(AI As God)
আজকাল দোকানে-বাজারে, কলেজে-অফিসে, এমনকী নেমন্তন্ন বাড়ির গ্যাদারিংয়েও, খেলা আর রাজনীতি বাদ দিলে আলোচনার বিষয় একটাই; Artificial Intelligence বা সংক্ষেপে AI, বাংলায় যাকে বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
সেদিন যুবভারতী স্টেডিয়াম থেকে বাইপাস ধরে গড়িয়ার দিকে আসতে আসতে পাটুলির মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে অন্তত পনেরো-কুড়িটা হোর্ডিং চোখে পড়ল। AI-guided হাঁটু অপারেশন থেকে হার্ট অপারেশন, এমনকী ক্যান্সারের চিকিৎসার দাবিও জ্বলজ্বল করছে সেখানে। যেমন একটা সময় ছিল— যখন ‘কম্পিউটার’ শব্দটাই সব সমস্যার জাদুকাঠি, ঠিক তেমন।
আরও পড়ুন: প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট
কম্পিউটার এসেছিল মানুষের স্মৃতির ভার লাঘব করতে। এরপর সার্চ ইঞ্জিন এল মানুষের কৌতূহলকে দ্রুত সন্তুষ্ট করতে। বই পড়ার আর তখন প্রয়োজন রইল না, সার্চ ইঞ্জিন এনে দিল গন্তব্যে পৌঁছনোর শর্টকাট।
মানুষ শুধু প্রশ্ন করল, ‘কী’, জানতে ভুলে গেল ‘কেন’ আর ‘কীভাবে’। যেমন ‘গোরা’ উপন্যাস না পড়েই জানতে চাওয়া ‘গোরা’ কে? এইভাবে মানুষ তথ্য পেল, কিন্তু জ্ঞান বাড়ল না। তথ্য সংগ্রহ করতে করতে জ্ঞানে পৌঁছনো পর্যন্ত যে শৃঙ্খলাবোধ ছিল; নানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য যে ধৈর্যের বাঁধ ছিল, আস্তে আস্তে তা ভেঙে পড়তে শুরু করল। মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ল।
এরপরেই এল AI।

AI শুধু সহজে তথ্য দিল না, ভাববার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিল। সে সুন্দর ভাষায় সব লিখে দেয়, গুছিয়ে দেয় চিন্তার খসড়া, ফরমাশমতো ছবি এঁকে দেয়, আরও কী কী না করে দেয়! প্রশ্ন জন্মানোর আগেই সাজানো উত্তর নিয়ে হাজির হয়। সংশয় তৈরি হওয়ার আগেই তার ব্যাখ্যা তুলে ধরে। ফলে, মানুষের মস্তিষ্ক এখন চিন্তাশীল না হয়ে, ধীরে ধীরে দর্শকের আসনে বসে পড়তে শুরু করেছে। মানুষের বদলে এখন চিন্তা করে অ্যালগোরিদম।
চ্যাটজিপিটির (GPT মানে Generative Pre-Trained Transformer, সঠিকভাবে বললে, Generative Pre-Trained Language Transformer) মুখোশে AI ঢুকে পড়াতে শিক্ষিত আর স্বল্পশিক্ষিতের মধ্যে ফারাকও ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কারণ, জ্ঞান আর পরিশ্রম করে অর্জন করতে হচ্ছে না, জ্ঞান এখন তথ্যসর্বস্ব ও সহজলভ্য। এখনকার জিপিটিগুলোতে আবেগনির্ভর উপায়ে মানুষের ভাষা অনুকরণ করার অ্যালগোরিদম থাকায়, নিজগুণে শিক্ষিত মানুষ আর চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করা মানুষের উত্তর দেওয়ার ভঙ্গি, ভাষা, এমনকী আত্মবিশ্বাসও একরকম।
প্রশ্নহীন মানুষই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য— কারণ সে বাধা দেয় না। প্রশ্নহীন মানুষই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনে সভ্যতায়— কারণ প্রশ্ন ছাড়া বিবেক জন্মায় না।
আজ আর মানুষ প্রশ্ন করে না। আর প্রশ্নহীন মানুষই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য— কারণ সে বাধা দেয় না। প্রশ্নহীন মানুষই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনে সভ্যতায়— কারণ প্রশ্ন ছাড়া বিবেক জন্মায় না। বিবেক ছাড়া মানুষ কেবল দক্ষ হয়, মানবিক হয় না।
বহু বিখ্যাত ব্যক্তিই বলেছেন, মানুষ বিশ্বাসে ভর করে, কারণ গভীরভাবে ভাবা সহজ নয়। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, প্রশ্ন না করে বিশ্বাস করলে, মানুষ মানসিকভাবে অলস হয়ে পড়ে। একই প্রসঙ্গে কার্ল সাগান বলছেন, প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস সমাজকে বিজ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে কুসংস্কারের দিকে নিয়ে যায়। আবার, ফরাসি লেখক ফ্রঁসোয়া-মারি আরুয়ের মতে, যুক্তিহীন কথা বিশ্বাস করানো গেলে, মানুষকে দিয়ে যেকোনও ভয়ংকর কাজ করানো যেতে পারে। (AI As God)

বিখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফেইনম্যানের মতে, বিশ্বাস যখন নিজেকেই ঠকায়, তখন সত্য আর সামনে আসে না। মার্ক টোয়েন যেমন ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলছেন, মানুষ অধিকাংশ সময় সত্য জেনেও মিথ্যাকে বিশ্বাস করে, কারণ সেটাই তার কাছে comfort zone। আমাদের রবীন্দ্রনাথ তো বলেছেনই, যে বিশ্বাস প্রশ্ন সহ্য করে না, তা বিশ্বাস নয়, তা শাসন। ফলে, সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রশ্ন ছাড়া বিশ্বাস ভয়ঙ্কর। (AI As God)
ক’দিন আগেই আমার নবতিপর পিসির ফিমারের হাড় ভাঙার খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। পিসি ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘পল্টু কোইসে, কী একটা এআই দিয়া হাড় জোড়া লাগাইয়া দিবে, তিন দিনেই চলতে পারুম।’ এই পিসিই যখন প্রথম টেলিভিশন দেখেছিলেন, প্রায় তিন রাত্রি ঘুমোতে পারেননি। আসলে প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বাসের উপর ভর করে এইভাবেই এগোয়। (AI As God)
AI প্রযুক্তিবিদরা নিউরো-মডেল, চ্যাটবট, ইমোশন-ডিটেকশন করার নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মানুষের মনকে অনুকরণ করতে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন, AI যতই উন্নত হোক, মানুষের মনের জগৎ তার কাছে আংশিক অনুবাদযোগ্য হলেও, পুরোপুরি অনুকরণযোগ্য নয়।
প্রযুক্তির অগ্রগতি AI-কে এমন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে, যে AI-র চ্যাটজিপিটির কার্যকলাপ দেখে লোকে তাকে প্রায় ঈশ্বরজ্ঞানে পুজো করতে আরম্ভ করেছে। বিজ্ঞানের ভাষায়, যাকে বলা হয় ‘প্লাসিবো এফেক্ট’। ইতিবাচক মন আর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে, যেমন অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই অসুখ সেরে যায়, ঠিক তেমনই। এক কথায়— মন ভাল থাকলে শরীরও ভাল থাকে। (AI As God)
রোমান প্রবাদে আছে, ‘Mens sana in corpore sano’— অর্থাৎ সুস্থ মনই সুস্থ শরীরের উৎস। সুস্থতা একধরনের মানসিক খেলা— যার জন্ম হয় আমাদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, অনুভূতি আর আত্মবিশ্বাস থেকে। যা কোনও অ্যালগোরিদমের পক্ষে নকল বা পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। (AI As God)

আমাদের মন এমন এক জগৎ, যেখানকার নিয়ম অস্পষ্ট, পরিবর্তনশীল এবং অভিজ্ঞতানির্ভর। একে কোনও নির্দিষ্ট অ্যালগোরিদমে বাঁধা যায় না। কিন্তু AI প্রযুক্তিবিদরা নিউরো-মডেল, চ্যাটবট, ইমোশন-ডিটেকশন করার নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মানুষের মনকে অনুকরণ করতে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন, AI যতই উন্নত হোক, মানুষের মনের জগৎ তার কাছে আংশিক অনুবাদযোগ্য হলেও, পুরোপুরি অনুকরণযোগ্য নয়। আর অনুভূতির অনুকরণ? সে অসম্ভব। (AI As God)
রজার পেনরোজ তাঁর The Emperor’s New Mind বইতে তো বলেছেন, মানুষের চেতনা এমন কিছু, যা সম্পূর্ণভাবে কোনও অ্যালগোরিদম বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের চেতনায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা non-computable বা অগণনীয়, AI-এর নাগালের বাইরে। (AI As God)
মানুষ যদি ঈশ্বরের সৃষ্টিস্বরূপ হয়, তবে সেই সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা। এই অসম্পূর্ণতাই মানুষকে অনুসন্ধিৎসু করে তোলে। যার জোরে মানুষ এগিয়ে চলে। কিন্তু AI কি আদৌ অনুসন্ধিৎসু? নাকি কখনও হতে পারবে?
