)
আরও পড়ুন: বিস্মৃত পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন
ব্রাউন সাহেবের চেয়ে জগদীশচন্দ্র অনেক বেশি গুছিয়ে, বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছিলেন এদের কর্মপ্রণালীকে। বাস্তব প্রয়োগের দিক থেকে জগদীশচন্দ্রই এগিয়ে রয়েছেন। (J.C. Bose)
কার্ল ব্রাউনকে তাঁর ওই কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল আরও কয়েক বছর পরে, ১৯০৯ সালে। মজার ব্যাপার, সে-বছর তাঁর সঙ্গে যাঁকে এই পুরস্কার যৌথভাবে দেওয়া হয়, তিনিও বাঙালির কাছে বিশেষ পরিচিত নাম— গুগলিয়েমো মার্কনি। হ্যাঁ, ইনিই সেই মার্কনি, যিনি নাকি জগদীশচন্দ্রের ‘কাজ’ চুরি করে সফলভাবে বেতার তরঙ্গ প্রেরণ করে এই কাজের পথিকৃতের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন। আজ আমরা শুধু আফসোসই করতে পারি যে নিজের আবিষ্কারগুলো নিয়ে আর একটু সিরিয়াস হয়ে, আরও গুছিয়ে ব্যাখ্যা করে যদি জগদীশচন্দ্র ঠিকঠাক সময়ে সেগুলো পেটেন্টকৃত করে রাখতেন, তাঁর নোবেল পাওয়া কেউ আটকাতে পারত বলে মনে হয় না! (J.C. Bose)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
দেড় দশক শিক্ষকতায় যুক্ত। বিজ্ঞান নিয়ে লেখালিখি পেরিয়েছে দশ বছরের সীমানা। প্রকাশিত বই নয়টি। পড়া আর লেখাই অবসরযাপনের মুখ্য সঙ্গী।
