(Budhhadeb Guha)
বাঙালির অরণ্যদেব বুদ্ধদেব গুহ জীবনের বাঁধনগুলোকে বারবার ঝাঁকুনি দিয়ে ভাঙতে চেয়েছেন। জীবন নিয়ে গবেষণা করে গিয়েছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে বাক্সবন্দি করেছেন, জীবনের মতো দেখতে চেয়েছেন জীবনটাকে। কাঁধে বন্দুক রেখেছেন আর ঠোঁটে রসিকতা। জীবনের জটিল সম্পর্কগুলো কলমের ছোঁয়ায় সহজ করে তুলেছেন।
সারাজীবনই সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন গুহ মশাই। এমন একটা প্রেক্ষাপট নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন, যা আজও বাঙালির কাছে বেস্টসেলার। ‘মাধুকরী’, ‘কোজাগর’, ‘কোয়েলের কাছে’, ‘হলুদ বসন্ত’, ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ অবশ্যই বুদ্ধদেব গুহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্বের ভিড়ে তাঁর অন্য এক নিদর্শন চাপা পড়ে গিয়েছে। ‘নগ্ন নির্জন’-এ লেখকের ভাষা এবং শব্দের ব্যবহারে যে অভিনবত্ব আছে, সেই ব্যবহার ওঁর বাকি উপন্যাসে সেইভাবে চোখে পড়ে না।
আরও পড়ুন: নৈহাটিতেই গড়ে ওঠে প্রথম বাস্তুহারা কলোনি?
প্রসঙ্গত, উনি যখন ‘নগ্ন নির্জন’ লিখেছেন, তখন তাঁর বয়স তেত্রিশ ছুঁইছুঁই। ততদিনে প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে ‘হলুদ বসন্ত’। ১৯৬৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘নগ্ন নির্জন’। তখন যুবক বুদ্ধদেবের কলম ধারালো। একের পর এক শব্দের দ্ব্যর্থহীন প্রয়োগে লেখার গতি এবং গুণগত মান বেড়েছে। উপন্যাসের শুরুর প্রথম দিকের কয়েকটা লাইনটা যদি দেখা যায়, ‘রোদ উঠে গেছে। আদিগন্ত কুয়াশার মাকড়সার জাল ছিন্নভিন্ন করে ভূলুণ্ঠিত করে নরম সোনালি আভাস বনে-পাহাড়ে, কুলথি খেতে, সরষে খেতে ছড়িয়ে গেছে। একে রোদ বলে না– এ একরকমের স্বর্গীয় ভৈরবী অভিজ্ঞতা।’
দ্বিতীয় লাইন থেকে লেখক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছেন। চাইলে তিনি লাইনটা ভেঙে লিখতে পারতেন, কিন্তু তিনি প্রথা ভাঙলেন। একটা লম্বা লাইনে এমন কতগুলো শব্দের নিরিবিছন্ন প্রয়োগ করলেন যা বারবার পড়ার পরেও, দারুণ এক রেশ তৈরি করছে। গল্পের প্লট জঙ্গল। তিনজন মুখ্য চরিত্রে। গল্পের কেন্দ্রে আছে বাঘ শিকার এবং সম্পর্কের এক নিদারুণ টানাপোড়েন। এমন প্লট যদিও বুদ্ধদেববাবু প্রচুর লিখেছেন। তবে নগ্ন নির্জনের মতো এহেন অরণ্য এবং জীবনের মেলবন্ধন খুব কমই করেছেন।

‘একদল ঘুঘু গিন্নি জামরঙের ওপর সাদা ফুটকি ফুটকি বালাপোশ মুড়ে কুলথিখেতের মাঝে একটি কালো কলাগাছের পাতায় সারি বেঁধে বসে ঘুম-ভাঙানো নরম নূপুর বাজিয়ে চলেছে ঘুঘুর-ঘুঘুরর-ঘু। ঘুঘুরঘুঘুরর-ঘু।’ একটানা একটা লাইন। বিভিন্ন শব্দ। কিছু প্রচলিত, আবার কিছু অপ্রচলিত। তবুও সেই শব্দের সঠিক প্রয়োগে কী চমৎকার বাক্য তৈরি হয়েছে।