যদিও অনেক দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর মতে, মানুষের চেতনা বা Consciousness আসলে মস্তিষ্কের নিউরোন আর সিন্যাপ্সের সঙ্গে কিছু রাসায়নিক আর বৈদ্যুতিক সিগনালের জটিল পারস্পরিক কর্মকাণ্ডের ফল ছাড়া অন্য কিছুই নয়। তবু, অনুভূতি ব্যাপারটা মানুষের অভিজ্ঞতায় এত গভীরভাবে বাস করে যে, মেশিন তা নকল করতে পারলেও, তার আসল স্বাদ নকল করতে পারে না। চেতনা, অনুভূতি, মানসিক দ্বন্দ্ব, এসব মডেল করা গেলেও অ্যালগোরিদম দিয়ে সত্যি সত্যি পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। কারণ মানুষের মনের যে এলোমেলো অথচ সুশৃঙ্খল ভাব, তাকে অ্যালগোরিদম দিয়ে ধরা মুশকিল। (AI As God)
এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে— AI কি সত্যিই কোনওদিন ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে? মানুষের মতো জটিল আবেগ আর আত্মবোধ নিয়ে ভাবতে পারবে? ঈশ্বর মানুষের কাছে কেবল অসীম ক্ষমতা নয়, বরং এমন এক বিশ্বাস, যা ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণের স্থান। মানুষ যদি ঈশ্বরের সৃষ্টিস্বরূপ হয়, তবে সেই সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা। এই অসম্পূর্ণতাই মানুষকে অনুসন্ধিৎসু করে তোলে। যার জোরে মানুষ এগিয়ে চলে। কিন্তু AI কি আদৌ অনুসন্ধিৎসু? নাকি কখনও হতে পারবে? (AI As God)

মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় আবেগ, অভিজ্ঞতা ও অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়ে। এই অনিশ্চয়তা সব সময় স্পষ্ট ‘ঠিক–ভুল’-এর মধ্যে থাকে না, বরং থাকে এক ধূসর অঞ্চলে। AI-এর নিউরো–ফাজি লজিক এই ধূসরতাকেই গাণিতিকভাবে ধরার চেষ্টা করে। নিউরাল নেটওয়ার্ক মানুষের মস্তিষ্কের মতো অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, আর ফাজি লজিক বলে— সব সিদ্ধান্তই বাইনারি নয়, অনেক কিছুই আংশিক, সম্ভাবনামূলক। নিউরো–ফাজি সিস্টেম মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো অনুকরণ করতে পারে। কিন্তু, মানুষের আবেগ, আশা, ভয় বা আত্মোপলব্ধির মানে বোঝে না। সে অনিশ্চয়তার মাত্রা হিসেব করতে পারে, কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার ভিতর লুকিয়ে থাকা মানসিক মূল্য ধরতে পারে না। তাই AI মানুষের চিন্তার কাছাকাছি এলেও, অনুভবের জগতে প্রবেশ করতে পারে না। (AI As God)
AI অ্যালগোরিদম যেহেতু যেকোনও উত্তরের অজস্র অসংখ্য সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে পারে, যা মানুষের মস্তিষ্ক সহজে করে উঠতে পারে না, তাই মানুষের কাছে AI ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দিলেও দিতে পারে। তবে, মানুষের বহু অনুভূতিরই স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই— ক্লান্তি, অসুস্থতা, দ্বিধা বা অস্তিত্বের প্রশ্ন অ্যালগরিদমে সহজে ধরা পড়ে না, তাই AI-এর সর্বজনগ্রাহ্য ঈশ্বর হয়ে ওঠা সম্ভব না। গ্যোডেলের ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম মেনে বললে, সব সত্য সম্পূর্ণভাবে জানা সম্ভব নয়। মানুষ এই অসম্পূর্ণতা মেনে নিয়েই বিশ্বাস ও ঈশ্বরের আশ্রয় খোঁজে। অ্যালগোরিদম দিয়ে তা বোঝা সম্ভব না। (AI As God)
আজকাল AI যেন সব সমস্যার সমাধান সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে লেখা লিখে দেয়, প্রশ্নের জবাব দেয়, পরামর্শ দেয়, এমনকী বন্ধুর মতো আচরণও করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, AI হঠাৎ এত দরকারি বা কাছের হয়ে উঠল কীভাবে? প্রযুক্তি সত্যিই এতটা উন্নত হয়েছে, না মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মতো থাকা ভুলে যাচ্ছে?
