(Shankar Obituary)
হাওড়ার চার রত্নের মধ্যে শঙ্করীপ্রসাদ বসু, নিমাইসাধন বসু এবং অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে। আজ চলে গেলেন শংকর, কত অজানার খোঁজে, নতুন দেশে। চলতি বছরের পদ্ম পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার পরে ফেসবুকে লিখেছিলাম, আমাদের দেশে সম্মান বা পুরস্কার পেতে হলে হাসপাতালের বেডে শুয়ে ভেন্টিলেশন নিতে হবে। নয়তো পরপারে গিয়ে তর্পণের জলের মতো মরণোত্তর শিরোনামে পুরস্কার গ্রহণ করতে হবে! ‘চৌরঙ্গী’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সীমাবদ্ধ’ ইত্যাদি সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়নি কখনও।
কিন্তু জীবনের প্রায় প্রান্তসীমায় এসে যখন, ‘একা একা একাশি’ লিখলেন, তখন সাহিত্য একাডেমির কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসলেন। হয়তো ভাবলেন আর কটা দিনই বা…, দাও একটা পুরস্কার ছুঁড়ে, লুফে নেবে। এই পুরস্কারের বিষয়ে শংকর নিজেই একবার বহুল প্রচারিত এক সিনেমা পত্রিকায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে সরকারের উদ্দেশ্যে তির্যক মন্তব্য করে লিখেছিলেন, ‘গাইয়েটা পঞ্চাশ বছর অনুষ্ঠানগুলোতে রাত জেগে গান শুনিয়েছে, তা হলে একটা পদ্মশ্রী ছুঁড়ে দাও।’ (Shankar Obituary)
আরও পড়ুন: মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবী
শংকরের ক্ষেত্রে মনে হয়, বিভিন্ন পুরস্কারদাতারা ভাবতেন কতিপয় সাহিত্যিকরা যেখানে যুবতীদের বক্ষযুগল বা শাড়ির আঁচল নিয়ে হরেকরকম কাব্য রচনা আর বোহেমিয়ান জীবন কাটিয়ে একাধিক পুরস্কার পেয়েছে, সেখানে শংকর নামক লোকটি বয়সের দোষে বেদান্ত সাহিত্য এবং ধর্মের বই লিখছেন! সুতরাং, থাকো অপেক্ষা করে। (Shankar Obituary)
সময়টা ২০২০, বর্ষীয়ান সাহিত্যিক মনিশংকর মুখোপাধ্যায়ের ভাগ্যে সাহিত্য একাডেমি জুটল। বিশেষ একটি সংবাদপত্রে তখন সাহিত্য-সংস্কৃতির পাতার দায়িত্বে থাকায়, ফোন করে ছুটলাম তাঁর বালিগঞ্জ ফাঁড়ির অভিজাত পাড়ার ফ্ল্যাটে।

অল্প দু-চার কথার স্মৃতিচারণ, শৈশবের কিছুটা কেটেছিল কাশী মিত্র ঘাটের কাছেই একটি বাড়িতে। সত্যজিৎ রায় যখন ঠিক করলেন ওঁর লেখা গল্প নিয়ে ছবি করবেন, তখন লেখকের সাম্মানিক বাবদ যে চেকটা পাঠালেন, সেটা লেখকমশাই কোনওদিনও ব্যাংকে জমা করলেন না! রায়বাবুকে বলেছিলেন, ‘আপনার সই করা চেকটা আমার কাছে একটা অমূল্য বস্তু। তাই ওটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই আমার কাছে থাক।’ (Shankar Obituary)
এমন কিছু স্মৃতিচারণের পর এক কপি, ‘একা একা একাশি’ আমার হাতে তুলে দিয়ে অনুরোধ করলেন সংবাদপত্রে সমালোচনা করে দেওয়ার জন্য। বললাম, ‘তাহলে তো বইটা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে হবে, আমার কাছে আর থাকবে না।’ বোধহয় আমার দুঃখ উপলব্ধি করে বইটিকে আবার আমার কাছ থেকে টেনে নিয়ে খসখস লিখে দিলেন, ‘অরিজিতের জন্য শংকর’, সঙ্গে তারিখ। (Shankar Obituary)
আড়চোখে ওঁকে একবার দেখে নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টে দেখে নিতাম, প্রথম বইটির মতো এতেও লেখা রয়েছে, ‘অরিজিতের জন্য শংকর।’
যে বইয়ের জন্য একাডেমি, সেই বই লেখক যখন নিজেই সই করে উপহার দেন, তখন আনন্দের সীমা হয়তো কিছুক্ষণের জন্য উধাও হয়ে যায়। ওঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেশ বুঝতে পারলাম, পা দুটো মাটিতে থাকলেও মনটা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলেছে। (Shankar Obituary)
এরপর থেকে মাঝে মাঝে মুঠোফোনের মিসড কল দেখে লজ্জিত হয়ে ফোন করলে, ওপার থেকে পরিচিত কণ্ঠে শুনতে পেতাম, ‘অফিস ফেরত সিনিয়র সাব-এডিটর যদি একবার বাড়ি আসেন ভাল হয়, দরকার আছে।’ ঘর ভর্তি বই আর স্বয়ং লেখককে সামনে আরও একবার দেখার লোভ সামলানো কঠিন! (Shankar Obituary)

বাড়ি গেলে আমাদের সংবাদপত্রের ঘরসংসারের খবর নিয়ে, সদ্য প্রকাশিত বইটি হাতে দিয়ে অনুরোধ করতেন পত্রিকায় সমালোচনার জন্য। আড়চোখে ওঁকে একবার দেখে নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টে দেখে নিতাম, প্রথম বইটির মতো এতেও লেখা রয়েছে, ‘অরিজিতের জন্য শংকর।’ (Shankar Obituary)
সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের হাতে বইটির চিরকালীন ভার তুলে দেওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তিলাভ করতাম। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, বছরের একটি বিশেষ সময় আমাদের সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে, ‘সাহিত্য সম্মান’ প্রদান করা হত। শহরের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে আর এই পুরস্কারের তালিকা নির্বাচনে প্রাধান্য পেত উত্তরপূর্ব ভারতে সংবাদপত্রের প্রধান শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মীদের পছন্দ। (Shankar Obituary)
চিঠি পড়ার পরে হাসিমুখে তিনি বলেছিলেন, ‘তিরস্কারের জন্য যখন অনুমতির প্রয়োজন হয় না, তখন পুরস্কারের জন্য কীসের অনুমতি।’
কলকাতায় একবার এই পুরস্কারটি দেওয়া হয় অমর মিত্র এবং পবিত্র সরকারকে। পবিত্রবাবু যেইবার সম্মানিত হন, সেইবার দক্ষিণ কলকাতার উত্তমমঞ্চে প্রধান অতিথি হয়ে এলেন শংকর। কিন্তু অদ্ভুত লাগত কর্তৃপক্ষ এবং প্রধান সম্পাদক কোনওদিনই তাঁর নাম সাহিত্য সম্মানের জন্য বিবেচনা করেননি! (Shankar Obituary)
করোনাকাল শেষ হওয়ার পরে পুজোর ঠিক আগে, ত্রিধারা সম্মিলনীর পক্ষ থেকে শংকরকে ‘ত্রিধারা সম্মান’ প্রদান করা হয়। মনিশংকর মুখোপাধ্যায় এবং ত্রিধারার কর্ণধার, কলকাতা পুরসভার মেয়র-পরিষদ এবং বিধায়ক দেবাশিস কুমারের মধ্যে যোগসূত্র ছিলাম আমি। পুরস্কার দেওয়ার অনুমতি চেয়ে শংকরকে দেবাশিস কুমারের লেখা চিঠির পত্রবাহকও ছিলাম আমি।আমি তাঁর বাড়ি গেলে, চিঠি পড়ার পরে হাসিমুখে তিনি বলেছিলেন, ‘তিরস্কারের জন্য যখন অনুমতির প্রয়োজন হয় না, তখন পুরস্কারের জন্য কীসের অনুমতি।’ (Shankar Obituary)
সভাস্থলে পুরস্কার গ্রহণে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, কারণ বয়সের ভারে পায়ের সমস্যা। পরে দে’জ পাবলিশিং-এর কর্ণধার সুধাংশুশেখর দে ওঁকে রাজি করান। আমি এবং সুধাংশুদা ওঁকে নিতে যাই অনুষ্ঠানের দিন। বেশ খোশমেজাজেই গল্প-গুজব করেছিলেন। (Shankar Obituary)
একদিন ওঁকে গল্প করার সময় বলেছিলাম, অনেক বছর আগে মাসখানেক দিল্লিতে থাকার সময় চৌরঙ্গী পড়তে শুরু করেছিলাম কিন্তু শেষ করিনি। কারণ একটা পর্বের পরে আমাকে উপন্যাসটি আর আকর্ষিত করেনি। আগে ছবিটা দেখে বই পড়তে শুরু করেছিলাম বলেই সম্ভবত ভাল লাগেনি। (Shankar Obituary)
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দকে নিয়ে লিখলেন একাধিক গ্রন্থ, সেগুলো অবশ্যই সুখপাঠ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ।
সাহিত্যের মানুষকে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়েছিল কর্পোরেট জগতে। সেখান থেকে লেখার রসদও পেতেন হয়তো। ভাবতে অবাক লাগে তাঁর সাহিত্য নিয়ে খুব অল্প সংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে! ‘সীমাবদ্ধ’ আর ‘জন অরণ্য’ বড় পর্দায় নিয়ে এলেন সত্যজিৎ রায়। ‘এক যে ছিল দেশ’-কে বাংলা ছবির দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিলেন তপন সিংহ। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দকে নিয়ে লিখলেন একাধিক গ্রন্থ, সেগুলো অবশ্যই সুখপাঠ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ। (Shankar Obituary)
শংকর যে সম্ভার রেখে গেলেন, তা আগামীতে পাঠকদের ঋদ্ধ করবে বলেই ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি। তিনি তো শুধু একজন সাহিত্য স্রষ্টা নন, তিনি একটি যুগ, একটি সময়। স্যাটা বোস আর মার্ককে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখে গেলেন মৃত্যুঞ্জয়ী শংকর। চৌরঙ্গীর পথ ধরে এখন তিনি কত অজানার পথে। (Shankar Obituary)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অরিজিৎ মৈত্র পেশায় সাংবাদিক। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অরিজিৎ পুরনো কলকাতা নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন। নিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই: অনুভবে তপন সিনহা, ছায়ালোকের নীরব পথিক বিমল রায়, চিরপথের সঙ্গী - সত্য সাই বাবা, বন্দনা, কাছে রবে ইত্যাদি।
