(AI Detective)
আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স বা এআই এখন সর্বত্র। অপরাধদমনই বা আর বাদ যায় কেন! ভয়েজ ক্লোন কিংবা ফেক ভিডিয়ো তৈরি করতে সমস্যা হলেও খুন-চুরি-ডাকাতির মতো ট্র্যাডিশনাল ক্রাইমের সমাধানে এআই আগামী দিনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে চলেছে।
পুলিশ কর্তাদের অন্তত তেমনটাই বক্তব্য। ঠিকভাবে এআইকে কাজে লাগাতে পারলে বহু অধরা অপরাধীদের চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি গ্রেফতারও করা সম্ভব। তদন্তকারীদের আর নির্ভর করতে হবে না সিসিটিভি ফুটেজ বা ফোনের টাওয়ার লোকেশনের উপর। সারা দেশের পরিসংখ্যান জড়ো করা গেলে দেখা যাবে, স্রেফ গত এক বছরে দিল্লি-মুম্বই ছাড়াও অন্তত আরও পাঁচ জায়গায় ১০০টিরও বেশি অপরাধের সমাধান করা গিয়েছে, এআইয়ের সাহায্যে। এর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য মামলা সইফ আলি খানের বাড়িতে এক বহিরাগতের প্রবেশ।
আরও পড়ুন: AI কি ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী
এআই বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ক্রাইম ডিটেকশনের শুরুটা হয়েছিল দিল্লিতে। আজ থেকে প্রায় দু’বছর আগে। নিহত এক ব্যক্তির বন্ধ চোখ খুলিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় একটি খুনের মামলার কিনারা করে রাজধানীর পুলিশ। দেশের মধ্যে প্রথমবার এআই প্রযুক্তিকে তদন্তের কাজে লাগিয়ে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্তদের।
ঘটনাটি ঘটেছিল উত্তর দিল্লির কোতোয়ালি থানার গীতা কলোনিতে। এরপর অবশ্য দেশের অন্যান্য রাজ্যের পুলিশের কাছেও প্রযুক্তি নির্ভর এই তদন্ত-পদ্ধতি নতুন এক দিক খুলে দেয়। দিল্লি পুলিশের নর্থ ডিভিশনের ডিসিপি মনোজ কুমার মিনা প্রথম এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছিলাম। অন্য রাজ্যের পুলিশও তারপর এআই ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি কেস সলভ করেছে।’

দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত বা সাক্ষীদের মুখে শুনে শুনে পেন-পেন্সিলে অপরাধী চিহ্নিতকরণের কাজ করতেন পুলিশের শিল্পীরা। যেমন, কলকাতা পুলিশ এবং সিআইডির শিল্পী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, ‘প্রযুক্তিকে সবসময়ে স্বাগত। কিন্তু মস্তিষ্কের কাছে সব শিশু। আমার নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, অন্তত তিনটি খুনের ঘটনায় শুধু মাথার খুলির ছবি এঁকে ও ফটোশপ ব্যবহার করে মানুষের রূপ দিয়েছিলাম। অপরাধীরাও ধরা পড়েছিল। এর মধ্যে সল্টলেকের রোমা ঝাওয়ার অপহরণের মতো ঘটনাও রয়েছে। সেখানে আসামী গুঞ্জন ঘোষের বর্ণনা শুনে অন্যতম অভিযুক্ত অরবিন্দের ছবি এঁকেছিলাম। যদিও পরে জানা যায়, তাঁকে গুলি করে খুন করা হয়।’
রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি অধীর শর্মার কথায়, ‘দক্ষতার সঙ্গে এআইকে ব্যবহার করেছে দিল্লি পুলিশ। আমাদের রাজ্যেও দক্ষ পুলিশকর্মীরা এখন এআই ব্যবহার করছেন। এতে তদন্তের সুবিধার পাশাপাশি একটা বড় ডেটাবেসও তৈরি হয়ে যাবে।’
ফ্লাইওভারের নিচে চোখ বন্ধ অবস্থায় বছর পঁয়ত্রিশের এক ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরনে জ্যাকেট, নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট। কিন্তু বহু চেষ্টার পরেও তাঁর পরিচয় জানতে পারেননি তদন্তকারীরা। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা যায়, গলা টিপে ওই ব্যক্তিকে খুন করে রাস্তার ধারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে পুলিশকর্তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্য নেন।
দিল্লির ঘটনাটি ছিল বেশ অভিনব। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি উত্তর দিল্লির গোল্ডেন জুবিলি পার্কের কাছে, ফ্লাইওভারের নিচে চোখ বন্ধ অবস্থায় বছর পঁয়ত্রিশের এক ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরনে জ্যাকেট, নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট। কিন্তু বহু চেষ্টার পরেও তাঁর পরিচয় জানতে পারেননি তদন্তকারীরা। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা যায়, গলা টিপে ওই ব্যক্তিকে খুন করে রাস্তার ধারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে পুলিশকর্তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্য নেন। প্রায় দশজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কাজ শুরু করেন। তাঁরা এআই-এর সাহায্য নিয়ে মৃতের ফেসিয়াল কালার এক রেখে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড প্রথমেই বদলে দেন।