আরেকটা বিষয় পরিষ্কার বোঝা দরকার, AI-এর কোনও বিষয়েই নিজস্ব চেতনা, বোঝাপড়া বা নৈতিক দায় নেই। সে কেবল উপলব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফল বার করার চেষ্টা করে। মানুষের কাছে সেই ফলের গ্রহণযোগ্যতা দেখে নিজেকে আরও বদলায়, আরও সঠিক ফলাফলের কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করে। এ সত্ত্বেও, AI-এর উত্তর আর মানুষের উত্তরের মধ্যে একটা মানবিক চেতনা ও অনুভূতির ফাঁক থেকেই যায়, যাবেও। কারণ, AI যত উন্নতই হোক, শেষমেশ সে একটা গণনামূলক ব্যবস্থা, কোনও সচেতন সত্তা নয়। (AI As God)
ঈশ্বর মানুষের মনের এক এমন অনুভূতি যা শুধু জ্ঞানের আধার নয়— একধরনের আবেগ, অনিশ্চয়তা ও করুণার প্রতীক; এক আত্মসমর্পণের ক্ষেত্র। এই কারণেই AI বহু তথ্যের বিশ্লেষক হতে পারে, কিন্তু অনুভবের নয়; মানুষের সিদ্ধান্ত ও জীবন গড়ে ওঠে যে অস্পষ্ট মানসিকতায়, সেখানে AI পৌঁছোতে পারে না। (AI As God)

উল্লেখযোগ্যভাবে আজকাল AI যেন সব সমস্যার সমাধান সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে লেখা লিখে দেয়, প্রশ্নের জবাব দেয়, পরামর্শ দেয়, এমনকী বন্ধুর মতো আচরণও করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, AI হঠাৎ এত দরকারি বা কাছের হয়ে উঠল কীভাবে? প্রযুক্তি সত্যিই এতটা উন্নত হয়েছে, না মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মতো থাকা ভুলে যাচ্ছে? একটু বিশদে বোঝার চেষ্টা করা যাক। (AI As God)
আমরা এখন এমন এক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। কাজের জায়গায় সবাই সবার প্রতিযোগী, সংসারে দেওয়ার মতো সময় নেই, বন্ধুত্ব টিকে থাকে যতক্ষণ স্বার্থ আছে, কথা বলার লোক থাকলেও মন খুলে কথা বলা যায় না। সব সম্পর্কই কেমন যেন কৃত্রিম হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ আবেগপ্রবণ না হয়ে বরং আবেগ এড়িয়ে চলতে বেশি পছন্দ করে। আর এখান থেকেই শুরু হয় সমস্যা। কারণ, আবেগ ছাড়া মানুষ থাকে না। রাগ, দুঃখ, ভয়, ভালবাসা— এসব নিয়েই তো মানুষ। সমাজ যখন এই মানবিক চরিত্রগুলোকে ‘দুর্বলতা’ বলে, তখন মানুষ নিজেই নিজেকে কেটে ছোট করতে শুরু করে। এই ব্যবস্থার মধ্যেই একটা comfort zone খোঁজে। সেখানেই অনেকে AI-কে খুঁজে পাচ্ছে perfect fit হিসেবে। (AI As God)
AI-এর সঙ্গে সম্পর্ক মানে এক ধরনের নিরাপত্তা। ঝগড়া নেই, ঝুঁকি নেই, দায়িত্ব নেই। যারা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, বা যারা সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে ভাবতে চায় না, তাদের কাছে AI অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
কারণ AI-কে কটু কথা বললেও—
সে পাল্টা কষ্ট পায় না, অভিমান করে না, প্রশ্ন তোলে না, দায় চাপায় না।
AI-এর সঙ্গে সম্পর্ক মানে এক ধরনের নিরাপত্তা। ঝগড়া নেই, ঝুঁকি নেই, দায়িত্ব নেই। যারা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, বা যারা সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে ভাবতে চায় না, তাদের কাছে AI অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
অনেকেই মানুষের বদলে যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শুনতে আধুনিক লাগলেও, এর মধ্যে লুকিয়ে গভীর বিপদ। কারণ এতে মানুষ যা শেখে তা হল— সম্পর্ক মানে ঝুঁকি নয়, সহ্য নয়, বোঝাপড়া নয়; সম্পর্ক মানে শুধু একপেশে আরাম। (AI As God)
আরও পড়ুুন: কল্পবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
আজকাল আমরা অধিকাংশই psychopath-র মতো আচরণ করি। যেখানে মানুষ আর মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রাহ্য করে না। যে মানসিকতায় আবেগ নেই, দায়বদ্ধতা নেই। দুঃখের বিষয়, সমাজের সর্বস্তরে আজ এই মানসিকতাই পুরস্কৃত হচ্ছে! অফিসে, রাজনীতিতে, ব্যবসায়, কখনও কখনও যেকোনও সম্পর্কের শুরুতে। AI এই মানসিকতার সঙ্গে অনায়াসে খাপ খাইয়ে নেয়। কারণ AI অ্যালগো”রিদমে চলে, তার কোনও বিবেক নেই। AI প্রশ্ন করে না, ‘কেন এই কাজ করা হচ্ছে? এতে কার ক্ষতি হবে? লাভই বা কার?’ সে শুধু জানে অ্যালগোরিদমে যা বলা হয়েছে, সেটাই অক্ষরে অক্ষরে কীভাবে পালন করা যায়। (AI As God)