এই উপন্যাসে তিনি বিভিন্ন পাখিদের দেখিয়েছেন, যাদের ইংরেজি নাম আমরা জানলেও, বাংলা নাম জানা নেই। লেখক এখানে ধনেশ পাখির কথা উল্লেখ করেছেন, যে পাখির তেলে বাত সারে। অথচ ধনেশ পাখিই যে আমাদের বহু পরিচিত হর্নবিল। উপন্যাস একটু এগোনোর পরেই লেখক এক চমকপ্রদ শব্দ প্রয়োগ করে বসেন। ‘রাকেশ বলল, থাক ওসব কথা শ্রুতি। সব প্রিকণ্ডিশাণ্ড, কপালে যা আছে, মানে যা ছিল, তা ঘটেছে।’ প্রিকণ্ডিশাণ্ড! প্রথমে মনে হবে শব্দটা কোনও বাংলা শব্দ, কিন্তু খুঁজলে পাওয়া যাবে এটি ইংরেজি শব্দ Preconditioned। ঘুরেফিরে আসতে হয় সেই প্রয়োগের জায়গায়। যাকে বলে একদম টু দ্য পয়েন্ট।
লেখক প্রতি অনুচ্ছেদে এক নিদারুণ আবহ তৈরি করে গিয়েছেন, যে আবহের প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে আপামর বাঙালি। ধূলিমলিন শব্দের প্রয়োগ আর কজন এমনভাবে করতে পেরেছেন? আমরা বুদ্ধদেব গুহকে কোট করতে যে লাইনগুলো ব্যবহার করে থাকি, বা যে লাইনগুলো লোকমুখে ঘোরে, তার অধিকাংশ এই উপন্যাসের অংশ।
যে সময়ে এই উপন্যাস লেখা, তখন এমন সহজ বাংলা ভাষার মধ্যে এমন ইংরেজি শব্দ গুঁজে দেওয়ার চল ছিল না। গুহবাবু সেই ধারা ভাঙার চেষ্টা করলেন। আমাদের চলতি জীবনের এমন কিছু ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ তিনি লেখার মধ্যে রাখতে চাইলেন। জীবনকে জীবনের মতো সহজ করে দেখার মতো। একটুও বাড়তি কিছু নয়।
‘শ্রুতি বসে বসে ভাবতে লাগল, প্রত্যেকেরই মনে মনে বোধ হয় অনেক স্বপ্ন থাকে– যেসব স্বপ্ন কোনওদিন নিজের জীবনে সত্যি হয় না– কিন্তু তাদের স্বপ্ন অন্যের মধ্যে সত্যি হয়ে দেখা দেয়– জীবনের ধূলিমলিন গেরুয়া একঘেয়েমিতে হঠাৎ হঠাৎ রোদ-পড়া অভ্রর কুচির মতো সেসব স্বপ্ন ঝিকমিক করে ওঠে।’

লেখক প্রতি অনুচ্ছেদে এক নিদারুণ আবহ তৈরি করে গিয়েছেন, যে আবহের প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে আপামর বাঙালি। ধূলিমলিন শব্দের প্রয়োগ আর কজন এমনভাবে করতে পেরেছেন? আমরা বুদ্ধদেব গুহকে কোট করতে যে লাইনগুলো ব্যবহার করে থাকি, বা যে লাইনগুলো লোকমুখে ঘোরে, তার অধিকাংশ এই উপন্যাসের অংশ।
‘রাকেশের মনে হয়, একবার কাউকে তেমন করে ভালোবাসলে, কারও ভালোবাসা তেমন করে পেলে, সে ভালোবাসা নিশ্চয়ই সারাজীবন থাকে। সাইকেল চড়া একবার শিখে ফেললে কেউ যেমন ইচ্ছে করেও তা ভুলে যেতে পারে না– সত্যিই তেমন করে কাউকে ভালোবেসে ফেললে শত চেষ্টা করেও তাকে আর ভোলা যায় না। যাকে ভালোবাসা যায় সে দূরে যেতে পারে, মরে যেতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা কেউ ভোলে না। তা সব সময় বুকের মধ্যে ঘুঘুর গানের মতো ঘুমিয়ে থাকে।’ যৌবন শিকারি গুহ ছাড়া এমন লাইন আর কেইবা লিখতে পারবে? জঙ্গলের ভেতরের প্রতিটা মুহূর্ত তিনি হুবহু তুলে ধরেছেন। আমাদের মনের ভিতরের ইচ্ছের সঙ্গে সেগুলোর মিলন ঘটিয়েছেন।