পাশাপাশি নিহত ব্যক্তির বন্ধ চোখ, ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন একই রেখে, খুলে দেওয়া হয়। এরপর ওই খোলা মুখের ছবি পোস্টার বানিয়ে কোথাও ব্যাকগ্রাউন্ডে ট্রেনের সঙ্গে, কোথাও পানের দোকানের ভিতরে, আবার কোথাও চলন্ত গাড়িতে বসে থাকার মতো করে তৈরি করা হয়। অফিসারেরা ঠিক করেন, অজ্ঞাতপরিচয় নিহত ব্যক্তির ছবি এমনভাবে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার আকারে ছড়িয়ে দেবেন, যাতে দেখলে মনে হয়, তিনি আসলে কোনও সেলফি তুলেছেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার ছবি ছাপিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সেঁটেও দেন পুলিশকর্মীরা। এমনই কয়েকটি ছবি পৌঁছে যায় চাওলা পুলিশ স্টেশনে। ঠিক একদিনের মাথায় ওই থানায় একটি ফোন আসে। যেখানে দাবি করা হয়, যে ব্যক্তির পোস্টার বিভিন্ন জায়গায় সাঁটানো হয়েছে, তাঁর নাম হিতেন্দর সিং (৩৫)। তিনি স্থানীয় একটি অডিট ফার্মে চাকরি করেন। ৯ তারিখ থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
পুলিশ এরপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাড়ির লোকেরা জানান, তাঁরাও থানায় মিসিং ডায়েরি করেছেন। এরপর শুরু হয় আসল তদন্ত।
মহারাষ্ট্র পুলিশের দাবি, তারা ২৬১টি মামলায় এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে সহজে। ফোন কল ডেটা, ওপেন-সোর্স টুলস ইত্যাদি ব্যবহার করে অভিযুক্তদের অবস্থান নির্ধারণের মতো কাজ করতে সাহায্য করে।
নিহতের মোবাইল ফোন, ওই এলাকার আশপাশের প্রায় ৮০০ সিসিটিভি ক্যামেরা তন্নতন্ন করে খোঁজ শুরু হয়। তাতেই জানা যায়, ৯ তারিখ হিতেন্দর তাঁর বন্ধু পরমবীর সিং ওরফে জেমস, হরনীত সিং ওরফে রকি এবং প্রিয়াঙ্কা ওরফে অ্যানির সঙ্গে রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ একটি মদের আসরে গিয়েছিলেন। সেই রাতে আর বাড়ি ফেরেননি। এরপরই পুলিশ জেমসকে তুলে নিয়ে জেরা করতে, প্রকাশ্যে আসে আসল ঘটনা।

পুলিশের বক্তব্য, নিহত ব্যক্তির সঙ্গে রুবি নামে এক মহিলার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে, জেমস রুবিকে পছন্দ করলেও পাত্তা পেতেন না। এই রাগ থেকেই ঘটনার রাতে জেমস অন্য সঙ্গীদের সঙ্গে পরামর্শ করে বন্ধুকে বাড়িতে ডাকেন। রুবিকে নিয়ে সেখানে দুই বন্ধুর মধ্যে মদ খেতে খেতে তুমুল অশান্তি শুরু হয়। বচসা চরম সীমায় উঠলে মদের নেশায় পুরোপুরি মাতাল হিতেন্দরকে চাদর দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। ভোররাতে দেহ ফেলে দেওয়া হয় ফ্লাইওভারের নিচে। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। হিতেন্দরের বন্ধ চোখ এআই খুলে দিতেই মামলার ‘ব্রেকথ্রু’ হয়ে যায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে।
মহারাষ্ট্র পুলিশের দাবি, তারা ২৬১টি মামলায় এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে সহজে। ফোন কল ডেটা, ওপেন-সোর্স টুলস ইত্যাদি ব্যবহার করে অভিযুক্তদের অবস্থান নির্ধারণের মতো কাজ করতে সাহায্য করে।

দিল্লি পুলিশ এখনও পর্যন্ত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৪০০টির বেশি মামলার সমাধান করেছে, যেখানে ৯৪৫টির বেশি সিসিটিভি ক্লিপ ও স্মার্টফোন ভিডিও ব্যবহার করে অপরাধীদের শনাক্ত ও আটক করা হয়েছিল। সিসিটিভি-ভিত্তিক ফেস রিকগনিশন সিস্টেম প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে এআই। তাতেই দিল্লির কিছু থানায় এই পরীক্ষার সুফল পাওয়া গিয়েছে। মুম্বই পুলিশ যেমন শহরে চলাচল করা কয়েক হাজার লরির থেকে ট্রাফিক রুল ভাঙা একটি লরিকে এআইয়ের সাহায্যে চিহ্নিত করে ফেলছে খুব সহজে।
মহারাষ্ট্র পুলিশের MahaCrimeOS নামে একটি এআই-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বহু মামলায় তদন্ত সহায়তা করেছে। এই সিস্টেমটি ফোনের তথ্য ও ওপেন-সোর্স ডেটা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের দ্রুত তথ্য দিতে পারে। যেমন, একটি ব্যাঙ্ক কর্মচারীর লক্ষ টাকা চুরি-জালিয়াতির চক্র শনাক্ত করে, অভিযুক্তদের ধরতে সাহায্য করেছে।
খোদ এআইয়ের কাছ থেকেই জেনে নেওয়া যেতে পারে, তার নিজের সলভ করা মামলার তথ্য। একটা প্রম্প্ট দিতেই নিজের ‘অ্যাচিভমেন্ট’-এর তালিকা দিচ্ছে সে। লিখছে—
মহারাষ্ট্র পুলিশের MahaCrimeOS নামে একটি এআই-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বহু মামলায় তদন্ত সহায়তা করেছে। এই সিস্টেমটি ফোনের তথ্য ও ওপেন-সোর্স ডেটা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের দ্রুত তথ্য দিতে পারে। যেমন, একটি ব্যাঙ্ক কর্মচারীর লক্ষ টাকা চুরি-জালিয়াতির চক্র শনাক্ত করে, অভিযুক্তদের ধরতে সাহায্য করেছে।
নাগপুর পুলিশ একটি তিন কোটি টাকা হোম লোন জালিয়াতি মামলায় এআই টুল ChatGPT ব্যবহার করে সম্প্রতি। প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছেলে কোন স্কুলে যায়, তা এআই-ই শনাক্ত করে দেয়। ওই তথ্য থেকেই ধরে ফেলা হয় প্রধান অভিযুক্তকে। দীর্ঘ তিন বছর তদন্ত এড়িয়ে চলেছিলেন অভিযুক্ত।

কেরল পুলিশের Technical Intelligence Wing-কে এআই পুরনো ফটো থেকে সন্দেহভাজনদের বর্তমান চেহারা অনুমান করতে সাহায্য করছে। সেই চেহারা সামাজিক মাধ্যমের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দু’জন অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। মামলাটি ছিল প্রায় ১৯ বছরের পুরনো একটি ট্রিপল মার্ডার কেস। এআই টুল ডিজিটাল এজিং ও ইমেজকে মিলিয়ে দীর্ঘদিনের মামলা সমাধানের পথ খুলে দেয়।
আপাতত, নিজে কোনও মামলা সরাসরি সমাধান করতে না পারলেও তদন্তকারীদের নানাভাবে সাহায্য করেছে। যার জেরে খুব দ্রুত একের পর এক সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। ফলে অপরাধদমনে এআই গোয়েন্দার ভবিষ্যত যে ‘উজ্জ্বল’, সে কথা সহজেই অনুমেয়।
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এই মুহূর্তে স্বতন্ত্র গোয়েন্দা না হলেও ভবিষ্যতে এর ক্ষমতা অনেকটাই বাড়বে। আপাতত, নিজে কোনও মামলা সরাসরি সমাধান করতে না পারলেও তদন্তকারীদের নানাভাবে সাহায্য করেছে। যার জেরে খুব দ্রুত একের পর এক সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। ফলে অপরাধদমনে এআই গোয়েন্দার ভবিষ্যত যে ‘উজ্জ্বল’, সে কথা সহজেই অনুমেয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পেশা, সাংবাদিকতা। নেশা, অপরাধ জগতের ঠিকুজিকুষ্ঠির হদিশ রাখা। ৩০ বছরের বেশি সময় টিভি আর খবরের কাগজে কাজ করে আজও চিত্রদীপের পছন্দের তালিকার শীর্ষে অপরাধ আর অপরাধী-ই। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরে ডানপথ কাগজে হাতেখড়ি। এরপর ওভারল্যান্ড, আজকাল, খাসখবর, স্টেটসম্যান, স্টার আনন্দ, ২৪ ঘণ্টা হয়ে বর্তমানে ‘এই সময়’ কাগজের চিফ অফ নিউজ ব্যুরো। তাজে জঙ্গি হানা, মাওবাদী হামলা, হায়দরাবাদে বিস্ফোরণ সহ দেশের বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা-দুর্ঘটনা কভার করেছেন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে। তদন্তমূলক সাংবাদিকতার জন্য অমর বসু স্মৃতি পুরস্কার, ইন্ডিউড এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড, দ্য ফেলু মিত্তির অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও ‘গ্যাংস অফ ভরতপুর’ বইয়ের জন্য পেয়েছেন ‘রেনেসাঁস সাহিত্য সম্মান’। লকডাউনে সাইবার ক্রাইম নিয়ে একমাসে ১৫১ টি কোর্স সম্পূর্ণ করায় নাম উঠেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল বুক অফ রেকর্ডস’-এ।