মানুষ যখন ক্রমশ এই নকল আবেগে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন বাস্তব জীবনের আবেগ অসহ্য মনে হবে। কান্না বিরক্তিকর লাগবে, রাগ অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকবে, প্রতিবাদ হয়ে উঠবে নতুন এক ঝামেলা।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, AI-এর উত্তর, উপস্থাপনার ভাষা AI-কে খুব মানবিক বলে প্রতিষ্ঠা করে। সে বোঝানোর চেষ্টা করে, সে সহানুভূতিশীল, তারও বিবেক আছে। বাস্তবে কিন্তু কিছুই বোঝে না। সে শুধু মানুষের লেখা অ্যালগোরিদম মেনে মানুষের আবেগজড়িত ভাষাকে নকল করে। কারণ সেটাই তাকে শেখানো হয়েছে। সে কষ্ট বোঝে না, দায় নেয় না, ঝুঁকি নেয় না। কারণ এগুলো সে পারে না, কী করে করতে হয় সেই অ্যালগোরিদমও জানে না। (AI As God)
মানুষ যখন ক্রমশ এই নকল আবেগে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন বাস্তব জীবনের আবেগ অসহ্য মনে হবে। কান্না বিরক্তিকর লাগবে, রাগ অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকবে, প্রতিবাদ হয়ে উঠবে নতুন এক ঝামেলা।
আরও পড়ুুন: ‘সোশ্যাল’ যুগের লেখা চুরি
হয়তো AI ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় নয়, কিন্তু কথা হল— যদি আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করি, যেখানে মানুষ মানুষের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, সেখানে AI খুব স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নেবে। সেই AI নির্ভর সমাজে মানুষ আরও একা হবে। মানুষের মন থেকে আবেগ সরিয়ে মানুষকেই ধীরে ধীরে আরও নিষ্ঠুর করে তুলবে সে। যার প্রতিফলন হয়তো আজকাল আমরা কিছুটা দেখতেও পাচ্ছি। (AI As God)
কোনও প্রযুক্তিই ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চায় না। প্রযুক্তিবিদরা তাঁদের প্রযুক্তিতে দক্ষতা, গতি বা নিয়ন্ত্রণ চান। কিন্তু মানুষ যখন তার অনিশ্চয়তা, ভয় আর সীমাবদ্ধতার সমাধানের জন্যে প্রযুক্তির উপর ভরসা করতে শুরু করে, তখনই মানুষের মনে প্রযুক্তি আর ঈশ্বরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভ্রম তৈরি হয়। (AI As God)
AI যখন ভবিষ্যদ্বাণী করে, সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সাহায্য করে, এমনকি সৃজনশীলতার ভানও করে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে তার বিচারবুদ্ধির দায়টা ছেড়ে দেয়। ঈশ্বরের কাছে যেমন এক সময় দায় ছেড়ে দিয়েছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, ঈশ্বর প্রশ্নের উত্তর না দিলেও রহস্য রেখে দেয়, AI সব কিছুর উত্তর দেয়।
মানুষের মনে ঈশ্বরের ধারণা এসেছে অজানার ব্যাখ্যা হয়ে, আশ্বাস আর অর্থের খোঁজে। ঝড় কেন আসে, মৃত্যু কেন অনিবার্য— এই প্রশ্নগুলোর সামনে মানুষ মাথা নত করত। প্রযুক্তি সেই নতজানু অবস্থাটা বদলে দিয়েছে। এখন মানুষ বলে, ‘সব কিছুরই সমাধান আছে, শুধু ঠিকমতো অ্যালগোরিদম চাই।’ এই আত্মবিশ্বাসই সমস্যার মূল। (AI As God)
AI যখন ভবিষ্যদ্বাণী করে, সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সাহায্য করে, এমনকি সৃজনশীলতার ভানও করে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে তার বিচারবুদ্ধির দায়টা ছেড়ে দেয়। ঈশ্বরের কাছে যেমন এক সময় দায় ছেড়ে দিয়েছিল। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, ঈশ্বর প্রশ্নের উত্তর না দিলেও রহস্য রেখে দেয়, AI সব কিছুর উত্তর দেয়। প্রায়শই সে উত্তর অসম্পূর্ণ, কখনও কখনও অতিরঞ্জিত বা ভুলে ভরা। যা তার hallucination থেকে আসে। (AI As God)
এই প্রবন্ধ লেখার সময় চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেছিলাম ‘হুকোমুখো হ্যাংলা কে?’