যতবার পড়ব, ততবার নতুন মনে হবে। ততবার বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠবে। ফেড আউট শব্দটার বাংলা করলে কী হবে? অদৃশ্য? মিলিয়ে যাওয়া? কিন্তু লেখক আবার একটা ইংরেজি শব্দের অব্যর্থ প্রয়োগ করে বাজিমাত করলেন।
‘…আমার ভারি ইচ্ছে করে আমার কোনো ভীষণ সুখের মুহূর্তে এমন সুন্দর কোনো পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনোদিন আমি জাস্ট ফেড-আউট করে যাব। তারপর আমাকে কেউ ডাকলেও আমি ফিরব না– আমি নিজে ডাকলেও আমি আর সাড়া দেব না। অথচ আমি আমার চারপাশের অন্ধকারেই ছড়িয়ে থাকব– ঝিঁঝির ডাক হয়ে থাকব, জোনাকি হয়ে থাকব– তারার আলোয় দ্যুতিমান শিশিরবিন্দু হয়ে থাকব, ঝরাপাতা হয়ে থাকব– অথচ শরীরে– এই স্থুল রক্ত মাংসের শরীরে আমি থাকব না।’
যতবার পড়ব, ততবার নতুন মনে হবে। ততবার বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠবে। ফেড আউট শব্দটার বাংলা করলে কী হবে? অদৃশ্য? মিলিয়ে যাওয়া? কিন্তু লেখক আবার একটা ইংরেজি শব্দের অব্যর্থ প্রয়োগ করে বাজিমাত করলেন।

উপন্যাসের মধ্যভাগে লেখক লিখছেন, ‘জোড় করে বলতে ইচ্ছে করল, আমাকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখো– অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখো, হে সূর্য, হে সুপুরুষতম সুপুরুষ, হে আনন্দের আনন্দ। আমাকে আরও অনেক দিন, অনেক দিন তোমার আলোয় ভরা পৃথিবীতে, তোমার পাখিডাকা বনে বনে একটি মুগ্ধ ভক্ত অনাবিল মন নিয়ে সুন্দরের খোঁজে খোঁজে ফেরাও।’ আহা! সুন্দরের পূজারী সুন্দরের খোঁজে ফেরাতে বলছেন। ঝড়ের মতো লাইন। সব ঘেঁটে দিয়ে চলে যাওয়ার মতো একটা প্রার্থনা।
যে বয়স এবং সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি এই লাইনগুলো লিখেছেন, তখনও জীবনের শুরুর মুহূর্ত। এর অনেক পরে তাঁর কালজয়ী লেখা বাংলা সাহিত্যে এসেছে। গুহ মশাইয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর লেখার দোসর হয়েছে। তিনি যতবার জঙ্গলে গিয়েছেন, ততবার সেই মখমলে অভিজ্ঞতা ধরা পড়েছে তাঁর লেখায়।
জীবনের মতো মেদহীন রাখতে চেয়েছেন ‘নগ্ন নির্জন’-কে। ঘুরেফিরে জঙ্গলের কথা এলেও, সেই জঙ্গলের ইতিহাস নিয়ে তিনি কথা বলেননি। উপরন্তু চরিত্রগুলোর সঙ্গে জঙ্গলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। গতি এনেছেন উপন্যাসে। হয়তো তাঁর পরবর্তীকালে লেখা উপন্যাসের গঠন এবং বাক্যের বাঁধুনি আরও মজবুত, কিন্তু ‘নগ্ন নির্জন’-এর মতো কুলুকুলু উদাসীনতা আর কোথায়?