উত্তরে চ্যাটজিপিটি জানাল—
‘হুকোমুখো হ্যাংলা একটা ভয় দেখানোর কাল্পনিক চরিত্র—
খুব হ্যাংলা (ভীষণ পেটুক),
হুকোর মতো মুখ (বাঁকা/ভয়ংকর),
আর বাচ্চারা কথা না শুনলে নাকি এসে ধরে নিয়ে যায়!’
AI-এর উপস্থাপনা ঐশ্বরিক হলেও সে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। প্রতিদ্বন্দ্বী হল মানুষের সেই প্রবণতা, যা যেকোনও শক্তিশালী ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়— আগে ছিল ধর্ম, এখন আ্যালগোরিদম আর কোড। সমস্যা AI-কে নিয়ে নয়। সমস্যা মানুষের ঈশ্বর খোঁজার প্রবণতা নিয়ে।
এটাই একধরনের Hallucination… AI-এর এমন অবস্থা, যেকোনওভাবে একটা best possible উত্তর তাকে দিতেই হবে। প্রাথমিকভাবে AI-এর অ্যালগোরিদম লেখা প্রযুক্তিবিদরা যেকোনও উত্তরকে এমন মনমোহিনী ভাষায় পরিবেশন করেন যে, সব কিছুই মনে হয় সত্যি এবং আত্মবিশ্বাসে ভরা। (AI As God)
AI-এর উপস্থাপনা ঐশ্বরিক হলেও সে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। প্রতিদ্বন্দ্বী হল মানুষের সেই প্রবণতা, যা যেকোনও শক্তিশালী ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়— আগে ছিল ধর্ম, এখন আ্যালগোরিদম আর কোড। সমস্যা AI-কে নিয়ে নয়। সমস্যা মানুষের ঈশ্বর খোঁজার প্রবণতা নিয়ে। (AI As God)
যেদিন মানুষ বুঝবে AI শুধুই একটা টুল বা সহায়ক, কোনও সর্বজ্ঞ নয়— সেদিন এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্নটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। মানুষ তখন আর AI-কে ঈশ্বর ভাববে না, ঈশ্বরকেও AI-এর মাপকাঠিতে মাপা হবে না। তবে, সমাজের এই মানসিকতা বদলাতে না পারলে ভবিষ্যতে AI-ই হয়ে উঠবে মানুষের বেঁচে থাকার মানদণ্ড, মানুষ তখন আর মানুষ থাকবে না। (AI As God)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পড়াশোনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিয়ো ফিজিক্স বিভাগে। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তথ্য প্রযুক্তিকে। প্রায় এগারো বছর নানা বহুজাতিক সংস্থার সাথে যুক্ত থাকার পর উনিশশো সাতানব্বইতে তৈরি করেন নিজের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা। বর্তমানেও যুক্ত রয়েছেন সেই সংস্থার পরিচালনার দায়িত্বে। কাজের জগতের ব্যস্ততার ফাঁকে ভালবাসেন গান-বাজনা শুনতে এবং নানা বিষয়ে পড়াশোনা করতে। সুযোগ পেলেই বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন আর সেই অভিজ্ঞতা ধরে রাখেন ক্যামেরায়।