এই উপন্যাসের প্রচ্ছদ করেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখক বন্দুক নিয়ে অনেক তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। শিকারের প্রাথমিক ধাপগুলো সহজভাবে বুঝিয়েছেন। বাঘ শিকারের কথা ছত্রে ছত্রে ফিরে এসেছে। যুবক বুদ্ধদেব তখন জীবনে যা দেখেছেন, তাই ছবির মতো তুলে ধরেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা ভক্তরা বলে থাকেন, লালাদা কোথাও গেলে সেখানে চুপচাপ বসে থাকতে ভালবাসেন। সেই জায়গার সঙ্গে আত্মিকতা তৈরি করেন। ঘুরতে গিয়ে তিনি লেখেন না। ফিরে এসে লিখতে বসেন।
জীবনের মতো মেদহীন রাখতে চেয়েছেন ‘নগ্ন নির্জন’-কে। ঘুরেফিরে জঙ্গলের কথা এলেও, সেই জঙ্গলের ইতিহাস নিয়ে তিনি কথা বলেননি। উপরন্তু চরিত্রগুলোর সঙ্গে জঙ্গলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। গতি এনেছেন উপন্যাসে। হয়তো তাঁর পরবর্তীকালে লেখা উপন্যাসের গঠন এবং বাক্যের বাঁধুনি আরও মজবুত, কিন্তু ‘নগ্ন নির্জন’-এর মতো কুলুকুলু উদাসীনতা আর কোথায়? যুবক বুদ্ধদেবের অ্যামেচারিশ ‘নগ্ন নির্জন’ যে এত বছর পরেও পাঠযোগ্য! এত বছর বাদেও শিহরণ জাগে এই উপন্যাস পড়লে।

উপন্যাসের একেবারে শেষের দিকে তিনি বলছেন, ‘বনে-পাহাড়ে তখন বেশ রোদ উঠে গেছে। পাতায় পাতায় রোদ ঝিলমিল করছে। ধনেশ পাখিগুলো হাঁক হাঁক হুঁক হুঁক করছে পাহাড়ে। আজকের সকালের মতো সুস্থ সুন্দর সান্ত্বনার সকাল রাকেশের জীবনে বহুদিন আসেনি। তার শ্রুতি, তার চিরদিনের জন্মজন্মের শ্রুতির এতদিনে সংস্কার-মুক্তি ঘটেছে– যা হয়তো এই পরিবেশে না হলে সম্ভব ছিল না।’
সত্যিই সম্ভব ছিল না। তরুণ পাঠক মনে কীভাবে নাড়া দিতে হয়, তিনি ওই বয়সেই ধরতে পেরেছিলেন। বারবার তাঁর লেখার গঠন ভেঙেছেন। চবুতরা সাধু ভাষায় লেখা একটি বিতর্কিত উপন্যাস। সম্পূর্ণ স্বগতোক্তি। আবার চিঠিভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে মহুয়ার চিঠি, মহুলসুখার চিঠি, অবরোহী, পর্ণমোচী উল্লেখযোগ্য। এগুলো বুদ্ধদেব গুহর অফবিট কাজের নিদর্শন।
যে মানুষ সময়ের থেকে এগিয়ে থাকে, তিনিই তো সেরা হয়ে ওঠেন। বুদ্ধদেব গুহ সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। পাঠকদের কাঁধে হাত দিয়ে চলা বুদ্ধদেব এখনও হয়তো কোনও ‘নগ্ন নির্জন’-এ হেঁটে চলেছেন চুপিসাড়ে।
‘নগ্ন নির্জন’-এ উনি বারবার বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণ বিধির বাইরে গিয়ে কাজ করতে চেষ্টা করেছেন। কখনও ক্রিয়াপদ, বিশেষণ, বিশেষ্য সব ওলটপালট করে দিয়েছেন। নগ্নতায় মিশিয়ে দিয়েছেন জীবনের পারাপার। নির্জন করে তুলেছেন হৃদস্পন্দনকে। টপ্পা শুনিয়েছেন, দিয়েছেন ভাল থাকার হদিশ। যে মানুষ সময়ের থেকে এগিয়ে থাকে, তিনিই তো সেরা হয়ে ওঠেন। বুদ্ধদেব গুহ সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। পাঠকদের কাঁধে হাত দিয়ে চলা বুদ্ধদেব এখনও হয়তো কোনও ‘নগ্ন নির্জন’-এ হেঁটে চলেছেন চুপিসাড়ে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত